দুই পক্ষেরই চেষ্টা হচ্ছে বিজয়ের জন্য এক নতুন মানচিত্র তৈরি করা। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার জন্য জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন পথের সন্ধানে নেমেছেন
দুই পক্ষেরই চেষ্টা হচ্ছে বিজয়ের জন্য এক নতুন মানচিত্র তৈরি করা। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার জন্য জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন পথের সন্ধানে নেমেছেন ছবি: এএফপি

যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে বিজয়ী হওয়ার জন্য সারা দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটারের সমর্থন যথেষ্ট নয়—এটা সবার জানা। কিন্তু এ কথার অর্থ এই নয় যে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট পাওয়া না–পাওয়া কিছুই নির্ধারণ করে না। বিজয়ী হওয়ার জন্য দরকার কৌশলগতভাবে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোট নিশ্চিত করা। এ কৌশলের রয়েছে দুটি দিক। একটি দিক হচ্ছে ভৌগোলিক, অন্যটি জনমিতিবিষয়ক বা ভোটারদের বর্ণ, বয়স, শিক্ষাগত যোগ্যতা, জেন্ডারভিত্তিক বৈশিষ্ট্য। এই দুইয়ের সমন্বয় ঘটাতে পারলেই একজন প্রার্থী বিজয়ী হন। যেকোনো নির্বাচনেই এই দুই বিষয়ের দিকে সবার মনোযোগ থাকে, কিন্তু আসন্ন নির্বাচনে এই দুইয়ের গুরুত্ব আগের যেকোনো সময়ের চেয়ে বেশি হয়ে উঠেছে; কেননা দুই বিবেচনাপ্রসূত এবং প্রচলিত অনেক কিছুই ২০১৬ সালের নির্বাচনের ফলের সঙ্গে মেলেনি। তারপরও এবারের নির্বাচনে দুই প্রার্থী—জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প—আগের সব ধরনের নির্বাচনী কৌশলের চেয়ে ভিন্নভাবে অগ্রসর হচ্ছেন। এখন পর্যন্ত নির্বাচনী কৌশল ও প্রচারণার বিবেচনায় দেখা যায় যে অতীতে দুই দল যেভাবে নির্বাচনী মানচিত্রকে বিবেচনা করত এবার সেভাবে করছেন না। দুই পক্ষেরই চেষ্টা হচ্ছে বিজয়ের জন্য এক নতুন মানচিত্র তৈরি করা। হোয়াইট হাউসে যাওয়ার জন্য জো বাইডেন ও ডোনাল্ড ট্রাম্প নতুন পথের সন্ধানে নেমেছেন।

ভৌগোলিক বিবেচনায় যুক্তরাষ্ট্রকে যদি উত্তর ও দক্ষিণে ভাগ করা হয়, তবে উত্তরে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেশি, দক্ষিণে রিপাবলিকানদের। ডেমোক্র্যাটরা উত্তর-পূর্ব এবং পশ্চিমের অনেকগুলো রাজ্যে তাঁদের স্থায়ী ঘাঁটি তৈরি করেছেন; এই অঙ্গরাজ্যগুলো জন-অধ্যুষিত ফলে এখানে ইলেকটোরাল ভোট বেশি। ২০০০ থেকে ২০১২ পর্যন্ত নির্বাচনের হিসাবে সব মিলে এসব রাজ্যে আছে ২৪২টি ইলেকটোরাল ভোট, অঙ্গরাজ্যের ভোটের সংখ্যা ১৭। রিপাবলিকানদের ঘাঁটি হচ্ছে ২২টি রাজ্য—দক্ষিণাঞ্চল, মধ্যাঞ্চল, উত্তর–পশ্চিম ও দক্ষিণ–পশ্চিম। যুক্তরাষ্ট্রের মানচিত্র যখন লাল-নীলে চিত্রিত করা হয়, তখন দেশের এক বড় অংশই হয়ে ওঠে লাল; কিন্তু এগুলোয় কম মানুষের বসবাস, ফলে এদের কাছে ইলেকটোরাল ভোট কম—১৭৯টি। ১০টি রাজ্য কারও নিশ্চিত ঘাঁটি নয়, ভোটের সংখ্যা ১১৭। লড়াই হয় এই নিয়েই।

দেশের উত্তর-পূর্বের নিউইয়র্ক, ম্যাসাচুসেটস, ম্যারিল্যান্ড আর পশ্চিমের ক্যালিফোর্নিয়া, অরেগন, ওয়াশিংটন ডেমোক্র্যাটদের ঘাঁটির মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ, কিন্তু তাঁদের বিজয়ের চাবিকাঠি সব সময়ই থেকেছে দেশের মধ্য-পশ্চিমাঞ্চলের কয়েকটি রাজ্যের হাতে। উইসকনসিন, মিনেসোটা, মিশিগান, ইলিনয় ও পেনসিলভানিয়া—এগুলো ডেমোক্র্যাটদের সঙ্গে আছে দীর্ঘদিন ধরে। যে কারণে এগুলোকে বলা হয়ে থাকে ‘ব্লু ওয়াল’—ডেমোক্রেটিক দুর্গের দেয়াল। অন্যদিকে রিপাবলিকানদের দুর্গ বলে বিবেচিত হয় টেক্সাস, অ্যারিজোনা, জর্জিয়া, টেনেসি ও ইন্ডিয়ানা। যে রাজ্যগুলো রিপাবলিকানদের ঘাঁটি, সেগুলোয় ডেমোক্র্যাটরা প্রায় কখনোই কামড় বসাতে পারেনি। এর সঙ্গে যখনই ফ্লোরিডা যুক্ত হয়েছে, তখনই রিপাবলিকানদের জয় নিশ্চিত হয়েছে; ডেমোক্র্যাটরা চেষ্টা করেছে ফ্লোরিডা ধরে রাখতে। ১৯৭২ সাল থেকে সব নির্বাচনে ফ্লোরিডা জয় না করে কেউই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হননি।

বিজ্ঞাপন

ভৌগোলিক এই বিভক্তি কেবল মানচিত্রের বিষয় নয়; আঞ্চলিক চরিত্র ও বসবাসকারীদের বৈশিষ্ট্য বিবেচনায় নির্বাচনী অঙ্কের হিসেবে যেসব অঙ্গরাজ্যের গুরুত্ব বেশি এবং যেখানে প্রতিদ্বন্দ্বিতা হতে পারে তাঁদের দুই ভাগে ভাগ করা হয়—রাস্ট বেল্ট বা মরচে ধরা এলাকা এবং সান বেল্ট বা সূর্যালোকিত এলাকা। রাস্ট বেল্ট হচ্ছে সেই রাজ্যগুলো, যেগুলো একসময় শিল্পাঞ্চল ছিল; এখন ভারী শিল্পের অবসান হলেও ম্যানুফ্যাকচারিং ও খনির কাজই বেশি। এখানে গত কয়েক দশকে অর্থনীতি নাজুক হয়েছে, বসবাসকারীদের মধ্যে নিম্নমধ্যবিত্ত ও শ্রমজীবীর সংখ্যা বেশি। একসময় শ্রমিক ইউনিয়নের শক্তিশালী অবস্থান থাকার কারণে পরিবারগুলো এখনো উদারনৈতিক রাজনীতির সমর্থক। নির্বাচনের বিবেচনায় রাস্ট বেল্টের রাজ্যগুলো হচ্ছে পেনসিলভানিয়া, ওহাইও, উইসকনসিন, মিশিগান, আইওয়া ও ইন্ডিয়ানা।

শিল্পনির্ভর নয় এবং আবহাওয়ার দিক থেকে শীতপ্রধান নয়, সেসব এলাকা হচ্ছে সান বেল্ট। সান বেল্টের রাজ্যগুলো হচ্ছে দেশের দক্ষিণাঞ্চলের বেশ কিছু অঙ্গরাজ্য, পশ্চিমের ক্যালিফোর্নিয়া, দক্ষিণ–পশ্চিমের টেক্সাস, অ্যারিজোনা, নেভাডা। এখানের অর্থনীতির কাঠামো ভিন্ন এবং বিকাশমান, এখানে জনসংখ্যায় মধ্যবিত্তের আধিক্য এবং চিন্তাভাবনার দিক থেকে ক্যালিফোর্নিয়া ছাড়া অন্য রাজ্যে রক্ষণশীলতাই প্রধান। ফলে দুই দল যখন তাদের নির্বাচনী বক্তব্য ও কৌশল নির্ধারণ করেন, তখন তাদের বিবেচনায় থাকে তারা কোন এলাকায় সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটের জন্য চেষ্টা করবে।

সামাজিক কাঠামো, অর্থনীতি, মূল্যবোধ ও অতীতের সাংগঠনিক শক্তির বিবেচনায় ডেমোক্র্যাটরা রাস্ট বেল্টের দেয়াল ধরে রাখতে চান—লড়াইটা হয় ওহাইওতে। ১৯৭২ সালের পর থেকে নির্বাচনে ওহাইওর ভোটাররা কখনো রিপাবলিকান কখনো ডেমোক্র্যাটদের ভোট দিয়েছেন। আর এই রাজ্যের ভোট যিনি পেয়েছেন, তিনিই হোয়াইট হাউসের বাসিন্দা হয়েছেন। রাস্ট বেল্টের একটি রাজ্য, ইন্ডিয়ানা, ১৯৭২ সাল থেকে এ পর্যন্ত একবার মাত্র ডেমোক্র্যাট প্রার্থীকে জিতিয়েছে; অন্যদিকে সান বেল্টের নেভাডা গত কয়েক নির্বাচনে রিপাবলিকানদের থেকে দূরে সরে এসেছে।

বিজ্ঞাপন

ডেমোক্রেটিক পার্টির প্রার্থী হিলারি ক্লিনটন ধরে নিয়েছিলেন এই দেয়াল অক্ষুণ্ন থাকবে। কিন্তু প্রচারণার কৌশলের দুর্বলতা, তাঁর প্রার্থিতা বিষয়ে দলের একাংশের ক্ষোভ, এক বড়সংখ্যক ভোটারের অনুপস্থিতি, সর্বোপরি এই অঙ্গরাজ্যগুলোর ব্যাপারে অবহেলা যে এই রাজ্যগুলো ডেমোক্র্যাটদের স্থায়ী ঘাঁটি, ফলে এগুলোয় নজর দেওয়ার দরকার নেই—এগুলো তাঁর পরাজয়ের কারণ হয়ে ওঠে। বলা হয় যে ডেমোক্রেটিক পার্টি তার শিকড় থেকে সরে গেছে, দল গরিব ও মধ্যবিত্তদের প্রতিনিধিত্ব করতে পারছে না; দল হয়ে উঠেছে উচ্চমধ্যবিত্ত এবং ধনীদের স্বার্থের প্রতিনিধি। অন্যদিকে, ট্রাম্পের জনতুষ্টিবাদী কথাবার্তা এবং আবারও শিল্পকারখানা আমেরিকায় ফিরিয়ে এনে এই অঞ্চলের পুরোনো গৌরব পুনঃপ্রতিষ্ঠা করবেন—এই প্রতিশ্রুতিতে মুগ্ধ হয়ে অনেক ডেমোক্র্যাট ভোটার তাঁকে সমর্থন জানান। সান বেল্টে নিজের ঘাঁটি অটুট রেখে ডেমোক্র্যাটদের ঘরে হানা দিয়ে বিজয়ী হন ট্রাম্প। প্রশ্ন ওঠে, এটা ডেমোক্র্যাটদের সমর্থনের ভিত্তিকেই দুর্বল করে দিল কি না, ট্রাম্পের বিজয় ব্যতিক্রম, নাকি নতুন নির্বাচনী মানচিত্রের সূচনা?

২০১৮ সালের মধ্যবর্তী নির্বাচনে ডেমোক্র্যাটরা আশাতীত ভালো ফল করে প্রতিনিধি পরিষদ তাঁদের করায়ত্ত করে; সারা দেশেই তাঁদের ফল ছিল লক্ষ করার মতো। কিন্তু ২০২০ সালে কে প্রার্থী হবেন এবং তিনি কোন শ্রেণির কাছে আবেদন জানাতে চান, তিনি ব্লু ওয়াল পুনঃপ্রতিষ্ঠায় নজর দেবেন, নাকি ভিন্নভাবে বিজয়ের চেষ্টা করবেন, সেই প্রশ্ন থেকেই গিয়েছিল। ভিন্ন কৌশলের প্রশ্ন উঠেছিল এই কারণেও যে ইতিমধ্যে রিপাবলিকানদের ঘাঁটি সান বেল্টের অ্যারিজোনা এবং টেক্সাসে ডেমোক্র্যাটদের সমর্থন বেড়েছে, ২০১৮ সালের নির্বাচনে এই দুই রাজ্যেই শুধু নয়, দক্ষিণের জর্জিয়ায়ও ডেমোক্র্যাট প্রার্থীরা ভালো ফল করেন। এর অন্যতম কারণ হচ্ছে অ্যারিজোনা ও টেক্সাসের জনসংখ্যা কাঠামোয় বদল—একসময় যেগুলো ছিল এককভাবে শ্বেতাঙ্গ সংখ্যাগরিষ্ঠ, সেখানে বেড়েছে ভিন্ন বর্ণের মানুষ—বিশেষত হিস্পানিক জনগোষ্ঠী। শ্বেতাঙ্গ প্রগতিশীলদের সঙ্গে এই জনগোষ্ঠীর জোট তৈরি হলে রিপাবলিকানদের পরাজিত করা অসম্ভব নয়।

বিজ্ঞাপন

মধ্যপন্থী জো বাইডেন ডেমোক্রেটিক পার্টির মনোনয়ন লাভের পর অনেকের আশঙ্কা ছিল যে তিনি ডেমোক্র্যাটদের হারানো অঙ্গরাজ্যগুলোয় আবেদন তৈরি করতে পারবেন না; অনেকেই ভাবছিলেন রিপাবলিকানদের ঘাঁটিতে হানা দেওয়ার চেয়ে ঘর সামাল দেওয়ার চেষ্টাই হবে তাঁর কৌশল। কিন্তু এখন পর্যন্ত জো বাইডেনের কৌশল যা দেখা যাচ্ছে, তাতে এটাই মনে হয় যে ভৌগোলিক বিবেচনায় এত দিনের প্রচলিত কৌশল কেবল রাষ্ট্র বেল্টের ওপর এককভাবে নির্ভর না করে তিনি চাইছেন রিপাবলিকানদের ঘাঁটিতে ট্রাম্পকে ব্যস্ত করে ফেলা এবং বিজয়ের চেষ্টা করা। তাতে তিনি সফল হলে এক নতুন ধরনের নির্বাচনী মানচিত্র তৈরি হবে। এখন পর্যন্ত জনমত জরিপের ইঙ্গিত হচ্ছে বাইডেনের কৌশল কাজে দিচ্ছে। যে টেক্সাসে ১৯৭৬ সালের পরে কোনো ডেমোক্র্যাট প্রার্থী বিজয়ী হয়নি, ট্রাম্প হিলারির চেয়ে ৯ শতাংশ ভোট বেশি পেয়েছিলেন, সেখানে দুজনের সমর্থন সমান। অ্যারিজোনায় হিলারি পরাজিত হয়েছিলেন ৩ শতাংশের বেশি ভোটের ব্যবধানে, বাইডেন এগিয়ে আছেন প্রায় ৪ শতাংশ বেশি সমর্থন নিয়ে।

এর বিপরীতে ট্রাম্পের বিজয়ের কৌশল হচ্ছে তাঁর নিজের ঘাঁটি রক্ষা করা এবং ফ্লোরিডা জিতে নেওয়া। জনমত জরিপ বলছে, ২০১৬ সালের অপ্রত্যাশিত চমক ছাড়া ডেমোক্র্যাটদের দেয়াল ভাঙা তাঁর পক্ষে সম্ভব নয়। সেদিকে তিনি নজর দিচ্ছেন বলেও মনে হয় না। তিনি তাঁর কট্টর সমর্থকদের ওপরে নির্ভর করছেন। আশা করছেন, নির্বাচনের দিন তারা তাঁকে বিজয় উপহার দেবেন, আর সেই বিজয়ের কেন্দ্রে থাকবে ফ্লোরিডা। তাতে তিনি সমর্থ হলে আরেক ধরনের নির্বাচনী মানচিত্রের দেখা মিলবে, যাতে ভূগোল নয় আদর্শিকভাবে উদ্বুদ্ধদের ওপরে নির্ভর করেই জয়ের দেখা মিলবে।

আলী রীয়াজ: যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির সরকার ও রাজনীতি বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর।

মন্তব্য পড়ুন 0