বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এখন স্থানীয় লোকজন নিজেরাই নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন। রোহিঙ্গারাও অনিরাপদ। রাতে পাহাড়ি ক্যাম্পগুলোতে সুনসান অন্ধকার। বিভিন্ন রোহিঙ্গা সন্ত্রাসী গ্রুপ চাঁদা আদায় ও বিভিন্ন ধরনের নির্যাতন করছে তাদের ওপর। সবশেষ ২১ অক্টোবর সশস্ত্র রোহিঙ্গা গ্রুপ রোহিঙ্গাদের একটি মাদ্রাসায় ছয়জন শিক্ষক ও ছাত্রকে হত্যা করে। অবস্থাদৃষ্টে মনে হচ্ছে, রোহিঙ্গাদের আন্তদলীয় কোন্দল ও অপরাধের মাত্রা বেড়েই চলছে। এটি এখন বাংলাদেশের বড় মাথাব্যথা।

গত ২৯ সেপ্টেম্বর রাতে রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহকে উখিয়ার কুতুপালংয়ে শরণার্থীশিবিরে গুলি করে হত্যা করে সন্ত্রাসীরা। মুহিবুল্লাহ রোহিঙ্গাদের মিয়ানমারে প্রত্যাবাসনে শরণার্থীদের সংগঠিত করেন। তাদের পক্ষে বিশ্বজনমত সৃষ্টির জন্য তিনি দেশে-বিদেশে কাজ করেছেন। বিদেশি রাষ্ট্রপ্রধান ও নেতাদের সঙ্গে বৈঠক করেছেন। ২০১৯ সালের ২৫ আগস্ট শরণার্থীশিবিরে মিয়ানমারের গণহত্যাবিরোধী মহাসমাবেশে কয়েক লাখো লোকের সমাবেশ ঘটান তিনি। ওই দিনটিকে তিনি ‘গণহত্যা দিবস’ হিসেবে ঘোষণা দেন। তখনকার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সঙ্গেও তিনি কথা বলার সুযোগ পেয়েছেন। ফলে সবার নজর কাড়েন তিনি। তাঁর জনপ্রিয়তা ও প্রভাবে প্রতিদ্বন্দ্বী গ্রুপ ঈর্ষান্বিত হয় এবং বিরোধিতা করে, যারা প্রত্যাবাসনের বিরোধী। তারাই এই হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে বলে ধারণা।

মুহিবুল্লাহর পরিবার ও অভিজ্ঞ মহলের ধারণা, যারা এই কাজটি করেছে তারাও রোহিঙ্গা। রোহিঙ্গাদের মধ্যে বিবদমান গ্রুপ ও কোন্দল রয়েছে। এ ছাড়া মিয়ানমারের গোয়েন্দারা রোহিঙ্গাদের সঙ্গে মিশে তথ্য সংগ্রহ ও পাচার করছে। মিয়ানমার চায় না প্রত্যাবাসন আন্দোলন জোরদার হোক। গুপ্তচরেরাই গ্রুপিং ও কোন্দলে উসকানি দিচ্ছে বলে ধারণা।

সবশেষ এবং গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হলো, মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে মিয়ানমারের সশস্ত্র গোষ্ঠী আরসা (আরাকান রোহিঙ্গা স্যালভেশন আর্মি) জড়িত। মুহিবুল্লাহর ছোট ভাই হাবিবুল্লাহ এ হত্যাকাণ্ডের একজন প্রত্যক্ষদর্শী। তিনি হত্যাকাণ্ডে অংশগ্রহণকারী একজন আরসা নেতাসহ তিনজনের নামও বলেছেন। এই হত্যাকাণ্ড সরকারের জন্য বিব্রতকর ও অতিরিক্ত চাপ।

বাংলাদেশ সরকার এই হত্যাকাণ্ড তদন্তে উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করেছে। রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সংখ্যা বৃদ্ধি ও নজরদারি বাড়ানো হয়েছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসনের জন্য কূটনৈতিক তৎপরতা বাড়ানো হচ্ছে। ইতিমধ্যে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৭৫ ও ৭৬তম অধিবেশনে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে জোরালো বক্তব্য দেন। এদিকে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে পশ্চিমা দেশগুলো, ঢাকায় তাদের দূতাবাস ও আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংস্থাগুলো উদ্বেগ প্রকাশ করেছে এবং সুষ্ঠু তদন্ত ও বিচার দাবি করেছে।

কিন্তু রোহিঙ্গা সমস্যা সমাধানে ও তাদের প্রত্যাবাসনে যারা কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারে, তারা কেউ মুখ খোলেনি। মিয়ানমারের নিকট প্রতিবেশীরা মুখে কুলুপ এঁটেছে। তাদের ব্যবসায়িক, অর্থনৈতিক ও ভূরাজনৈতিক স্বার্থে তারা রোহিঙ্গা সংকট নিরসনে ভূমিকা রাখছে না। অথচ তারাই মূল খেলোয়াড়। রাশিয়া ও চীন জাতিসংঘে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যা বিষয়ে মিয়ানমারের পক্ষ নিয়েছে।

একই কারণে ভারতও তাদের দলে যোগ দিয়েছে। ফলে কোনো উদ্যোগই কার্যকর হচ্ছে না। অথচ রোহিঙ্গা সংকট সমাধানে তাদের পূর্ণ নাগরিক অধিকার নিয়ে মিয়ানমারে নিজ বাস্তুভিটায় প্রত্যাবাসনই একমাত্র সমাধান। কিন্তু তা সুদূরপরাহত। কিন্তু বাংলাদেশের পক্ষে শুধু নিজ প্রচেষ্টায় কোনো ত্বরিত ও কার্যকর ব্যবস্থা গ্রহণ করা সম্ভব নয়।

কক্সবাজার-টেকনাফের রোহিঙ্গা ক্যাম্পগুলো অপরাধীদের অভয়ারণ্য হয়ে উঠেছে। মুহিবুল্লাহ হত্যার আগ পর্যন্ত রোহিঙ্গা শিবিরগুলোতে ১০৮টি হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে (বাংলাদেশ পিস অবজারভেটরি-এর প্রতিবেদন)। দিন দিন সেখানে খুন, রাহাজানিসহ অপরাধ বাড়ছে। আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর চেষ্টা সত্ত্বেও রোহিঙ্গা শিবিরে কমপক্ষে ১৪টি রাজনৈতিক ও মাদক পাচারকারীদের সন্ত্রাসী গ্রুপ রয়েছে। যারা নিজেদের মধ্যেও অন্তর্দ্বন্দ্বে লিপ্ত।

আধিপত্য বিস্তার ও সম্পদ অর্জনের জন্য এসব গ্রুপ রাহাজানিতে লিপ্ত এবং মাদক পাচারে নেতৃত্ব দেয়। রোহিঙ্গা শিবিরের পরিবেশকে অস্থির করার জন্য মিয়ানমার থেকে অস্ত্র আসছে বলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান নিজে জানিয়েছেন সাংবাদিকদের প্রশ্নোত্তরে। ওদিকে মুহিবুল্লাহ হত্যাকাণ্ডে বিদেশি সংস্থার জড়িত থাকার বিষয়েও সন্দেহ প্রকাশ করা হচ্ছে। রোহিঙ্গাদের প্রত্যাবাসন ঠেকাতে শরণার্থীশিবিরে মিয়ানমার গোয়েন্দাগিরি অব্যাহত রেখেছে এবং তাদের চরেরা অন্তঃকোন্দল ও অপরাধে উসকানি দিচ্ছে বলে অভিযোগ রয়েছে।

রোহিঙ্গা শরণার্থীরা বাংলাদেশের জন্য একটি বিরাট বোঝা। পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আশ্রয়শিবির বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শিবির। বাংলাদেশের মতো একটি কম আয়তনের ও জনঘনবসতির দেশের পক্ষে এই বোঝা বহন করা কঠিন। বাংলাদেশের অর্থনীতি ও প্রশাসনের ওপর এটি অতিরিক্ত চাপ। বাংলাদেশ প্রতি মাসে ব্যয় করেছে তিন শ মিলিয়ন মার্কিন ডলার, যা বাংলাদেশি টাকার আড়াই হাজার কোটি টাকার বেশি।

এ ছাড়া দাতাগোষ্ঠী, জাতিসংঘের সংস্থা এবং এনজিওগুলো শরণার্থীদের আর্থিক ও অন্যান্য সাহায্য করছে। এরপরও বাংলাদেশের ব্যয় হয়েছে গত ৪ বছরে ১ লাখ ২০ হাজার কোটি টাকা। এ ছাড়া প্রশাসনিক এবং নারী-পুরুষ ও শিশুদের জনস্বাস্থ্য শিক্ষাবিষয়ক সহায়তা দিচ্ছে সরকার।

ইতিমধ্যে কক্সবাজার-টেকনাফ থেকে শরণার্থীদের চাপ কমানো এবং আরও উন্নত জীবনযাপনের জন্য নোয়াখালীর ভাসানচরে এক লাখ শরণার্থীকে অস্থায়ী আবাসনের ব্যবস্থা করা হয়েছে। এ পর্যন্ত সেখানে প্রায় ২০ হাজার শরণার্থীকে পাঠানো হয়েছে। অনিশ্চয়তার মধ্যে এবং জনমানবশূন্য ভাসানচরে যেতে রোহিঙ্গারা আগ্রহী ছিল না, এমনকি জাতিসংঘসহ আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠনগুলো বন্যা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের আশঙ্কায় এ স্থানান্তরে বিরোধিতা করলেও পরবর্তীতে নিজেদের অবস্থান পরিবর্তন করে। জাতিসংঘের সংস্থাগুলো সেখানে মানবিক সহায়তা দেবে। সেখানে ইতিমধ্যে ৩৪টি এনজিও কাজ করছে। আগামী ছয় মাসের মধ্যে আরও ৮০ হাজার শরণার্থীকে সেখানে স্থানান্তর করা হবে।

শরণার্থী জীবনের নির্যাতন ও দুঃখগাথা সাহিত্যকর্মে আপসহীনভাবে তুলে ধরার জন্য ২০২১ সালের নোবেল সাহিত্য পুরস্কার পেয়েছেন তানজানিয়ান বংশোদ্ভূত যুক্তরাজ্যপ্রবাসী লেখক আবদুলরাজাক গুরনাহ। তাঁর সাহিত্যের বিষয়বস্তু তাঁকে এই পুরস্কারে ভূষিত করেছে। সেটি হলো, শরণার্থী জীবনের বিড়ম্বনা ও দুর্দশা। বাংলাদেশের রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ক্ষেত্রেও তা-ই ঘটছে। কীভাবে তাদের এই দুর্দশার মোচন হবে, সেই প্রচেষ্টায় নেতৃত্ব দিচ্ছিলেন রোহিঙ্গা নেতা মুহিবুল্লাহ।

কিন্তু তাতে বাদ সাধল স্বার্থান্বেষী মহল, যারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের প্রত্যাবাসন চায়নি। এখনেই নতুন মোড় নিয়েছে রোহিঙ্গা শরণার্থী সমস্যার সমাধানে। আর মিয়ানমারের সামরিক সরকার তা হতে দেয়নি এবং দেওয়ার সম্ভাবনাও নেই।

তবে একটি আশার আলো ক্ষীণ হলেও দৃশ্যমান হচ্ছে। মিয়ানমারের বর্তমান সামরিক সরকার কর্তৃক ক্ষমতাচ্যুত ও কারাবন্দী অং সান সু চি ও তার দল এনএলডি (ন্যাশনাল লীগ ফর ডেমোক্রেসি) সমর্থনে গঠিত হয়েছে প্রবাসী সরকার এনইউজি (ঐক্য সরকার)। তারা রোহিঙ্গা শরণার্থীদের ব্যাপারে নমনীয়। মিয়ানমারের জনগণের সমর্থনে এনইউজি আন্দোলন করছে এবং সরকারবিরোধী সশস্ত্র গ্রুপগুলো এনইউজির সহযোগে মিয়ানমারের সামরিক সরকারের বিরুদ্ধে সক্রিয় রয়েছে।

রোহিঙ্গারাও তাদের সমর্থন দিয়েছে বলে আমরা জানতে পারছি। ফলে মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার এ আন্দোলন রোহিঙ্গাদের মধ্যে আশা সঞ্চার করছে। আমরাও চাই মিয়ানমারে গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠা হোক, রোহিঙ্গাসহ সেখানকার সব জাতিগোষ্ঠী তাদের নাগরিক অধিকার ফিরে পাক। এতেই ঘুচতে পারে ভাগ্যপীড়িত রোহিঙ্গাদের দুর্দশাময় জীবন।

লে. কর্নেল (অব.) মো. রুহুল আমীন অধ্যক্ষ ও লেখক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন