default-image

নতুন বছরে নির্বাচনকে কেন্দ্র করে পশ্চিমবঙ্গের শিক্ষিত শ্রেণির এমন সব অভিজ্ঞতা হচ্ছে, যাতে তাঁরা প্রতিদিনই আঁতকে উঠছেন। তিনটি অভিজ্ঞতার কথাই এখানে আলোচনা করব। প্রথমে জাতপাতের রাজনীতির কথাই ধরা যাক।

হিন্দু ‘কাস্ট সিস্টেম’ বা জন্মের ভিত্তিতে কাজ ও কাজের ভিত্তিতে সামাজিক অবস্থানের রাজনীতি তেমন জোরালোভাবে রাজ্যের নির্বাচনী রাজনীতিতে ছিল না। এর কারণ অবিভক্ত বাংলায় মুসলমান সংখ্যাগুরু ছিল। স্বাধীনতার পরে কমিউনিস্টরা জাতপাতের পরিচয় (আইডেনটিটি) ভিত্তিক রাজনীতি রুখলেন। পশ্চিমবঙ্গে জাতপাতের রাজনীতির সাম্প্রতিক শুরুটা হলো মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরে।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় একটি তপসিলি জাতি নমশূদ্রদের বোঝালেন কীভাবে তাঁরা তাঁদের প্রাপ্য সম্মান বাম আমলে পাননি। তাঁরা মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়কে সমর্থন করলেন। জাতপাতের রাজনীতিকে কাজে লাগিয়ে বহুজন সমাজ পার্টি নামে একটি দলের প্রতিষ্ঠাতা কাশীরাম উত্তর ভারতে কংগ্রেসকে একেবারে কোণঠাসা করে দিয়েছিলেন। তবে কাশীরাম একজন ধর্মকেন্দ্রিক রাজনীতির প্রবক্তা ছিলেন না, ছিলেন মানুষের অধিকারের আন্দোলন থেকে উঠে আসা এক শ্রমিকনেতা। সেই অবস্থান থেকেই তপসিলি জাতিগুলোকে তিনি বোঝালেন কীভাবে তাঁদের উন্নয়নের বাইরে রাখা হয়েছে। এই কাজই তাঁর মতো করে পশ্চিমবঙ্গে করলেন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়।

বিজ্ঞাপন

উত্তর ভারতের দল হিসেবে ভারতীয় জনতা পার্টি (বিজেপি) আরও গভীরভাবে জাতের রাজনীতি বুঝতে ও করতে সক্ষম। তারা সমাজের সর্বস্তরে ঢুকে জাতের রাজনীতি দিয়ে ধীরে ধীরে তৃণমূল কংগ্রেসকে কোণঠাসা করল, ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে বিজেপি ও তৃণমূলের তপসিলি জাতির ভোট সমান সমান হয়ে গেল—৪৪ শতাংশ। পশ্চিমবঙ্গে ২০১১ সালের আদমশুমারি মোতাবেক ২৩ শতাংশ মানুষ তপসিলি জাতিভুক্ত, অর্থাৎ ১০ কোটির মধ্যে প্রায় আড়াই কোটি মানুষ তপসিলি। ফলে, তাঁদের ভোট নির্বাচনের ভবিষ্যৎ অনেকাংশে নির্ধারণ করতে পারে।

প্রশ্ন হলো কীভাবে বিজেপি পশ্চিমবঙ্গের তপসিলি জাতিভুক্ত মানুষের মধ্যে জায়গা করে নিল। এর অনেক ব্যাখ্যার মূলটি হলো ভারতের বৃহত্তম হিন্দুধর্মের থেকে সম্মান পাওয়ার একটা ইচ্ছা সব জাতের মানুষেরই রয়েছে। তাঁরা হিন্দু ধর্মের হলেও তাঁদের সম্মান এই সমাজে ব্রাহ্মণ বা ক্ষত্রিয়দের মতো উঁচু জাত বলে চিহ্নিত মানুষের সঙ্গে তুলনীয় নয়। ফলে, উঁচু জাতের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের পাশাপাশি স্বীকৃতি পাওয়ার ইচ্ছা সমাজের নিচের দিকে থাকা মানুষের রয়েছে। কাশীরাম জোর দিয়েছিলেন লড়াইয়ের ওপরে, নরেন্দ্র মোদি জোরটা দিলেন স্বীকৃতির ওপরে।

উত্তর প্রদেশের সমাজবিজ্ঞানী বদ্রি নারায়ণ দেখিয়েছেন কীভাবে কখনো নীচু জাতের মানুষের দেবদেবীদের মেনে নিয়ে, কখনো-বা মন্দির বানিয়ে দিয়ে তাদের মন জয় করেছে হিন্দুত্ববাদী সংগঠন রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘ। এই পরিকল্পনার অংশ হিসেবে বিজেপি একদিকে তপসিলি জাতিভুক্ত এক অপরিচিত মানুষকে ভারতের রাষ্ট্রপতি করেছে, আর অন্যদিকে বাংলাদেশের ওড়াকান্দিতে গিয়ে নমশূদ্র সমাজের মন্দিরে মাথা ঠেকিয়ে এসেছেন নরেন্দ্র মোদি। নানাভাবে নানান গোষ্ঠী ও জাতির মধ্যে ঢুকে তাদের কাছে টানার যে রাজনীতি পশ্চিমবঙ্গে শুরু করেছিলেন মমতা, এবারের নির্বাচনে সেটিকে নতুন রূপ দিয়েছেন মোদি।

দ্বিতীয়ত, এভাবে খোলাখুলি সাম্প্রদায়িক মেরুকরণ পশ্চিমবঙ্গ সাম্প্রতিক অতীতে দেখেনি। কোচবিহার জেলার শীতলকুচিতে গুলি চলল, চারজন মুসলিম মারা গেলেন। বিজেপির নেতা বললেন, এ রকম আরও হবে, কারণ এতে বিভাজনের রাজনীতি করতে সুবিধা হবে। ২০১৬ সালে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের রাজনৈতিক উপদেষ্টা রজার স্টোন বলেছিলেন, রাজনীতিতে ভালোবাসার থেকে ঘৃণার কার্যকারিতা অনেক বেশি। সেটাই এবারের নির্বাচনে দেখা গেল।

বিজ্ঞাপন

সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতির বৈশিষ্ট্যটি এবারের নির্বাচনে বাংলাদেশকে টেনে আনার প্রবণতা থেকেও স্পষ্ট। একদিকে নমশূদ্র সম্প্রদায়ের ধর্মীয় স্থান পরিদর্শনে যাচ্ছেন প্রধানমন্ত্রী, আর তাঁরই মন্ত্রিসভায় দুই নম্বরে থাকা স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ বলছেন, ‘বাংলাদেশের উন্নয়ন সীমান্ত এলাকার নিচুতলায় পৌঁছয়নি...ফলে গরিব মানুষ এখনো খেতে পাচ্ছে না। সে কারণেই অনুপ্রবেশ চলছে। আর যারা অনুপ্রবেশকারী তারা শুধু বাংলাতেই থাকছে তা নয় ভারতের বিভিন্ন রাজ্যে ছড়িয়ে পড়ছে।’ অর্থাৎ একদিকে বাংলাদেশের হিন্দু সম্প্রদায়ের সঙ্গে একটা যোগ স্থাপনের চেষ্টা চলছে যাতে পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে তার সুবিধা পাওয়া যায়। আবার অন্যদিকে অনুপ্রবেশের তত্ত্ব চলছে পশ্চিমবঙ্গে ভোট মেরুকরণ করতে। এই ঘৃণার রাজনীতিও এবারে দেখল পশ্চিমবঙ্গ।

আরও একটি বিষয় চোখে পড়ার মতো। পশ্চিমবঙ্গের বাঙালি সম্পর্কে একটা সার্বিক ধারণা আছে যে জায়গাটি সাংস্কৃতিক দিক থেকে অনেক এগিয়ে। এই ধারণা তৈরি হয়েছে উনিশ শতকের শিক্ষাদীক্ষার বাতাবরণ ও কিছু মানুষের জগৎজোড়া খ্যাতিকে কেন্দ্র করে, যেমন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, সত্যজিৎ রায়, অমর্ত্য সেন প্রভৃতি। এই ধরনের তথ্য কতটা ভুল তা এই নির্বাচনে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে বিজেপি। অমর্ত্য সেনকে নিয়মিত গালাগালি করে বিজেপি। তাঁকে পশ্চিমবঙ্গে কেন্দ্রীয় সরকারি প্রেক্ষাগৃহে অনুষ্ঠান পর্যন্ত করতে দেওয়া হয় না, শান্তিনিকেতনে তাঁর বাড়ি কেড়ে নেওয়ার চেষ্টা করছে বিশ্বভারতী কর্তৃপক্ষ। আর রবীন্দ্রনাথের বিশ্বভারতী নিয়ে কথা যত কম বলা যায় ততই ভালো। এই কেন্দ্রীয় সরকারের প্রতিষ্ঠানটিকে ধ্বংস করতে উঠেপড়ে লেগেছেন ওই বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য। অথচ কলকাতায় সংস্কৃতিপ্রেমী বাঙালি এখন পর্যন্ত একটা বড় মিছিল বের করতে পারেনি এসবের প্রতিবাদে। এর থেকেই বোঝা যায় কলকাতাকেন্দ্রিক বাঙালির সংস্কৃতির শিকড় কতটা ‘গভীর’।

মজার কথা হলো, পশ্চিমবঙ্গসহ গোটা ভারতে বিজেপির সাফল্যের প্রধান কারণ এটাই। বিজেপি এটা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে সংস্কৃতি, শিক্ষা, পড়াশোনা এসবের মধ্যে নিজেদের যাঁরা আবদ্ধ রাখেন, তাঁদের সঙ্গে সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষ, অশিক্ষিত, অর্ধশিক্ষিত বাঙালি, দরিদ্র কৃষক, শ্রমিক, তপসিলি জাতি ও উপজাতির মানুষের জীবনযাপনের কোনো সম্পর্কই নেই। বিজেপি যে শুধুই জাতপাতের রাজনীতি বা অসাম্প্রদায়িক মেরুকরণের রাজনীতি করেছে তা নয়, তারা একটা শ্রেণিকেন্দ্রিক রাজনীতিও (ক্লাস পলিটিকস) করেছে, যে রাজনীতিতে রবীন্দ্রনাথ থেকে অমর্ত্য সেন ব্রাত্য, যেখানে কলকাতার শিক্ষিত সম্প্রদায়ের সঙ্গে গ্রামগঞ্জের গরিবের কোনো সম্পর্ক নেই।

মাঠপর্যায়ে কথাটা যে খুব ভুল তা বলা যাবে না। বস্তুত সারা পৃথিবীতেই কথাটা সত্যি। যে কারণে ইরানে ২০০৫ সালের নির্বাচনে শহরে জনপ্রিয় হাসেম রাফসানজানি হেরে যান গ্রামের ধর্মীয় আন্দোলন থেকে উঠে আসা নেতা মাহমুদ আহমেদিনেজাদের কাছে। পশ্চিমবঙ্গে বামপন্থীরাও দীর্ঘদিন কলকাতায় হারতেন আর গ্রামে জিততেন গ্রাম-শহরের এই বৈপরীত্যকে কাজে লাগিয়েই।

সারা ভারতে গ্রাম-শহরের রাজনীতি করে খুব ভালো ফল পেয়েছে বিজেপি। তারা বোঝাতে সক্ষম হয়েছে, শহরের ওই যে মানুষ যারা বিশিষ্ট স্থপতি লুটইন্সের তৈরি দক্ষিণ দিল্লিতে থাকেন, জওহরলাল নেহরু বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন বা খান মার্কেটে বাজার করেন তাঁরা গ্রামীণ মানুষের সংস্কৃতি, তাঁদের ধর্মীয় আচার, তাঁদের সংস্কার বোঝেন না, সম্মানও করেন না। এরা যে ভারতের খুব ছোট একটা অংশ সেটা আর এখন মানুষ বিবেচনার মধ্যে আনছেন না।

গ্রামীণ ভারত আর শহরের ইন্ডিয়ার মধ্যে যে ৭০ বছরের ফারাক, মোহনদাস করমচাঁদ গান্ধীর পরে তা সম্ভবত সবচেয়ে ভালো বুঝেছেন যে গুজরাটি, তাঁর নাম নরেন্দ্র দামোদর দাস মোদি। ভারতের খেটে খাওয়া, গরিব মানুষকে শিক্ষিত ভারতের থেকে দূরে নিয়ে যাওয়ার এই রাজনীতি তাঁদের আরও বেশি করে ধর্মের দিকে, ধর্মান্ধতার দিকে এবং অবশ্যই মুসলমান বিদ্বেষের দিকে ঠেলে দিচ্ছে। পিছিয়ে পড়া ভারত দেশের সংবিধান, নির্বাচন, গণতন্ত্র বা বিচারব্যবস্থা থেকে বিরাট কিছুই পায়নি, তাই একে রক্ষা করার কোনো দায়ও এই দরিদ্র ভারতের নেই।

পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনে এই দরিদ্র ভারতের ভোটই বেশি। তাই ক্রমে ছোট হচ্ছেন রবীন্দ্রনাথ, সত্যজিৎ, অমর্ত্য সেনরা। যদিও তাঁদের কাজের বড় অংশই হচ্ছে ধনী ও দরিদ্রের বৈষম্য নিয়ে, গরিব-বড়লোকের ফারাক নিয়ে এবং এই ফারাক কীভাবে কমানো যায় তা নিয়ে। জাতপাত, ধর্মের পাশাপাশি এই ধর্মভিত্তিক-শ্রেণিকেন্দ্রিক রাজনীতিও এবারে দেখল পশ্চিমবঙ্গ। নির্বাচনে যেই জিতুক, উত্তর ভারতের হাওয়া পশ্চিমবঙ্গে তাই এক নতুন রাজনীতির জন্ম দিল এবারের পয়লা বৈশাখে।

শুভজিৎ বাগচি প্রথম আলোর কলকাতা সংবাদদাতা

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন