অভিনেত্রী পরিচালক নন্দিতা দাসের নাম শুনে, চেহারা দেখে আর তাঁর মুখে চমৎকার বাংলা শুনে তাঁকে সবাই বাঙালি বলেই ধরে নেন। কিন্তু কাল বাংলা একাডেমিতে ঢাকা লিট ফেস্টে আমার মতো অনেককে অবাক করে তিনি জানালেন যে তিনি বাঙালি নন!

কাল নন্দিতা দাস পরিচালিত ‘মান্টো’ ছবির বাংলাদেশ প্রিমিয়ার শো হলো। অসাধারণ এক মানুষের ওপর তৈরি এক অসাধারণ চলচ্চিত্র। উর্দু সাহিত্যের এক অনন্য প্রতিভা সা’দত হাসান মান্টোকে ভারত ও পাকিস্তান দুই দেশই তাদের লোক মনে করে। তাঁর ওপর ২০১৫ সালে পাকিস্তানেও ‘মান্টো’ নামেই ছবি তৈরি হয়েছে।

১৯৪৭ সালে ভারত বিভাগের সময় পাঞ্জাব ও বাংলাকে কেটে দুই টুকরো করে ভারত ও পাকিস্তানের পাতে একেক টুকরো তুলে দেওয়া হয়। এ সময় সাম্প্রদায়িক দাঙ্গায় পাঞ্জাব ও বাংলায় অসংখ্য মানুষ প্রাণ হারায়। লাখ লাখ মানুষ বাস্তুচ্যুত হয়। দেশ বিভাগের এই নির্মমতার ছবি এঁকে যে কজন উর্দু লেখক উর্দু সাহিত্যে একটি বিশিষ্ট ধারা প্রবর্তন করেছেন, তাঁদের পুরোভাগে আছেন মান্টো।

মান্টো তাঁর সময় থেকে এগিয়ে ছিলেন বলে বিতর্ক তাঁর পিছু ছাড়েনি। তাঁর লেখার বিরুদ্ধে অশ্লীলতার অভিযোগ ওঠায় বারবার তাঁকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়েছে। ব্রিটিশ ভারতে যেমন, তেমনি আযাদ পাকিস্তানে। সব সময় দুই দেশের মুক্তমনা মানুষ তাঁর পক্ষে দাঁড়িয়েছেন। নিজের লেখা সম্পর্কে আদালতে দাঁড়িয়ে তিনি বলেছেন, ‘আমি তো পর্নোগ্রাফি লেখক নই, আমি সাহিত্যিক। আমরা চোখের সামনে যা ঘটেছে দেখতে পাই, তা নিয়ে লিখতে আপত্তি কেন?’ তাঁর লেখায় খোলা চোখে দেখা সমাজের রূঢ়, অপ্রিয় বাস্তবতা ও অসংগতির অকুণ্ঠ প্রকাশ সমাজকে, রাষ্ট্রযন্ত্রকে বিচলিত করে তুলত।

নন্দিতা দাস মান্টোর পুরো জীবনকে ধরেননি। মান্টোর জীবনের সবচেয়ে উত্তাল সময় ১৯৪৬ থেকে ১৯৫০ এই চার বছরকে অবলম্বন করে তিনি মান্টোকে তুলে ধরেছেন। মান্টো তাঁর জীবনের এই সময়ের অভিজ্ঞতার আলোকেই সবচেয়ে শক্তিশালী, আলোচিত-বিতর্কিত গল্পগুলো লিখেছেন। ছবির ঘটনাস্থল বোম্বে ও লাহোর। যে দুই শহরে ভারত বিভাগের অব্যবহিত পূর্বে ও পরে মান্টো বাস করতেন। গত বছর মান্টোকে নিয়ে নন্দিতা দাস ‘ইন ডিফেন্স অব ফ্রিডম’ নামে একটি শর্টফিল্ম তৈরি করেন। সেটি ‘টরন্টো আন্তর্জাতিক ফিল্ম ফেস্টিভালে’ প্রশংসিত হয়েছে। ফিল্মটি ইউটিউবে পাওয়া যায়।

মান্টো ছবিতে মান্টোর জীবনের মাত্র চার বছরের চিত্রায়ণে উঠে এসেছে বোম্বেতে ইসমত চুঘতাই, কৃষণ চন্দর, অভিনেতা অশোক কুমার ও শ্যাম চাড্ডার সঙ্গে তাঁর সখ্য, দাঙ্গার কারণে পাকিস্তানে চলে যাওয়া, পাকিস্তানে ‘ঠান্ডা গোস্ত’ গল্প নিয়ে অশ্লীলতার মামলা, স্ত্রী সাফিয়া ও পারিবারিক জীবন, অর্থসংকট, অত্যধিক মদ্যপান, দেশ বিভাগের পরিণতি থেকে তৈরি হওয়া মানসিক যাতনা এবং সর্বোপরি একজন লেখকের স্বাধীনতার জন্য তাঁর ক্লান্তিহীন লড়াইয়ের কথা।

মান্টোর বিখ্যাত গল্পগুলোকে নন্দিতা দাস অসাধারণ মুনশিয়ানার সঙ্গে ছবিতে তুলে এনেছেন। ছবি শুরু হয়েছে ‘দশ রুপাই’ গল্প দিয়ে। যে গল্পে এক শিশু যৌনকর্মীর একদিন খদ্দেরের সঙ্গে বেড়াতে যাওয়ার কথা আছে। তাঁর বিখ্যাত গল্প ‘ঠান্ডা গোস্ত’ কিংবা ‘খোল দো’কে পরিচালক অতুলনীয় নৈপুণ্যে কাহিনির সঙ্গে মিশিয়ে দিয়েছেন। দেশ বিভাগের সময় নারী নির্যাতনের ভয়াবহতা অস্বস্তিকরভাবে তুলে ধরার জন্য এই দুটো গল্পের জন্য পাকিস্তানে মান্টোকে কাঠগড়ায় দাঁড়াতে হয়। ছবির শেষ হয় মান্টোর আরেকটি বিখ্যাত গল্প ‘টোবা টেক সিং’ দিয়ে। দেশভাগের পর ভারত ও পাকিস্তান সরকার হিন্দু পাগলদের ভারত এবং মুসলিম পাগলদের পাকিস্তানে পাঠানোর সিদ্ধান্ত নেয়। লাহোরের এক মানসিক হাসপাতালে থাকা একজন পাগল বিষাণ সিংয়ের বাড়ি পাকিস্তানের টোবা টেক সিংয়ে। সে ভারত–পাকিস্তান চেনে না। কেবল তার গ্রাম টোবা টেক সিং যেতে চায়। অবশেষে দুই দেশের সীমানায়, নোম্যান্স ল্যান্ডে কাঁটাতারের দুই পাশে দুই পা রেখে বিষাণ সিং মারা যায়। সেই নোম্যান্স ল্যান্ডই যেন হয়ে যায় বিষাণ সিংয়ের টোবা টেক সিং।

মান্টো চরিত্রে নাকি ইরফান খানের অভিনয় করার কথা ছিল। তাঁর বদলে নওয়াজউদ্দিন সিদ্দিকীকে নিয়ে নন্দিতা ঠিক কাজটি করেছেন। বিখ্যাত অভিনেতা ইরফান খানের মধ্যে বেচারা মান্টোকে হারিয়ে ফেলার ঝুঁকি ছিল। কিন্তু নওয়াজ চমৎকারভাবে নিজেকে মান্টোতে রূপান্তরিত করেছেন। ছোট ছোট একেকটি দৃশ্যে জাভেদ আখতার, ঋষি কাপুর, পরেশ রাওয়ালের মতো হেভিওয়েটদের দেখে ভালো লেগেছে।

বাংলাদেশের কথাসাহিত্যিক আখতারুজ্জামান ইলিয়াস বলতেন যে তিনি পাঠকের মনে আরাম দেওয়ার জন্য লেখেন না। তিনি লেখেন যেন তাঁর লেখা পড়ে সমাজের নানা অসংগতি দেখে মানুষের মনে অস্বস্তি সৃষ্টি হয়। গতকাল নন্দিতা দাসও তাঁর ছবি সম্পর্কে একই কথা বললেন। হ্যাঁ, এই ছবি দেখে মনে একটি অস্বস্তি সৃষ্টি হয় বৈকি। মান্টোর লেখা পড়ে যে অস্বস্তি ও হাহাকার একসঙ্গেই হয়, তা–ই এই ছবির পরতে পরতে ছড়িয়ে আছে। একজন সাহসী, সময়ের চেয়ে অগ্রসর মানুষ মান্টোর জীবনের ছবিও তাঁর গল্পের মতো সমাজের নানা অসংগতির দিকে, অবিচারের প্রতি, স্বার্থান্ধতার প্রতি আমাদের মনোযোগ টানে।

মান্টো তাঁর একটি গল্পে বলেছেন, ‘এ কথা বলো না যে এক লাখ হিন্দু বা এক লাখ মুসলমান মারা গেছে। বলো যে দুই লাখ মানব সন্তান নিশ্চিহ্ন হয়ে গেছে।’ মান্টো এ কথাগুলো যে সময়ে বলেছেন, তারপর অনেকগুলো বছর পার হয়ে গেছে। কিন্তু আজও মানুষ তার ধর্মীয় পরিচয়, জাতীয় পরিচয়ের নিগড় ভেঙে মানুষ পরিচয় নিয়ে দাঁড়াতে পারেনি; বরং মানুষ যেন আরও বেশি করে হিন্দু, মুসলমান, ইহুদি, খ্রিষ্টান হয়ে উঠছে। হিংসায় আরও উন্মত্ত হচ্ছে পৃথ্বী।

প্রায় পৌনে এক শতাব্দী আগে মান্টোকে বাক্‌স্বাধীনতার জন্য লড়তে হয়েছিল। আজও বিশ্বব্যাপী লেখক–শিল্পীদের সেই লড়াই করতে হচ্ছে, বারবার হেরে যেতে হচ্ছে, হারিয়ে যেতে হচ্ছে, মরতে হচ্ছে।

গতকাল বাংলা একাডেমি মিলনায়তনে ছিল উপচে পড়া ভিড়। দাঁড়িয়ে, ফ্লোরে বসে অনেকে ছবি দেখেছেন মন্ত্রমুগ্ধের মতো। তাঁদের অধিকাংশই তরুণ, অধিকাংশই মান্টোর কোনো লেখা পড়েননি। অনেকে এর আগে মান্টোর নামও হয়তো শোনেননি। এই ছবি দেখে তাঁরা এই সময়ে মান্টোর প্রাসঙ্গিকতা যদি বুঝতে পারেন, যদি উর্দু সাহিত্যের এই দুর্দান্ত লেখককে পড়ার জন্য তাঁদের মধ্যে আগ্রহ তৈরি হয়, যদি তাঁরা বাক্‌স্বাধীনতা ও মুক্তচিন্তার প্রতীক মান্টোকে নিজের মধ্যে শনাক্ত করেন, তবেই অ্যাকটিভিস্ট নন্দিতা দাসের ‘মান্টো’ নির্মাণ সার্থক হবে। মান্টো সিনেমা দেখে মান্টো পাঠে মন দিলে মান্টো ও নন্দিতা দাশ, উভয়ের প্রতিই সুবিচার করা হবে।

চৌধুরী মুফাদ আহমদ। প্রাবন্ধিক।
[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন