সাংবিধানিক বাধ্যবাধকতা থাকা সত্ত্বেও গত ৫০ বছরে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগের লক্ষ্যে কোনো সরকারই একটি আইন প্রণয়ন করেনি, যার কারণ আইনের মাধ্যমে সৃষ্ট কিছু বাধ্যবাধকতা মেনে নিতে তাদের অনিচ্ছা। অর্থাৎ আইনের অনুপস্থিতিতে নিজেদের পছন্দের ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার ব্যাপারে যে ‘স্বাধীনতা’ ভোগ করছিলেন, তা পরিহার করতে তারা অনাগ্রহী ছিল। সরকারের এমন অনাগ্রহের পরিপ্রেক্ষিতে আমরা সুজনের পক্ষ থেকে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ প্রদানের লক্ষ্যে একটি আইন প্রণয়নের দাবি বহুদিন থেকেই করে আসছি। ড. শামসুল হুদা কমিশনও তাঁদের বিদায়কালে এ–সম্পর্কিত একটি আইনের খসড়া রেখে যান। কিন্তু এ বিষয়ের প্রতি সরকার, রকিবউদ্দীন কমিশন, নূরুল হুদা কমিশন কেউই ভ্রুক্ষেপও করেনি। এ অবস্থায় অনেক নির্বাচন বিশেষজ্ঞ, আইনজ্ঞ ও বিশিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করে ড. শামসুল হুদা কমিশনের রেখে যাওয়া খসড়াটি এবং আমাদের আশপাশের দেশগুলোর সংশ্লিষ্ট আইন পর্যালোচনা করে আমরা আমাদের খসড়াটি তৈরি করেছি।

স্বচ্ছতার সঙ্গে সঠিক ব্যক্তিদের যাতে নির্বাচন কমিশনে নিয়োগ দেওয়া যায়, সে লক্ষ্যে প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় আমরা অনেকগুলো বিধান অন্তর্ভুক্ত করেছি। প্রথমত, আইনের খসড়ায় প্রধান নির্বাচন কমিশনার ও অন্য কমিশনারদের যোগ্যতা-অযোগ্যতার মাপকাঠি নির্ধারণ করে তাদের ব্যাকগ্রাউন্ড সম্পর্কে তথ্য প্রদান ও প্রকাশের বিধান আমরা রেখেছি, যাতে কোনো অনাকাঙ্ক্ষিত ব্যক্তি কমিশনে নিয়োগ না পান। দ্বিতীয়ত, সঠিক ব্যক্তিদের বাছাইয়ের পদ্ধতি হিসেবে প্রস্তাবিত খসড়ায় সংসদ নেতা, বিরোধী দলের নেতা ও সংসদের তৃতীয় বৃহৎ দল মনোনীত তিনজন সাংসদ এবং চারজন দলনিরপেক্ষ ও সুনামসম্পন্ন ব্যক্তির সমন্বয়ে সাত সদস্যের একটি ‘অনুসন্ধান কমিটি’ গঠনের বিধান রাখা হয়েছে। তৃতীয়ত, অনুসন্ধান কমিটির কার্যপ্রণালি এবং পুরো নিয়োগপ্রক্রিয়ায় স্বচ্ছতা যাতে নিশ্চিত হয়, সে লক্ষ্যে গণশুনানি, প্রতিবেদন প্রকাশ, কমিটি সভার কার্যবিবরণী লিপিবদ্ধকরণ ও প্রকাশ ইত্যাদি বিধান খসড়ায় সংযুক্ত করা হয়েছে। চতুর্থত, নির্বাচন কমিশনের কার্যক্রমে ধারাবাহিকতা রক্ষার বিধানও আমরা খসড়া আইনে অন্তর্ভুক্ত করেছি।

শঙ্কার বিষয় হলো যে আইন প্রণয়ন না করা হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন নিয়োগ পাবে অতীতের মতো অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে, যে ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সংসদকে পাস কাটিয়েই আবারও কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে

সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে আইনমন্ত্রী দাবি করেছেন যে আইনটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যদিও গত ১২ বছরের ক্ষমতায় থাকাকালে আওয়ামী লীগ সরকার এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই নেয়নি, কিন্তু পরবর্তী নির্বাচন কমিশন নিয়োগের পূর্বে তা প্রণয়নের যথেষ্ট সময় নেই। মন্ত্রীর এ যুক্তির পরিপ্রেক্ষিতে আমাদের বক্তব্য ছিল যে আগামী ফেব্রুয়ারি মাসের মাঝামাঝি সময়ে বর্তমান কমিশনের মেয়াদ উত্তীর্ণ হবে এবং এখনো প্রায় তিন মাস সময় আছে এবং সরকারের সদিচ্ছা থাকলে এ সময়ের মধ্যে আমাদের খসড়া এবং সরকারের তৈরি খসড়া দুটি বিবেচনায় নিয়ে স্বার্থসংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের সঙ্গে আলাপ-আলোচনার ভিত্তিতে একটি বিল তৈরি করে আগামী সংসদ অধিবেশনে তা পাস করা যাবে। কারণ, এটি তিন-চার পৃষ্ঠার একটি সহজ ও সংক্ষিপ্ত আইন। আর পরবর্তী সংসদ অধিবেশন পর্যন্ত অপেক্ষা না করে রাষ্ট্রপতি কর্তৃক অধ্যাদেশ জারির মাধ্যমেও খসড়াটিকে দ্রুতই আইনে পরিণত করা যেতে পারে, যা করতে মন্ত্রী অসম্মত।

প্রসঙ্গত, আইনমন্ত্রী সম্ভবত ভুলে গেছেন যে সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী, যাতে সংবিধানের প্রায় এক-তৃতীয়াংশের মতো পরিবর্তন করে এর খোলনলচে পরিবর্তন করে ফেলা হয়, মাত্র নয় দিনের ব্যবধানে পাস করা হয়। সাজেদা চৌধুরীর নেতৃত্বে সংবিধান সংশোধনের লক্ষ্যে গঠিত বিশেষ কমিটির সুপারিশসমূহ ২০১১ সালের ২০ জুন মন্ত্রিসভা অনুমোদন করে, যার চার দিন পর ২৫ জুন তা বিল আকারে সংসদে উত্থাপিত হয়। একই দিনে পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য দুই সপ্তাহের সময় দিয়ে আইন ও সংসদবিষয়ক মন্ত্রণালয়–সম্পর্কিত স্থায়ী কমিটিতে এটি প্রেরণ করা হয়। কমিটি চারটি উপদফা যুক্ত করার সুপারিশসহ মোট ৫৫ দফাসংবলিত প্রতিবেদন দাখিল করে ২৯ জুন। পরদিন, অর্থাৎ সংসদে উত্থাপনের পাঁচ দিনের মাথায় চলমান বাজেট অধিবেশনেই এর জন্য সংসদের কোনো বিশেষ অধিবেশনও ডাকা হয়নি, সংবিধানের পঞ্চদশ সংশোধনী বিলটি পাস হয়। ইচ্ছা করলে সরকার যে কত দ্রুততার সঙ্গে আইন, এমনকি সংবিধানের অতি গুরুত্বপূর্ণ সংশোধনীও পাস করতে পারে, এ তারই প্রমাণ।

অধ্যাদেশ জারি করে প্রস্তাবিত খসড়াটিকে আইনে পরিণত করার ব্যাপারে আইনমন্ত্রীর অসম্মতির কারণ হলো, এতে সংসদকে এড়িয়ে যাওয়া হবে, যা তিনি করতে চান না এবং যা আমরাও চাই না। তবে অধ্যাদেশ হিসেবে জারি করে খসড়াটিকে আইনে পরিণত করা হলেও এতে সংসদের সম্পৃক্ততা থাকবে। কারণ, বিধিমোতাবেক অধ্যাদেশটি পরবর্তী সংসদ অধিবেশনে অনুমোদনের জন্য পেশ করতে হবে। আর অধ্যাদেশ জারির পরিবর্তে বিলটি সরাসরি সংসদে পাস করার জন্য সংসদের একটি বিশেষ অধিবেশনও ডাকা যেতে পারে।

শঙ্কার বিষয় হলো যে আইন প্রণয়ন না করা হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন নিয়োগ পাবে অতীতের মতো অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে, যে ঘোষণা সরকারের পক্ষ থেকে এরই মধ্যে দেওয়া হয়েছে। অর্থাৎ, সংসদকে পাস কাটিয়েই আবারও কমিশনে নিয়োগ দেওয়া হবে।

অতীতে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগের ফলে আমরা রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশন পেয়েছি। এই দুই কমিশনের সদস্যদের চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে গুরুতর অসদাচরণেরই নয়, নূরুল হুদা কমিশনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে

উল্লেখ্য, অতীতের দুটি অনুসন্ধান কমিটিতে একজনও সাংসদ ছিলেন না। পক্ষান্তরে আমাদের প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় সাতজন অনুসন্ধান কমিটির সদস্যের মধ্যে তিনজনই হবেন সাংসদ। তাই আমাদের প্রস্তাবিত খসড়াটি গৃহীত হলে পরবর্তী নির্বাচন কমিশন নিয়োগে সাংসদদের গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা থাকবে এবং সংসদকে এড়িয়ে যাওয়া হবে না।

আর অতীতে অনুসন্ধান কমিটির মাধ্যমে অস্বচ্ছ পদ্ধতিতে নিয়োগের ফলে আমরা রকিবউদ্দীন কমিশন ও নূরুল হুদা কমিশন পেয়েছি। এই দুই কমিশনের সদস্যদের চরম পক্ষপাতদুষ্ট আচরণের ফলে আমাদের নির্বাচন প্রক্রিয়াই প্রায় ধ্বংস হয়ে গেছে। শুধু জালিয়াতির নির্বাচনের মাধ্যমে গুরুতর অসদাচরণেরই নয়, নূরুল হুদা কমিশনের বিরুদ্ধে ভয়াবহ দুর্নীতির অভিযোগও উঠেছে। বর্তমান সরকার কি এই দুই কমিশনের সব অপকর্মের দায় এড়াতে পারবে?

এ ছাড়া বর্তমান নূরুল হুদা কমিশন আমাদের নির্বাচনী ব্যবস্থাকে যে পর্যায়ে নিয়ে গেছে, তা থেকে উত্তরণ ঘটাতে না পারলে আমরা মহাসংকটের দিকে ধাবিত হতে পারি। আর এ উত্তরণের জন্য প্রয়োজন যোগ্য, নিরপেক্ষ ও সাহসী ব্যক্তিদের একটি আইন প্রণয়নের মাধ্যমে কমিশনে নিয়োগ দেওয়া। আর এ আইন এখনই প্রণয়ন করতে হবে, তা না হলে আইনের বিধানাবলি সাপেক্ষে সঠিক ব্যক্তিদের কমিশনে নিয়োগ দেওয়ার জন্য আরও পাঁচ বছর অপেক্ষা করতে হবে, যা জাতি হিসেবে আমাদের জন্য কাল হয়ে দাঁড়াতে পারে। পুরোপুরি ধ্বংস হয়ে যেতে পারে আমাদের নির্বাচনব্যবস্থাও, যা ভবিষ্যতে অনিয়মতান্ত্রিকভাবে ক্ষমতা বদলের পথ প্রশস্ত করবে। কারণ, নির্বাচনই সাংবিধানিক ও শান্তিপূর্ণভাবে ক্ষমতা বদলের একমাত্র পথ।

এ ছাড়া সংবিধানের ৪৮(৩) ধারা অনুযায়ী, শুধু প্রধানমন্ত্রী ও প্রধান বিচারপতি নিয়োগ ছাড়া রাষ্ট্রপতিকে প্রধানমন্ত্রীর সুপারিশ অনুযায়ীই সিদ্ধান্ত নিতে হয়। তাই রাষ্ট্রপতি কর্তৃক গঠিত অনুসন্ধান কমিটি প্রধানমন্ত্রীর পছন্দের ব্যক্তিদের নিয়েই গঠিত হবে। সে অনুসন্ধান কমিটি এবং তার সুপারিশে গঠিত নির্বাচন কমিশন কতটুকু গ্রহণযোগ্য এবং জনস্বার্থ সংরক্ষণ করতে সক্ষম হবে, তা নিয়ে অনিশ্চয়তা ও বিতর্ক থেকেই যাবে। এ কারণে নির্বাচন কমিশন নিয়ে যে চরম আস্থার সংকট বর্তমানে বিরাজ করছে, তা অব্যাহতই থাকবে, যা কারোর কাম্য হতে পারে না। তাই আমরা মনে করি, প্রেক্ষাপট ও গুরুত্বের বিবেচনায় জরুরি ভিত্তিতে নির্বাচন কমিশন নিয়োগ আইন প্রণয়ন এখন সময়ের দাবি এবং এর কোনো বিকল্প নেই।

বদিউল আলম মজুমদার সম্পাদক, সুশাসনের জন্য নাগরিক (সুজন)

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন