বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

১৯৮৭ সালের ১০ নভেম্বর বিরোধী দল আহূত সচিবালয় অবরোধ কর্মসূচি সফল করতে যুবলীগ কর্মী নূর হোসেন নিজের বুকে-পিঠে যথাক্রমে ‘স্বৈরাচার নিপাত যাক, গণতন্ত্র মুক্তি পাক’ স্লোগান উৎকীর্ণ করে মিছিলে যোগ দিয়েছিলেন। মিছিলটি জিপিওর মোড়ে এলে পুলিশ নূর হোসেনের বুকে সরাসরি গুলি করলে তিনি গুরুতর আহত হন। এরপর সহযোদ্ধারা তাঁকে হাসপাতালে নিয়ে যেতে থাকলে পুলিশ তাঁদের কাছ থেকে নূর হোসেনকে ছিনিয়ে নিয়ে শাহবাগে পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নিয়ে যায়।

১০ নভেম্বর বিবিসি বাংলায় সেদিনের ঘটনার বিবরণ দিয়েছেন সংবাদমাধ্যমটির বাংলাদেশ প্রতিনিধি ও সেই সময় বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রথম বর্ষের ছাত্র মোয়াজ্জেম হোসেন। এরশাদবিরোধী আন্দোলন করতে গিয়ে তিনিও সেদিন গ্রেপ্তার হন। তিনি পুলিশ কন্ট্রোল রুমে নূর হোসেনের লাশ পড়ে থাকতে দেখেছেন। কিন্তু সরকার জনরোষের ভয়ে নূর হোসেনের লাশ তাঁর মা–বাবার কাছে ফেরত দেয়নি। এক সপ্তাহ পর তাঁরা জানতে পারেন, নূর হোসেনকে জুরাইন কবরস্থানে দাফন করা হয়েছে। মোয়াজ্জেম হোসেনের প্রতিবেদন থেকে আমরা জানতে পারি অদম্য নূর হোসেন আন্দোলন সফল করতে কীভাবে জীবনের ঝুঁকি নিয়েছিলেন। তিনি মতিঝিলে ইকরাম হোসেন নামের এক কমার্শিয়াল শিল্পীকে ধরলেন তাঁর শরীরে স্লোগান উৎকীর্ণ করে দিতে। ইকরাম ইতস্তত করলে নূর হোসেন বলেন, আরও শ খানেক তরুণ এই স্লোগান শরীরে উৎকীর্ণ করে মিছিল করবেন। ফলে কেউ জানতে পারবেন না, এটি কার আঁকা।

নব্বইয়ে স্বৈরাচারের পতনের পর বেশ ঘটা করে গণতন্ত্র পুনরুদ্ধার দিবস, নূর হোসেন দিবস, তাজুল দিবস, ডা. মিলন দিবস, সেলিম-দেলোয়ার দিবস পালিত হতো। সময়ের ব্যবধানে সেসব দিবস ফিকে হয়ে আসে রাজনীতির নানা হিসাব-নিকাশে। অথচ গণতন্ত্রের জন্য আত্মাহুতি দেওয়া এই মানুষগুলো গণতন্ত্রের প্রতীকে পরিণত হয়েছিলেন।

গণতন্ত্রের জন্য নূর হোসেনসহ অনেক তরুণ জীবন দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই গণতন্ত্রের আজ কী হাল, সে কথা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদেরই বলে দিয়েছেন। তাঁর ভাষ্য, ‘নূর হোসেনের রক্তদানের মধ্য দিয়ে গণতন্ত্রের শৃঙ্খলমুক্তি ঘটলেও গণতন্ত্র এখনো প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি।’ নূর হোসেন আত্মাহুতি দিয়েছেন ৩৩ বছর আগে। এরপর বুড়িগঙ্গা দিয়ে অনেক পানি গড়িয়েছে। আওয়ামী লীগই সবচেয়ে বেশি সময়—প্রায় ১৮ বছর ধরে ক্ষমতায় ছিল ও আছে। তারপরও যদি দেশে গণতন্ত্র প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পেয়ে না থাকে, তার জন্য বিএনপি বা অন্য কোনো দলকে দায়ী করা যাবে না। দায় আওয়ামী লীগকেই নিতে হবে। আওয়ামী লীগ অর্থনৈতিক উন্নতির কৃতিত্ব নিলে গণতন্ত্রের অধোগতির দায়ও বহন করতে হবে।

সংবিধানের ৭ অনুচ্ছেদে বলা আছে: প্রজাতন্ত্রের সকল ক্ষমতার মালিক জনগণ। প্রশ্ন হলো সেই মালিকানা কীভাবে নির্ধারিত হবে? মালিকানা নির্ধারণের সর্বসম্মত ও সর্বজনস্বীকৃত উপায় হলো অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন। অতীতে আওয়ামী লীগ নেতারা প্রায়ই নালিশ করতেন, ক্ষমতার গর্ভে জন্ম নেওয়া দল সুষ্ঠু নির্বাচন দিতে পারে না। তারা রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানগুলোকে ব্যক্তি ও গোষ্ঠীস্বার্থে ব্যবহার করেছেন। দুর্ভাগ্যের বিষয়, তঁারা সুষ্ঠু নির্বাচনের কথা আর এখন বলেন না। নির্বাচন নিয়ে যে অভিযোগ বিএনপি ও জাতীয় পার্টির বিরুদ্ধে কেউ করতে পারেনি, সেই অভিযোগ আজ আন্দোলন–সংগ্রামের মধ্য দিয়ে গড়ে ওঠা এবং স্বাধীনতাসংগ্রামে নেতৃত্ব দেওয়া আওয়ামী লীগকে শুনতে হচ্ছে। এর চেয়ে পরিতাপের বিষয় আর কী হতে পারে?

ওবায়দুল কাদের বলেছেন, নূর হোসেনের আত্মদানের মাধ্যমে গণতন্ত্র শৃঙ্খলমুক্ত হয়েছে। শৃঙ্খলমুক্ত বলতে যদি তিনি স্বৈরাচারী শাসকের বিদায় বুঝিয়ে থাকেন, তা-ও হয়নি। কেননা এরশাদ আমলে রাজনৈতিক ক্ষেত্রে যেসব অনাচার ও অশুভ তৎপরতা ছিল, রাজনৈতিক কর্তৃত্বকে খর্ব করার চেষ্টা ছিল, তা এখনো আছে। ক্ষমতার দৃশ্যপট থেকে এরশাদ বিদায় নিলেও তাঁকে নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি টানাটানিও কম করেনি। শেষ পর্যন্ত এরশাদ আওয়ামী লীগের নৌকায় উঠেছেন এবং ক্ষমতার হিস্যা নিয়েছেন এবং নিজে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ দূত হয়েছেন। এরশাদ নেই। কিন্তু তঁার দল এখন আওয়ামী লীগকেই গণতন্ত্রের সবক দিচ্ছে। নির্বাচনকে তামাশা বলছে।

ওবায়দুল কাদের গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে সরকার কাজ করছে বলে মন্তব্য করেছেন। যেকোনো গণতান্ত্রিক দেশের তিনটি স্তম্ভ—নির্বাহী বিভাগ, আইনসভা ও বিচার বিভাগ। এখন তিনটি প্রায় একাকার হয়ে গেছে। সংসদীয় গণতন্ত্রে জাতীয় সংসদই রাজনীতির কেন্দ্রবিন্দু হওয়ার কথা থাকলেও তা হচ্ছে না। অদৃশ্য সুতার টানে চলছে সরকার। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের দ্বিতীয় পূর্বশর্ত স্বাধীন সংবাদমাধ্যম ও শক্তিশালী নাগরিক সমাজ। সংবাদমাধ্যমের হাত-পা বেঁধে দিতে সরকার একের পর এক আইন করছে। হুমকি-ধমকি দিচ্ছে। অন্যদিকে সরকার নাগরিক সমাজের অস্তিত্ব ততক্ষণ স্বীকার করে, যতক্ষণ তার পক্ষে থাকে। কোনো সমালোচনা সহ্য করে না। কিন্তু সরকারের নীতিনির্ধারকেরা বুঝতে চান না যে জিন্দাবাদ ও মুর্দাবাদ দেওয়ার জন্য নাগরিক সমাজের প্রয়োজন হয় না। দলীয় নেতা-কর্মীরাই যথেষ্ট। এরশাদ আমলে ৩১ বুদ্ধিজীবীর যুক্ত বিবৃতি অনেক রাজনৈতিক কর্মসূচির চেয়ে জনমনে বেশি নাড়া দিয়েছিল।

সংসদে বিরোধী দলের উপনেতা ও জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, ‘দেশে এখন সাংবিধানিক একনায়কত্ব চলছে।’ তিনি সংবিধানে ৭০ অনুচ্ছেদ বহাল রাখার ইঙ্গিত করেছেন।

দলের বিপক্ষে ভোট দেওয়া দূরে থাক, যে দেশে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরা স্বাধীনভাবে কথা বলতে পারেন না, সে দেশে গণতন্ত্র কখনোই প্রাতিষ্ঠানিক রূপ নিতে পারে না। আমাদের দেশে সত্যিকার সংসদীয় ব্যবস্থা কখনোই ছিল না, এখনো নেই। রাষ্ট্রপতির সব ক্ষমতা প্রধানমন্ত্রীর হাতে ন্যস্ত করলেই সংসদীয় গণতন্ত্র হয় না।

তবে আওয়ামী লীগ একটা বিষয়ে কৃতিত্ব দাবি করতে পারে যে তারা স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন যাঁরা করেছিলেন, আর যাঁরা পরাজিত হয়েছিলেন, তাঁদের সবাইকে ক্ষমতার স্বাদ দিয়েছেন। এ প্রসঙ্গে আমাদের এক সাংবাদিক বন্ধু শহীদুল জহিরের গল্পের রেশ টেনে লিখেছেন, মহল্লার নিরুপায় মুরব্বিরা যেভাবে কুয়া বন্ধ করে দিয়ে এতে পড়ে মারা যাওয়ার ঘটনাগুলো ঢেকে দিতে চেয়েছিলেন; আমাদের রাজনীতিকেরাও সেভাবে নূর হোসেনদের আত্মদানের কথা ভুলিয়ে দিতে চান।

নব্বইয়ের গণ-অভ্যুত্থানের পর বিএনপি যুদ্ধাপরাধীদের হাত ধরে এবং আওয়ামী লীগ স্বৈরাচারের হাত ধরে গণতন্ত্রকে প্রাতিষ্ঠানিক রূপ দিতে চাইছে।

কবি সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের বিখ্যাত কবিতা ‘কেউ কথা রাখেনি’। তার প্রথম পঙ্‌ক্তিটি ছিল এ রকম: কেউ কথা রাখেনি, তেত্রিশ বছর কাটলো, কেউ কথা রাখেনি। সুনীল তাঁর কবিতায় ব্যক্তিকে দেওয়া কথা না রাখার কথা বলেছেন। এই ব্যক্তিগত ক্ষতি হয়তো পুষিয়ে নেওয়া সম্ভব। না নিলেও ব্যক্তির বাইরে কাউকে স্পর্শ করে না। কিন্তু যাঁরা সেদিন গণতন্ত্র পুনরুদ্ধারের কথা বলে নূর হোসেনদের রাস্তায় নামিয়েছিলেন, জাতির কাছে তাঁদের ওয়াদা ভঙ্গ করার ক্ষতি বিশাল ও অপূরণীয়। নূর হোসেনের আত্মা আমাদের ক্ষমা করবে কি?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন