default-image

কয়েক দিন আগে এক জরুরি প্রয়োজনে আমাকে গভীর রাতে বাসার বাইরে বের হতে হয়েছিল। রাতের ঢাকার নির্জন চেহারা আমার খুব একটা পরিচিত নয়। কবি-সাহিত্যিকদের লেখায় রাতের ঢাকার সৌন্দর্য নিয়ে পড়েছি, গান শুনেছি। তবে জনবিরল ঢাকার রাতের যে রূপটি আমি সেদিন দেখেছিলাম, তাতে স্তম্ভিত না হয়ে পারিনি। সেই রাতে ঢাকাকে আমার আরও বেশি বিবর্ণ আর কদর্য বলে মনে হয়েছে। মনে হয়েছে, দিনের বেলা জনতার ঢলে অনেকটাই ঢাকা পড়ে যায় এই শহরের কদর্য দশা, ময়লা, আবর্জনা। কিন্তু নির্জন রাতের ঢাকাকে আড়াল করার কেউ নেই। এত নোংরা আমাদের ঢাকা! সেই রাতে সম্পূর্ণ ঢাকা শহরকে আমার আবর্জনার এক বৃহৎ স্তূপ ছাড়া কিছুই মনে হয়নি। একজন ঢাকাবাসী হিসেবে আমি আরেকবার লজ্জিত হয়েছি, স্তম্ভিত হয়েছি, হতাশা অনুভব করেছি। ঢাকা শহরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা, কর্মচারী, জনপ্রতিনিধিসহ আমরা সাধারণ মানুষ সবাই ঢাকার এই কদর্য রূপটির জন্য কি কমবেশি দায়ী নই! মনে প্রশ্ন জাগে, আমরা কি সত্যিই ভালোবাসি ঢাকাকে?

দুই দশক ধরে আমি ঢাকায় বসবাস করছি। কিন্তু ঢাকা যেন দিনে দিনে নেংরা হয়েছে এবং তা এখন মাত্রা ছাড়িয়েছে। একটি শহরের ন্যূনতম সৌন্দর্য রক্ষার যে শর্তগুলো মানা প্রয়োজন, তার প্রতিটিই যেন হুমকির মুখে। চলতি পথে একচিলতে দৃষ্টিনন্দন, সুখকর কোনো দৃশ্যের দেখা পাওয়া সত্যিই কঠিন। অন্তবিহীন ট্রাফিক জ্যামে বসে গণপরিবহন কিংবা গাড়ির বাইরে চোখ রেখে যা দেখা যায়, তা হলো চল্টা ওঠা, বিবর্ণ হয়ে যাওয়া জরাজীর্ণ গণপরিবহন, অটোরিকশা কিংবা লেগুনা। প্রায় প্রতিটি পাবলিক বাসের জানালা বেয়ে নেমে আসা শুকিয়ে যাওয়া বমির চিহ্ন যেন এক মুহূর্তেই পথের স্বস্তিকে উধাও করে দেয়। গণপরিবহনের ভেতরের পরিবেশ আরও ভয়াবহ। গণপরিবহনগুলোর মেঝে, বসার সিট কিংবা জানালার পর্দার যা অবস্থা, তা নিশ্চিতভাবেই রোগজীবাণুর আস্তানা।

দখলদারের নজর এড়িয়ে যে সামান্য ফুটপাতটুকু পথচারীর ব্যবহারের জন্য আছে, তার অধিকাংশই এবড়োখেবড়ো, হাঁটার অনুপযুক্ত। আর ফুটপাতে ফেলা ময়লার যন্ত্রণা তো আছেই। এমনকি সড়কদ্বীপগুলো আর ডিভাইডারগুলোও যেন ময়লার স্তূপে পরিণত হয়েছে। কয়েক বছর আগের সড়কদ্বীপ ও ডিভাইডারগুলোর সবুজায়ন কর্মসূচি এখন আর চোখে পড়ে না। রাস্তার পার্শ্ববর্তী দেয়ালগুলো যেন পুরুষ পথচারী ও পরিবহনের শ্রমিকদের গণশৌচাগারে পরিণত হয়েছে। রাস্তার দুই পাশে মাকড়সার জালের মতো নানা ধরনের তারের মেলা। সেখানে ঝুলতে থাকে ময়লা-আবর্জনা। মেট্রোরেলের নির্মাণকাজ মনে হচ্ছে যেন অনন্তকাল ঠেকতে চলেছে। তার সঙ্গে আছে ফি বছর গ্যাস, পানি কিংবা পয়োনিষ্কাশনের লাইন সংস্কার কিংবা উন্নয়নের নামে রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ির মহোৎসব। সিটি করপোরেশনের নির্ধারিত ময়লার ডিপোর বাইরেও রয়েছে অসংখ্য দখলকৃত ময়লা ফেলার স্থান। সেই ময়লাগুলো বাতাসে উড়ে, বৃষ্টিতে ভিজে পুরো এলাকাকে দূষিত করছে।

সম্প্রতি গিয়েছিলাম জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে। সেখানে দূষণ আর ময়লার যে চিত্রটি দেখেছি, তা ছিল রীতিমতো ভয়াবহ। নয়নাভিরাম এই বিশ্ববিদ্যালয়টি যেন ময়লার ভাগাড়ে পরিণত হতে চলেছে। উন্মুক্ত মাঠ, লেক এমনকি গাছের ফোকরে ময়লা-আবর্জনা ফেলতে কুণ্ঠাবোধ করছে না কেউ। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থা আরও ভয়াবহ। আবাসিক হলগুলোর সীমানাপ্রাচীর এবং আশপাশে সর্বত্র খুঁজে পেয়েছি ওপর থেকে ফেলা ময়লার অস্তিত্ব। সম্প্রতি শেষ হওয়া বইমেলায় পাঠককে দেখেছি সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের নয়নাভিরাম স্বাধীনতাস্তম্ভের লেকের পানিতে প্লাস্টিক বোতল কিংবা নোংরা আবর্জনা ফেলতে। আর বইমেলাজুড়ে ভাষার দূষণ তো ছিলই। বইমেলার ভিড়ে শুনতে হয়েছে ইঙ্গিতপূর্ণ বিকৃত মন্তব্য কিংবা নোংরা ভাষার ব্যবহার। ভাষার অপব্যবহার আর অমর্যাদাও তো একধরনের দূষণ। সারা বছর শহরজুড়ে চলছে পিভিসি ব্যানার, ফেস্টুন কিংবা পোস্টারের যত্রতত্র ব্যবহার। ভুল বানানে পরিপূর্ণ সেই সব প্রচার-প্রচারণা সামগ্রীও একমুহূর্তে মনকে হতাশায় ভরিয়ে দেয়।

নগরের পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার জন্য আমরা সব সময়ই কর্তৃপক্ষের ঘাড়ে দোষ চাপাতে ভালোবাসি। কিন্তু খুব কমই ভেবে দেখি চারপাশের পরিবেশ পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখার দায় কিন্তু আমাদেরও। শহরটি যে মাত্রায় ঘনবসতিপূর্ণ, তাকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এত সহজ নয়। আমরা কয়জন নির্ধারিত স্থানে ময়লা ফেলি, বাসার আশপাশ পরিষ্কার রাখি! বুকে হাত দিয়ে আমরা কয়জন বলতে পারি, আমি কখনো রাস্তায় ময়লা ফেলি না, কিংবা থুতু ফেলি না! কয়টি শিশুকে হাতেকলমে শিক্ষা দিই পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন থাকার! আসলে পরিবর্তনটা আগে প্রয়োজন আমাদের নিজেদের। বাংলাদেশে শিক্ষিতের হার বাড়ছে। কিন্তু শিক্ষা অর্থহীন হয়ে পড়ে যদি বাস্তব জীবনে এর প্রয়োগ না ঘটে। ঢাকায় বসবাসকারী আমরা দুই কোটির মতো মানুষ যদি চারপাশের পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখার উদ্যোগ গ্রহণ করি, তবে আমরা নিজেরাই ঢাকার চেহারা কয়েক মাসের মধ্যে অনেকটাই বদলে দিতে পারব। যেটুকু আমাদের নিয়ন্ত্রণে আছে অন্তত সেটুকুর প্রতিও যদি আমরা যত্নবান হই, তবে কমিয়ে ফেলা সম্ভব অর্ধেক দূষণ। নিজেদের বাঁচানোর জন্যই তো দূষণ ঠেকাতে হবে। দেশ এখন করোনাভাইরাস ছড়িয়ে পড়ার বিপদের মধ্যে রয়েছে। অন্য দিকে ধেয়ে আসছে ডেঙ্গুর সময়। এখনই সচেতন না হলে আর কবে সচেতন হব আমরা?

দেশব্যাপী উদ্‌যাপন হতে যাচ্ছে মুজিব বর্ষ। পরিবেশদূষণকারী পিভিসি ব্যানারে চলছে প্রচার-প্রচারণা। আমরা কি পারতাম না মুজিব বর্ষকে পরিবেশদূষণমুক্ত স্বচ্ছ বাংলাদেশ গড়ার বর্ষ হিসেবে পালন করতে? অনেক আয়োজনের চেয়ে এ ধরনের উদ্যোগ হয়তো দেশের টেকসই উন্নয়নের ক্ষেত্রে অনেক বেশি অবদান রাখতে পারত।

নিশাত সুলতানা: লেখক ও গবেষক
purba_du@yahoo.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0