বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ায় বরিচের পথটা যেমন সহজ ছিল না, আবার সামনে তাঁর চলার পথ আরও বেশি সংকুল। নির্বাচনে বরিচ ৫৬ শতাংশ ভোট পেয়ে নির্বাচিত হয়েছেন। তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী অগাস্তো পিনোশের উত্তরসূরি হোসে আন্তোনিও কাস্ত পেয়েছেন ৪৪ শতাংশ ভোট। ১৯৮৯ সালে গণভোটে চিলিতে গণতন্ত্রের যাত্রা শুরু হওয়ার পর সবচেয়ে বেশি ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছেন তিনি। অবশ্য প্রথম দফার ভোটে বরিচের চেয়ে ২ শতাংশের বেশি ভোট পেয়ে প্রথম হয়েছিলেন দক্ষিণপন্থী কাস্ত। এবারের ভোটের এ সমীকরণ থেকে স্পষ্ট যে চিলির সমাজে মেরুকরণ এখন যেকোনো সময়ের চেয়ে তীব্র।

গাব্রিয়েল বরিচ ২০১৯ সালে চিলির যে গণবিক্ষোভ তারই সন্তান। সে অর্থে তিনি চিলির হতবিহ্বল তরুণ প্রজন্ম এবং সাধারণ খেটে খাওয়া মানুষের প্রতিনিধি। তাঁর চিন্তা ও কর্মসূচি বামপন্থার সঙ্গে মিললেও পুরোনো প্রথাগত বামপন্থীদের বিরোধিতার মুখে তাঁকে পড়তে হয়েছে। আবার কাস্তের নেতৃত্বে ডানপন্থী শিবিরের যে কুৎসিত প্রপাগান্ডার শিকার তাঁকে হতে হয়েছে, তার সঙ্গে তুলনীয় দেশটির প্রবাদপ্রতিম নেতা সালভাদর আয়েন্দেবিরোধী ১৯৫৮, ১৯৬৪ ও ১৯৭০ সালের নির্বাচনী প্রচারণার সময়কাল। এবারের নির্বাচনেও ডানপন্থী ও মূলধারার গণমাধ্যম এবং সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ভরে যায় কমিউনিস্টবিরোধী প্রচারণায়। বরিচের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনা হয়, সন্ত্রাসবাদে মদদ দেওয়ার। তিনি নির্বাচিত হলে চিলিতে কর্তৃত্ববাদী শাসন প্রতিষ্ঠা হবে, মাদকাসক্তি, মাদক পাচার, সামাজিক অপরাধ বেড়ে যাবে। এমনকি বরিচ মাদকসেবী এমন প্রচারণা করতেও কুণ্ঠিত হয়নি কাস্ত শিবির। মূলধারার গণমাধ্যম খুব উদ্দেশ্যমূলকভাবে বারবার তাঁকে ভেনেজুয়েলা, নিকারাগুয়া কিংবা কিউবা নিয়ে প্রশ্ন করে জনমনে দ্বিধা তৈরি করতে চেষ্টা করেছে। এর ফলাফলে মধ্যবিত্ত ভোটাররা দ্বিধান্বিত হয়ে পড়েন।

অবশ্য বরিচের মূল শক্তি দেশটির তরুণ প্রজন্ম এবং অসম উন্নয়নে কোণঠাসা হয়ে পড়া কৃষক ও শ্রমজীবীরা। ২০১৯ সালের অক্টোবর মাসের বিক্ষোভে তাদের প্রাণ গেছে, রক্ত ঝরেছে। কিন্তু সেই বিক্ষোভে আবার নতুন স্বপ্ন ও প্রত্যাশারও জন্ম হয়েছে। চিলির নতুন প্রজন্ম ও শ্রমজীবীরা ভালো করেই জানতেন, অক্টোবর বিক্ষোভে জন্ম নেওয়া প্রত্যাশা এবং পিনোশের দক্ষিণপন্থী প্রেতাত্মার আছর ঠেকাতে হলে বরিচকে তাঁদের প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত করতে হবে। বিভিন্ন ঘরানার বাম, পরিবেশবাদী, রাজনৈতিক অ্যাকটিভিস্ট এবং নারী, আদিবাসী, সমলিঙ্গ অধিকারকর্মীদের নিয়ে বরিচ যে জোট করে নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করেছেন, সেটার নাম ‘আপ্রুবো ডিগনিডাড’। এর মানে ‘মর্যাদার পক্ষে আমার ভোট’। এই মর্যাদা চিলির নতুন প্রজন্ম ও সাধারণ মানুষের ছিনতাই হয়ে যাওয়া মর্যাদা এবং নতুন চিলি নির্মাণের গণ–আকাঙ্ক্ষা। চিলির অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক কর্তৃত্ব যাদের হাতে শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত তারা চেষ্টা করেছে বরিচকে ঠেকাতে। তারা ভোটের দিন বাস বন্ধ রেখেছে, যাতে প্রত্যন্ত এলাকার শ্রমজীবীরা বরিচকে ভোট না দিতে পারেন।

কাস্ত তাঁর নির্বাচনী বক্তৃতায় বরিচ ও বামপন্থী মতাদর্শকেই আক্রমণ করেননি, নির্বাচিত হলে তিনি নারীবিষয়ক মন্ত্রণালয়, সমলিঙ্গ বিয়ে, গর্ভপাত আইন বাতিলের ঘোষণা দেন। এমনকি স্বৈরশাসক পিনোশের আমলে গণহত্যার স্মৃতিতে নির্মিত জাদুঘর এবং শিল্প, সংস্কৃতি নাটকের পৃষ্ঠপোষকতা দেওয়া গ্যাব্রিয়েল মিসট্রাল সেন্টার বন্ধের ঘোষণা দেন। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার কমিশন ও জাতীয় মানবাধিকার কমিশন থেকে চিলিকে প্রত্যাহার করে নেওয়ার কথাও বলেন তিনি। চিলির উত্তর সীমানায় গভীর করে খাল কেটে সীমানা বন্ধ করার ঘোষণা দেন, যাতে অভিবাসীরা দেশটিতে না ঢুকতে পারেন। এমনকি পিনোশের আমলের কুখ্যাত সিনিস্টার পুলিশ ফিরিয়ে আনার ঘোষণা দেন। তাঁর এসব মানবাধিকারবিরোধী ও উগ্র জাতীয়তাবাদী উন্মাদনা চিলির একটা বড় অংশের মধ্যে প্রভাব তৈরি করে। ফলে কাস্ত প্রথম দফায় ২৫ শতাংশ ভোট পেয়ে প্রথম হন। আবার দ্বিতীয় দফায় ৪৪ শতাংশ ভোট পান।

চিলির যে সংকট সেটা মুক্ত বাজার ও নয়া উদার অর্থনীতির সংকট। শুধু চিলি নয়, এ সংকট বিশ্বের সবখানেই, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটছে ওপরের ১-২ শতাংশ মানুষের কাছে। তাদের পকেট চুইয়ে যা বাকি ৯৮-৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে, তা অসমতার মাত্রাকেই তীব্র করছে। সুষম বণ্টন না হওয়ায় উন্নয়নের সুফল সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে যাচ্ছে না।

কাস্ত শিবির যেমন বরিচের বিরুদ্ধে নোংরা প্রচারণা চালিয়েছে আবার অনেক গোঁড়া বামপন্থী বিশ্লেষকও বরিচকে গ্রহণ করতে পারেননি। তাঁরা মনে করেন, কাস্ত ও বরিচের মধ্যে কোনো পার্থক্য নেই। ফ্যাসিবাদ ও গণতন্ত্রের মধ্যে যে ফারাক আছে আদতে সেটা ভুল ধারণা। অনেকে এক ধাপ এগিয়ে বলেছেন, কাস্ত ও বরিচ যেই জিতুক তাতে চিলি হারবে।

তবে বরিচ হারবে না জিতবে, তা বলার সময় এখনই আসেনি। চিলির অক্টোবর বিক্ষোভের যে গণপ্রত্যাশা বরিচ জিতে যাওয়ায় তা একটা ধাপ অতিক্রম করেছে। কিন্তু এটাই শেষ কথা নয়। ২০১৯ সালে নিম্ন মজুরি, অপর্যাপ্ত আবাসন, পেনশন বেসরকারি খাতে ছেড়ে দেওয়া, ব্যয়বহুল স্বাস্থ্যসেবা, পানিকে বেসরকারীকরণ, গ্যাসের মূল্যবৃদ্ধি, আদিবাসী ভূমি দখল, পরিবেশ বিপর্যয়, নারী নিপীড়ন ও মানবাধিকার লঙ্ঘনসহ নানা ইস্যুতে বিক্ষোভে ফেটে পড়েছিল চিলির জনগণ। এ বিক্ষোভের প্রাণভোমরা ছিলেন ভবিষ্যৎ নিয়ে দিশেহারা তরুণ প্রজন্ম এবং তীব্র উন্নয়ন বৈষম্যের শিকার চিলির আমজনতা।

পিনোশের বিদায়ের পর গত তিন দশক চিলি শাসন করেছে মধ্যপন্থী ও বাম জোট। তাদের সময়েই চিলি অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করে। কিন্তু এ সময়ে দেশটিতে দারিদ্র্যও বেড়েছে ব্যাপক হারে। সম্পদের ন্যায়সংগত বণ্টন না হওয়ায় এ পরিস্থিতি সৃষ্টি হয়েছে। অসমতা পরিমাপের জিনি সহগ সূচক অনুসারেও চিলি বিশ্বের সবচেয়ে বৈষম্যমূলক রাষ্ট্রগুলোর একটি। জাতিসংঘ সংস্থা ইকোনমিক কমিশন ফর লাতিন আমেরিকা অ্যান্ড ক্যারাবিয়ানের (ইসিএলএসি) তথ্য অনুসারে, চিলির সবচেয়ে ওপরের দিককার ১ শতাংশ মানুষ দেশটির ২৫ শতাংশের বেশি সম্পদের মালিক। অর্গানাইজেশন ফর ইকোনমিক কো-অপারেশন অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (ওইসিডি) তথ্য অনুসারে, উন্নয়নশীল অর্থনীতির দেশগুলোর মধ্যে পরিবারপ্রতি আয়ের দিক থেকে চিলি দ্বিতীয় বৈষম্যপূর্ণ দেশ।

চিলির যে সংকট সেটা মুক্ত বাজার ও নয়া উদার অর্থনীতির সংকট। শুধু চিলি নয়, এ সংকট বিশ্বের সবখানেই, বিশেষ করে গণতান্ত্রিক বিশ্বে। সম্পদের কেন্দ্রীভবন ঘটছে ওপরের ১-২ শতাংশ মানুষের কাছে। তাদের পকেট চুইয়ে যা বাকি ৯৮-৯৯ শতাংশ মানুষের কাছে গিয়ে পৌঁছেছে, তা অসমতার মাত্রাকেই তীব্র করছে। সুষম বণ্টন না হওয়ায় উন্নয়নের সুফল সংখ্যাগরিষ্ঠের কাছে যাচ্ছে না। বরং উল্টো স্বাস্থ্য, শিক্ষার, খাদ্যের মতো মৌলিক অধিকারগুলো কাটছাঁট করা হচ্ছে। গণতান্ত্রিক শাসনের এ ব্যর্থতার ফলে বৈশ্বিক রাজনীতিতে কর্তৃত্ববাদ ও দক্ষিণপন্থার বিকাশ ঘটছে সুনামির মতো।

বরিচের সামনে এখন চ্যালেঞ্জ বহুমুখী। সমাজ যে ক্রমাগত দক্ষিণপন্থার দিকে হাঁটছে তা থেকে চিলিকে রক্ষা করতে হবে। কিন্তু মূল চ্যালেঞ্জ হচ্ছে, নয়া উদার নীতি থেকে চিলিকে বের করে আনা। এ ক্ষেত্রে কর্তৃত্ববাদের পথেও হাঁটতে পারবেন না তিনি। সেটা গ্রহণ করবে না চিলির স্বাধীনচেতা তরুণ প্রজন্ম। আবার যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্রদের বিরোধিতার মুখেও পড়তে হবে। তাহলে এ থেকে উত্তরণ হবে কীভাবে?

বরিচ তাঁর নির্বাচনী প্রতিশ্রুতিতে সর্বজনীন স্বাস্থ্য বিমা চালু, পেনশন ব্যবস্থা ঢেলে সাজানো, ন্যূনতম মজুরি বাড়ানো, ছাত্রদের ঋণ মওকুফ এবং সাপ্তাহিক কর্মঘণ্টা কমানোর প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন। তিনি সামাজিক খাতে জিডিপির ৮ শতাংশ ব্যয় করার ঘোষণা দিয়েছেন। বড় কোম্পানি ও ধনী ব্যক্তিদের ওপর কর বাড়িয়ে বাড়তি এ রাজস্বের সংস্থান তিনি করতে চান। বরিচের এ কর্মসূচি বৈপ্লবিক নয়, বরং সংস্কারমূলক। সামাজিক গণতন্ত্রীদের মতো তিনি কল্যাণমূলক রাষ্ট্র গড়তে চান চিলিতে। তাঁর কর্মসূচি যুক্তরাষ্ট্রের বার্নি স্যান্ডার্সের কর্মসূচির সঙ্গে অনেক বেশি মিলে যায়।

চিলির জনগণের বিশেষ করে তরুণদের আকাঙ্ক্ষা পূরণে বরিচ ন্যূনতম কিছু কর্মসূচি হাতে নিয়েছেন। সেটা করতে গেলে তাঁকে পিনোশের আমলে নেওয়া নয়া উদারবাদী সংবিধানের বদলে নতুন সংবিধান প্রণয়ন করতে হবে। অন্যান্য যে সংস্কার কর্মসূচি সেটা করতে গেলেও আইনসভায় তাঁর সমর্থন লাগবে। কিন্তু সেটা তাঁর জন্য কঠিনই। বরিচ বিজয়ী হলেও আইনসভায় তাঁর জোটের প্রতিনিধি কম।

সব মিলিয়ে বরিচের পথ মসৃণ নয়। কিন্তু তরুণ এই নেতার সবচেয়ে বড় শক্তি অক্টোবর বিদ্রোহের জনগণ। নয়া উদারবাদ ও কর্তৃত্ববাদী ব্যবস্থার বিপরীতে চিলিকে নতুন কোনো পথ কি তিনি দেখাতে পারবেন? বরিচ সফল হলে বাকি বিশ্বের জন্যও নতুন এক দিশা আসবে।

মনোজ দে প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন