বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

২০১৭ সালে শারমিন হোয়াইট হাউসে গিয়েছিলেন সাহসী নারীর পুরস্কার নিতে। সাবেক মার্কিন ফার্স্ট লেডি মেলানিয়া ট্রাম্পের কাছ থেকে পুরস্কার নেন তিনি। মার্কিন পররাষ্ট্র দপ্তরের ওয়েবসাইটে শারমিন আক্তার সম্পর্কে বলা হয়েছে, মাত্র ১৫ বছর বয়সেই শারমিন সাহসিকতার সঙ্গে তাঁর মায়ের তাঁকে বিয়ে দেওয়ার উদ্যোগ ঠেকিয়ে দিয়েছিলেন এবং নিজের পড়াশোনা চালিয়ে যাওয়ার অধিকার সুরক্ষিত করেছিলেন। দক্ষিণ এশিয়ায় এ ধরনের চাপের মুখে থাকা বহু কিশোরীর জন্য তিনি একটি উদাহরণ তৈরি করেছিলেন।

সেই শারমিন আক্তার রাজাপুর পাইলট স্কুল থেকে এসএসসি ও রাজাপুর কলেজ থেকে এইচএসসি পাস করার পর এখন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হওয়ার চেষ্টা করছেন। দাদি ও বাবার সঙ্গে ঢাকায় আছেন।

সেদিন প্রতিবাদ না করলে হয়তো তাঁকে আরও অনেক মেয়ের মতো বাল্যবিবাহের শিকার হতে হতো।

ঝালকাঠির শারমিনের মতো চুয়াডাঙ্গার মেয়ে বর্ষাও সম্প্রতি সাহসের সঙ্গে নিজের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছে। ১০ বছর আগে তার মা-বাবার মধ্যে বিচ্ছেদ হয়। বর্ষা থাকত মায়ের কাছে। মা একটি মুড়ির কারখানায় দৈনিক ২১০ টাকা মজুরিতে কাজ করেন। যেদিন কারখানা বন্ধ থাকে কিংবা তিনি যেতে পারেন না, সেদিন কোনো পয়সা পান না। খুবই কষ্টের জীবন। মামা-খালারা কিছু সহায়তা করতেন। এখন সম্ভবত তাঁরা আর সহায়তা করতে চান না। এ কারণেই ঝিনুক বালিকা বিদ্যালয়ের দশম শ্রেণির বিজ্ঞানের ছাত্রী বর্ষাকে বিয়ে দেওয়ার জন্য উঠেপড়ে লাগেন তাঁরা। মা প্রথমে আপত্তি করলেও পরে আর্থিক অবস্থার কথা ভেবে মেয়েকে বিয়ে দিতে রাজি হন। কিন্তু বর্ষা অনড়। সে বিয়ের প্রস্তুতির কথা টের পেয়ে গত মঙ্গলবার দামুড়হুদা থানায় গিয়ে ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তাকে তার সমস্যার কথা জানায় এবং থানা-পুলিশ তার বিয়ে বন্ধ করে দেয়।

বৃহস্পতিবার প্রথম আলোর চুয়াডাঙ্গা প্রতিনিধি শাহ আলমের পাঠানো বর্ষার বাল্যবিবাহ প্রতিরোধের খবর প্রকাশিত হওয়ার পর এলাকায় চাঞ্চল্য সৃষ্টি হয়। মহিলাবিষয়ক অধিদপ্তরের পক্ষ থেকে তাকে সংবর্ধনা দেওয়া হয়। সেদিনই জাতীয় কন্যাশিশু দিবসের অনুষ্ঠানে বর্ষার হাতে ক্রেস্ট ও ফুল তুলে দেন চুয়াডাঙ্গা জেলা প্রশাসক নজরুল ইসলাম সরকার। তিনি বর্ষাকে সাহসী কন্যা উপাধিতেও অভিষিক্ত করেন। জেলা প্রশাসক তার পড়াশোনার সহায়তার জন্য মাসে এক হাজার টাকা দেবেন বলে জানিয়েছেন। গতকাল চুয়াডাঙ্গার একাধিক সাংবাদিকের সঙ্গে টেলিফোনে কথা হয়। তাঁরা জানান, বর্ষার সাহসী ভূমিকায় তার বিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা তো বটেই, এলাকার মানুষও আনন্দিত। ওই বিদ্যালয়ের মেয়েরা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, তারা এলাকায় কোনো বাল্যবিবাহ হতে দেবে না।

শারমিন ও বর্ষার মতো মেয়েরা পরিবার ও অভিভাবকের হুমকি ও অত্যাচার অগ্রাহ্য করে বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছে। আমরা তাদের অভিনন্দন জানাই। কিন্তু আমাদের গোঁড়া ও পশ্চাৎপদ সমাজের ভ্রুকুটি উপেক্ষা করে কতজন মেয়ে এভাবে সাহসী ভূমিকা রাখতে পেরেছে? অনেকে পরিবেশ পরিস্থিতির কারণে পরিবার ও সমাজের অন্যায় সিদ্ধান্ত মেনে নিতে বাধ্য হয়। বাল্যবিবাহের মাধ্যমে একটি মেয়ের জীবনই ধ্বংস করা হয় না, ভবিষ্যৎ প্রজন্মকেও গভীর অনিশ্চয়তায় ঠেলে দেওয়া হয়। প্রথম আলোর খবর থেকে জানা যায়, করোনা মহামারির মধ্যে গত দেড় বছর দেশের ৯ জেলায় সাড়ে সাত হাজারের বেশি বাল্যবিবাহ হয়েছে। দেশের ৬৪টি জেলার হিসাব নিলে বাল্যবিবাহের সংখ্যাটি কত হবে, অনুমান করা কঠিন নয়।

আইনেও গলদ আছে। আগে বিয়ের ক্ষেত্রে ন্যূনতম বয়সসীমা ছিল মেয়েদের ১৮ ও ছেলেদের ২১ বছর। কিন্তু ২০১৩ সালের আইনে বিশেষ বিবেচনায় ১৬ বছর বয়সী মেয়েদের বিয়ের বৈধতা দেওয়া হয়, যা ছিল আত্মঘাতী। আমাদের দেশে জন্মনিবন্ধন বাধ্যতামূলক না হওয়ায় মানুষ সুবিধামতো বয়স বাড়িয়ে-কমিয়ে নেয়। অন্যান্য ক্ষেত্রে কমানোর প্রবণতা থাকলেও মেয়েদের বিয়ের ক্ষেত্রে বাড়িয়ে নেওয়ার অসংখ্য নজির আছে।

চুয়াডাঙ্গার স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, শিক্ষক ও সহপাঠীরা বর্ষাকে সর্বতোভাবে সহযোগিতা করেছে বলেই বর্ষা জীবন নিয়ে স্বপ্ন দেখতে পেরেছে। তার মা–ও ভুল স্বীকার করেছেন। ঝালকাঠির শারমিন আক্তার বাবা ও দাদির সমর্থন পেয়েছেন। তাই সমর্থনটা প্রথমে আসতে হবে পরিবার থেকেই। সারা দেশে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী, জনপ্রতিনিধিদের এ রকম ন্যায়ানুগ ভূমিকা প্রয়োজন। প্রয়োজন আইনের যথাযথ প্রয়োগ। মা-বাবা, অন্য আত্মীয়স্বজন কিংবা কাজি যে–ই বাল্যবিবাহের সঙ্গে জড়িত থাকুন, তাঁকে কঠিন শাস্তি দিতে হবে। মুচলেকা দিয়ে ছেড়ে দেওয়া কিংবা কিছু আর্থিক জরিমানা যথেষ্ট নয়।

এর পাশাপাশি আরেক সাহসী নারীর গল্প শোনালেন প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক মানসুরা হোসাইন। তনুশ্রী দাশ নামের এই নারী কীভাবে শিশুসন্তানকে কোলে করে কলেজে পাঠ নিচ্ছেন। তনুশ্রী রাজধানীর বাড্ডার মহানগর কলেজের এইচএসসি পরীক্ষার্থী। আগামী ডিসেম্বরে তাঁর এইচএসসি পরীক্ষা। ২০১৯ সালে ১৯ বছর বয়সে বিয়ে করেন তনুশ্রী। তাঁর ছেলে আবেগের বয়স এখন আট মাস। নিজের পছন্দের পর পারিবারিকভাবে তাঁর বিয়ে হয়। করোনার কারণে গত দেড় বছর কলেজ বন্ধ ছিল। ১২ সেপ্টেম্বর থেকে কলেজ খোলে। এখন স্বাস্থ্যবিধি মেনে ছেলেকে সঙ্গে নিয়েই কলেজে যান তিনি। এ ক্ষেত্রে তিনি স্বামী, পরিবারের অন্যান্য সদস্য, কলেজের শিক্ষক এবং কর্মচারীদের সহায়তা পেয়েছেন।

যেখানে বাংলাদেশের অনেক উচ্চশিক্ষিত মেয়ে স্বামীর অসহযোগিতার কারণে চাকরি ছেড়ে ঘরসংসার করতে বাধ্য হন, সেখানে তনুশ্রীর স্বামীকে ধন্যবাদ জানাতে হয়। আমাদের দেশের স্বামীরা যদি তনুশ্রীর স্বামীর মতো সংসারের কাজ ভাগাভাগি করে নিতেন, তাহলে ঘরসংসার কিংবা সন্তানের কারণে মেয়েদের চাকরি ছাড়তে হতো না।

শারমিন ও বর্ষা নিজেদের বাল্যবিবাহ ঠেকিয়েছেন। ভবিষ্যতে নিজেকে গড়ে তোলার এবং দেশ-জনগণের জন্য কাজ করার স্বপ্ন দেখছেন। কিন্তু যাদের জীবন শুরু না হতেই বাল্যবিবাহ নামের ‘মরু পথে’ হারিয়ে যায়, তাদের উদ্ধারে আমাদের রাষ্ট্র ও সমাজ এগিয়ে আসবে কবে?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন