পরমাণু বোমা নিষিদ্ধ করার সময় এসেছে

ইরান ও জাতিসংঘের পাঁচ স্থায়ী সদস্য, জার্মানি ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের মধ্যে যে পারমাণবিক চুক্তি হলো, তা ঐতিহাসিকভাবে বেশ অনুকূল সময়েই হলো। আজ থেকে ৭০ বছর আগে এ মাসেই জাপানের হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে যে পারমাণবিক বোমা ফেলা হয়েছিল, তা বহুকালের যুদ্ধের বিভীষিকার ইতিহাসে সবচেয়ে অন্ধকারাচ্ছন্ন যুগের সূচনা করেছিল। গুলি, বুলেট ও বেয়নেটের সঙ্গে পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তাও যোগ হয়—গ্যাস ও জীবাণু অস্ত্রের মতো পারমাণবিক তেজস্ক্রিয়তাও এক নীরব, অদৃশ্য ঘাতক।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় তথাকথিত গ্যাস প্রটোকল গ্রহণ করে, এর মধ্য দিয়ে রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ব্যবহার নিষিদ্ধ করা হয়। একইভাবে, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের পর থেকে পারমাণবিক অস্ত্রের যেকোনো ব্যবহার নিষিদ্ধের দাবি অব্যাহতভাবেই তোলা হচ্ছে।
কিন্তু পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রগুলো সব সময়ই এ রকম নিষেধাজ্ঞার বিরোধিতা করেছে। তাদের যুক্তি হচ্ছে, এটা বিশ্বাসযোগ্য হবে না। এর বদলে তারা ধারাবাহিক প্রক্রিয়ার সুপারিশ করেছে, যার মাধ্যমে পারমাণবিক অস্ত্র ধারণ ও উৎপাদনে নিষেধাজ্ঞা আরোপ হবে। সর্বোপরি, এই একই মনোভঙ্গির কারণেই রাসায়নিক ও জীবাণু অস্ত্র ব্যবহারের ওপর কঠোর সীমাবদ্ধতা আরোপ করা হয়েছিল।
হিরোশিমা ও নাগাসাকির পারমাণবিক বোমা হামলার ৭০ বছর পর আজ বলতে হয়, এই ধারাবাহিক প্রক্রিয়া পরিষ্কারভাবেই ব্যর্থ হয়েছে। স্নায়ুযুদ্ধের সময় সারা পৃথিবীতে পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা ৫০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। এগুলোর মধ্যে অনেকগুলোরই, হাইড্রোজেন বোমাসহ, ধ্বংসক্ষমতা জাপানে যে বোমা ফেলা হয়েছিল, তার চেয়ে অনেক বেশি ছিল।
পারমাণবিক অস্ত্রের বিপদের রাশ টেনে ধরতে কিছু পদক্ষেপের ব্যাপারে ঐকমত্য হয়েছিল। এর মধ্যে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র ও সোভিয়েত ইউনিয়নের মধ্যে দ্বিপক্ষীয় অস্ত্র নিয়ন্ত্রণ চুক্তি, নতুন অস্ত্রের পরীক্ষা-নিরীক্ষার ওপর নিষেধাজ্ঞা প্রভৃতি। সর্বোপরি, পারমাণবিক অস্ত্র বিস্তার রোধ চুক্তিও (এনটিপি) ছিল এই প্রক্রিয়ারই ফসল। ১৯৬৮ সালে স্বাক্ষরিত এই চুক্তির লক্ষ্য ছিল, পৃথিবীকে পারমাণবিক অস্ত্রমুক্ত করা। অর্থাৎ, যাদের পারমাণবিক অস্ত্র নেই, সেই রাষ্ট্রগুলো প্রতিজ্ঞা করবে যে তারা তা বানাবে না। আর যে পাঁচটি রাষ্ট্রের (যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য, ফ্রান্স, চীন ও রাশিয়া) হাতে আনুষ্ঠানিকভাবে এই অস্ত্র আছে, তারা নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে ঐকমত্যে আসবে—এমন প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল।
কিন্তু সামগ্রিক ঝুঁকি কখনোই তেমন একটা কমেনি। তবে নিশ্চিতভাবেই এই এনটিপির প্রথম অংশের কিছু সফলতা আছে। এই চুক্তি কার্যকর হওয়ার পর এ পর্যন্ত চারটি দেশ পারমাণবিক অস্ত্র তৈরি করেছে। দেশগুলো হলো ভারত, ইসরায়েল, উত্তর কোরিয়া ও পাকিস্তান। দক্ষিণ আফ্রিকা তার পারমাণবিক অস্ত্র বর্জন করে এনটিপির পক্ষরাষ্ট্রে পরিণত হয়েছে, আর ইউক্রেন, বেলারুশ ও কাজাখস্তান নিজেদের পারমাণবিক অস্ত্র রাশিয়াতে স্থানান্তর করেছে। ওদিকে ইরাক ও লিবিয়ার পারমাণবিক অস্ত্র বানানোর প্রক্রিয়া থামানো হয়েছে। ইরান এই চুক্তির আরেকটি পক্ষরাষ্ট্র। তারাও এখন পারমাণবিক কর্মসূচির ওপর আরোপিত গুরুত্বপূর্ণ নিষেধাজ্ঞা মেনে চলতে রাজি হয়েছে।

>লোকে বলে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বর্ষণের ঘটনার কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের ওপর একরকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। আমাদের মনে সে আশার আলোই প্রজ্বলিত হোক

কিন্তু পাঁচটি পারমাণবিক অস্ত্রধর রাষ্ট্র যে নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তার তেমন ফলাফল আমরা এখনো দেখিনি। স্নায়ুযুদ্ধের পর পারমাণবিক অস্ত্রের মজুত কমেছে মূলত অর্থনৈতিক কারণে। তারপর পৃথিবীর মোট পারমাণবিক অস্ত্রের সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ২০ হাজার (মানবজাতিকে কয়েকবার ধ্বংস করার জন্য সেটাই যথেষ্ট)। আর ২০১০ সালের নতুন স্টার্ট চুক্তিতে যুক্তরাষ্ট্র ও রাশিয়ার পারমাণবিক অস্ত্রের সর্বোচ্চ সীমা নির্ধারণ করে দেওয়া হয়, সেটাকে সবাই স্বাগত জানিয়েছিল। কিন্তু তারপর নিরস্ত্রীকরণের ব্যাপারে আন্তরিক আলোচনা হয়নি।
সামরিকভাবে কার্যকারিতা নেই—সামগ্রিকভাবে এমন ধারণা থাকায় ন্যাটো ইউরোপে অবস্থিত ন্যাটোর স্বল্পসংখ্যক অকৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সংস্থাটি প্রত্যাহার করে যুক্তরাষ্ট্রে নিয়ে যাবে, একসময় মানুষ এমনটা আশা করেছিল। এটা হলে রাশিয়া তার নিজের কৌশলগত পারমাণবিক অস্ত্র সরিয়ে নিতে পারে, সবাই এটাই ধারণা করেছিল। কিন্তু কোনো কিছুই হয়নি।
একইভাবে মানুষ আশা করেছিল, ১৯৯৬ সালে গৃহীত কম্প্রিহেনসিভ নিউক্লিয়ার টেস্ট ব্যান ট্রিটিও (সিটিবিটি) বাধ্যবাধকতামূলক হবে। এই চুক্তি মুলতবি হয়ে আছে। মনিটরিংয়ের এক চমৎকার প্রক্রিয়া তৈরি করা হয়েছিল, যেটা শুধু অস্ত্রের পরীক্ষা নির্ণয় নয়, ভূমিকম্প ও সুনামিও চিহ্নিত করতে পারত। কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র, চীনসহ আটটি রাষ্ট্র তা অনুসমর্থন করেনি বলে সিটিবিটি আইনিভাবে এখনো মাটির নিচেই রয়েছে। বলা যেতে পারে, এটি ক্রিয়াশীল থাকলেও কার্যকর নয়।
না, নিরস্ত্রীকরণ নয়, তার বদলে পৃথিবীতে এখন পারমাণবিক অস্ত্রের উন্নয়ন ঘটছে, কিছু কিছু ক্ষেত্রে তার বিস্তারও ঘটছে। নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্যরা যদি মনে না করে যে নিজেদের নিরাপত্তার জন্যই তাদের ক্ষান্ত দিতে হবে এবং নিরস্ত্রীকরণের প্রতিশ্রুত আলোচনা শুরু করতে হবে, তাহলে পরিবর্তনের সম্ভাবনা খুবই কম। অন্য রাষ্ট্র যাতে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী হতে না পারে, সে বিষয়ে তাদের আগ্রহ সবাই দেখেছে। এখন সময় এসেছে, তাদের নিজেদের রাশ নিজেদেরই টেনে ধরতে হবে।
কিছু রাষ্ট্র এমন সনদে স্বাক্ষর করতে চায় না, যাতে গুচ্ছবোমা ও স্থলমাইন নিষিদ্ধ হয়। একই কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের অধিকারী রাষ্ট্রগুলোও তাদের রাশ টেনে ধরে, এমন রীতিতে স্বাক্ষর করতে চায় না। তারপরও এমন কোনো চুক্তি থাকলে তাদের সব সময় মনে করিয়ে দেওয়া যাবে, তাদের কাছ থেকে মানুষ কী প্রত্যাশা করে। শুধু সেই কারণেই আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে এই বিষয়ের অগ্রাধিকার পাওয়া উচিত।
স্নায়ুযুদ্ধের সময় অনেক মানুষের মনেই আশঙ্কা ছিল, মানবজাতি পারমাণবিক যুদ্ধ লাগিয়ে হঠাৎ একদিন নিশ্চিহ্ন হয়ে যাবে। আজ আরও বেশি মানুষ হয়তো উদ্বেগের সঙ্গে ভাবে যে বৈশ্বিক উষ্ণায়নের কারণে মানবজাতির মৃত্যু-প্রক্রিয়া দীর্ঘায়িত হবে। কিন্তু পারমাণবিক ভীতি এখনো আছে। আর গ্লোবাল জিরোর মতো যে গ্রুপগুলো জনসচেতনতা সৃষ্টির চেষ্টা করছে, আমাদের উচিত হবে, তাদের সমর্থন দেওয়া।
লোকে বলে, হিরোশিমা ও নাগাসাকিতে পারমাণবিক বোমা বর্ষণের ঘটনার কারণে পারমাণবিক অস্ত্রের ব্যবহারের ওপর একরকম নিষেধাজ্ঞা আরোপ হয়েছে। আমাদের মনে সে আশার আলোই প্রজ্বলিত হোক। আমরা আরও আশা করি, এই নিষেধাজ্ঞা আইনি রূপ পাক।
ইংরেজ থেকে অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন; স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট
হ্যান্স ব্লিক্স: ইন্টারন্যাশনাল অ্যাটোমিক এনার্জি এজেন্সির সাবেক মহাপরিচালক।