বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যুক্তরাজ্যের কথাই ধরুন। সেখানে প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের জনতুষ্টিবাদী নাবালকসুলভ ক্যারিশমা তাঁকে জিতিয়েছে এবং ক্ষমতায় অধিষ্ঠিত করতে সক্ষম করেছে। এর মধ্য দিয়ে দেশটির রাজনৈতিক মানচিত্র আবার অঙ্কিত হয়েছে। অল্প কিছুদিন আগেও জনসনের অসংখ্য অযোগ্যতা, মহামারিতে মৃত্যুর ক্রমবর্ধমান সংখ্যা ও অর্থনৈতিক মন্দাকে মানুষ গায়ে মাখছিল না এবং তাঁকে সমর্থন দিয়ে আসছিল। কিন্তু একটি সাধারণ কারণে জনসনের জনসমর্থনে অবশেষে রক্তক্ষরণ শুরু হয়েছে। কারণটি হলো, তিনি এবং তাঁর সরকার পশ্চিমের সাধারণ নিয়মের প্রতি অশ্রদ্ধা প্রদর্শন করেছেন।

২০২০ সালের ডিসেম্বরে যখন যুক্তরাজ্যজুড়ে বিধিনিষেধ চলছিল, তখন ১০ নম্বর ডাউনিং স্ট্রিটে (প্রধানমন্ত্রীর বাসভবন) বরিস জনসন ক্রিসমাস পার্টির আয়োজন করেছিলেন। জনসনের অন্যান্য কেলেঙ্কারি ও সীমা লঙ্ঘন যতটা না তাঁর খ্যাতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করেছিল, ওই ঘটনা তার চেয়ে বেশি তাঁর জনপ্রিয়তাকে কমিয়েছে।

আন্তর্জাতিক স্তরে পশ্চিমা সরকারগুলো নিয়মভঙ্গের জন্য নিয়মিতভাবে অন্যদের নিন্দা করে। যেমন ক্রিমিয়া দখল করা, অন্যান্য দেশের ওপর বারবার সাইবার আক্রমণ এবং বিদেশে রাশিয়ান ভিন্নমতাবলম্বীদের ওপর শারীরিক আক্রমণের জন্য রাশিয়াকে তিরস্কার করা হয়েছে।

বড় অপরাধী হিসেবে চীনেরও নিন্দা করা হয়েছে। পূর্বসূরি ডোনাল্ড ট্রাম্প যা বলেছিলেন বা করেছিলেন, তাঁর অনেক কিছুর সঙ্গে মার্কিন প্রেসিডেন্ট জো বাইডেন একমত না-ও হতে পারেন, কিন্তু তিনি ট্রাম্প প্রশাসনের চীননীতিকে অনুসরণ করে যাচ্ছেন। বাইডেন ট্রাম্পের পদাঙ্ক অনুসরণ করে চীনকে বৈশ্বিক হুমকি হিসেবে চিহ্নিত করে যাচ্ছেন। তবে যা বোঝা যাচ্ছে, আগামী কয়েক দশকে ‘সবচেয়ে বড় বৈশ্বিক হুমকি’ এই চীনই সবচেয়ে বড় আইন ভঙ্গকারী নয়, বরং সবচেয়ে বড় আইন তৈরিকারী দেশ হিসেবে আত্মপ্রকাশ করবে।

আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন, মান এবং কনভেনশনের ওপর চীনের ক্রমবর্ধমান প্রভাব পুরো বৈশ্বিক দাবার ঘুঁটি উল্টে দেবে। শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে পশ্চিমা শক্তিগুলো ধরেই নিয়েছে, তারাই বিশ্বের আদর্শ-নির্ধারক। ওয়াশিংটন কী চায়, তার ওপর বৈশ্বিক নীতি এত দিন নির্ভর করেছে।

অর্থনীতিবিদ জন উইলিয়ামসন দেখিয়েছিলেন, কীভাবে ওয়াশিংটনভিত্তিক নীতি ব্যাপকভাবে বিশ্ববাজারকে নিয়ন্ত্রণ করে। কয়েক দশক ধরে এই পশ্চিমা উদারপন্থা আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল, বিশ্বব্যাংক এবং বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থাকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করে আসছে। ওগুলোকে পশ্চিমারা সুশাসন এবং সমৃদ্ধির একটি সর্বজনীন রেসিপি হিসেবে দেখিয়ে আসছে।

কিন্তু গত এক দশকে ওয়াশিংটনের মতে পরিচালিত বিশ্বায়ন, শিল্পনীতি এবং রাষ্ট্রীয় পুঁজিবাদ একটি ‘বেইজিং কনসেনসাস’-এর চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে।

অনেক বৈশ্বিক নিয়ম নির্ধারণী সংস্থা, যা একসময় ইউরোপীয় এবং আমেরিকান প্রাধান্যের ওপর চলত, তারা এখন চীনা নেতাদের ওপর ক্রমে নির্ভরশীল হতে শুরু করেছে। এর মধ্যে ইন্টারন্যাশনাল টেলিকমিউনিকেশন ইউনিয়ন, ইন্টারন্যাশনাল অর্গানাইজেশন ফর স্ট্যান্ডার্ডাইজেশন এবং ইন্টারন্যাশনাল ইলেকট্রো টেকনিক্যাল কমিশনের অন্তর্ভুক্ত। চীন কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা এবং রোবটিকসের মতো দ্রুত বিকাশমান প্রযুক্তির মান নির্ধারণ করতে নিজেদের সক্ষম করে তুলেছে। চীনা কোম্পানির প্রযুক্তিগত অবকাঠামো ও ব্যবস্থা (চীনা মান অনুযায়ী নির্মিত) অনেক দেশে ছড়িয়ে পড়েছে। এখন চীনের তৈরি নিয়মকানুন ধীরে ধীরে প্রতিষ্ঠা পেতে শুরু করেছে। এই সব নিয়মের প্রতি পশ্চিমারা প্রতিশ্রুতিশীল থাকবে কি না, তা একটি জরুরি প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এই প্রতিযোগিতায় এগিয়ে থাকার জন্য কিছু পশ্চিমা সরকার প্রচলিত নিয়মভিত্তিক অনুশাসনের আদল পুনর্বিন্যাসের কথা চিন্তাভাবনা করতে শুরু করেছে। উদাহরণস্বরূপ ইইউ এখন ‘কৌশলগত সার্বভৌমত্ব’ সম্পর্কে একটি ধারণা উত্থাপন করছে। পুতিনের রাশিয়া কিংবা সি চিন পিংয়ের চীনের নীতির সঙ্গে পশ্চিমাদের নীতির মধ্যে সমঝোতা ঘটানোর কোনো উপায় বের করা যায় কি না, সে বিষয়ে তারা চিন্তাভাবনা করছে। যদিও সেই ভাবনার সঙ্গে বাইডেনের যুক্তরাষ্ট্র একেবারেই একমত নয়। সে কারণেই সম্প্রতি শেষ হওয়া যুক্তরাষ্ট্রের গণতন্ত্র সম্মেলনে চীন ও রাশিয়ার মতো কর্তৃত্ববাদী দেশগুলোর বিষয়ে যুক্তরাষ্ট্র কড়া বার্তা দিয়েছে। কিন্তু আসন্ন ভবিষ্যতে আন্তর্জাতিক নিয়মকানুন কারা ঠিক করবে, যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্ররা নাকি চীন ও তার সঙ্গীরা, তা এখনই বলা যাবে না। তবে একটি সংঘাত অনিবার্য, তা বলা যায়।

ইংরেজি থেকে অনূদিত, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট

  • মার্ক লিওনার্ড ইউরোপিয়ান কাউন্সিল অন ফরেন রিলেশনসের পরিচালক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন