বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

যেখানে পার্বত্য চুক্তির মধ্য দিয়ে পার্বত্যাঞ্চলের হানাহানির অবসান হয়েছে বলে দাবি করা হয়, সেখানে এ ধরনের সংঘাত ও হানাহানি কেন আবার দেখা দিল? এর পেছনে কী কারণ দায়ী? কিংবা কে বা কারা দায়ী? রাষ্ট্রীয় কর্তৃপক্ষ থেকে প্রায়ই এ সংঘাতপূর্ণ নাজুক পরিস্থিতির জন্য পার্বত্য চুক্তির অন্যতম স্বাক্ষরকারী জনসংহতি সমিতিকে দায়ী করা হয়। কিন্তু আসলে এর কি সত্যতা আছে, নাকি এ পরিস্থিতির পেছনে গভীর ষড়যন্ত্র ও অন্তর্নিহিত কারণ ক্রিয়াশীল? তারা যখন জনসংহতির বিরুদ্ধে ভিত্তিহীন অভিযোগ আনছে, তখন জনসংহতি সমিতির স্থানীয় পর্যায়ের বহু নেতা-কর্মী সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর হাতে খুন হচ্ছেন। সরকারের কাছে নালিশ করেও কোনো প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না। আসলে পার্বত্য চুক্তি যথাযথ ও পূর্ণাঙ্গভাবে বাস্তবায়িত না হওয়ায় সেখানে সংঘাতময় পরিস্থিতি বিরাজ করছে।

বলার অপেক্ষা রাখে না যে বর্তমানে পার্বত্য চট্টগ্রামে এখনো জুম্ম জনগণের ওপর ধরপাকড়, তল্লাশি অভিযান, বিচারবহির্ভূত হত্যাসহ মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে। ভূমিবিরোধকে কেন্দ্র করে রাষ্ট্রযন্ত্রের ছত্রচ্ছায়ায় জুম্মদের ওপর সংঘবদ্ধ সাম্প্রদায়িক হামলা, মিডিয়ার ভাষায় পাহাড়ি-বাঙালির সংঘাত প্রায়ই ঘটছে। পার্বত্য চুক্তির পরও জুম্মরা অব্যাহতভাবে ভূমি থেকে উচ্ছেদ হচ্ছে এবং নারীর ওপর সহিংসতা চলছে। উদ্বেগের কথা হলো এসব হামলার জন্য দায়ী ব্যক্তিদের বিচারের মুখোমুখি করা হচ্ছে না। তারা শাস্তির বাইরেই থেকে যাচ্ছে।

পাহাড়ে সংঘাতের অন্যতম কারণ সেটেলর বাঙালিদের অব্যাহত উসকানিমূলক তৎপরতা। ২০১৯ সালে সেটেলর, উগ্র জাতীয়তাবাদী ও উগ্র সাম্প্রদায়িক গোষ্ঠীর সংগঠনগুলোর বিলুপ্ত করে ‘পার্বত্য চট্টগ্রাম নাগরিক পরিষদ’ নামে একক সংগঠন গঠন করা হয়েছে। এরপরই এ সংগঠনের উদ্যোগে ওই বছরের ডিসেম্বরে রাঙামাটিতে ও ২০২০ সালের ফেব্রুয়ারিতে বান্দরবানে পার্বত্য চট্টগ্রাম ভূমি কমিশনের বৈঠকস্থল ঘেরাও করা হয়। অন্যদিকে জুম্মদের মধ্যে তাঁবেদার গোষ্ঠী সৃষ্টি করে পার্বত্য চট্টগ্রাম চুক্তি বাস্তবায়নের প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত করা হচ্ছে। ইউপিডিএফ, জেএসএস (এম এন লারমা) সংস্কারপন্থী, ইউপিডিএফ (গণতান্ত্রিক), মগ পার্টিসহ পার্বত্য চুক্তিবিরোধী ও মৌলবাদী জঙ্গিগোষ্ঠীর আশ্রয়-প্রশ্রয় দিয়ে সন্ত্রাসী তৎপরতা চালিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামে অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টি করা হচ্ছে। আবার এ কথাও সত্য যে পার্বত্য চুক্তি বাস্তবায়ন না করায় জুম্ম জনগণের মধ্যে ক্ষোভ ও অসন্তোষ বেড়েছে।

১৯৯৭ সালে যে সরকার পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তারাই এখন ক্ষমতায়। চুক্তির পর আওয়ামী লীগ পৌনে চার বছর ক্ষমতায় ছিল। এরপর ২০০৯ সাল থেকে একটানা ১৩ বছর ক্ষমতায় আছে। এরপরও যদি চুক্তি বাস্তবায়িত না হয়ে থাকে, তার দায়ও তাদের নিতে হবে।

উল্লেখ্য, পার্বত্য চট্টগ্রাম সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধানের লক্ষ্যে ১৯৯৭ সালে সরকার ও জনসংহতি সমিতির মধ্যে পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষরিত হয়। এই চুক্তিতে পার্বত্য চট্টগ্রামের উপজাতি-অধ্যুষিত অঞ্চলের বৈশিষ্ট্য সংরক্ষণের কথা বলা হয়েছিল। আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের অধীনে আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি ও ভূমি ব্যবস্থাপনা, বন ও পরিবেশ, পর্যটন, যোগাযোগব্যবস্থার উন্নয়ন ইত্যাদিসহ রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও অর্থনৈতিক ক্ষমতা ও কার্যাবলি হস্তান্তরের কথা ছিল; যা এখনো পুরোপুরি বাস্তবায়িত হয়নি। তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের নির্বাচনের জন্য স্থায়ী বাসিন্দাদের নিয়ে ভোটার তালিকা প্রণয়ন, ভূমি কমিশনের মাধ্যমে ভূমিবিরোধ নিষ্পত্তি করার যে অঙ্গীকার চুক্তিতে ছিল, তা–ও অবাস্তবায়িত রয়ে গেছে। ফলে পার্বত্য সমস্যার রাজনৈতিক ও শান্তিপূর্ণ সমাধান অর্জিত হয়নি।

১৯৯৭ সালে যে সরকার পার্বত্য চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল, তারাই এখন ক্ষমতায়। চুক্তির পর আওয়ামী লীগ পৌনে চার বছর ক্ষমতায় ছিল। এরপর ২০০৯ সাল থেকে একটানা ১৩ বছর ক্ষমতায় আছে। এরপরও যদি চুক্তি বাস্তবায়িত না হয়ে থাকে, তার দায়ও তাদের নিতে হবে। ভূমি বিরোধ নিষ্পত্তিসহ বিভিন্ন ক্ষেত্রে চুক্তি বাস্তবায়নে সরকারের অনীহা ও অনাগ্রহ জুম্ম জনগণের মধ্যে অনাস্থা ও অবিশ্বাস তৈরি করেছে। সরকার যদি জুম্ম জনগণকে দেওয়া প্রতিশ্রুতি রক্ষা না করে একের পর এক চুক্তিবিরোধী ও জুম্ম জনগণের স্বার্থ পরিপন্থী কার্যক্রম চালাতে থাকে, তার চেয়ে দুর্ভাগ্যজনক আর কী হতে পারে?

যে মহান লক্ষ্য সামনে রেখে ঐতিহাসিক পার্বত্য চুক্তি সম্পাদিত হয়েছিল, তা থেকে যদি রাষ্ট্রপক্ষ বিচ্যুত হয় এবং ভিন্ন পথ গ্রহণ করে; স্বভাবতই ভুক্তভোগীদের মধ্যে প্রতিবাদী চেতনা গড়ে উঠবে। আজ যদি পার্বত্য চুক্তি যথাযথভাবে বাস্তবায়িত হতো, যদি চুক্তি বাস্তবায়নের মাধ্যমে জুম্ম জনগণসহ পার্বত্য চট্টগ্রামের স্থায়ী অধিবাসীরা বিশেষ শাসনব্যবস্থার অধিকারী হতো; যদি সাধারণ প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা, পুলিশ, ভূমি, বন ও পরিবেশ, পর্যটন ইত্যাদি বিষয় আঞ্চলিক পরিষদ ও তিন পার্বত্য জেলা পরিষদের ওপর ন্যস্ত হতো; তাদের বেহাত হওয়া জায়গাজমি ও বাড়িঘর ফেরত পেত; নিজ নিজ জায়গাজমি থেকে উদ্বাস্তু হওয়া জনগণ যদি যথাযথ পুনর্বাসন পেত; পার্বত্যাঞ্চলের সব চাকরিতে যদি অগ্রাধিকার ভিত্তিতে পার্বত্যবাসী নিয়োগ পেত; জুম্মদের জায়গাজমিতে বসতি প্রদানকারী সেটেলরদের সরিয়ে নিয়ে পার্বত্য চট্টগ্রামের বাইরে সম্মানজনক পুনর্বাসন করা হতো; তাহলে নিশ্চিত করে বলা যায় পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে আসত।

মঙ্গল কুমার চাকমা পার্বত্য চট্টগ্রাম জনসংহতি সমিতির তথ্য ও প্রচার সম্পাদক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন