এটাও সত্য যে ইউরোপে এখন অর্থনৈতিক সংকট চলছে। এ সংকটকে পুঁজি করে জনতুষ্টিবাদীরা নিজেদের পক্ষে আরও বেশি জনসমর্থন আদায় করে নিচ্ছেন। ফ্রান্সের অতি ডানপন্থী মেরিন লঁ পেন প্রেসিডেন্ট নির্বাচনে এই বিষয়কেই নিজের প্রচারণার কৌশল করেছেন। ইউরোপে এখন জ্বালানি, নিত্যপণ্য ও খাদ্যসামগ্রীর দাম ঊর্ধ্বমুখী। ১৯৭০-এর দশকের পর এই প্রথম মূল্যস্ফীতি দুই অঙ্কের ঘর ছুঁয়েছে। ২০০৮ সালের বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকটে ইউরোপীয় ইউনিয়নের লোকদের জীবনযাত্রার মান যতটা পড়ে গিয়েছিল, এবার সেটা আরও নেমে যেতে পারে। সে সময় ইউরোপীয় নেতারা যে ভুল পদক্ষেপ নিয়েছিলেন, তাতে অনেক ভোটারই তাঁদের দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছিলেন।

ইউক্রেন যুদ্ধ আবার পশ্চিম ইউরোপের ভোটারদের কাছে একটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁরা এখন উপলব্ধি করতে পারছেন, তাঁরা অনেক ভাগ্যবান। শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মুক্ত দেশে তাঁরা বাস করতে পারছেন। যদিও ইউরোপীয় উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ নিখুঁত একটা অবস্থায় পৌঁছতে অনেক দূরে রয়েছে। ধ্বংস নয়, এগুলোর আরও সংস্কার প্রয়োজন। ইউরোপের গণতন্ত্রে গলদ থাকলেও স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে তার তুলনা কোনোভাবেই করা যায় না।

চলমান অর্থনৈতিক সংকটের প্রতিফলন এরই মধ্যে আমরা দেখতে পাচ্ছি। হাঙ্গেরির স্বৈরাচারী প্রধানমন্ত্রী ভিকতর ওরবান এ ক্ষেত্রে রীতিমতো চ্যালেঞ্জ ছুড়ে দিয়েছেন। অরবান দীর্ঘ সময় ধরে পুতিনের মিত্র। তাঁর বিরুদ্ধে অভিযোগ হচ্ছে, তিনি হাঙ্গেরির নির্বাচনব্যবস্থাকে খুব পরিকল্পিতভাবে নিজের পক্ষে ব্যবহার করেছেন। এ মাসে সাধারণ নির্বাচনে তাঁর দল ভূমিধস বিজয় পেয়েছে। চতুর্থবারের মতো তিনি প্রধানমন্ত্রী হয়েছেন।

ইউরোপের জন্য এটা সতর্কসংকেত। এ ধরনের প্রবণতা বড় পরিসরে ছড়িয়ে পড়ার আগেই ইউরোপীয় ইউনিয়নের সরকারগুলোর পক্ষ থেকে তাদের দুর্বল জনগোষ্ঠীকে অবশ্যই সহায়তা দিতে হবে। এ থেকে উত্তরণে জনকল্যাণে ব্যয় কাটছাঁট না করা, জ্বালানির বিকল্প খোঁজা এবং স্বল্প খরচের প্রযুক্তিতে বিনিয়োগ বাড়াতে হবে। ভালো খবরটা হচ্ছে, নীতিনির্ধারকেরা এসব বিষয় নিয়ে যে কাজ করতে শুরু করেছেন, তাঁরা সফল হলে ইউরোপের রাজনীতিবিদ ও টেকনোক্র্যাটদের প্রতি জনগণের আস্থা ফিরে আসবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ রাশিয়ার সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ও পুতিনের প্রশংসায় মুখর থাকা জনতুষ্টিবাদী নেতাদের রাজনীতির ক্ষেত্রে আস্থার সংকট তৈরি করছে। আগ্রাসন শুরুর পর ইতালির মাত্তিও সালভিনি ও যুক্তরাজ্যের নাইজেল ফারাজের মতো জনতুষ্ঠিবাদী নেতারা রাশিয়ার সঙ্গে কে কার আগে দূরত্ব তৈরি করবে, তা নিয়ে ঠেলাঠেলি শুরু করে দিয়েছেন। এমনকি ভিকতর ওরবানও ভোটে জেতার পর রাশিয়ার সঙ্গে তাঁর দেশের ‘ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনর্মূল্যায়ন’-এর ঘোষণা দিয়েছেন। তিনি রাশিয়াকে ‘প্রতিদ্বন্দ্বী’ বলে বিবেচনা করছেন।

ফ্রান্সের প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের প্রথম দফা ভোটে অতি ডানপন্থী দুই নেতাই একই কাজ করেছেন। পুতিনের সঙ্গে বছরের পর বছর ধরে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক রাখার পর এবং রাশিয়ার কাছ থেকে উল্লেখযোগ্য পরিমাণ অর্থায়ন পাওয়ার পরও ন্যাশনাল র‌্যালির নেতা লঁ পেন ঘোষণা দিয়েছেন, ইউক্রেনে আগ্রাসন অন্যায্য। একই ভাবে রিকনকয়েটের নেতা ইরিক জেরমোঁ, যিনি ফ্রান্সে পুতিনের মতো শাসক হওয়ার স্বপ্ন দেখতেন, তিনিও এই যুদ্ধের বিরোধিতা করেছেন।

কিন্তু তাঁদের এই বিবৃতিই যথেষ্ট নয়। প্রথম দফা নির্বাচনে এই দুই অতি ডান-নেতা মধ্যপন্থী ইমানুয়েল মাখোঁর কাছে হেরে গেছেন। মাখোঁ প্রথম দফায় ২৭ দশমিক ৬ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। দ্বিতীয় দফা ভোটে মাখোঁরই প্রেসিডেন্ট নির্বাচিত হওয়ার সম্ভাবনা বেশি। প্রথম দফা নির্বাচনে লঁ পেন ২৩ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। কিন্তু সম্প্রতি তিনি ফ্রান্সের সঙ্গে ন্যাটো ও ইউরোপীয় ইউনিয়নের দূরত্ব তৈরি করার প্রস্তাব দিয়েছেন। এতে তাঁর ভোট কমে যাবে। প্রথম দফা নির্বাচনে লঁ পেনের একই মতাদর্শের জেরমোঁ মাত্র ৭ শতাংশ ভোট পেয়েছেন। এর কারণ হচ্ছে, তাঁর অভিবাসীসম্পর্কিত দৃষ্টিভঙ্গি।

আয় ও জীবনমান পড়ে যাওয়ায় অথবা এ ধরনের দুর্ভোগে পড়তে হতে পারে—এই ভয়ে ইউরোপীয়রা এখন সংক্ষুব্ধ হয়ে উঠছে। জনতুষ্টিবাদীদের সমর্থন বাড়ার পেছনে এটি মূল কারণ। কিন্তু এরপরও শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতির নতুন একটা বোধ ইউরোপে জন্ম নিয়েছে। জেরমোঁর সমর্থন লঁ পেনের মতো হলেও তিনি ইউক্রেনের শরণার্থীদের স্বাগত জানানোর বিরোধিতা করেন। এ কারণেই নির্বাচনে তাঁর ভরাডুবি হয়।

অবশ্য সহিংসতা থেকে জীবন বাঁচাতে পালিয়ে আসা সব শরণার্থীই যে ইউরোপীয়দের সহানুভূতি পাচ্ছে, এমনটা নয়। আবার ইউক্রেনের শরণার্থীদের বড় পরিসরে আশ্রয় দেওয়া হচ্ছে, এমনটাও নয়। শরণার্থীর স্রোত আরও বাড়বে কি না এবং তাদেরকে আত্তীকরণ করে নিতে কতটা মূল্য দিতে হবে, সেই প্রশ্নে দ্বিধা তৈরি হয়েছে। ইউরোপে শরণার্থীদের প্রতি সহানুভূতি যদি স্থায়ী না হয়, তাহলে পুতিনের দিক থেকে আসা হুমকি থেকেই যাবে।

ইউক্রেন যুদ্ধ আবার পশ্চিম ইউরোপের ভোটারদের কাছে একটি বিষয় সামনে নিয়ে এসেছে। তাঁরা এখন উপলব্ধি করতে পারছেন, তাঁরা অনেক ভাগ্যবান। শান্তিপূর্ণ, নিরাপদ ও মুক্ত দেশে তাঁরা বাস করতে পারছেন। যদিও ইউরোপীয় উদারনৈতিক গণতন্ত্র ও পুঁজিবাদ নিখুঁত একটা অবস্থায় পৌঁছতে অনেক দূরে রয়েছে। ধ্বংস নয়, এগুলোর আরও সংস্কার প্রয়োজন। ইউরোপের গণতন্ত্রে গলদ থাকলেও স্বৈরতন্ত্রের সঙ্গে তার তুলনা কোনোভাবেই করা যায় না।

মধ্য ও পূর্ব ইউরোপের সরকারগুলোকে বিষয়টা মনে রাখতে হবে। পোল্যান্ডকে ইউরোপীয় ইউনিয়ন যে নিরাপত্তা দিয়েছে, সেটা দেশটির জনতুষ্টিবাদী প্রশাসনকে মূল্যায়ন করতে হবে। তারা যে সেটা বুঝতে পারছে, সেটার নমুনাও দেখা যাচ্ছে। হাঙ্গেরির ওরবানের সঙ্গে পোলান্ডের ন্যাটোবিরোধী যে অপ্রকাশ্য জোট ছিল, সম্প্রতি সেটা ভেঙে গেছে। বলা চলে, কয়েক বছরের অভ্যন্তরীণ বিভাজনের পর ইউরোপীয়রা আবার বাইরের শত্রুর বিরুদ্ধে ঐক্যবদ্ধ হয়েছে। নিজেদের মূল্য প্রমাণের জন্য ইউরোপীয় ইউনিয়নের সামনে এখন একটা সুবর্ণ সুযোগ এসেছে। প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও অর্থনীতির ক্ষেত্রে যে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে, সম্মিলিত প্রচেষ্টার তা নিরসনের মাধ্যমে সেটা তারা করতে পারে।

ইউরোপীয় ইউনিয়নের বৈদেশিক বিষয় ও নিরাপত্তা নীতির উচ্চ প্রতিনিধি জোসেফ বোরেল সম্প্রতি বলেছেন, পুতিনের যুদ্ধ ভূরাজনৈতিক ইউরোপের জন্ম দিয়েছে। তিনি ঠিক কথাই বলেছেন। এখন ইউরোপীয় ইউনিয়নের প্রধান উদ্দেশ্য হচ্ছে, পুতিনের রাশিয়া যে হুমকি তৈরি করেছে, তা থেকে ইউরোপকে রক্ষা করা।

স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে
ফিলিপ লেগরেইন ইউরোপীয় কমিশনের প্রেসিডেন্টের সাবেক অর্থনীতিবিষয়ক উপদেষ্টা

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন