বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন
পরাশক্তিগুলো কখনো অস্ত্র ব্যবসার নামে, কখনো নিজেদের শক্তি দেখানোর জন্য, কখনো শক্তি বাড়ানোর জন্য যুগে যুগে যুদ্ধ বাধিয়ে চলেছে। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হচ্ছে।

এস্তোনিয়ায় থাকছি প্রায় বছর দশেক। মাত্র ১২ লাখ জনসংখ্যার বাল্টিক এই দেশটি সোভিয়েত ইউনিয়ন থেকে স্বাধীন হওয়ার পর দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে সব দিক দিয়ে। স্বাধীন হয়ে দেশটি ইউরোপীয় ইউনিয়নে যোগ দেয়। সেনঝেনভুক্ত এই দেশটি এরপর ন্যাটোতেও যোগ দেয়। গত ১০ বছরে দেশটিতে কখনো কোনো রাজনৈতিক অস্থিরতা দেখিনি। মানুষ যে যার মতো করে নিজেদের জীবন উপভোগ করছে। পৃথিবী প্রথম ই-কান্ট্রি এই দেশ অর্থনীতিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। বলা হয়ে থাকে বাল্টিকের সবচেয়ে সফল দেশ হচ্ছে এটি। তুষারে ঢাকা উত্তর–পূর্ব ইউরোপের নির্মল-শান্ত এই দেশটির মানুষের জীবন আসলেই খুব সহজ-সরল। কোথাও কোনো ‘অন্য রকম’ কিছু হয় না! এই নিয়ে এ দেশের মানুষকে মাঝেমধ্যেই হতাশায় ভুগতে দেখেছি।

কিছুদিন যাবৎ রাশিয়া-ইউক্রেন সংকটের কারণে এই দেশেও এর প্রভাব অল্প হলেও পড়তে শুরু করেছিল। সেটি আরও বেড়ে গিয়েছিল দিন দুয়েক আগে রাশিয়ার প্রেসিডেন্ট পুতিনের ভাষণের পর থেকে। তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, সাবেক সোভিয়েত ইউনিয়নের দেশগুলো এত সহজে স্বাধীন হয়ে যাওয়াটাকে তিনি মানতে পারছেন না। এটিকে তিনি ‘ম্যাডনেস’ বলেছেন! এই ভাষণের পর বাল্টিকের দেশগুলোতে (এস্তোনিয়া, লিথুনিয়া ও লাটভিয়া) এর প্রভাব পড়েছে। সবার মনেই কেমন যেন একটা শঙ্কা! সেই শঙ্কা হাজার গুণ বেড়ে গিয়েছে গতকাল বুধবার যখন প্রেসিডেন্ট পুতিন ইউক্রেনে রাশিয়ান হামলার অনুমতি দিয়েছেন। এই ভাষণে তিনি পরিষ্কার করে বলেছেন, ন্যাটো কিংবা আমেরিকা যদি রাশিয়ার পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায়, তাহলে তাদের এমন ‘শিক্ষা’ দেওয়া হবে, যেটা পৃথিবীর মানুষ এর আগে কখনো দেখেনি।

তাঁর এই ভাষণ শুনে আর ঘুম হয়নি রাতে। বারবার মনে হচ্ছিল, কী বোঝাতে চাইছেন তিনি। কী শিক্ষা তিনি পশ্চিমকে দেবেন? সেটা কি পারমাণবিক হামলা? এই সব যখন চিন্তা করছি, তখন খবর আসতে শুরু করেছে, ইউক্রেনের বিভিন্ন শহরে ঢুকে পড়েছে রাশিয়ার সৈন্য। চারদিক থেকে ক্ষেপণাস্ত্র হামলে পড়ছে ইউক্রেনে। বারবার মনে হচ্ছিল, এরপর কোন দেশ? ইউক্রেনের পর কি তবে পুতিন বাল্টিক দেশগুলোর দিকে নজর দেবেন? দেশগুলো তো ন্যাটোভুক্ত দেশ। তাহলে সে যে হুমকি দিয়েছেন, সেটার কী হবে? ইউক্রেনে হামলার পর বিশ্বব্যবস্থা কেমন হবে, কোথায় গিয়ে দাঁড়াবে তা বোঝা দায়। তবে এখন এস্তোনিয়ায় বসে আমাকে যে হামলার ভীতি নিয়ে বাস করতে হবে, তাতে কোনো সন্দেহ নেই।

এই সব ভাবতে ভাবতে নিজের বাসায় ফিরছি, দেখা হলো আমার পাশের অ্যাপার্টমেন্টে থাকা ইউক্রেন থেকে আসা প্রায় ৫০ ছুঁই লোকটার সঙ্গে। বছর পাঁচেক আগে এস্তোনিয়া এসেছেন একটি আইটি ফার্মে কাজ করতে। ওর পুরো পরিবার থাকে ইউক্রেনে। দেখেই মনে হলো জিজ্ঞেস করি ওর পরিবার কেমন আছে সেখানে? উত্তর শুনে অস্থিরতা আরও বেড়ে গিয়েছে। সে বলছিল, পরিবার আজ খুব ভোরে রাজধানী কিয়েভ থেকে বের হওয়ার জন্য রওনা দিয়েছে। প্রথমে যাবে ইউক্রেনের পশ্চিমের একটা শহরে। ওখানে যদি নিরাপদ মনে হয় থাকবে। নইলে সীমান্ত দিয়ে পোল্যান্ডে যাওয়ার চেষ্টা করবে। আমি তাকে জিজ্ঞেস করছিলাম, এরপর? ভদ্রলোক আমার দিকে এমনভাবে তাকাচ্ছিল, আমি পরিষ্কার বুঝতে পারছিলাম এর উত্তর তার জানা নেই। মুহূর্তে তার পুরো পরিবার শরণার্থী হয়ে যাওয়ার শঙ্কার মধ্যে পড়ে গেছে, যা হয়তো জীবনে কখনো চিন্তাও করেনি।

জানি না এর শেষ কোথায়। পরাশক্তিগুলো কখনো অস্ত্র ব্যবসার নামে, কখনো নিজেদের শক্তি দেখানোর জন্য, কখনো শক্তি বাড়ানোর জন্য যুগে যুগে যুদ্ধ বাধিয়ে চলেছে। মাঝখান থেকে সাধারণ মানুষকে তাদের জীবন দিয়ে এর মূল্য দিতে হচ্ছে। শ্বেতশুভ্র মায়াময় ছোট্ট এস্তোনিয়া নামের এই দেশটির মানুষ দুই দিন আগেও নিজেদের নিয়ে অভিযোগ করত, জীবন খুব একঘেয়েমিতে ভরা! সেই মানুষগুলোকেও আজ রাতে বিছানায় যেতে হবে শঙ্কা নিয়ে!

ড. আমিনুল ইসলাম এস্তোনিয়ান এন্টারপ্রেনারশিপ ইউনিভার্সিটির ক্রিয়েটিভিটি অ্যান্ড ইনোভেশন বিভাগের সিনিয়র লেকচারার। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন