পূর্ব-পশ্চিম বিভাজন কেন?

বিজ্ঞাপন

৩০ লাখ শহীদের রক্তের বিনিময়ে পাওয়া স্বাধীনতাকে স্বাধীন দেশের মানুষকে প্রতি মুহূর্তে মনে রাখতে হয়। কেন বাংলাদেশ নামের একটি রাষ্ট্রের জন্ম হয়েছিল, সে কথাও মনে রাখা অত্যাবশ্যক। কিন্তু আমরা যেন সে কথা ভুলেই গেছি। যে আঞ্চলিক বৈষম্যের সূত্র ধরে স্বাধীন বাংলাদেশের রূপরেখা রচিত হয়েছিল, তা আজও দূর হয়নি।

বিশ্বব্যাংক আগেও বলেছে, ৭ অক্টোবর আবার বলেছে, বাংলাদেশের অর্থনীতিতে আঞ্চলিক বৈষম্য বিরাজ করছে। সংস্থাটির মতে, ২০০০ থেকে ২০১০ সাল পর্যন্ত দারিদ্র্য কমানোর যাত্রায় দেশের পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে ব্যবধান কমে আসছিল, কিন্তু ২০১০ সালের পর পশ্চিমাঞ্চলের বিভাগগুলোতে দারিদ্র্যবিমোচনের গতি কমেছে। ফলে পূর্ব ও পশ্চিমাঞ্চলের মধ্যে দারিদ্র্য পরিস্থিতির পার্থক্য আবার ফিরে এসেছে (প্রথম আলো, ৮ অক্টোবর ২০১৯)।

স্বাধীনতার এক দশক আগে, ১৯৬১ সালে লাহোরে এক একাডেমিক আলোচনায় পশ্চিম পাকিস্তানের সঙ্গে পূর্ব পাকিস্তানের আঞ্চলিক বৈষম্যের তত্ত্ব হাজির করে হইচই ফেলে দিয়েছিলেন সে সময়ের তরুণ অর্থনীতিবিদ রেহমান সোবহান। ‘এক দেশ দুই অর্থনীতি’ তত্ত্বের মাধ্যমে তিনি দেখিয়ে দেন, পাকিস্তানের কেন্দ্রীয় সরকার পূর্ব পাকিস্তানের প্রতি কী ধরনের বৈষম্যমূলক আচরণ করছে। তাঁর এই নিবন্ধের বক্তব্যে এতই সাড়া পড়ে যে আইয়ুব খান নাকি জিজ্ঞেস করেছিলেন, রেহমান সোবহান কে? অথচ স্বাধীন দেশে আজ স্বাধীনতার ৫০ বছর পূর্তির প্রস্তুতি চলছে, কিন্তু আঞ্চলিক বৈষম্য নিয়ে কোনো আলোচনা নেই। প্রতিক্রিয়া নেই। আমরা কি এই বাংলাদেশ চেয়েছিলাম?

বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদন বলছে, ২০১০ থেকে ২০১৬ সালের মধ্যে পশ্চিমের রংপুর বিভাগে দারিদ্র্য বেড়েছে। রাজশাহী ও খুলনায় দারিদ্র্য পরিস্থিতি অপরিবর্তিত আছে। অন্যদিকে দেশের পূর্বাঞ্চলের ঢাকা ও সিলেট বিভাগে দ্রুত দারিদ্র্য কমেছে। চট্টগ্রামে কমেছে পরিমিতভাবে। তবে দক্ষিণের বরিশাল বিভাগে সবচেয়ে বেশি দারিদ্র্য কমেছে। অর্থমন্ত্রী দাবি করেছেন, জাতীয় বাজেটে বরাদ্দ দেওয়ায় কোনো বৈষম্য করা হয়নি। তাহলে প্রশ্ন, ২০১০ সালে রংপুর ও বরিশাল বিভাগের দারিদ্র্য হার যেখানে প্রায় একই রকম ছিল, সেখানে ২০১৬–তে এসে রংপুর বিভাগে দারিদ্র্যের হার বাড়ল কেন? বরিশাল বিভাগের দারিদ্র্যের হার অতি দ্রুত কমল কীভাবে?

সরকার স্বীকার করুক আর না-ই করুক, দেশে সমহারে অর্থনৈতিক উন্নয়ন হচ্ছে না। উন্নয়নে আঞ্চলিক বৈষম্য প্রকট, এর প্রভাব পড়ছে দারিদ্র্য হারের হ্রাস-বৃদ্ধিতে। বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্সের চলতি বছরের এক গবেষণা বলছে, বার্ষিক উন্নয়ন কর্মসূচিতে (এডিপি) ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জ জেলা বেশি বরাদ্দ পাচ্ছে। এডিপির ৩৭ দশমিক ৪ শতাংশ বরাদ্দ পায় এই তিন জেলা। অর্থাৎ, ১০০ টাকা বরাদ্দ থাকলে ঢাকা, চট্টগ্রাম ও গোপালগঞ্জ পায় ৩৭ টাকা ৪০ পয়সা। অন্যদিকে, মাগুরা, নড়াইল ও লক্ষ্মীপুর জেলায় বরাদ্দ সবচেয়ে কম, এডিপির মাত্র দশমিক শূন্য ৫ শতাংশ (প্রথম আলো, ২৮ মে ২০১৯)।

সংবিধানে বলা আছে, প্রজাতন্ত্রের সর্বত্র অর্থনৈতিক উন্নয়নের সমান স্তর অর্জনের লক্ষ্যে সুষম সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করতে হবে। কিন্তু রূঢ বাস্তবতা হলো, দারিদ্র্য যেখানে বেশি, সেসব এলাকায় বরাদ্দ তুলনামূলকভাবে কম। ২০১৮-১৯ অর্থবছরে দেখা গেছে, দেশের এডিপিতে মোট বরাদ্দ ছিল ১ লাখ ৭৬ হাজার ৬১৯ কোটি ৭১ লাখ টাকা। এর মধ্যে রংপুর বিভাগের জন্য বরাদ্দ ছিল ১ হাজার ৭২৪ কোটি ৫৮ লাখ টাকা। অর্থাৎ, মোট এডিপি বরাদ্দের মাত্র শূন্য দশমিক ৯৮ শতাংশ পেয়েছে রংপুর বিভাগ (বণিক বার্তা, ৬ মে ২০১৯)।

আঞ্চলিক বৈষম্যের এই পরিসংখ্যান সমগ্র দেশের জন্য উদ্বেগজনক। দেশের কোনো এলাকার এগিয়ে যাওয়ার জন্য কোনো এলাকাকে পেছনে ফেলে রাখা অন্যায্য। কুড়িগ্রামে দারিদ্র্যের হার ৭১ শতাংশ আর নারায়ণগঞ্জে ২ শতাংশ—এই তথ্য একটি অসম সমাজ ও রাষ্ট্রব্যবস্থার ছবি তুলে ধরে। একইভাবে সমতলে কম দারিদ্র্য, পাহাড়ে বেশি—এটাও কোনোভাবে কাম্য নয়। উন্নয়নবৈষম্যের এই প্রবণতা চলতে থাকলে বড় ধরনের সামাজিক-অর্থনৈতিক সমস্যা তৈরি হতে পারে।

বিশ্বব্যাংকের মতে, মূলত শিক্ষা ও সামাজিক খাতে তুলনামূলক কম অগ্রগতির কারণেই পশ্চিমাঞ্চল পিছিয়ে পড়েছে। তবে পিছিয়ে পড়ার আরও অনেক কারণ আছে। পশ্চিম ও উত্তরাঞ্চলে গ্যাস–সংযোগ নেই, যোগাযোগব্যবস্থা অনুন্নত; অবকাঠামোর অভাবে শিল্পের পর্যাপ্ত বিকাশ হয়নি; কর্মসংস্থান নেই। ফলে দেশের অন্যান্য অঞ্চলের সঙ্গে বৈষম্য প্রকট হচ্ছে। শুধু ঢাকাকেন্দ্রিক ব্যবস্থা আঞ্চলিক বৈষম্য বাড়াচ্ছে কি না, তা–ও খতিয়ে দেখা উচিত।

উন্নয়নে সবার অধিকার সমান। তাই আঞ্চলিক বৈষম্য কমাতে সরকারের উন্নয়ন পরিকল্পনায় সমতা আনা জরুরি। প্রয়োজন স্বল্প, মধ্য ও দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা ও তার যথাযথ বাস্তবায়ন। কোনো অঞ্চলকে বিশেষ সুবিধা দিয়ে সমৃদ্ধ করা এবং অন্য অঞ্চলকে নামমাত্র সুবিধা দিয়ে পশ্চাৎপদ রাখার নীতি কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়। এ জন্য সবার আগে চাই রাজনৈতিক সিদ্ধান্ত।

জহির রায়হান: একটি বেসরকারি টেলিভিশনের সংবাদকর্মী
jrjewel90@gmil.com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0
বিজ্ঞাপন