পেশাদার সাংবাদিকতার টিকে থাকার উপায়

গত ২২ আগস্ট প্রথম আলোয় ‘পেশাদার সাংবাদিকতা টিকবে কীভাবে’ শিরোনামে যে নিবন্ধটি লিখেছিলাম, সেখানে বিশ্বজুড়ে সংবাদমাধ্যম শিল্প ও পেশাদার সাংবাদিকতার সংকটের চিত্র সংক্ষেপে তুলে ধরার চেষ্টা ছিল। ডিজিটাল মাধ্যমের বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে বিজ্ঞাপন থেকে সংবাদমাধ্যমের আয় কমার শুরু; আর বিজ্ঞাপনই যেহেতু সংবাদমাধ্যমের আয়ের বৃহত্তম বা প্রধান উৎস, সেহেতু তখন থেকেই সংবাদমাধ্যমের রাজস্ব সমস্যার সূচনা ঘটে। সেই সমস্যা বাড়তে বাড়তে প্রায় এক দশকে সংকটের রূপ ধারণ করেছে এবং সর্বশেষ কোভিড-১৯ মহামারির অভিঘাতে সংবাদমাধ্যমের ইতিহাসে ‘বৃহত্তম অস্তিত্বের সংকটে’ পরিণত হয়েছে।

চলমান মহামারির প্রায় ছয় মাসে বাংলাদেশসহ বিশ্বের প্রায় সব দেশেই অজস্র সংবাদমাধ্যমের প্রকাশনা বন্ধ হয়ে গেছে; হাজার হাজার সাংবাদিক চাকরি হারিয়েছেন এবং এই প্রক্রিয়া অব্যাহত। সংবাদমাধ্যমের এই অস্তিত্বসংকট থেকে উত্তরণের একটা উপায়ের কথা সেদিনের নিবন্ধে সংক্ষেপে বলা হয়েছিল।

সেটা হলো আয়ের প্রধান উৎসের পরিবর্তন। অর্থাৎ এতকাল সংবাদমাধ্যমের প্রধান আয়নির্ভরতা ছিল যে বিজ্ঞাপন, সেই বিজ্ঞাপনের সিংহভাগই যখন গুগল, ফেসবুক ইত্যাদি ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের কাছে চলে গেছে এবং ক্রমেই আরও বেশি মাত্রায় যাচ্ছে, তখন সংবাদমাধ্যমের আয়ের প্রধান উৎস হবেন এর পাঠক-দর্শক-শ্রোতা। অর্থাৎ বিজ্ঞাপননির্ভরতার মডেল থেকে সংবাদমাধ্যমের ব্যবসায়িক মডেলের রূপান্তর ঘটাতে হবে ভোক্তানির্ভর মডেলে। আরও স্পষ্ট করে বললে ভোক্তারা অর্থের বিনিময়ে সংবাদমাধ্যমের গ্রাহক হবেন; তাঁদের সাবস্ক্রিপশন ফি বা গ্রাহক মাশুলই হবে সংবাদমাধ্যমের আয়ের প্রধান উৎস। এই ব্যবসায়িক মডেলের বড় সাফল্য লক্ষ করা যাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্রের দ্য নিউইয়র্ক টাইমস-এর ক্ষেত্রে। তারা তাদের ডিজিটাল গ্রাহকের সংখ্যা ৬৫ লাখে উন্নীত করতে সক্ষম হয়েছে; ২০২৫ সালের মধ্যে এই সংখ্যা ১ কোটিতে উন্নীত করার চেষ্টা চালাচ্ছে। শুধু নিউইয়র্ক টাইমসই নয়, আমেরিকায় ওয়াশিংটন পোস্ট, ওয়াল স্ট্রিট জার্নালসহ অনেক সংবাদপত্রের ডিজিটাল গ্রাহকের সংখ্যা বেড়েছে এবং আরও বেড়ে চলেছে। ইউরোপে যুক্তরাষ্ট্রের গার্ডিয়ান এবং জার্মানির ডের স্পিগেলসহ প্রায় সব বড় পত্রপত্রিকাই গ্রাহকভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলকেই অগ্রাধিকার দিচ্ছে।

বিজ্ঞাপন

গত ২২ আগস্ট প্রকাশিত নিবন্ধে বলা হয়েছিল, গ্রাহকভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেল ছাড়াও সংবাদমাধ্যমের সংকট কাটিয়ে টিকে থাকার এবং ক্রমে আরও বিকশিত হওয়ার আরও কয়েকটা সম্ভাব্য উপায় আছে। সেগুলোর একটা হলো রাজস্ব ভাগাভাগি: গুগল, ফেসবুকসহ যেসব ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম সংবাদমাধ্যমের বিষয়বস্তু বা কনটেন্ট ব্যবহার করে বিপুল পরিমাণ রাজস্ব আয় করে, তাদের কাছ থেকে রাজস্বের ভাগ আদায় করা। বহু বছর আগে রুপার্ট মারডক এই দাবি তুলেছিলেন। গুগল, ইয়াহু, এমএসএন (এখনকার ‘বিং’)—এ রকম ইন্টারনেট সার্চ ইঞ্জিন ও ব্রাউজার কোম্পানিগুলোর কাছ থেকে মারডক অর্থ দাবি করেছিলেন এ জন্য যে তারা তাদের ওয়েবসাইটগুলোতে মারডকের মিডিয়া সাম্রাজ্য ‘নিউজ করপোরেশন’–এর বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের সাংবাদিকদের লেখা সংবাদ, ভিডিও চিত্র ইত্যাদি কনটেন্ট ব্যবহার করে। কিন্তু সেই সময় প্রচণ্ড দাপটের সঙ্গে দ্রুত উত্থানমুখী ওই সব ডিজিটাল প্রতিষ্ঠান মারডকের কথায় ভ্রুক্ষেপ করেনি। নিউজ কনটেন্ট ব্যবহার করার জন্য সংবাদমাধ্যমগুলোকে অর্থ দিতে ওই সব প্রতিষ্ঠানকে বাধ্য করার কোনো আইনি পন্থাও মারডকের হাতে ছিল না।

এই পথে অগ্রগতির একটা খবর পাওয়া গেল রুপার্ট মারডকেরই জন্মভূমি অস্ট্রেলিয়া থেকে। দেশটির সরকার বিজ্ঞাপনের বাজারে ‘ন্যায্যতা নিশ্চিত করতে সবার জন্য সমান সুযোগ’ প্রতিষ্ঠার আইনি উদ্যোগ নিতে চলেছে। অস্ট্রেলিয়ান কম্পিটিশন অ্যান্ড কনজ্যুমার কমিশন গত জুলাই মাসে একটি খসড়া বিধান তৈরি করেছে, যা পার্লামেন্টের অনুমোদনে আইনে পরিণত হলে দেশটিতে গুগল, ফেসবুকসহ ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোকে অস্ট্রেলীয় সংবাদমাধ্যমের তৈরি সংবাদ, ভিডিও চিত্র ইত্যাদি তথ্যমূলক উপকরণ (নিউজ কনটেন্ট) ব্যবহারের জন্য অর্থ প্রদান করতে হবে। ‘কোড অব কনডাক্ট’ নামের এই খসড়া বিধানে বলা হয়েছে, প্রাথমিকভাবে ফেসবুকের নিউজ ফিড ও গুগলের সার্চ রেজাল্টে প্রতিটি ক্লিকের জন্য ফেসবুক ও গুগল সংশ্লিষ্ট সংবাদ প্রতিষ্ঠানকে অর্থ প্রদান করতে বাধ্য থাকবে। প্রদেয় অর্থের পরিমাণ কী হবে, তা ফেসবুক ও গুগল সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর সঙ্গে আলোচনার ভিত্তিতে নির্ধারণ করবে। এই দর-কষাকষি বা আলোচনার জন্য সরকার গুগল-ফেসবুককে নির্দিষ্ট সময়সীমা বেঁধে দেবে; সেই সময়ের মধ্যে তারা বোঝাপড়ায় পৌঁছাতে ব্যর্থতা হলে সরকার একটি স্বাধীন ‘আরবিট্রেশন অথরিটি’র মাধ্যমে রাজস্ব ভাগাভাগির বিষয়টি ঠিক করে দেবে।

অস্ট্রেলিয়ার সরকারি কর্তৃপক্ষ বলছে, গুগল ও ফেসবুকের মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বিজ্ঞাপনের বাজারে একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণ ভোগ করছে; এর বদলে সবার জন্য সমান সুযোগ সৃষ্টি করার লক্ষ্যেই এই বিধান তৈরির উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। তারা ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ও সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোর মধ্যে রাজস্ব ভাগাভাগির বিধানটি কার্যকর করতে সক্ষম হলে সংবাদমাধ্যমশিল্পের আর্থিক সংকট অনেকটাই লাঘব হবে। তাহলে একই দৃষ্টান্তের অনুসরণে পৃথিবীর আরও অনেকে দেশেই সংবাদমাধ্যম প্রতিষ্ঠানগুলোর ডিজিটাল বিজ্ঞাপনের রাজস্বের ভাগ পাওয়ার আইনি বন্দোবস্ত হতে পারে। ভারতের সংবাদমাধ্যমগুলো ইতিমধ্যে তাদের সরকারের কাছে এ রকম বিধান তৈরির দাবি জানাতে শুরু করেছে। উল্লেখ করা প্রয়োজন, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলোকে তাদের নিউজ কনটেন্ট ব্যবহারের জন্য খুবই সামান্য কিছু অর্থ দিয়ে থাকে; কিন্তু সেটা তারা করে নিজেদের মর্জিমাফিক, নিজেদের ধার্য করা অঙ্কে। এখানে সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো তাদের সঙ্গে দর-কষাকষি করতে পারে না। অস্ট্রেলীয় সরকার তাদের এই একচেটিয়া নিয়ন্ত্রণের অবসান ঘটানোর লক্ষ্যেই উল্লিখিত খসড়া আইনটি সামনে এনেছে।

বিজ্ঞাপন

গত ২২ আগস্টের লেখায় সংবাদমাধ্যমের নতুন ব্যবসায়িক মডেলের একটি উপাদান হিসেবে বলেছিলাম গ্রাহকভিত্তিক রাজস্ব আয়ের কথা। আয়ের দ্বিতীয় পন্থাটি হতে পারে ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মের সঙ্গে রাজস্ব ভাগাভাগির বন্দোবস্ত। এই দুটি পন্থা কার্যকর করা সম্ভব হলে সংবাদমাধ্যমের ‘অস্তিত্বের সংকট’ থাকবে না। বরং ডিজিটাল মাধ্যমে তার আরও বিকশিত হওয়ার পথ প্রশস্ত হবে। নতুন বাস্তবতায় সংবাদমাধ্যমকে এ পথেই অগ্রসর হতে হবে। ইউরোপ-আমেরিকায় সংবাদ প্রতিষ্ঠানগুলো বিশেষভাবে জোর দিচ্ছে পাঠক-দর্শক-শ্রোতা, অর্থাৎ গ্রাহকভিত্তিক ব্যবসায়িক মডেলটির ওপর। বাংলাদেশসহ উন্নয়নশীল দেশগুলোতেও সাংবাদিকতার সংকট উত্তরণ ও ভবিষ্যৎ বিকাশ এই পথেই ঘটবে বলে আমাদের ধারণা। দায়িত্বশীল পেশাদার সাংবাদিকতার মাধ্যমে সঠিক তথ্যপ্রবাহের প্রধান উপকারভোগী যেহেতু পাঠক, দর্শক ও শ্রোতা; সেহেতু সংবাদমাধ্যমকে আর্থিক সংকট থেকে মুক্ত করতে তাঁরাই এগিয়ে আসছেন এবং ভবিষ্যতে আরও বেশি সংখ্যায় আসবেন। ভবিষ্যতের সাংবাদিকতা ও সংবাদমাধ্যম বিজ্ঞাপনদাতা বা অন্য কোনো মহলের ওপর অর্থনৈতিকভাবে নির্ভরশীল থাকবে না; তার অর্থনৈতিক শক্তি জোগাবেন ভোক্তা-গ্রাহকেরাই।

আর এই মুহূর্তে বাংলাদেশে সংবাদমাধ্যম যে প্রকট সংকটের মুখে পড়েছে, তা থেকে উত্তরণের জন্য রাষ্ট্রকে এগিয়ে আসতে হবে। কোভিডের আঘাতে অর্থনীতির বিভিন্ন খাত মারাত্মকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে এবং তার প্রত্যক্ষ নেতিবাচক প্রভাবে সংবাদমাধ্যমের আয় ভীষণভাবে কমে গেছে। সরকারের পক্ষ থেকে বিভিন্ন খাতের জন্য আর্থিক প্রণোদনার ব্যবস্থা করা হয়েছে। কিন্তু সংবাদমাধ্যমের জন্য তেমন কিছু করা হয়নি।

বাংলাদেশ সংবাদপত্র মালিক সমিতি (নোয়াব) সরকারের কাছে কয়েকটি ন্যায্য দাবি জানিয়েছে। যেমন তারা বলছে, সংবাদপত্রশিল্পকে যে ৩৫ শতাংশ হারে করপোরেট কর দিতে হচ্ছে, তা কমিয়ে ১০ বা ১২ শতাংশ করা হোক। প্রশ্ন হলো, তৈরি পোশাকশিল্পের করপোরেট করের হার যেখানে ১০-১২ শতাংশ, সেখানে সংবাদপত্রশিল্পের জন্য এই হার ৩৫ শতাংশ করা হয়েছে কী যুক্তিতে? তা ছাড়া ভ্যাট ও সম্পূরক শিল্পসংক্রান্ত আইনে সংবাদপত্রগুলো ভ্যাটের আওতার বাইরে হওয়া সত্ত্বেও কেন নিউজপেপার আমদানিতে তাদের কাছ থেকে ১৫ শতাংশ ভ্যাট আদায় করা হচ্ছে? এসব ছাড়াও সংবাদমাধ্যমকে তাদের বিজ্ঞাপনের আয় থেকে ৪ থেকে ২ শতাংশ হারে উৎসে কর প্রদান করতে হয়; কাঁচামালের ওপর ৫ শতাংশ হারে অগ্রিম আয়কর আদায় করা হয়।

চলমান গুরুতর সংকট থেকে সংবাদমাধ্যমের উত্তরণের জন্য এই সব কর অন্তত আগামী পাঁচ অর্থবছরের জন্য প্রত্যাহার করা উচিত। অন্যথায় অনেক সংবাদ প্রতিষ্ঠানের প্রকাশনা অচিরেই বন্ধ হয়ে যাবে, চাকরি হারাবেন শত শত সাংবাদিক ও সংবাদমাধ্যমের অন্যান্য কর্মী। এ ছাড়া সংবাদপত্রগুলোর সরকারি বিজ্ঞাপন প্রকাশ বাবদ যে অর্থ পাওনা বকেয়া রয়েছে, তা অতি দ্রুত পরিশোধ করা উচিত।

মশিউল আলম প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহকারী সম্পাদক

mashiul.alam@gmail.com

মন্তব্য পড়ুন 0