নটর ডেম কলেজের ছাত্র নাঈম হাসানের মৃত্যুর আহাজারির মধ্যেই কুমিল্লা ভিক্টোরিয়া সরকারি কলেজ ও চাঁদপুর সরকারি কলেজের তিন শিক্ষার্থী ঊর্মি মজুমদার, সাকিবুল হাসান ও মাহবুবুল ইসলামের মরদেহ আসল আমাদের উঠানে। তাঁদের শেষকৃত্যের প্রস্তুতির মধ্যে জানা গেল, চট্টগ্রামের আরেক শিক্ষার্থী সাদিয়া আফরোজের মৃত্যুসংবাদ।

আমরা কি বুকে পাথর বাঁধতে জানি, নাকি বুকটাই পাথর হয়ে গেছে এত দিনে! একে একে থেঁতলে যাওয়া, পিষ্ট মাংসপিণ্ডে পরিণত হওয়া সন্তানের-স্বজনের মরদেহ নিয়মসিদ্ধ কবরস্থ করি, দাহ করি। তাই রাজধানীর রামপুরায় সদ্য এসএসসি পরীক্ষা দেওয়া কিশোর মাইনুদ্দিন ইসলামের দাফনও ‘ঠিকঠাক’ হয়ে যায়। খবর আসে, ব্রাহ্মণবাড়িয়ার সরাইলে আরেক কিশোর শিক্ষার্থী সোহান চৌধুরীকে পিষিয়ে দিয়ে গেছে একটি ট্রাক। চট্টগ্রাম নগরে কলেজছাত্র জয়দীপ দাশেরও প্রাণ গেছে সড়কে। সন্তানের-স্বজনের অকালমৃত্যুর সিলসিলা চলমান।

সড়কেই কি স্বজন হারাচ্ছি রোজ? সকালে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে কারখানায় যাওয়া মানুষটিকে শনাক্তে কি ছুটছে হচ্ছে না মর্গে? শতকোটি টাকার ভবন তৈরি হয়, নিরাপত্তায় ফুটো কড়িও নষ্টে কেউ রাজি নয়। নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে, থেঁতলে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বছরে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু তাই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় পরিণত।

মৃত্যু মানেই তো শোক, কিন্তু এত এত মৃত্যুর পর শোকের এ বিরামহীনতায় মানুষ কি কাঁদতে পারে! গতকালের শোক চাপা পড়ছে আজকের মৃত্যুর খবরে, আজকের আহাজারি থমকে যাচ্ছে আরেক লাশ দেখে! এ যেন শোকের সরণি; এই সরণি ধরে যাওয়াই কি আমাদের নিয়তি?

রোড সেফটি ফাউন্ডেশনের হিসাবে গেল নভেম্বরেই আমরা নাঈম হাসান-মাইনুদ্দিন ইসলামের মতো ৫৪ জন শিক্ষার্থীকে হারিয়েছি (প্রথম আলো, ৫ ডিসেম্বর ২০২১)। চলতি বছরের ১১ মাসে ৭৩৭টি তরুণ প্রাণ সড়কের পিচে মিশে গেছে! কোনো মাসেই এই অকাল প্রবোধহীন মৃত্যুর সংখ্যা পঞ্চাশের কম ছিল না। মে মাসে ছিল সর্বোচ্চ ৮৪, জুনে ৫৩।

সড়কেই কি স্বজন হারাচ্ছি রোজ? সকালে টিফিন ক্যারিয়ার হাতে কারখানায় যাওয়া মানুষটিকে শনাক্তে কি ছুটছে হচ্ছে না মর্গে? শতকোটি টাকার ভবন তৈরি হয়, নিরাপত্তায় ফুটো কড়িও নষ্টে কেউ রাজি নয়। নির্মাণাধীন বহুতল ভবন থেকে পড়ে হাড়গোড় ভেঙে, থেঁতলে, বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে বছরে শতাধিক শ্রমিকের মৃত্যু তাই ‘স্বাভাবিক’ ঘটনায় পরিণত।

কতজন তো আবার ‘হারিয়ে’ও যায়। কারা নাকি এসে ধরে নিয়ে যায়, এরপর তাঁর নাম-নিশানা কোথাও পাওয়া যায় না। ভোটার তালিকায় নাম থাকলেও তিনি ভোট দেন না। অফিসে নাম থাকলেও গরহাজির। তাঁর মৃত্যুসনদও ইস্যু করে না রাষ্ট্র। এই ‘নাই’ হয়ে যাওয়া মানুষের ‘অবশেষটুকু’ থাকে কেবল মায়ের অন্তরাত্মায়, বাবার বুকের ফাঁকে, স্ত্রীর চোখের জলে, সন্তানের বিষণ্নতায়, স্বজনদের দীর্ঘশ্বাসে। হারিয়ে যাওয়া মানুষটির মরদেহকে একবার বিদায় জানানোর অধিকারও পান না স্বজনেরা। বেঁচে আছেন কি না, তার নিশ্চয়তাও পান না তাঁরা রাষ্ট্রের কাছ থেকে। ‘জীবন’ ও ‘মৃত্যু’—দুভাবেই বেখবর এসব মানুষকে কীভাবে সংজ্ঞায়িত করা যায়? সরকারের জবানিতে জানতে ইচ্ছে করে।

অবশ্য এই জানার ইচ্ছে কত দিন জিইয়ে থাকে, সে-ও এক প্রশ্ন বটে। প্রতিদিনই তো ‘গরল’ খাচ্ছি, নিশ্বাসে নিচ্ছি ‘বিষ’—খাবারে ভেজাল, পানি দূষিত, হলাহলে পূর্ণ হাওয়া। হুটহাট না মরলেও আমরাও দ্রুত এগোচ্ছি মৃত্যুর দিকে; এর আগে বিষের পার্শ্বপ্রতিক্রিয়ার ভোগান্তি তো থাকছেই। এ-ও কি অকালমৃত্যুর নামান্তর নয়?
কী একটা ‘কার্টুন’ আঁকার জন্য মানুষকে কারাগারে পচে মরতে হয় যে দেশে, সেখানে জীবনের মর্যাদা ‘হাওয়ায় ফাঁদ’ পেতেও ধরা পড়বে না। জমি–জিরাত বিক্রি করে বিদেশে গিয়ে লাশ হয়ে ফেরেন কত শত প্রবাসী শ্রমিক। সরকারি হিসাবেই, গত এক যুগে মধ্যপ্রাচ্য থেকে ৩৩ হাজার ‘মর্যাদাহীন’ তরুণ-যুবা কফিনবন্দী হয়ে ফিরেছেন বাংলা মায়ের কোলে। আহ্, কী সান্ত্বনাহীন অকালমৃত্যু, শ্রমশক্তির কী বিপুল অপচয়! তাদের কর্মপরিবেশ, তাদের নিরাপত্তা নিয়ে কোনো কথা শোনা না গেলেও রেমিট্যান্স-গর্বে দেশের বুক ফুলে থাকে।

দেশের বুক আরও চওড়া হয়, যখন জানা যায় আমদানিকারক শীর্ষ ২০ দেশের ‘সম্মানজনক’ তালিকায় তার নাম উঠেছে। এমনকি মহাকাশেও ‘লেখা’ হয়েছে নাম— স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণকারী দেশের কাতারে এখন বাংলাদেশ। স্বল্পোন্নত দেশের তালিকা থেকে নাম কাটছে। অর্থনীতির আকার বাড়ছে তড়তড়িয়ে। অনেকে ভালোবেসে তাই এ দেশকে ‘উন্নয়নের রোল মডেল’ বলে ডাকে।

অন্য কত ক্ষেত্রেও যে ‘রোল মডেল’ হয়ে আছে বাংলাদেশ, তার খবর কে রাখে! আক্ষরিক অর্থেই চোখ কপালে তোলার মতো অঢেল টাকায় মহাসড়ক নির্মাণের রেকর্ড গড়েছি আমরা। বিশ্বের সবচেয়ে দ্রুতগতিতে (কুইকেস্ট গ্রোইং) পয়সাওয়ালা তৈরির সব বন্দোবস্ত পাকা হয়েছে দেশে। জনগণের অর্থ লোপাটকারী, ঋণখেলাপি, দেশের সম্পদ পাচারকারী, এমনকি শত শ্রমিক ‘হত্যাকারী’ও বহাল তবিয়তে থাকতে পারেন এ দেশে। অনেক ক্ষেত্রে ‘পুরস্কৃত’ও করা হয় তাঁদের।

কেবল গণমানুষের জীবন ‘মূল্যহীন’। বেঁচে থাকতেও তাঁদের কদর নেই, মৃত্যুও ঘটে অসম্মানের বাতাবরণে। মৃত্যুকে যতভাবে চেনা করা যায়, ‘পটল তোলা’ই বুঝি তার মধ্যে সবচেয়ে ‘সস্তা’ উপমায় বিবৃত। রাস্তাঘাটসহ কলকারখানা-কর্মক্ষেত্রে যখন-তখন, অহরহ, অবিরাম এসব অকাল-অপঘাতের মৃত্যু যেন ‘পটল তোলা’র সঙ্গেই তুলনীয়। মূল্যহীন মানুষদের সস্তা মৃত্যুতে তাই শোক কেবল পরিবারের, স্বজনের। তাঁরা পড়ে থাকুক শোকের সরণিতে; উন্নয়নের মহাসড়ক ধরে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ।

হাসান ইমাম সাংবাদিক
[email protected]