বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শিক্ষকদের দাবির মধ্যে আছে; প্রতিবন্ধিতা-সম্পর্কিত বিশেষ শিক্ষা নীতিমালা অনুযায়ী বিদ্যালয়গুলোর স্বীকৃতি ও এমপিওভুক্তি, বিদ্যালয় নিয়োগের তারিখ থেকে শিক্ষকদের বেতন-ভাতা প্রদান, সব বিদ্যালয়ের বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শতভাগ উপবৃত্তি প্রদান, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষা কারিকুলাম অনুযায়ী বিনা মূল্যে পাঠ্যবই বিতরণ, বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের স্বাস্থ্যসম্মত খাবার পরিবেশন, শিক্ষা উপকরণ সরবরাহ, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ে আধুনিক সরঞ্জামসহ থেরাপি কেন্দ্র চালু এবং শিক্ষাজীবন শেষে প্রতিবন্ধীদের কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করা।

প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় শিক্ষক সমিতির হিসাব মতে, সারা দেশে প্রায় ২ হাজার ৬৯৭টি প্রতিবন্ধীদের বিদ্যালয় রয়েছে। শিক্ষক-কর্মচারীর সংখ্যা ৬০ থেকে ৭০ হাজার। এসব বিদ্যালয়ে প্রায় ছয় লাখ শিক্ষার্থী পড়াশোনা করে। স্কুলগুলোতে সাধারণ শিক্ষার পাশাপাশি বৃত্তিমূলক শিক্ষাও দেওয়া হয়। কিন্তু ২০০৯ সালে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয় নীতিমালা প্রণয়ন করা হলেও তা বাস্তবায়িত হয়নি। একটি নীতিমালা বাস্তবায়ন করতে কত বছর সময় লাগে?

শিক্ষকদের এসব দাবির কোনোটি অযৌক্তিক নয়। তাঁরা বলেছেন, যেদিন কাজে যোগ দিয়েছেন, সেদিন থেকে বেতন-ভাতা দিতে হবে। শিক্ষার্থীদের শতভাগ বৃত্তি দিতে হবে। যেখানে সাধারণ শিক্ষার্থীদের একটা বড় অংশ উপবৃত্তি পেয়ে থাকে, সেখানে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীরা কেন পাবে না? সরকার যেখানে লাখ লাখ শিক্ষার্থীকে বিনা মূল্যে বই বিতরণ করছে, সেখানে এই ছয় লাখ শিক্ষার্থী কেন বঞ্চিত হবে?

শিক্ষক সমিতির আহ্বায়ক আরিফুর রহমান বলেছেন, ‘প্রতিবন্ধীরা মানবগোষ্ঠীর সবচেয়ে পিছিয়ে পড়া সন্তান। প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের জীবনের মান উন্নয়ন করে মূলধারায় নিয়ে আসা সরকারের দায়িত্ব। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোর শিক্ষক-কর্মচারীরা দীর্ঘদিন ধরেই বেতন ভাতার অভাবে মানবেতর জীবনযাপন করছেন। যেই শিক্ষকেরা অনেক কষ্ট করে প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দান করছেন, তারা কেন বেতন-ভাতা পাবেন না? কেন তাদের মানুষের দয়ার ওপর নির্ভর করতে হবে?

গাইবান্ধার রামচন্দ্রপুর বুদ্ধিপ্রতিবন্ধী এ আর বিদ্যালয়ের শিক্ষক শারমিন খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘আমাদের কোনো বেতন দেওয়া হয় না। স্বামী-সন্তান, যৌথ পরিবার নিয়ে পরিবার চালানো অসম্ভব। তবু আমরা আমাদের নিজস্ব টাকায় শিক্ষার্থীদের যাতায়াত, টিফিন, ওষুধ, শিক্ষার প্রয়োজনীয় উপকরণ দিয়ে থাকি। আমরা সরকারের প্রতি আহ্বান জানাই, পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে যেন এগিয়ে নেওয়া হয়।’

এই ঢাকা শহরে আমরা যখন স্বাভাবিক জীবন যাপন করছি, যাদের অফিসে যাওয়ার কথা তাঁরা অফিসে যাচ্ছেন, যাঁদের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে যাওয়ার কথা তাঁরা সেখানে যাচ্ছেন, কিন্তু এই শিক্ষকেরা কেবল নিজেদের বেতন-ভাতার জন্য নয়; প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থীদের শিক্ষাজীবন নিশ্চিত করতে রাজপথে আন্দোলন করছেন। চার/পাঁচ দিন ধরে খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাচ্ছেন। তারা ইচ্ছে করলে অন্য পেশায় যেতে পারতেন, কিন্তু এই বিদ্যালয়ে আছেন প্রতিবন্ধী শিশু-কিশোরদের মায়ায় পড়ে। শিক্ষকদের কাছে এরাও তাদের সন্তানের মতো।

default-image
দুর্মূল্যের বাজারে প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের এই শিক্ষকেরা কোথায় যাবেন? কীভাবে চলবেন? ঘরে যদি খাবারই না থাকে, তাহলে কীভাবে তাঁরা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন? একটি স্বাভাবিক শিশুকে পড়ানোর চেয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে পড়ানো অনেক বেশি কষ্টের। অনেক বেশি পরিশ্রমের। তারপরও কেন তারা বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা পাবেন না?

সরকার অনুৎপাদনশীল খাতে অনেক অপ্রয়োজনীয় খরচ করছে। উন্নয়নের নামে সড়ক ছাড়া সেতু নির্মাণ, লোকালয় না থাকা সত্ত্বেও সড়ক নির্মাণ করে অর্থের অপচয় করছে। অথচ সমাজের এই কয়েক লাখ বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুদের যারা পড়াচ্ছেন, তাঁদের বেতন-ভাতা দিচ্ছে না। আগে বেসরকারি প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়গুলো সামাজিক সহায়তায় কোনোরকম চললেও করোনাকালে প্রায় অচল হয়ে পড়ে। সমাজের যেসব সহৃদয় ব্যক্তি সাহায্য-সহযোগিতা করতেন, অর্থনৈতিক সংকটের কারণে এখন তারাও দিতে পারছেন না। ফলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের সামান্য অর্থসহায়তার ওপরই এঁদের ভরসা করতে হয়েছে।

দুর্মূল্যের বাজারে এই শিক্ষকেরা কোথায় যাবেন? কীভাবে চলবেন? ঘরে যদি খাবারই না থাকে, তাহলে কীভাবে তাঁরা বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীদের পড়াবেন? একটি স্বাভাবিক শিশুকে পড়ানোর চেয়ে বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিশুকে পড়ানো অনেক বেশি কষ্টের। অনেক বেশি পরিশ্রমের। তারপরও কেন তারা বেঁচে থাকার মতো বেতন-ভাতা পাবেন না?

প্রতিবন্ধী শিশুদের কল্যাণ মানে বড় বড় অনুষ্ঠান আয়োজন নয়। এই শিশুরা যেসব বিদ্যালয়ে পড়ে, সেখানে তাদের সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা থাকতে হবে। তাদের উপযোগী বিদ্যালয়ের ঘর, দরজা, সিঁড়ি, টয়লেট, বেঞ্চ, টেবিল তৈরি করতে হবে। সর্বোপরি যেই শিক্ষকেরা তাদের পড়াচ্ছেন, তাঁদেরও ন্যূনতম বেতন-ভাতা তো দিতে হবে। শিক্ষকদের অভুক্ত রেখে আপনি বলতে পারেন না, শিক্ষাদান করো।

সরকারের কর্তাব্যক্তিদের কেউ যদি খোলা আকাশের নিচে রাত কাটাতেন, তাহলে শিক্ষকদের কষ্ট বুঝতেন। সর্বশেষ খবর হলো শিক্ষকদের একটি প্রতিনিধিদল প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে গিয়ে স্মারকলিপি দিয়েছে। একটি স্মারকলিপি দিতে শিক্ষকদের পাঁচ দিন অপেক্ষা করতে হয়েছে। আমরা কেমন দেশে আছি। এই পাঁচ দিন ধরে পুরুষ শিক্ষকদের পাশাপাশি নারী শিক্ষকেরাও খোলা আকাশের নিচে ছিলেন। আছেন। কয়েকজন শিক্ষকের সঙ্গে কথা বললে তারা জানান, আর প্রতিশ্রুতি নয়, এবার দাবি আদায় করেই আমরা ঘরে ফিরে যাব।

কয়েক দিন আগে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এক প্রতিবন্ধী শিক্ষার্থী আমাকে টেলিফোন করেছিলেন। তিনি দৃষ্টিপ্রতিবন্ধী। অন্যের সহায়তায় পরীক্ষা দিয়ে বিশ্ববিদ্যালয় পর্যন্ত এসেছেন। তিনি লেখালেখি করেন। তাঁর ইচ্ছে, জাতীয় পত্রিকায় তাঁর লেখা ছাপা হোক। এ রকম বিশেষ চাহিদাপ্রাপ্ত শিক্ষার্থীদের তৈরি করার দায়িত্ব যারা নিয়েছেন, সই শিক্ষকদের দুঃখ দুর্দশার কথা আমরা কী করে ভুলে যাই? কেন রাষ্ট্র তাদের সহায়তায় এগিয়ে আসবে না? শিক্ষামন্ত্রী-শিক্ষা উপমন্ত্রী কি করছেন?

সরকারের নীতিনির্ধারকদের বলব, প্রতিবন্ধী বিদ্যালয়ের শিক্ষকদের অবহেলার চোখে দেখবেন না। বিশেষ চাহিদাসম্পন্ন শিক্ষার্থীদের শিক্ষা দিয়ে তাঁরা মহৎ কাজ করছেন। আপনারা সাড়ে পাঁচ লাখ কোটি টাকার বাজেট করেন, উন্নত দেশ গড়ার খোয়াব দেখেন, কিন্তু এই শিক্ষকদের রাস্তায় রেখে তা সম্ভব নয়। প্রতিবন্ধী শিক্ষকদের ন্যায্য দাবি মেনে নিন।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি।

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন