>

ঢাকা রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের নবম শ্রেণির ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনায় করা মামলায় গত বৃহস্পতিবার ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালত প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমানসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করেন। এ ঘটনায় উদ্বেগ জানিয়েছেন দেশের ৪৭ জন বিশিষ্ট নাগরিক। বিবৃতি দিয়েছে আন্তর্জাতিক মানবাধিকারবিষয়ক সংগঠন অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল। গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির খবরটি বিভিন্ন দেশের নামকরা গণমাধ্যমে প্রকাশ করা হয়। এ ঘটনাপ্রবাহে সরব সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুক ব্যবহারকারীরাও। শিক্ষক, পেশাজীবী, সাংবাদিক, গবেষকসহ সমাজের নানা শ্রেণি-পেশার নাগরিকেরা এ বিষয়ে তাঁদের মতামত তুলে ধরেছেন। ফেসবুক থেকে কয়েকটি নির্বাচিত লেখা এখানে প্রকাশ করা হলো। (ফেসবুকে পোস্ট দেওয়ার সময়ের ক্রম অনুযায়ী)

default-image


পেশার ওপর আঘাত
পুলক ঘটক
দেশের সবচেয়ে সফল সংবাদপত্রের নাম প্রথম আলো। দেশের সবচেয়ে সফল সম্পাদকের নাম মতিউর রহমান। প্রখ্যাত এই সাংবাদিকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে। একটা উদ্দেশ্যমূলক বাজে মামলায় এই গ্রেপ্তারি পরোয়ানা।

মতিউর রহমান এবং সাহিত্যিক আনিসুল হক উদ্দেশ্যমূলক অবহেলার মাধ্যমে আবরারকে হত্যা করেছেন—এ রকম কথা বলা উদ্দেশ্যমূলক মতলববাজি মাত্র। মূল উদ্দেশ্য, পত্রিকাটির ওপর চাপ সৃষ্টি করা এবং পারলে পত্রিকাটি বন্ধ করে দেওয়া। এই করে দেশের গণতন্ত্র এবং মিডিয়া উপকৃত হবে না।

সরকার প্রতিপক্ষ হলে দেশের শ্রেষ্ঠ সম্পাদক এবং এক নম্বর দৈনিক পত্রিকাটিকে রক্ষা করা সামগ্রিকভাবে বাংলাদেশের সাংবাদিক সমাজ এবং জনগণের ওপর বর্তায়।

আমি একজন সাধারণ সংবাদকর্মী হিসেবে এবং বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের সাবেক যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে এই দুঃসময়ে দৈনিক প্রথম আলো এবং মতিউর রহমানের পক্ষে সামগ্রিক শক্তি নিয়ে দাঁড়ানোর জন্য সাংবাদিক সমাজের প্রতি সবিনয়ে অনুরোধ জানাচ্ছি।

মতিউর রহমানের সঙ্গে বিভিন্ন ইস্যুতে আপনাদের অনেকের মতপার্থক্য থাকতেই পারে। কিন্তু প্রথম আলোর ওপর আঘাতকে যদি আপনাদের পেশার ওপর আঘাত হিসেবে বিবেচনা না করেন, তাহলে বড় ভুল করবেন।

১৬ জানুয়ারি ২০২০, রাত ১০টা ১৫ মিনিট
পুলক ঘটক: সাবেক যুগ্ম মহাসচিব, বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়ন

default-image


হয়রানির প্রতিবাদ জানাই
মুশফিক ওয়াদুদ

প্রথম আলোতে আমার কাজের অভিজ্ঞতা অল্প কয়েক মাস। আমেরিকায় আসার আগ দিয়ে অল্প কিছুদিন কাজ করেছি। খুব কাছ থেকে পত্রিকাটিকে ভেতর থেকে দেখার সুযোগ হয়েছে। আমার চাকরিজীবনের অন্যতম একটি ভালো সময় এ কয় মাস। কোনো দিন প্রথম আলোতে কাজের সুযোগ না হলেও এই কথাগুলো আমি লিখতাম।

বাংলাদেশের সব সাংবাদিক স্বীকার করবেন যে বাংলাদেশে সাংবাদিকতায় প্রাতিষ্ঠানিক সুযোগ-সুবিধার ক্ষেত্রে প্রথম আলোডেইলি স্টার সবার আগে। শুধু প্রথম আলোডেইলি স্টার যে সুযোগ-সুবিধা দেয় তাদের ক‌র্মীদের, তা দেশের অন্য ভালো প্রতিষ্ঠানগুলোর প্রায় কাছাকাছি। অনেক ক্ষেত্রে বেশি। অন্য কোনো সংবাদমাধ্যমকে তার ধারেকাছে পাওয়া যাবে না। প্রথম আলোডেইলি স্টার-এর সংবাদক‌র্মীদের অর্থনৈতিক ও সামাজিক একধরনের নিরাপত্তা আছে, যা বাংলাদেশের অন্য অনেক সাংবাদিকদের নেই এবং এ ধরনের সুযোগ-সুবিধা অনেকটাই সাসটেইনেবল।

আমি এটাও মনে করি যে বাংলাদেশে পত্রিকাগুলোতে বা টিভি মাধ্যমে সাংবাদিকেরা যে এখন ভালো বেতন পাচ্ছেন, সুযোগ-সুবিধা পাচ্ছেন, তা মূলত প্রথম আলো, ডেইলি স্টার-এর কারণে, বিশেষ করে প্রথম আলোর সম্পাদক মতিউর রহমানের কারণে। মতি ভাই শুধু সাংবাদিকতাই করেননি, সাংবাদিকতাকে বাংলাদেশে একটি প্রাতিষ্ঠানিক ভিত্তি দিয়েছেন। ধ‌ৈর্য নিয়ে দী‌র্ঘ সময়ে একটি প্রতিষ্ঠান গড়ে তুলেছেন। এবং অন্য অনেক সম্পাদকের মতো সাংবাদিকদের ঠকাননি। আমি মনে করি, প্রথম আলোর এই অবদান ছাড়া সাংবাদিকেরা এখন যে ভালো বেতন আর সুযোগ-সুবিধা পান, সেটা সম্ভব হতো না। অনেকেই ক্যারিয়ার হিসেবে নিতেন না।

আমার একটি হাইপোথিসিস আছে। প্রতিষ্ঠানের ক্যানটিনের মানের ওপর ক‌র্মীদের প্রোডাকটিভিটি নি‌র্ভর করে। প্রথম আলোডেইলি স্টার এই দিক থেকেও এগিয়ে। ক্যানটিনের মান অন্য সব প্রতিষ্ঠান থেকে ভালো। প্রথম আলোর ক্যানটিনকে আমি এখনো মিস করি।:)

অনেকের মতিউর রহমানের সঙ্গে রাজনৈতিক, সামাজিক বিভিন্ন বিষয়ে মতভিন্নতা থাকা খুবই স্বাভাবিক। আমারও আছে, কিন্তু বাংলাদেশের সাংবাদিকতার জন্য তাঁর অবদান কেউ অস্বীকার করতে পারবে না। প্রথম আলোর অঙ্গপ্রতিষ্ঠানের একটি অনুষ্ঠানে অনাকাঙ্ক্ষিত একটি মৃত্যুর জন্য তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা হওয়ার সংবাদটি দুঃখিত করেছে। আমার বিশ্বাস, এটি উচ্চ আদালতে টিকবে না।

প্রথম আলো এবং তাঁর সম্পাদককে হয়রানি করার যেকোনো চেষ্টার প্রতিবাদ জানাই। সব সাংবাদিকদের প্রতিবাদ করা উচিত বলে মনে করি।

১৭ জানুয়ারি ২০২০, রাত ১টা
মুশফিক ওয়াদুদ: গবেষক, ইউনিভার্সিটি অব নেভাদা, যুক্তরাষ্ট্র

default-image


কতটা দায়
শওগাত আলী সাগর
নাইমুল আবরারের মুত্যু হয়েছে দুর্ঘটনায়, সেই দুর্ঘটনায় কারও অবহেলা থাকলে অবশ্যই তাঁর যথাযথ বিচার হবে। সেই ঘটনায় দেশের শীর্ষ দৈনিকের সম্পাদক এবং তাঁর সহকর্মীদের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তরি পরোয়ানা জারি হয়ে যাবে—এটি একটি অভাবিত ঘটনা। বাংলাদেশের কি আইনের শাসন এতটাই ‘মার মার কাট অবস্থায়’ পৌঁছে গেছে যে দেশের শীর্ষ একজন সম্পাদকের বিরুদ্ধে, একজন খ্যাতিমান লেখকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়ে যায়!

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান কিংবা লেখক আনিসুল হক কি আবরারকে মেরে ফেলার নির্দেশ দিয়েছিলেন? নিশ্চয়ই দেননি। তাঁদের আয়োজিত অনুষ্ঠানে কোনো অবহেলা হয়ে থাকলে তার বিচার হতে তো কোনো সমস্যা নেই। কিন্তু সেই অবহেলায় সম্পাদক মতিউর রহমান কিংবা লেখক আনিসুল হকের কতটা দায় ছিল, সেটা নির্ধারণ করা তো দরকার।

এই যে সেদিন স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের মালিকানাধীন বিমা কোম্পানির একজন কর্মকর্তা বহুতল ভবন থেকে পড়ে মরে গেলেন, তাঁর তো ময়নাতদন্তও হলো না। তিনি কীভাবে পড়ে গেলেন—সেখানে কারও অবহেলা ছিল কি না, নিদেনপক্ষে রাষ্ট্র উদ্যোগী হয়ে তাঁর ময়নাতদন্ত করবে—এমন পরিস্থিতি কিন্তু আমরা সেখানে দেখিনি। হতে পারে, সেটা স্বাস্থ্যমন্ত্রীর পরিবারের সদস্যদের মালিকানাধীন প্রতিষ্ঠান বলে কেউ সেখানে ‘অবহেলা’ কিংবা ‘অন্য কোনো কিছু সন্দেহ করার’ উপাদান খুঁজে পাননি। প্রথম আলো পত্রিকার ক্ষেত্রে যা সহজেই পাওয়া গেছে।

মতিউর রহমান, আনিসুল হকসহ প্রথম আলোর কর্মীদের বিরুদ্ধে করা গ্রেপ্তারি পরোয়ানা প্রত্যাহারের দাবি জানাই।

সম্পাদক-লেখকের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি রাষ্ট্রকে, সরকারকে কখনোই সুখ্যাতি দেয় না—এটা যেন আমরা বুঝতে পারি।

১৭ জানুয়ারি ২০২০, রাত ১টা ৩২ মিনিট

২.

‘বিএনপি–জামায়াত দুঃশাসন ২০০১-২০০৬’ শিরোনামে একটি ছবির অ্যালবাম আওয়ামী লীগের সমর্থকেরা ব্যাপক প্রচার করেছিলেন বিএনপির বিরুদ্ধে প্রচারণা হিসেবে। সেই অ্যালবামে বিভিন্ন সংবাদপত্রের নিউজের ১৪৫টি কাটিং রয়েছে। তার মধ্যে প্রথম আলোর কাটিং আছে এক শর বেশি। ভোটের প্রচারণায়, ক্ষমতায় আসার পথে সেদিন প্রথম আলোর নিউজই ছিল আওয়ামী লীগের অন্যতম অবলম্বন।

১৮ জানুয়ারি ২০২০, সকাল ১০টা ৪৬ মিনিট
শওগাত আলী সাগর: কানাডাপ্রবাসী সাংবাদিক

default-image


একই বৃন্তে দুটি ফুল
মাহবুব মোর্শেদ

প্রথম আলো ও আওয়ামী লীগ একই বৃন্তে দুটি ফুল বা একই মায়ের পেটে দুই ভাই বা বোন। বাংলাদেশের রাজনীতিতে আওয়ামী লীগের আদর্শিক ভিত্তি তৈরি করেছে যে সংগঠনটি, তার নাম বাংলাদেশের কমিউনিস্ট পার্টি। আদর্শ, নীতিনিষ্ঠ ও ভালো আওয়ামী লীগ বলতে যা বোঝায়, সিপিবি তা–ই। আবার বেপথু সিপিবি বলতে যা বোঝায়, তা-ই আওয়ামী লীগ। সিপিবি দলটি এখন আনুষ্ঠানিকভাবে টিকে আছে। কিন্তু এর মতাদর্শ পুরোটা টিকে আছে প্রথম আলোর মধ্যে। ফলে প্রথম আলোই এখন আওয়ামী লীগের মতাদর্শিক মেন্টর। প্রথম আলোই ভালো ও আদর্শ আওয়ামী লীগ। আওয়ামী লীগের কী করা উচিত, সেটা প্রথম আলো ঠিকভাবেই বলে।

অনেকে মনে করেন, এগুলো বানানো কথা। কিন্তু আপনারা কখনো খেয়াল করেছেন প্রথম আলোর সাংবাদিক হয়েও ফারুক ওয়াসিফ যখন কোনো নাগরিক আন্দোলনে সংহতি জানান, তখন ব্যাপারটাকে খুব বেখাপ্পা লাগে। তিনি প্রতিবাদী বাম, ব্যাপারটা প্রথম আলোর সঙ্গে ঠিক যেন যেতে চায় না। অন্য দল দূরে থাকুক, একটু সামাজিক আন্দোলনেই বেশ অস্বস্তি তৈরি হয়। কিন্তু প্রথম আলোর নীতিনির্ধারক ও শীর্ষ ব্যক্তি হয়েও আনিসুল হক আওয়ামী লীগের অনুষ্ঠানে বক্তৃতা দেন, বছরের পর বছর প্রোপাগান্ডা উপন্যাস লেখেন। কিন্তু এসব কারও কাছেই বেমানান মনে হয় না। পাঠকেরা প্রশ্ন তোলেন না, প্রথম আলোও এটাকে সমালোচনামূলকভাবে দেখে না। কারণ, আওয়ামী লীগ ও প্রথম আলোর মধ্যে মতাদর্শিক বিবাদ নেই। থাকলেও খুব সামান্য।

প্রশ্ন হলো বিবাদটা কোথায়?

বিবাদ ভাইয়ে ভাইয়ে রেষারেষি। মনোমালিন্য। সবচেয়ে জনপ্রিয় ও বড় মিডিয়া হিসেবে প্রথম আলোকে নানা নেগেটিভ খবর প্রকাশ করতে হয়। এটা সরকারের অনেকে মেনে নিতে পারে না। এখন প্রথম আলো ওই খবরগুলো ছাপা বন্ধ করলে দেশে আর কোনো সমস্যা সত্যিই থাকে না। কিন্তু ওরা পাঠক হারাবে। ওরা পাঠক হারালে আওয়ামী লীগের সবচেয়ে শক্তিশালী মতাদর্শিক ওয়েপনটি দুর্বল হবে। দীর্ঘ মেয়াদে ক্ষতি হবে আওয়ামী লীগেরই। আজ যদি মতিউর রহমানকে জেলে ঢুকিয়ে আপন মায়ের পেটের ভাই প্রথম আলোকে আওয়ামী লীগ সরকারই ধ্বংস করার উদ্যোগ নেয়, তবে এর চেয়ে দুঃখের কারণ আর কী হতে পারে। নিজের স্বার্থে আওয়ামী লীগের উচিত এই ভ্রাতৃঘাতী সংঘাত থেকে বেরিয়ে আসা। তা ছাড়া, রেসিডেনসিয়ালে যখন অনুষ্ঠান হয় সে সময়, মানে ওই দিনগুলোতে মতিউর রহমান বেশ অসুস্থ ছিলেন। ওই অনুষ্ঠান, আবরারের মৃত্যু এসব বিষয়ে তিনি কিছু জানতেন না এবং এটাই বাস্তব। ফলে ব্যাপারটাকে ওদিকে না নিয়ে যাওয়াই ভালো হবে।

১৭ জানুয়ারি ২০২০, সকাল ৯টা ২৬ মিনিট
মাহবুব মোর্শেদ: কথাসাহিত্যিক

default-image


গোটা সংবাদপত্রের সংকট
সাখাওয়াত টিপু
একটা জিনিস খেয়াল করলাম, যেসব কবি-সাহিত্যিক-কলামিস্ট প্রথম আলোতে লেখেন না, প্রথম আলোর সুবিধা ভোগ করেন না, তাঁরাই দেখি প্রথম আলোর পক্ষে কলম ধরেছেন। সামাজিকতা হিসেবে এটা ভালো দিক।
তবে প্রথম আলো ক্ষতিগ্রস্ত হলে অনেক সাংবাদিকের জীবন সংকটের মুখে পড়বে, এটা নিশ্চিত! এমনকি, বাংলাদেশের সংবাদপত্র নতুন সংকটের মুখোমুখি হবে। এমনিতেই মিডিয়ার সার্বিক অবস্থা খুব করুণ। আমি চাই, প্রথম আলো ক্ষতিগ্রস্ত না হোক! মনে রাইখেন, এই সংকট শুধু প্রথম আলোর নয়, গোটা সংবাদপত্রের সংকট!

১৭ জানুয়ারি ২০২০, দুপুর ১টা
সাখাওয়াত টিপু: কবি

default-image


বেদনার্ত ও শঙ্কিত
মঈনুল আহসান সাবের
প্রথম আলো দেশের সবচেয়ে সুসম্পাদিত, মার্জিত ও ব্যবসাসফল পত্রিকা। পাশাপাশি পাঠকের ভেতর পত্রিকার নীতিনির্ধারকেরা এই বোধের সঞ্চার করতে জানেন—এই যে তুমি প্রথম আলো পড়ছ, তুমি কিন্তু এলিট ক্লাসে চলে এসেছ। বলা বাহুল্য, আমরা এলিট হতে চাই।

এই পত্রিকার সঙ্গে (পত্রিকাসংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে নয়) আমার সম্পর্ক অত্যন্ত খারাপ। সে নিয়ে আমার আনন্দ বা বেদনা কোনোটাই নেই। তবে আমি বেদনা ও শঙ্কা বোধ করছি মতিউর রহমান ও আনিসুল হকসহ ১০ জনের বিরুদ্ধে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি হয়েছে, এই সংবাদে। যে কারণে এই পরোয়ানা, তা কোনো যুক্তিতে পড়ে না। তাঁদের বিরুদ্ধে আদালত কোনো রায় দেননি, তাঁরা পলাতকও নন। আমি এই সিদ্ধান্তকে (যদিও জানা আছে যে সময়ে আমরা আছি, সে সময়ে সকল নিন্দা, ক্ষোভ, অসন্তোষ অর্থহীন) অত্যন্ত অপছন্দ করেছি।

১৭ জানুয়ারি ২০২০, দুপুর ২টা ৩০ মিনিট
মঈনুল আহসান সাবের: কথাসাহিত্যিক

default-image


গণমাধ্যমের কঠিন সময়
গোলাম মোর্তোজা
একজন সম্পাদক-সাংবাদিক বা একটি পত্রিকা বা একটি টেলিভিশন যখন বিপদে পড়ে, তখন অন্য সম্পাদক-সাংবাদিক, পত্রিকা বা টেলিভিশন নীরব থাকে বা আড়ালে মুচকি হাসে। পাশে দাঁড়ায় না। ভাবখানা থাকে এমন, ‘যোগ্যতায় তো পারা যায়নি, ও যদি ডোবে তো লাভ হবে আমার বা আমাদের।’ বিএনপি জমানায় ইটিভি বন্ধ করার সময় এমন দৃশ্য দেখা গিয়েছিল।

এবার বহুজাতিক কোম্পানিগুলো যখন ডেইলি স্টার প্রথম আলোয় বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দিতে বাধ্য হলো, তখন অন্যরা ভাবলেন, সব বিজ্ঞাপন তাঁরা পাবেন।

বাস্তবে হলো উল্টো, ফোন কোম্পানিগুলো বিজ্ঞাপন দেওয়াই প্রায় বন্ধ করে দিল। বহুজাতিক কোম্পানি বিজ্ঞাপন বাজেট আশঙ্কাজনক অনুপাতে কমিয়ে ফেলল। তাদের বিজ্ঞাপন চলে গেল বিদেশি চ্যানেলে। দেশের পত্রিকা-টেলিভিশনগুলো রুগ্‌ণ হয়ে গেল। দলীয় প্রোপাগান্ডায় পাঠক-দর্শক মুখ ফিরিয়ে নিতে শুরু করল। কঠিন সময়ের মধ্য দিয়ে যাচ্ছে দেশের গণমাধ্যম।

এমন অবস্থায় প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে মামলা, বিপদ শুধু সম্পাদক মতিউর রহমান বা প্রথম আলোর নয়। সম্পাদক মতিউর রহমান ইতিমধ্যে সাফল্যের যে শিখরে পৌঁছেছেন, তাঁর নতুন করে তেমন কিছু করার নেই। তিনি ইতিহাসের গুরুত্বপূর্ণ অংশে স্থান নিশ্চিত করেছেন।

সুতরাং মূল বিপদ সব সম্পাদক-সাংবাদিক, পত্রিকা-টেলিভিশনের।

রুগ্‌ণ হয়ে বেঁচে থেকে করুণা পাওয়া যাবে, সম্মান নয়।

১৭ জানুয়ারি ২০২০, রাত ১১টা ৫৬ মিনিট
গোলাম মোর্তোজা: প্রধান, অনলাইন বাংলা সার্ভিস, দ্য ডেইলি স্টার

default-image


বিস্মিত ও ব্যথিত
সাদাত হোসেন
সফল মানুষদের প্রতি আমি একধরনের তীব্র কৌতূহল অনুভব করি। সেই কৌতূহল মূলত ওই সফল মানুষের আড়ালের ব্যক্তিমানুষটাকে জানার। আমার সব সময়ই জানতে ইচ্ছে হয়, মানুষটার ম্যাজিক আসলে কী?

প্রথম আলো সম্পাদক মতিউর রহমান তাঁদের একজন, যাঁর প্রতি আমার তীব্র অনুসন্ধিৎসা। আমার খুব জানতে ইচ্ছে হয় যে ওনার ম্যাজিকটা কী? যখনই কিছু ছুঁয়েছেন, তখনই তা কী করে অমন সোনা হয়ে উঠেছে!

সেই কৌতূহল খানিকটা মিটল গত মাসে। ব্যক্তিগতভাবে তাঁর সঙ্গে সেদিনই আমার প্রথম দেখা। এবং আমাদের সুদীর্ঘ গল্প, কথোপকথন, আড্ডা। সেই আড্ডায় আমি মুগ্ধ হয়ে তাঁর গল্প শুনেছি। ভাবনা শুনেছি। শৈশবের স্মৃতিময়তায় তিনি কাতর হয়েছেন। আমিও। আমি যেমন তন্ময় হয়ে শুনেছি তাঁর স্মৃতিময় শৈশবের গল্প, তিনিও ঠিক একই আগ্রহে শুনেছেন আমার দুরন্ত শৈশবের দুরন্তপনার গল্প। অথচ আমার ভাবনাটা ছিল এমন যে এত বড় একজন মানুষ, নিশ্চয়ই খুব গম্ভীর ভঙ্গিতে কথা বলবেন, কিংবা গ্রাহ্যই করবেন না।

কিন্তু ঘটল পুরো উল্টো।

পরে তাঁর তুমুল ব্যস্ততার মধ্যেও দারুণ আন্তরিকতায় কথা হয়েছে ফোনেও। এত সহজ ভঙ্গিতে কথা বললেন যে তাতে বরং যেন আরও আড়ষ্ট লাগছিল আমার!

বিষয়গুলো ব্যক্তিগতভাবে আমাকে মুগ্ধ করেছে। আমার হঠাৎ মনে হলো, এই যে এত বড় একজন মানুষ, অথচ এত সাধারণ, এত অকপট, হয়তো এটাই ম্যাজিক। সামনে হয়তো তাঁর সেই সাধারণ অবয়বে অসাধারণ হয়ে ওঠার আরও অনেক অনেক গল্প শোনার সুযোগ হবে। কিন্তু এর আগে আজ তাঁর গ্রেপ্তারি পরোয়ানার খবর শুনে থমকে গেছি। আবরারের মৃত্যুর ঘটনা তার পরিবারের জন্য অচিন্তনীয় শোকের, অপূরণীয় ক্ষতির। এই শোক অসহনীয় যন্ত্রণার। যে দুর্ঘটনার কারণে আবরারের এই অকালপ্রয়াণ, সেই দুর্ঘটনার সুষ্ঠু তদন্তও অপরিহার্য। ঘটনাটি শোনার পর প্রচণ্ড মানসিক যন্ত্রণা অনুভব করেছি। যতবারই ওই বয়সের একটি শিশুর মৃত মুখ চোখে ভেসেছে, তার বাবা–মায়ের কথা ভেবেছি, স্বজনদের কথা ভেবেছি, ততবারই তীব্র যন্ত্রণায় আচ্ছন্ন হয়েছি। কিন্তু সেই দিন ঘটনাস্থলে উপস্থিত না থাকা সত্ত্বেও দেশের শীর্ষস্থানীয় দৈনিকের সম্পাদকের বিরুদ্ধে সেই ঘটনায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করার ঘটনা শুনে বিস্মিত হয়েছি, ব্যথিত হয়েছি। আশা করছি, বিষয়টির সুষ্ঠু তদন্ত হবে। অকারণে, উদ্দেশ্যমূলকভাবে কাউকে হয়রানি করা হবে না।

১৮ জানুয়ারি ২০২০, রাত ১টা ১৫ মিনিট
সাদাত হোসেন: লেখক ও চিত্রনির্মাতা

default-image


সাংবাদিকের মাংস
আসিফ নজরুল
কাক নাকি কাকের মাংস খায় না। তবে বাংলাদেশের সাংবাদিকেরা ঠিকই সাংবাদিকদের মাংস খায়।

প্রথম আলো সম্পাদকের বিরুদ্ধে হয়রানিমূলক মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারির ঘটনায় সাংবাদিক নেতৃবৃন্দের নীরবতায় তা আবারও প্রমাণিত হলো। কিশোর আলো আয়োজিত একটি অনুষ্ঠানে নাইমুল আবরারের মৃত্যুর ঘটনার পর সরকারের বিভিন্ন মানুষের বক্তব্য ও সরকারের শ্রেণিচরিত্র দেখে একটা গাধারও বোঝার কথা, এ মামলায় কেন প্রথম আলো সম্পাদককে জড়ানো হয়েছে? এটি করা হয়েছে প্রথম আলোর স্বাধীন সাংবাদিকতার টুঁটি চেপে ধরার জন্য, অন্য সংবাদপত্রগুলোকে আরও বেশি আতঙ্কে অবশ করে রাখার জন্য।

না হলে অন্য ঘটনাগুলোতে এমন মামলা হয় না কেন? মাত্র কিছুদিন আগে ভিআইপির যাতায়াতের জন্য ফেরি থামিয়ে রাখার ঘটনায় একজন কিশোরের মৃত্যুর জন্য সেই ভিআইপির বিরুদ্ধে মামলা হলো না কেন? কিশোর আলো আয়োজিত ঘটনায় দুর্ঘটনাবশত আবরারের মৃত্যুর জন্য যদি প্রথম আলোর সম্পাদকের বিরুদ্ধে হত্যার মামলা হয়, তাহলে চট্টগ্রামের সাবেক মেয়রের কুলখানির ঘটনায় পদদলিত হয়ে ১০ জনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলা হলো না কেন?

জেনে-বুঝে অব্যবস্থাপনা বজায় রাখার কারণে নৌ, রেল আর সড়কপথে হাজার হাজার মৃত্যুর জন্য মন্ত্রীদের বিরুদ্ধে মামলা হয় না কেন?

বুয়েটে বা অন্য কিছু শিক্ষাঙ্গনে হত্যার ঘটনায় ভিসি, প্রভোস্ট, প্রক্টর আর ছাত্রলীগের মূল নেতৃত্বের বিরুদ্ধে মামলা হয় না কেন?

সাংবাদিক নেতাদের/সিনিয়র সাংবাদিকদের সব বোঝার কথা। কিন্তু না বোঝার ভান করে তাঁদের অনেকে চুপ করে আছেন। কেউ কেউ এমনকি নানা কৌশলে ইন্ধনও দিচ্ছেন সুবিধা পাওয়ার আশায়। কেউ আছেন ভয়ে চুপসে।

সাংবাদিক নেতার মুখোশে থেকে আপনারা আসলে শুধু নিজের স্বার্থ দেখছেন। বাংলাদেশে সংবাদপত্রশিল্পে বর্তমান দুরবস্থার জন্য আপনাদের হানাহানি, লোভ আর ক্ষুদ্রতা দায়ী।

১৮ জানুয়ারি ২০২০, দুপুর ১২টা ২৯ মিনিট
আসিফ নজরুল: অধ্যাপক, আইন বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

default-image


কণ্ঠরোধের অস্ত্র
প্রভাষ আমিন
কিশোর আলোর অনুষ্ঠানে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে রেসিডেনসিয়াল মডেল কলেজের ছাত্র নাইমুল আবরারের মৃত্যু অনাকাঙ্ক্ষিত, দুঃখজনক। কিন্তু এটি অসাবধানতাজনিত মৃত্যু। কারও না কারও খামখেয়ালি বা প্রস্তুতিতে কোথাও না কোথাও ঘাটতি ছিল। কিন্তু মতিউর রহমান বা আনিসুল হক তো নাইমুল আবরারকে হত্যার নির্দেশ দেননি বা মৃত্যু চানওনি। আবরারের মৃত্যুতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে তার পরিবারের। এরপর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি হয়েছে প্রথম আলো আর কিশোর আলোর।

মতিউর রহমান তো সেদিনের অনুষ্ঠানে ছিলেনই না, আনিসুল হকও ঘটনা জেনেছেন অনেক পরে। যাঁদের খামখেয়ালিতে আবরারের মৃত্যু হয়েছে, তাঁদের বিচার অবশ্যই চাই। কিন্তু এই মামলাকে যেন প্রথম আলোর কণ্ঠরোধের অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করা না হয়। আইন যেন নিজস্ব গতিতে চলে। প্রথম আলোর মামলার সুপারসনিক গতি, আবার অনেক মামলায় তদন্ত শেষ হতেই কয়েক বছর লাগে; সন্দেহটা এখানেই। যে মামলায় সমন দিয়েই বিচার শুরু করা যায়, সে মামলায় গ্রেপ্তারি পরোয়ানা; আমাদের সন্দেহ বাড়ায়। প্রথম আলোর বিভিন্ন বিষয়ে আমার দ্বিমত আছে। সেই ভিন্নমতটা আমি প্রকাশ্যে বলি এবং লিখিও। কিন্তু তাঁদের মতপ্রকাশের স্বাধীনতা, গণমাধ্যমের স্বাধীনতার প্রতি আমার পূর্ণ শ্রদ্ধা আছে। গণমাধ্যমের কণ্ঠরোধের যেকোনো অপচেষ্টার প্রতিবাদ জানাই।

১৮ জানুয়ারি ২০২০, দুপুর ১টা ১৫ মিনিট
প্রভাষ আমিন: হেড অব নিউজ, এটিএন নিউজ

default-image


স্ব–আরোপিত সেন্সর
ফাহমিদুল হক
প্রথমেই প্রথম আলো নিয়ে দুটো সমালোচনা।

১. নব্বইয়ের দশকে নিওলিবারেল বিশ্বায়ন বা মুক্তবাজার অর্থনীতি বাংলাদেশে কায়েম হবার পর্যায়ে কৃষি-অর্থনীতির আওতায় থাকা মানুষদের মধ্যে ভোক্তা সংস্কৃতি চালু করার দায়িত্ব পালন করেছে প্রথম আলো। ক্রয়মনস্ক জনগোষ্ঠী ছাড়া মুক্তবাজার চলে না, তাই কম চাহিদার মফস্বলি মানসিকতার মানুষগুলো যে রাতারাতি আদর্শ ক্রেতায় পরিণত হয়েছে এবং সেই নবচাহিদা পূরণের জন্য তাদের নাভিশ্বাস হচ্ছে, তাতে প্রথম আলোর অবদান রয়েছে। প্রথম আলো নতুন শতকের শুরুতে উদীয়মান ব্যবসায় খাতের প্রতিনিধি ছিল।

২. ব্যবসায় খাতের স্বার্থেই প্রথম আলোর রাজনীতি নিয়ে অবস্থান ছিল। প্রথম আলো কেমন রাজনীতি চায়, তা তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সময় বুঝিয়ে দিয়েছিল। রাজনৈতিক গোলমালমুক্ত একটি ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ চেয়েছিল তারা, প্রয়োজনে সিভিল সোসাইটির হাতে সেই নেতৃত্ব দিতে তারা প্রস্তুত ছিল। কিন্তু তাদের সেই প্রকল্প ব্যর্থ হয়েছে।

আপত্তি নেই, কিন্তু পর্যবেক্ষণ আছে একটা
১. সংবাদের বাইরে অনেক সামাজিক কর্মসূচি নেওয়া। এভাবে নাগরিক মধ্যবিত্তের কাছে আপন হয়ে ওঠা। ধরা যাক, একটি পরিবারের সব সদস্যের জন্য তাদের সামাজিক কর্মসূচি আছে—বাবার জন্য, মায়ের জন্য, মেয়েটির জন্য, ছেলেটির জন্য, ছাত্রছাত্রীর জন্য, যাতে পরিবারের প্রত্যেক সদস্যেরই বাসায় প্রথম আলো রাখার ব্যাপারে সম্মতি থাকে। এ রকমই এক কর্মসূচিতে এসে ছাত্র আবরার মারা যায়। এসব ইভেন্ট করার যে ঝক্কি, তা সাংবাদিকতা করার চাইতে বেশি কিছু। বস্তুত প্রথম আলো সংবাদপত্রের পাশাপাশি সামাজিক প্রতিষ্ঠান হতে চেয়েছে।

কিন্তু দুটি বন্দনা রয়েছে
১. তত্ত্বাবধায়ক সরকারের পর রাজনীতি নিয়ে তাদের যে দৃষ্টিভঙ্গি কী, তা–ও স্পষ্ট ছিল—কোনো দলের অনুগামী না হওয়া, দলনিরপেক্ষ ভাবমূর্তি ধরে রাখা। তা তারা আজ অবধি ধরে রেখেছে। ফলে বর্তমানে কর্তৃত্ববাদী বাংলাদেশে ও পরাক্রমশালী আওয়ামী লীগের শাসনামলে, প্রতিটি সংবাদমাধ্যম স্বেচ্ছায় বা বাধ্য হয়ে ‘মিউ মিউ সাংবাদিকতা’ করছে, প্রথম আলো বা ডেইলি স্টার তাদের সার্কুলেশন, ব্র্যান্ড ভ্যালু ও নিষ্ঠার কারণে, বাংলাদেশে মৃতপ্রায় সাংবাদিকতাকে গুণমানে ধরে রেখেছে।

২. ভোক্তা-সংস্কৃতি তৈরিতে যে ভূমিকা রেখেছিল প্রথম আলো, বাকি সংবাদমাধ্যমও তা–ই করেছে। বাকি সবাই প্রথম আলোই হতে চেয়েছে। ভূমিকা যেমনই হোক, সংবাদজগতের বহু কিছুতেই প্রথম আলো নেতৃত্ব দিয়েছে। প্রথম আলোয় কর্মরত সাংবাদিকদের কর্মতুষ্টি অন্যদের তুলনায় বেশি।

স্বীকারোক্তি
আজকের আলোচনায় খুব প্রাসঙ্গিক নয়, তবু উল্লেখ করছি, সাংগঠনিক পর্যায়ে প্রথম আলোকে আমরা মোটামুটি পাশে পেয়েছি। বিশ্ববিদ্যালয় পর্যায়ে আমরা যে অ্যাকটিভিজম করি, তার সংবাদ পরিবেশনে, যৌথ বিবৃতি ও মতামত কলাম প্রকাশে প্রথম আলো আমাদের সঙ্গে সব সময়ই সহযোগিতাপরায়ণ ছিল।

গ্রেপ্তারি পরোয়ানা কেন?
আবরার নিহত হবার ঘটনায় আয়োজকদের অবহেলার বিষয়টি স্পষ্ট হয়েছে। প্রথম আলোর সব প্রকল্পের মধ্যে কিশোর আলো আমার সবচেয়ে পছন্দের, শিশু-কিশোরদের মননের বিকাশে কিশোর আলোর ইতিবাচক ভূমিকা রয়েছে। কিন্তু তাদের অনুষ্ঠানেই মৃত্যুর মতো ঘটনা ঘটেছে। হয়তো ঠিকঠাক পদক্ষেপ নেওয়া গেলে ছেলেটি বেঁচে যেত। আবরারের বাবার দিক থেকে মামলার বিষয়টি ঠিকই আছে। কিন্তু আইনগত দিক থেকে যা যা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে, তার মধ্যে দমনমূলক একটা রাজনীতি আছে। স্বাভাবিক চর্চা হলো, সমন জারি করে অভিযুক্তকে আদালতে হাজির হয়ে জবাব দিতে বলা এবং অভিযুক্ত আদেশমতো হাজির না হলে তাঁর বিরুদ্ধে পরোয়ানা জারি করা । প্রথম পর্যায়েই যে গ্রেপ্তারি পরোয়ানা জারি করা হয়েছে, তা আইনগত দিক থেকে ভুল নয়, সম্ভবত আইনের ব্যত্যয়ও হয়নি। কিন্তু কার জন্য কোন পদক্ষেপ আগে–পরে নেওয়া হচ্ছে, তার রাজনীতি স্বাভাবিক জ্ঞানেই বোঝা সম্ভব। বলা যায়, প্রথম আলোর আপেক্ষিক স্বাধীন অবস্থানের পরিপ্রেক্ষিতে এ হলো সরকারের দিক থেকে ‘তক্কে তক্কে থাকা’ এবং মওকা বুঝে ‘ছোবল’ দেওয়া—এর আগে ছিল প্রথম আলোর জন্য টেলিকমের বিজ্ঞাপন বন্ধ করে দেওয়ার আদেশ বা মৌখিক বিষোদ্‌গার, আর এবার হলো আইনগত দিক থেকে যদি এর অবিসংবাদিত সম্পাদক মতিউর রহমানসহ অন্যদের কোর্ট–কাচারির লম্বা হয়রানির মধ্যে ফেলে দেওয়া যায় কিংবা সম্ভাব্য জেলের হুমকির মধ্যে ঝুলিয়ে রাখা যায় এবং এভাবে স্ব–আরোপিত সেন্সরের মধ্যে ঠেলে দেওয়া যায়। সবচেয়ে ভালো হয় পত্রিকাটিই যদি বন্ধ হয়ে যায় বা মতিউর রহমান অবসরে যান।

মতিউর রহমান, মাহ্ফুজ আনামসহ অন্য অনেকেই অনেক মামলা-হয়রানির মধ্যে বিভিন্ন সময় থেকেছেন, এটিও তাঁরা মোকাবিলা করবেন, কিন্তু আইনকে নিজস্ব গতিতে চলতে দিতে হবে—এই হলো চাওয়া।

১৮ জানুয়ারি ২০২০, বিকেল ৫টা
ফাহমিদুল হক: অধ্যাপক, গণযোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়

default-image


কোথায় আছি!
কামরুজ্জামান কামু
এখনো যদি কোনো কথা বলার জায়গা থেকে থাকে তো সেটা প্রথম আলো। মতিউর রহমান আর আনিসুল হককে গ্রেপ্তার করা মানে গোটা জাতিকে স্তব্ধ করে দেওয়া। সংবাদটা পড়ার পর গত দুই দিন থেকে হতভম্ব আর আতঙ্কিত হয়ে বসে আছি। কী লিখব, কেন লিখব, কোথায় আছি! এটা কি আমার দেশ নয়!

১৯ জানুয়ারি ২০২০, রাত ৮টা ৩৮ মিনিট
কামরুজ্জামান কামু: কবি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0