default-image

বিদ্রোহী কবি কাজী নজরুল ইসলাম অনেক বছর আগে লিখেছিলেন, ‘বিশ্ব যখন এগিয়ে চলেছে, আমরা তখনও বসে/ বিবি তালাকের ফতোয়া খুঁজেছি, ফিকাহ ও হাদিস চষে।’
গেল শতকের তৃতীয় দশকে সম্পূর্ণ ভিন্ন প্রেক্ষাপটে আমাদের প্রিয় কবি এই পঙ্ক্তিগুলো উচ্চারণ করলেও এখনো সমভাবে প্রাসঙ্গিক। তিনি কথাগুলো বলেছিলেন ভারতবর্ষের, আরও নির্দিষ্ট করে বললে বাংলার মুসলমান সম্প্রদায়ের অজ্ঞানতা ও কুসংস্কারকে ইঙ্গিত করে। তিনি যে বাঙালি মুসলমানদের মনোজগতে আঘাত দিয়ে তাদের চৈতন্যোদয় ঘটাতে চেয়েছিলেন, সেই বাঙালি মুসলমান এখনো জেদ ও ফতোয়াবাজিতে ব্যস্ত। তখন ধর্মীয় ফতোয়া জোরদার ছিল, এখন রাজনৈতিক ফতোয়া। কথায় কথায় প্রতিপক্ষকে গালমন্দ না করলে, বিদেশের দালাল না বানাতে পারলে নেতা-নেত্রীদের পেটের ভাত হজম হয় না।
গণতন্ত্রের জন্য আমরা ভারতবর্ষ ভেঙেছি। লক্ষ প্রাণের বিনিময়ে পাকিস্তান ভেঙে স্বাধীন-সার্বভৌম বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করেছি। কিন্তু গণতন্ত্র অধরাই রয়ে গেছে। গণতন্ত্র বলতে আমরা গোষ্ঠীতন্ত্র ও দলতন্ত্রকেই প্রাধান্য দিয়ে চলেছি। আমাদের নেতা-নেত্রীরা জর্জ ডব্লিউ বুশের সেই কুখ্যাত উক্তিকেই অনুসরণ করে চলেছেন, ‘যে আমার সঙ্গে নেই, সেই আমার শত্রু।’ আমার দল ছাড়া সব দলই বিদেশের দালাল।
যখন দেশ জ্বলছে, মানুষ পুড়ছে, অর্থনীতির চাকা থেমে আছে, তখন এসব রাজনৈতিক তত্ত্বকথা আওড়ানোর সুযোগ নেই। এই মুহূর্তে দেশ বাঁচাতে হবে। আগুনে মানুষ পোড়া বন্ধ করতে হবে। অন্যথায় নেতা-নেত্রীদের জেদ ও গোঁয়ার্তুমি বজায় থাকলেও দেশের অর্থনীতি বলতে কিছুই থাকবে না। খোদ অর্থমন্ত্রী দেশের পরিস্থিতিতে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেছেন, ঢাকার অবস্থা ভালো হলেও বাইরের পরিস্থিতি নাজুক। যেখানে এই মহাদুর্যোগ থেকে বাঁচার জন্য রাজনৈতিক দলগুলোর আশু কর্তব্য ছিল আলোচনায় বসে সমস্যার সমাধান করা, সেখানে তারা তো বসছেই না, যারা আলোচনার কথা বলছে, তাদেরই একহাত নিচ্ছে। কে কত অনড় ও আপসহীন, সেটি প্রমাণের জন্য নেতা-নেত্রীরা মরিয়া হয়ে উঠেছেন। মানুষের কল্যাণের জন্য যে রাজনীতি, সেই রাজনীতি সব মানবিক মূল্যবোধ হারিয়ে ফেলেছে।
দেশের এই ভয়াবহ সংকটে জাতিসংঘসহ বিশ্ব সম্প্রদায় গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করলেও আমাদের রাজনৈতিক নেতৃত্ব নির্বিকার। এক পক্ষ মাসাধিককাল দেশ মহাসন্ত্রাসের কবলে পড়লেও সেটিকে আমলে নিচ্ছে না। তাদের কাছে এটি নিছকই আইনশৃঙ্খলাজনিত সমস্যা এবং বলপ্রয়োগের মাধ্যমেই তার সমাধান খুঁজছে। কিন্তু তারা বুঝতে পারছে না যে পরীক্ষায় পাসের জন্য সহজ বা সংক্ষিপ্ত সিলেবাস থাকলেও রাজনৈতিক সংকট উত্তরণে সে রকম কিছু নেই। আরেক পক্ষ লাগাতার অবরোধ–হরতালের নামে নৈরাজ্য সৃষ্টি করছে। পেট্রলবোমা ছুড়ে মানুষ মারছে।
প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা গত বুধবার ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের বার্ন ইউনিট পরিদর্শনকালে দগ্ধ মানুষের আহাজারি দেখে নিজেও কেঁদেছেন। তাঁর এই অনুভূতি দেশের সাধারণ মানুষকেও স্পর্শ করেছে। পরদিন প্রথম আলোসহ প্রায় সব পত্রিকার প্রথম পাতায় প্রধানমন্ত্রীর এই কান্নারত ছবিটি ছাপা হয়েছে। বলার অপেক্ষা রাখে না যে, আহত ও যন্ত্রণাকাতর মানুষগুলো এবং তাদের স্বজনদের আকুতি প্রধানমন্ত্রীর হৃদয়কে নাড়া দিয়েছে।
সন্ত্রাসীদের পেট্রলবোমায় মারাত্মকভাবে আহত হয়ে যাঁরা বার্ন ইউনিটে ভর্তি হয়েছেন, তাঁদের আর্তনাদ প্রধানমন্ত্রী শুনেছেন। আমরাও প্রতিদিন টিভিতে, পত্রিকায় তাঁদের আহাজারির খবর দেখছি ও পড়ছি। আমাদের যেসব সহকর্মী বার্ন ইউনিটে গিয়ে খবর সংগ্রহ করছেন, ছবি তুলছেন, তাঁদের মুখে শুনেছি কী ভয়ংকর, কী বেদনাদায়ক সেই দৃশ্য। বেঁচে থাকা মানুষগুলো মৃত ব্যক্তিদের ঈর্ষা করছিলেন। যাঁরা কোনো দিন রাজনীতি করেননি, যাঁরা সরকারি বা বিরোধী দল বোঝেন না, কেবল জীবন ও জীবিকার তাগিদে পথে নেমে পেট্রলবোমাধারী যমদূতদের শিকার হয়েছেন। কারও শরীরের ৭০ শতাংশ পুড়ে গেছে, কারও শরীরের ৫০ শতাংশ। কী দুঃসহ যন্ত্রণার মধ্য দিয়ে তাঁদের প্রতিটি ক্ষণ, প্রতিটি মুহূর্ত কাটছে!
আমরা কী সান্ত্বনা দেব এই দগ্ধ-পোড়া মানুষগুলোকে, তাঁদের স্বজনদের। আমরা কী করে ভুলে যাব সেই নারীর কথা, যিনি কক্সবাজার থেকে বাড়ি ফেরার পথে স্বামী ও মেয়েকে হারিয়েছেন। আমরা কী করে ভুলে যাব কুড়িগ্রামের সেই ছোট্ট শিশুটির কথা, যে মাকে বলেছিল, ‘ওরা আমার গায়ে কেন বোমা মারল?’ হাসপাতালের বার্ন ইউনিটের বাইরেও অনেক সন্তানহারা মায়ের, স্বামীহারা স্ত্রীর, বাবাহারা সন্তানের কান্না শুনছি। এদের স্বজনদের হাসপাতালেও ঠাঁই হয়নি। ঠাঁই হয়েছে মর্গে। আমরা নীরব কান্না শুনছি ১৫ লাখ এসএসসি পরীক্ষার্থীর। দফায় দফায় যাদের পরীক্ষা পিছিয়ে এখন কবে শেষ হবে, কেউ বলতে পারে না। আমরা নীরব কান্না শুনছি লাখ লাখ দিনমজুরের, যাঁদের রুটি–রুজি বন্ধ হওয়ার উপক্রম হয়েছে। আমরা কান্না শুনছি লাখ লাখ পরিবহনশ্রমিকের, যাঁরা বোমার ভয়ে রাস্তায় বের হতে পারছে না, না খেয়ে মরছে।
মাননীয় প্রধানমন্ত্রীও নিশ্চয়ই ওই সব মূঢ় ম্লান মুখ মানুষের নীরব কান্নাও শুনছেন। অনুভব করছেন তাঁদের দুঃখ, বেদনা ও দীর্ঘশ্বাস। কিন্তু এই লাখো-কোটি মানুষের সরব কান্না ও নীরব দীর্ঘশ্বাস মোচনের কথা কী একবারও ভেবে দেখেছেন? প্রধানমন্ত্রী বলেছেন, ‘কাদের সঙ্গে আলোচনা? খুনিদের সঙ্গে আলোচনা করব না।’...‘বিএনপি-জামায়াত যা করেছে, তা জঙ্গি ও সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড। আমরা এই দানবদের কোনো ছাড় দেব না। আমরা এই দানবদের প্রতিহত করে দেশে শান্তি আনব।’
প্রধানমন্ত্রী খুনিদের সঙ্গে আলোচনা করবেন না, দানবদের কাছে হার মানবেন না। খুবই ভালো কথা। আমরা তাঁর এই প্রত্যয়ের সঙ্গে পুরোপুরি একমত। প্রশ্ন হলো, কতিপয়ের দুর্বৃত্তপরায়ণতার জন্য একটি স্বীকৃত রাজনৈতিক দলকে কি দানব বা খুনি আখ্যায়িত করা যায়? (সংগত কারণেই আমি জামায়াতে ইসলামীকে এই হিসাবে আনছি না। এই দলটি একাত্তরে কেবল যুদ্ধাপরাধই সংঘটিত করেনি, এর রাজনৈতিক দর্শনও গণতন্ত্রের পরিপন্থী।) বিএনপিকে রাজনৈতিক দল হিসেবে আওয়ামী লীগ যদি নিশ্চিহ্ন করতে চায়, তাহলে বিএনপিও একই কাজ করবে। এর পরিণাম হবে ভয়ংকর। এ থেকে উত্তরণের পথ কী? গণতন্ত্রে প্রতিপক্ষকে হারাতে হয় ভোটের মাধ্যমে। যেমনটি দিল্লিতে আম আদমি পার্টির নেতা কেজরিওয়াল করেছেন। কোনো দলের মন্দ নীতিকে পরাস্ত করতে হবে উত্তম নীতি দিয়ে। কিন্তু কোনোভাবেই তার কথা বলার, সভা-সমাবেশ করার অধিকার খর্ব করা যাবে না। আবার বিএনপি নেত্রীও সরকারের স্বৈরাচারী নীতির প্রতিবাদ করতে গিয়ে আন্দোলনের নামে যেভাবে মানুষ পুড়িয়ে মারছেন, দেশকে জিম্মি করছেন, তা কোনোভাবেই মেনে নেওয়া যায় না।
এই মুহূর্তে প্রধানমন্ত্রীর কাছে সবার দাবি শান্তি ও স্থিতি। এই মুহূর্তে সবার চাওয়া উন্নয়নের ধারা এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। কিন্তু সরকার বলপ্রয়োগের ও মুখ বন্ধ করার যে কৌশল নিয়েছে, তা ফল দেবে না। বিএনপি ক্ষমতায় থাকতেও একই কৌশল নিয়েছিল। বর্তমান সরকারও যদি সেটি করতে চালিয়ে যায়, তাহলে মারাত্মক ভুল করবে।
প্রধানমন্ত্রী একটি কথা প্রায়ই বলেন, খালেদা জিয়ার ভুলের খেসারত কেন জনগণ দেবে? আমরাও মনে করি, একজন রাজনৈতিক নেত্রী বা দলের ভুলের খেসারত কোনোভাবেই জনগণ দিতে পারে না। তারা সেই ভুলের দায় নেবে না। কিন্তু একজন প্রধানমন্ত্রী যদি ভুল করেন, পুরো দেশকেই তার জন্য কাফফারা দিতে হয়। বিএনপি-জামায়াত আমলে দেশ কী ভয়ংকর অবস্থায় গিয়েছিল, সেটি আমরা জানি। কিন্তু তখন কিন্তু ক্ষমতাসীনেরা সবকিছুর দায় আওয়ামী লীগের ষড়যন্ত্র বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। তার ফলও তাঁরা ভোগ করেছেন। এখন যদি ক্ষমতাসীনেরা সে রকম কোনো ভুল করেন, ভবিষ্যতে তার দায়ও তাঁদের নিতে হবে।
প্রধানমন্ত্রী বার্ন ইউনিটের দগ্ধ মানুষের আহাজারি শুনে নিজে স্থির থাকতে পারেননি। কেঁদেছেন। এখন যেটি করণীয় সেটি হলো আর যাতে কাউকে পেট্রলবোমায় দগ্ধ হয়ে বার্ন ইউনিটে আসতে না হয়, সেই ব্যবস্থা নেওয়া। এবং তার একটিই উপায় হলো সমঝোতা। ২০০৭ সালে বিএনপি সমঝোতা করলে বিরোধী দলে থাকলেও সম্মানজনক আসন পেত। কিন্তু সেদিন তাদের গোঁয়ার্তুমির জন্য কেবল নির্বাচনটিই ভন্ডুল হয়নি, এক-এগারোর অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে। এবার সে ধরনের কোনো অশুভ তৎপরতা বন্ধ করতেই সরকারকে সমঝোতার পথে আসতে হবে। দেশের উদ্বিগ্ন মানুষ এবং বিদেশের বন্ধুরা সে কথাটিই জোর দিয়ে বলছেন।
আওয়ামী লীগের নেতারা বড় গলায় বলেন, আওয়ামী লীগ বিএনপি নয়। তারা জনগণের দল। জনগণকে নিয়ে অান্দোলন করে। আমরাও মনে করি, আওয়ামী লীগ জনগণের ভেতর থেকে উঠে আসা একটি দল, যারা এই দেশের প্রতিটি গণতান্ত্রিক আন্দোলনে নেতৃত্ব দিয়েছে। নেতৃত্ব দিয়েছে স্বাধীনতাযুদ্ধে। এই দলটি কেন জনগণের মুখোমুখি হতে ভয় পাবে? কেন ৫ জানুয়ারি বিতর্কিত নির্বাচনের রায়ের ভিত্তিতে ক্ষমতা আঁকড়ে থাকবে? তবে আলোচনার অর্থ এই নয় যে বিএনপির সব দাবি মেনে নিতে হবে। আলোচনার মাধ্যমে সংবিধানের ভেতরেই সবার কাছে গ্রহণযোগ্য একটি নির্বাচনের উপায় খুঁজে বের করা যেতে পারে। যেমন আইনজীবী শাহদীন মালিক বলেছেন, ‘আওয়ামী লীগ এই মুহূর্তে ক্ষমতা ছেড়ে নির্বাচন দেবে, সেটি আমি মনে করি না। দুই পক্ষকেই ছাড় দিতে হবে। শেখ হাসিনার অধীনেই মধ্যবর্তী নির্বাচন হতে পারে। নির্বাচন কখন ও কীভাবে হবে সেটি আলোচনার মাধ্যমে ঠিক করা যেতে পারে। আমরা মনে করি, এটিই এই মুহূর্তে বিরোধী দলের হরতাল–অবরোধ বন্ধ এবং সাধারণ মানুষের কান্না থামানোর পথ।
প্রধানমন্ত্রী সেটি করতে প্রস্তুত আছেন কি?
সোহরাব হাসান: কবি, সাংবাদিক।
sohrab০[email protected]

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন