নেতা নেই যে ‘বিপ্লবে’র

কলম্বোতে ৯ জুলাইয়ের বিপ্লবের নেতৃত্ব কোনো বিরোধী দল দেয়নি। পাঁচ মাস ধরে সেখানে মাঝেমধ্যে বিরোধী দলগুলো রাজপথে টুকটাক নামলেও সর্বশেষ গণসুনামি শুধুই সাধারণ জনতার ডাকে হয়েছে।

শ্রীলঙ্কার এই অভিজ্ঞতা হয়তো দক্ষিণ এশিয়ায় কর্তৃত্ববাদের হাতে ধুঁকতে থাকা অনেক দেশের নাগরিকদের ভাবাবে। পুরোনো রাজনৈতিক তাত্ত্বিকেরাও হয়তো তাঁদের ভাবনাচিন্তাগুলো আরেক দফা উল্টেপাল্টে দেখবেন। মধ্যবিত্ত যে এখনো নাগরিক অভ্যুত্থানের সামর্থ্য রাখে, সেটাই কলম্বোর ছাত্রছাত্রী আর আইনজীবী সংগঠনগুলো দেখাল। গত সপ্তাহেও এদের মিছিলে মাত্র কয়েক শ লোক হতো। কিন্তু এরা কেউ মাঠ ছেড়ে যায়নি। শেষ পর্যন্ত জনতাকে প্রেসিডেন্ট প্রাসাদে ঢোকাতে পেরেছে তারা।

প্রেসিডেন্ট গোতাবায়ার মতোই প্রধানমন্ত্রী রনিল বিক্রমেসিংহকেও হয়তো বিদায় নিতে হবে শিগগিরই। তাঁর শক্তির উৎস রাজাপক্ষে। তাদের উৎপাটনে তাঁরও পায়ের তলায় মাটি সরে গেছে। গোতাবায়া খলনায়ক হিসেবে বিদায় নিয়েছেন। রনিল সেই মর্যাদাও পাবেন না। তাঁর বিদায়ে করুণা করে উল্লাসও করা হবে না বলে মনে হচ্ছে। কিন্তু আইনি বিবেচনায় মুশকিলের দিক হলো পালিয়ে গেলেও প্রেসিডেন্ট এই লেখার সময় পর্যন্ত পদত্যাগ করেননি। তিনি পদত্যাগ না করা পর্যন্ত প্রধান্ত্রমন্ত্রীকে প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব চালিয়ে যেতে হবে অন্তত এক মাস। তবে আপাতত গোতার মতোই রনিলেরও রাজনৈতিক ক্যারিয়ার শেষ হয়েছে ধরে নেওয়া যায়।

বলা বাহুল্য, বিপুল সহায়তা দরকার দেশটির। ভারত ও চীন নতুন সরকারকে সামান্যই সহানুভূতি দেখাবে এখন। ইউরোপ-আমেরিকাই এ রকম একটা সরকারের জন্য একমাত্র হাত পাতার জায়গা হতে পারে। ওয়াশিংটনের সবুজসংকেত পেলে আইএমএফ এবার তার প্যাকেজ নিয়ে হাজির হতে পারে।

কিন্তু দেশ কে চালাবে

শনিবার সন্ধ্যা থেকে শ্রীলঙ্কাজুড়ে আলোচনার প্রধান বিষয় হয়ে উঠেছে পরবর্তী প্রশাসনিক নেতৃত্ব। দেশটিতে ক্ষমতার উৎস প্রেসিডেন্ট। সেই পদে কে আসবে এবং তিনি ধ্বংসের কিনার থেকে দেশকে কীভাবে বাঁচাবেন, সেটা মিলিয়ন ডলার দামের এক কৌতূহল হয়ে আছে কলম্বোতে এখন।

গোতা পলাতক অবস্থা থেকে পদত্যাগপত্র পাঠালে সম্ভাব্য নেতা হিসেবে আসতে পারেন প্রধান বিরোধী দল ‘সঙ্গী জন বালাওয়েগা’র সজিথ প্রেমাদাসা, সাবেক সেনাপ্রধান শরৎ ফনসেকা এবং জেভিপির অনুঢ়া কুমার দেশনায়েকে প্রমুখ। এঁদের বাইরের কেউও প্রেসিডেন্ট হতে পারেন। পার্লামেন্টের স্পিকারের নামও ভারপ্রাপ্ত প্রেসিডেন্ট হিসেবে আসছে। প্রধানমন্ত্রী হিসেবেও লাগবে কাউকে। তবে সব ক্ষেত্রে জেভিপি ও সঙ্গী জন বালাওয়েগার সমর্থন লাগবে। কারণ, জনতার কাছে এখন কেবল এই দুই রাজনৈতিক দলের কিছু প্রভাব রয়েছে। তবে নতুন সরকারের জন্য এদের চেয়েও জরুরি হলো সেই ছাত্র-তরুণদের সম্মতি, যারা গত পাঁচ মাস রাজপথে পড়ে ছিল রাজাপক্ষেদের তাড়াতে। নতুন সরকারকে তাদের চাওয়া-পাওয়া পূরণ করতেই হবে। না হলে তারা আবার রাস্তায় নামবে। এই তারুণ্য চাইছে প্রেসিডেন্টের ক্ষমতার ব্যাপক বিকেন্দ্রীকরণ। তারা রাজাপক্ষেদের পাচারকৃত সম্পদ ফিরিয়ে আনার দাবি জানিয়ে রেখেছে। সর্বোপরি তারা দেশটির এত দিনকার চমক দেখানো উন্নয়ন-রাজনীতির বদলও চাইছে। এর মধ্যে প্রথমটা যে অর্জিত হবে, সেটা নিশ্চিত। এতে শ্রীলঙ্কার সমাজে তামিলদের কথা বলার রাজনৈতিক পরিসর খানিকটা বাড়বে। সিংহলি সমাজেও গণতান্ত্রিক আবহ বাড়তি জোর পাবে।

ওয়াশিংটনের মৃদু বিজয়?

গোতাবায়ার পলায়ন এবং রনিল বিক্রমাসিংহের সম্ভাব্য বিদায় চীন ও ভারত—উভয়ের জন্য বিমর্ষ হওয়ার মতোই ঘটনা। প্রথমজনকে চীন অনেক মদদ দিয়েছিল এবং দ্বিতীয়জনকে বহুকাল নয়াদিল্লি শক্তি জুগিয়ে যাচ্ছে। এঁরা উভয়ে সিংহলি কুলীন রাজনীতির দুই প্রতিভূ। ৯ জুলাই এই কুলীনতন্ত্রকে বাঁচাতে পারেনি সিংহলি সামরিক-আমলাতন্ত্র। এর ব্যাখ্যা খুব সহজ এবং স্পষ্ট: জনতা জেগে উঠলে কোনো বুদ্ধিমান সামরিক বাহিনী গুলি চালানোর ঝুঁকি নেয় না। শ্রীলঙ্কার সেনাবাহিনী অতি পরিণত মানসিকতার পরিচয় দিয়েছে ৯ জুলাই প্রেসিডেন্টকে পালাতে দিয়ে বা লুকিয়ে ফেলে। এর বিকল্প হতো চরম রক্তপাত।

সিংহলি সামরিক আমলাতন্ত্র দূরদর্শী সিদ্ধান্তের মধ্য দিয়ে নিজেকে রক্ষা করল এবং ভবিষ্যতের জন্য নিজেদের রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা বজায় রাখল। কিন্তু তাদের রাজনৈতিক ভিত্তি যে উগ্র জাতীয়তাবাদ, সেই পাটাতন অনেকখানি সরে গেছে। ৯ জুলাইয়ের আগের এবং পরের শ্রীলঙ্কা অবশ্যই আর আগের মতো থাকবে না। সিংহলি তরুণ-তরুণীরা ইতিমধ্যে এই উপলব্ধির প্রকাশ ঘটিয়েছে—গৃহযুদ্ধকালে তামিলদের প্রতি অবিচার করা হয়েছে। নতুন সরকার অবশ্যই সামরিক বাহিনী থেকে রাজাপক্ষেদের বশংবদ কর্মকর্তাদের সরাবে এখন। এটা না হলে এবং তাৎক্ষণিকভাবে না হলে বিপ্লব অনেকখানি অপূর্ণ থেকে যাবে। তামিলরা তাদের প্রতি ঘটে যাওয়া যুদ্ধাপরাধের বিচারের দাবিও তুলবে নতুন করে। আমেরিকা ও ইউরোপের জোরালো সমর্থন থাকবে তাতে।

পাকিস্তানে ইমরান খানের পতনের সঙ্গে কেউ কেউ হয়তো শ্রীলঙ্কার সর্বশেষ অধ্যায়কে মিলিয়ে দেখতে চাইবেন। তাঁদের এ রকম ভাবনা অনেকখানি সঠিক যে গোতা ও রনিলের বিদায়ে ওয়াশিংটন ও লন্ডনের খুশি হওয়ার কারণ আছে। গোতাবায়ার একসময় আমেরিকার নাগরিকত্ব থাকলেও তাঁর সরকার নিয়ে পাশ্চাত্য অখুশি ছিল। পালানোর আগের দিন হাস্যকরভাবে পুতিনের সঙ্গে টেলিফোন আলাপ করে হয়তো গোতা নিজের রাজনৈতিক আয়ু আরও কমিয়ে ফেলেছিলেন। তবে আমেরিকাকে এখন সম্ভাব্য সরকারের পেছনে শক্তভাবে দাঁড়াতে হবে। যদি সে রকম কোনো সরকার শ্রীলঙ্কার পরিবর্তনবাদী মানুষ শিগগিরই গঠন করতে পারে।

default-image

অনেক ডলার দরকার হবে নতুন সরকারের

প্রেসিডেন্টকে তাড়ানোর উল্লাস শেষ হলেই শ্রীলঙ্কার প্রত্যেক নাগরিকের জন্য দুঃখজনক এবং নির্মম এক অভিজ্ঞতা অপেক্ষা করছে গতকালের মতোই আগামীকাল থেকে। তাদের রান্নার জ্বালানি নেই, বিদ্যুতের অভাবে অফিস-আদালত চলছে না, ওষুধ নেই হাসপাতালে, স্কুল–কলেজ বন্ধ, ডলারের অভাবে পণ্য আমদানি করা যাচ্ছে না।

বলা বাহুল্য, বিপুল সহায়তা দরকার দেশটির। ভারত ও চীন নতুন সরকারকে সামান্যই সহানুভূতি দেখাবে এখন। ইউরোপ-আমেরিকাই এ রকম একটা সরকারের জন্য একমাত্র হাত পাতার জায়গা হতে পারে। ওয়াশিংটনের সবুজসংকেত পেলে আইএমএফ এবার তার প্যাকেজ নিয়ে হাজির হতে পারে। পাকিস্তানে নতুন সরকারের অর্থমন্ত্রী ইতিমধ্যে আইএমএফের সঙ্গে সফলভাবে চুক্তি হয়ে দেশটিকে দম নেওয়ার সুযোগ করে দিয়েছে। ইমরানের পতন এই চুক্তিকে ত্বরান্বিত করেছে। গোতার নির্বাসনও শ্রীলঙ্কার জন্য সেই রাস্তাই হয়তো সুগম করবে। তবে এ–ও সত্য যে আইএমএফের অর্থনৈতিক সংস্কার প্রস্তাবে নাগরিক জীবনের জন্য কষ্টকর এক অধ্যায়ের অনিবার্যতা আছে—কিন্তু আজ থেকে ঘুম ভাঙার পর শ্রীলঙ্কার কাউকে ব্যর্থ পরিবারতন্ত্রের ঔদ্ধত্য অন্তত আর দেখতে হবে না। আপাত–দুঃখী জীবনে এই সুখটুকু তারা একান্তই নিজস্ব এক রাজনৈতিক সংগ্রামে কিনতে পারল শনিবার। গত ছয় মাসে এই প্রথম একটা দেশে সবাই মিলে উল্লাস করতে পারল। শ্রীলঙ্কার ইতিহাসে নাগরিক জাগরণের এই কৃতিত্ব দারুণ ব্যতিক্রমী ঘটনা হিসেবেই লিখা থাকবে।

আলতাফ পারভেজ গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন