default-image

‘উকিল সাবে য্যাঁয়াত্তে “ফডর ফডর” গরের, য়াঁয়াত্তেই বুঝজি, কেইসর অবস্থা হারাপ। ফরে জজ শাবে য্যাঁত্তে হইলদে “ফশ”, বুঝিলামদে আঁই শেষ!’ অর্থাৎ ‘উকিল সাহেব যখন “পটর-পটর” করছিলেন, তখনই বুঝতে পারছিলাম, মামলার অবস্থা খারাপ। অবশেষে জজ সাহেব যখন বললেন “ফস”, বুঝলাম, আমি শেষ!’ এই আষাঢ়ে গল্পে চট্টগ্রামের অশিক্ষিত কুমারের জবানে ‘পটর’ আর ‘ফস’ হচ্ছে যথাক্রমে ইংরেজি শব্দ ‘পটার’ এবং ‘ফলস’ এর তদ্ভব রূপ।

বিচার আর শিক্ষার মাধ্যম যদি বাংলা না হয়, তবে বাংলা কদাপি কাজেকর্মে রাষ্ট্রভাষা হবে না। বিচারের পাখিটিও বন্দী আছে ভাষার খাঁচায়। এই খাঁচা ভাঙতে হলে কমপক্ষে চারটি শর্ত পূরণ করতে হবে: ১. নতুন আইন বাংলায় লেখা হবে এবং বিদ্যমান আইনের বঙ্গানুবাদ থাকবে; ২. আদালতে সওয়াল-জওয়াব বাংলা ভাষায় হবে; ৩ যাবতীয় মামলার রায় বাংলায় লেখা হবে এবং ৪. কলেজ-বিশ্ববিদ্যালয়ে আইনশিক্ষার মাধ্যম হবে বাংলা।

বিজ্ঞাপন

সাহিত্যের অনুবাদককে যেমন সংশ্লিষ্ট ভাষা দুটি জানতে হয় এবং সাহিত্যিকও হতে হয়, তেমনি আইন অনুবাদের ক্ষেত্রেও অনুবাদককে ১. উৎস (ইংরেজি) ও ২. লক্ষ্য (বাংলা)Ñ উভয় ভাষায় এবং ৩. আইনেও পারঙ্গম হতে হবে। ‘তিমির আড়ালে ডুবিল রবি’ বাংলা কবিতার এই পঙ্‌ক্তি শুনে যিনি বুঝবেন ‘তিমি মাছের আড়ালে সূর্য ডুবল’, তেমন ব্যক্তির আইন শুধু নয়, কোনো অনুবাদই না করা শ্রেয়। ভাষায় পারঙ্গমতার পাশাপাশি অনুবাদকর্মে আগ্রহও থাকতে হবে। বিচারপতি মুহাম্মদ হাবিবুর রহমান অতি পারঙ্গম ছিলেন বাংলা ভাষা ও আইন উভয় বিষয়ে; তাঁর মতো আছেন হয়তো আরও অনেকেই। কিন্তু ধর্মপুস্তক অনুবাদে তাঁর কিংবা তাঁদের যত আগ্রহ, আইন কিংবা আইনের পুস্তক অনুবাদে ততটা আগ্রহ না-ও থাকতে পারে। বাংলাদেশে সাধারণত যাঁর যা কাজ, তাঁর তা না করাই দস্তুর।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের শিক্ষক হাফিজুর রহমান কার্জন বলেন, ‘আমরা ইংরেজিতে আইন পড়াই, কারণ প্রথমত, আইনের বইগুলো সব ইংরেজি ভাষায় লেখা; দ্বিতীয়ত, গত ২০০ বছরে যত রায়, যত রেফারেন্স দেওয়া হয়েছে, সেগুলোর প্রায় সবই ইংরেজিতে এবং তৃতীয়ত, কমনওয়েলথ দেশগুলোর আইনের “কমন” ভাষা ইংরেজি।’ তিনি অবশ্য অস্বীকার করেন না যে বিশ্ববিদ্যালয়ে বাংলা ভাষায় আইনের পাঠ না দেওয়া বাংলাদেশের সংবিধান ও ১৯৮৭ সালের বাংলা প্রচলন আইনের বরখেলাপ।

‘বিচারকদের অতি ক্ষুদ্র একটি অংশ বাংলায় রায় লিখতে শুরু করেছে সম্প্রতি,’ বললেন নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন আইনজীবী। তবে তাঁদের রায়ের বাংলা ইংরেজির চেয়েও দুর্বোধ্য। এই দুর্বোধ্যতার একটা কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে আইনজীবী জ্যোতির্ময় বড়ুয়া বলেন, ‘আইনের অনেক টার্ম ইংরেজিতেই অনুবাদ করা হয়নি, অদ্যাবধি লাতিনে রয়ে গেছে। লাতিন “ভয়েড অ্যাব ইনিসিও” (‘সূচনাতেই বাতিল’ কিংবা ‘বিসমিল্লায় খারিজ’) শব্দবন্ধটিকে ভাবানুবাদ না করে আপনি যদি স্রেফ “অক্ষরান্তর” বা ট্রান্সলিটারেশন করেন, তবে আর লাভ হলো কী? আইন কিংবা রায় অনুবাদ করার সমস্যাও আছে। আইনের ক্ষেত্রে শব্দের কিংবা বাক্যের যাবতীয় বিবিধার্থকতা যথাসম্ভব পরিহার্য। অনুবাদের কারণে যদি অর্থের পার্থক্য দাঁড়িয়ে যায়, তবে সংশ্লিষ্ট মক্কেল ক্ষতিগ্রস্তও হতে পারেন।’

বাংলা ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ যত গভীর হবে, ততই ব্যথায় ‘পটর-পটর’ করবে তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অবশেষে বিচারক যখন একদিন বলে উঠবেন ‘ফস’, তখন প্রেম-স্বপ্ন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। প্রেম আর স্বপ্ন যখন থাকে না, রাষ্ট্রেরও তখন নাভিশ্বাস উঠে যায়

শুদ্ধ ইংরেজিতে রায় লেখার মতো বিচারকের সংখ্যা কমছে দিন দিন। আগের বিভিন্ন মামলার রায় থেকে প্রয়োজনীয়-অপ্রয়োজনীয় তথ্য নিয়ে অতি দীর্ঘ রায় দেওয়ার এক প্রথা দাঁড়িয়ে গেছে। যে রায় যত দীর্ঘ, সে রায় লেখা এবং সংশোধনেও সময় তত বেশি লাগে, ভুলের সম্ভাবনাও আনুপাতিক হারে বাড়তে থাকে, সে ইংরেজিতেই হোক কিংবা বাংলায়। জ্যোতির্ময় বড়ুয়া মনে করেন, ‘রায়ের কলেবর যদি কয়েক পৃষ্ঠায় সীমাবদ্ধ রাখা যেত, যেমন নজির রয়েছে ভারতে, তবে ভাষা ও ব্যাকরণগত ভুলের সম্ভাবনা কমে যেত এবং তুলনামূলক স্বল্প সময়ে শুদ্ধ, বোধগম্য বাংলায় রায় লেখা সম্ভব হতো।’

লেখক ও অধ্যাপক সলিমুল্লাহ খান বলেন, ‘ইংরেজরা উপমহাদেশে আইন প্রণয়ন করেছিল ফারসি, ইংরেজি, হিন্দুস্তানি ও বাংলা—এই চারটি ভাষায়। আইনের অনেক টার্ম বাংলায় ভাবানুবাদ করা হয়েছিল, কিছু টার্মের তদ্ভব রূপও সৃষ্টি হয়েছিল, যেমন “লাট” (লর্ড), “আর্দালি” (অর্ডার্লি), “তেরজুরি” (ট্রেজারি) ইত্যাদি। আইনে ব্যবহৃত সব অধিশব্দের বঙ্গানুবাদ করার প্রয়োজন নেই। “ভয়েড অ্যাব ইনিসিও”র মতো লাতিন টার্ম “যৎদৃষ্টৎ তল্লিখিতং” থাকলে সমস্যা কী? দ্ব্যর্থবোধকতা যেহেতু ভাষার অপরিহার্য বৈশিষ্ট্য, সেহেতু যতক্ষণ পর্যন্ত বিচারিক কাজে ভাষার ব্যবহার হবে, ততক্ষণ পর্যন্ত দ্ব্যর্থবোধকতাও কমবেশি থাকবে। আইন রচনা, আইন শিক্ষণ, আদালতে সওয়াল-জওয়াব, রায় প্রদান—কিছুই আমরা বাংলা ভাষায় করছি না, কারণ আমরা লোক সুবিধার নই এবং “দুর্জনের ছলের অভাব হয় না!”’

বিজ্ঞাপন

প্রথম আলোতে আমার ভাষাবিষয়ক এক লেখা পড়ে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের উচ্চপদস্থ একজন কর্মকর্তা আগারগাঁওয়ে আমাকে নিজের অফিসে ডেকে নিয়ে একাধিক নির্বাচনী আইন বাংলায় অনুবাদের আগ্রহ প্রকাশ করেছিলেন। ‘ফেব্রুয়ারি মাস বলেই কি বাংলা ভাষার কথা মনে পড়ছে আপনার, নাকি সারা বছরই মনে পড়বে?’ আমার প্রশ্ন শুনে মহামহিম কর্মকর্তা দৃশ্যত অপ্রস্তুত হয়েছিলেন। এরপর কত ফেব্রুয়ারি চলে গেছে, তিনি আর যোগাযোগ করেননি। প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় নিজেদের স্ট্যাটিউটটি বাংলায় অনুবাদ করতে আগ্রহ প্রকাশ করেছিল। অনুবাদের উপযুক্ত সময় ও সম্মানী দাবি করার পর থেকে নীরবতা হিরণ্ময়। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ও কি গত অর্ধ দশকে তার সংবিধান, ৭৩-এর অধ্যাদেশ বাংলায় অনুবাদ করে উঠতে পেরেছে? সামর্থ্য নয়, অনুবাদকের অভাব নয়, একান্তভাবে কর্তৃপক্ষের ইচ্ছার অভাব এই অপারগতার অন্যতম কারণ।

‘ব্যথা নয়, প্রেম-স্বপ্ন নয়, চারদিকে বিচ্ছেদের ঘ্রাণ লেগে রয়,’ লিখেছেন জীবনানন্দ। বাংলা ভাষার সঙ্গে বাংলাদেশ রাষ্ট্রের বিচ্ছেদ যত গভীর হবে, ততই ব্যথায় ‘পটর-পটর’ করবে তার বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। অবশেষে বিচারক যখন একদিন বলে উঠবেন, ‘ফস’, তখন প্রেম-স্বপ্ন কিছুই আর অবশিষ্ট থাকবে না। প্রেম আর স্বপ্ন যখন থাকে না, রাষ্ট্রেরও তখন নাভিশ্বাস উঠে যায়।

শিশির ভট্টাচার্য্য ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আধুনিক ভাষা ইনস্টিটিউটের পরিচালক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন