বাংলাদেশের নিতান্ত মধ্যবিত্ত পরিবারেও বিয়ের বাজেট কত, আমরা তা জানি। সেই আলোকেই সরকার দলীয় একজন সাংসদ কাজী কানিজ সুলতানা হেলেনের ছেলের বিয়ের বাজেট সহজেই অনুমেয়। কিন্তু তাঁর ছেলে বিয়ের পর কনেসহ বরযাত্রী নিয়ে বাসায় ফেরার পথে পায়রা সেতুর টোল দিতে চাননি, এমনকি জড়িয়েছেন মারামারিতে।

সেতুর টোল না দিয়ে যে কয়টি টাকা বাঁচাতে পারতেন সাংসদের পরিবার, সেটা তাঁদের আছে একেবারেই নস্যি। কিন্তু দেশের আর সব মানুষকে যখন টোল দিয়ে সেতু পার হতে হয়, সেখানে সাংসদের সন্তানের বিয়ের বরযাত্রীকে টোল দিতে হয় না, এটা সবার সামনে তাঁর দাপট প্রমাণ করে। বিশেষ করে, যখন ছেলে বিয়ে করে বউ নিয়ে ফিরে যাচ্ছে, তখন নববধূকে দেখানোটা জরুরি, তিনি কাকে বিয়ে করেছেন। ক্ষমতা বলে কথা। হ্যাঁ, টাকা বাঁচানো নয়, দাপট প্রতিষ্ঠা করাই ছিল এর মুখ্য উদ্দেশ্য। ক্ষমতার প্রমাণ রাখতে তাই দাপট দেখানো এতটাই জরুরি যে টোল ফাঁকি দেওয়ার জন্য কেউ মারামারি করে কেউবা আবার বিনা টিকিটে ট্রেনে চড়ে বসে।

রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর ভাগনেদের সঙ্গে ঠিক কী কী ঘটেছে, আমরা পুরোপুরি নিশ্চিত হতে পারিনি। সব পক্ষেরই নিজস্ব বয়ান আছে আর তাই টিটিই এবং ভাগনেদের পক্ষ থেকে ভিন্ন ভিন্ন বয়ান আমাদের সামনে এসেছে। বয়ানে ভিন্নতা যা–ই থাক, দুপক্ষই একটা বিষয় স্বীকার করেছে আর তা হলো মন্ত্রিমশাই এর ভাগনেদের কাছে টিকিট ছিল না। তাঁরা টিকিট ছাড়া নিজেরাই ট্রেনে উঠে গেছেন নাকি, টিকিট না পেয়ে স্টেশনমাস্টারের ‘বিশেষ ব্যবস্থায়’ ট্রেনে উঠেছেন, সেটা আপাতত নিশ্চিত নয়।

যা–ই হোক, টিকিট না থাকা সত্ত্বেও ভাগনেরা ট্রেনে উঠেছিলেন এবং রীতিমতো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরার দখল নিয়েছিলেন। যখন টিটিই তাঁদের টিকিটের জন্য ধরলেন, তখন তাঁরা ভুল স্বীকার করে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরার টিকিট কিনে নিলেই পারতেন। কিন্তু সেটি করলে তো আর দাপট দেখানো হয় না। তাই অনেক ঝামেলার পর তাঁরা কিনেছিলেন শোভন শ্রেণির টিকিট, কিন্তু সেই টিকিটেই থেকে যেতে চেয়েছিলেন শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায়। রেলমন্ত্রীর ভাগনে হিসেবে আবদার খুব বেশি নয়।

এই দুই শ্রেণির টিকিটের পার্থক্য যত টাকা, সেটা তাঁদের না থাকার কোনো কারণ নেই। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নেই শোভন শ্রেণির ওপরে টিকিট কেনার সামর্থ্য তাঁদের ছিল না তাহলে আর সবার মতো শোভন শ্রেণিতে তাঁদের ভ্রমণ করার কথা। মূল বিষয় আসলে ক্ষমতার দাপট। তাঁরা দাপট দেখাতে গিয়েছিলেন। প্রথমে দেখাতে গিয়েছিলেন টিকিট ছাড়াই তাঁরা ট্রেনে চড়তে পারেন, তা–ও রীতিমতো শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কামরায়। এই চেষ্টায় বাধা তৈরি হওয়ার পর পেতে চেয়েছিলেন ‘সান্ত্বনা পুরস্কার’ শোভন শ্রেণির টিকিটের টাকা দিয়ে শীতাতপনিয়ন্ত্রিত কোচে থাকবেন। অর্থাৎ যেকোনোভাবেই হোক দাপট দেখাতে হবে।

টিটিই শেষ পর্যন্ত সেটাও করতে না দেওয়ায় যে পরিস্থিতি হলো তার জন্য টিটিইকে বরখাস্ত করাটা জরুরি ছিল। শুধু মন্ত্রী কেন মন্ত্রীর স্ত্রী, শালী, ভাগনা–ভাগনে কতটা দাপট রাখেন, সেটা দেখাতে হবে তো। যাত্রীদের সঙ্গে বিভিন্ন সময় রেলের কর্মচারীদের দুর্ব্যবহারের ইতিহাস এ দেশে অনেক পুরোনো। কোনো যাত্রী অভিযোগ করে তার ন্যূনতম প্রতিকার কখনো পেয়েছে এমন উদাহরণ অতি বিরল। কিন্তু মুহূর্তেই টিটিইকে বরখাস্ত করা রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর দাপট প্রমাণ করেছে। দেশের সার্বিক পরিস্থিতি বিবেচনায় অনেকেই অবশ্য বলছেন—টিটিই তো বেঁচে গেলেন, তাঁর জেল জরিমানা গুনতে হলো না অন্তত।

সংবাদটি প্রকাশিত হওয়া এবং সেটা নিয়ে প্রচণ্ড শোরগোল হওয়ায় আপাতদৃষ্টিতে কিছুটা ব্যাকফুটে পড়েছেন মন্ত্রী এবং তাঁর স্ত্রী। টিটিইকে চাকরিতে ফিরিয়ে আনা হয়েছে, এমনকি তাঁকে পুরস্কৃত করার কথাও আলোচনায় আসছে। তবে এখনো কোনো ব্যবস্থা নেওয়ার কথা শোনা যায়নি যে কর্মকর্তা রেলমন্ত্রীর স্ত্রীর কথায় এই অন্যায় পদক্ষেপ নিলেন, তাঁর বিরুদ্ধে। রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের একজন কর্মকর্তা রেলমন্ত্রীর স্ত্রী তো বটেই স্বয়ং রেলমন্ত্রী এমনকি প্রধানমন্ত্রীর অন্যায়, বেআইনি আদেশ মানতে বাধ্য নন। কিন্তু এটা আসলে দাপট দেখানোর সমাজ, দাপটের সামনে মাথা নুইয়ে চলার সমাজ, না হলে এখানে টিকে থাকাই অসম্ভব।

তবে এই শোরগোল মিইয়ে যাবে অচিরেই। একজন ‘নগণ্য’ টিটিই যে দুঃসাহস করেছেন, অনুমান করি, তিনি সেটার মূল্য দেবেন। তিনি যদি পার পেয়ে যান, তাহলে একজন মন্ত্রী স্ত্রীর দাপট ভবিষ্যতের জন্য হুমকির মুখে পড়ে যেতে পারে। এটা হয়ে উঠবে বিরাট ক্ষমতাবানদের দাপটের বিরুদ্ধে কোনো ‘তুচ্ছ’ মানুষের টিকে যাওয়ার উদাহরণ, যা অনুপ্রেরণা হয়ে উঠবে আরও অনেক ‘তুচ্ছ’ মানুষের কাছে, যাঁরা দাপটের বিরুদ্ধে দাঁড়াতে পারেন। এই দেশে দাপটওয়ালারাই যেকোনো মূল্যে ঠেকাবেন সেটা। সুতরাং অনুমান করি, আপাতত চাকরি ফিরে পেলেও নিকট ভবিষ্যতেই এই ঘটনার মূল্য চোকাতে হবে টিটিইকে।

আমরা যখন বলি ‘উনি খুব পাওয়ারফুল মানুষ’ তখন শ্রোতা বুঝে নেন আমরা এমন একজন মানুষের কথা বলছি যিনি চাইলে অনেক আইন, নিয়ম ভেঙে দাপট দেখাতে পারেন। মানুষের শ্রদ্ধা না পেলেও অন্তত ভীতিজনিত সমীহ আদায় করে নেন তিনি। ভীতিজনিত সমীহ ধরে রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে মানুষের সামনে নিয়মিত ক্রমাগত বেআইনি, অন্যায় দাপট প্রদর্শন। তাই এ দেশের একজন ‘ক্ষমতাবান’ মানুষ তাঁর এই দাপট চালিয়ে যান।

এ তো গেল মন্ত্রী এমপির মতো বড় ক্ষমতাবানদের কথা। এ দেশের পরতে পরতে এখন ক্ষমতাবানদের ছড়াছড়ি। এই ক্ষমতা টাকার ক্ষমতা, এই ক্ষমতা দীর্ঘদিন সরকারে থাকার ক্ষমতা। বর্তমান বাংলাদেশের তৃণমূল পর্যায়ের আওয়ামী লীগ এবং এর অঙ্গসংগঠনের নেতাদের কাছে আছে বেশুমার টাকা; লাখ টাকার হিসাবও নাকি তাঁরা করেন না। তৃণমূল পর্যায়ের কোনো নেতা তাঁর সাঙ্গপাঙ্গদের নিয়ে স্থানীয় কোনো রেস্টুরেন্টে সেখানকার দামি খাবারে ভোজ উৎসব করলে যে বিল হবে সেটাও তাঁর কাছে একেবারেই নস্যি। কিন্তু আমরা দেখি বহু সময় তাঁরা বিল দেন না, ফাউ খান। এখানেও টাকা বাঁচানো কারণ নয়, বরং সাঙ্গপাঙ্গদের এবং এলাকায় নিজের ক্ষমতার দাপট দেখানোর জন্য এমনটা করেন তাঁরা। সরকারি দলের সঙ্গে যুক্ত থাকার পরও যদি বিল দিতে হয়, তাহলে আর ইজ্জতটা থাকে কোথায়?

উন্নত, বিকশিত গণতান্ত্রিক দেশগুলোতে ‘ক্ষমতা’ বলতে বোঝায় যে কারও সংবিধান এবং আইনের চৌহদ্দির মধ্যে ক্ষমতা। যিনি বেশি ক্ষমতাবান, তাঁর এই চৌহদ্দি অনেক বড়, কিন্তু তাঁকেও ক্ষমতার প্রয়োগ করতে হয় এই চৌহদ্দির ভেতরে থেকেই, আইনকানুন, নিয়ম মেনে। এমনকি আপাতদৃষ্টিতে কম ক্ষমতাবান কেউ তাঁর সংবিধান ও আইনি চৌহদ্দির মধ্যে বেশি ক্ষমতাবান কাউকে চ্যালেঞ্জ করতে পারেন এবং আইনি পদক্ষেপও নিতে পারেন। সম্প্রতি কোভিড নিষেধাজ্ঞা ভেঙে পার্টি করার অভিযোগে স্বয়ং ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী বরিস জনসনের বিরুদ্ধে তদন্ত করেছে লন্ডন মেট্রোপলিটন পুলিশ এবং তাতে বরিসকে দায়ী পেয়ে জরিমানা করা হয়েছে। এটা সাম্প্রতিক ঘটনা, কিন্তু তুলনামূলক অনেক কম ক্ষমতাবান মানুষ রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ ক্ষমতাবান মানুষকে শাস্তি দিয়েছে, এমন উদাহরণ পশ্চিমে ভূরি ভূরি।

একটি দেশের প্রেক্ষাপট কোনো শব্দের নতুন দ্যোতনা, নতুন মানে তৈরি করতে পারে। দুই পক্ষের গোলাগুলির মাঝে পড়ে কেউ গুলিবিদ্ধ হলে সেটা হচ্ছে ‘ক্রসফায়ার’। অথচ এই দেশে যখন আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী শব্দটি আমাদের সামনে বলে, তখন একজন শিশুও জানে এর মানে কী। এ কারণেই সত্যি ক্রসফায়ার একটি দুর্ঘটনা হলেও আমাদের দেশে কাউকে ‘ক্রসফায়ারে দেওয়ার’ হুমকি দেওয়া হয়। একইভাবে আমি বিশ্বাস করি বাংলাদেশে ‘ক্ষমতা’ শব্দটির মানেও পাল্টে গেছে।

বাংলাদেশে ‘ক্ষমতা’ শব্দটি বেআইনি, অন্যায়, অনৈতিক দাপট প্রকাশের প্রতিশব্দে পরিণত হয়েছে। নিত্যকার আলাপে বাংলা ‘ক্ষমতাবান’ শব্দটি খুব একটা ব্যবহার করি না আমরা, ব্যবহার করি এর ইংরেজি প্রতিশব্দটি। আমরা যখন বলি ‘উনি খুব পাওয়ারফুল মানুষ’ তখন শ্রোতা বুঝে নেন আমরা এমন একজন মানুষের কথা বলছি যিনি চাইলে অনেক আইন, নিয়ম ভেঙে দাপট দেখাতে পারেন। তিনি আইনকে বৃদ্ধাঙ্গুলি দেখালেও আইনের হাত অত লম্বা নয় যে তাঁকে আইনের আওতায় আনতে পারে। এই কারণে মানুষের শ্রদ্ধা না পেলেও অন্তত ভীতিজনিত সমীহ আদায় করে নেন তিনি। ভীতিজনিত সমীহ ধরে রাখার একমাত্র উপায় হচ্ছে মানুষের সামনে নিয়মিত ক্রমাগত বেআইনি, অন্যায় দাপট প্রদর্শন। তাই এ দেশের একজন ‘ক্ষমতাবান’ মানুষ তাঁর এই দাপট চালিয়ে যান।

ক্ষমতা হতে পারে রাজনৈতিক, হতে পারে অর্থনৈতিক, প্রশাসনিক কিংবা সামাজিক। ক্ষমতার উৎস যা–ই হোক, প্রকাশ মোটামুটি একই ধরনের। ক্ষমতায় কুলালে কোনো এমপি সাধারণ মানুষ থেকে সরকারি কর্মচারীদের চড়থাপ্পড় মারা থেকে শুরু করে জমি দখল পর্যন্ত কোনোটাই বাদ দেন না। জ্যামে পড়ে মাথা গরম এমপি পুত্রের ইতস্তত গুলি চালানো কিংবা এমপির গাড়ির সঙ্গে বাইকের ধাক্কা লাগার খেসারত হিসেবে গাড়ি থেকে নেমে মারধর, আত্মহত্যা প্ররোচনা বা হত্যা মামলার প্রধান অভিযুক্ত হওয়ার পরও গ্রেপ্তার তো দূরে থাকুক সামান্য জিজ্ঞাসাবাদের মুখোমুখি পর্যন্ত না হওয়া, কুখ্যাত ব্যাংক লুটেরা হয়েও সবার নাকের ডগায় দেশত্যাগ, করোনার মহাদুর্যোগে যখন সব যোগাযোগ বন্ধ, তখন হত্যাচেষ্টা মামলার দুই আসামির দেশ ছাড়া হওয়ার মতো বৃহৎ দাপট দেখানোর উদাহরণ আমরা দেখি নিয়মিত বিরতিতে। আর মাঝারি বা ক্ষুদ্র দাপট প্রদর্শনের মধ্যেই এই দেশের মানুষদের নিত্যকার জীবনযাপন।
এভাবেই ক্রমাগত বেআইনি, অন্যায় দাপট দেখানো চলে ক্ষমতাবানদের আর ক্ষমতাবান হতে চাওয়াদের। এভাবেই দাপট দেখিয়ে দেখিয়ে দেশে কিছু মানুষ এই দেশের মানদণ্ডে সত্যিকারভাবে ‘ক্ষমতাবান’ হয়ে ওঠেন, যাঁদেরকে নানা পরিস্থিতিতে ‘আমারে চিনস’ বলতে হয় না, নিজস্ব চৌহদ্দির মানুষ তাঁদের চেনে এমনিতেই, ভয়মিশ্রিত সমীহ সহকারে।

  • রুমিন ফারহানা বিএনপির সংসদ সদস্য ও হুইপ এবং বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন