কমলী রানী উচ্চকণ্ঠে বলছিলেন, ‘সবাই চলি গেইলে হামার বাড়িত ফির যদি হামলা হয়, হামারা কী করমো? হামরা কি এ দেশোত ভালো থাইকপার নই?’ রংপুরের পীরগঞ্জের রামনাথপুর ইউনিয়নের বড় করিমপুরের মাঝিপাড়ায় গত মঙ্গলবার এই কথাগুলো বলছিলেন কমলী রানী। করিমপুরের এক ব্যক্তির কথিত একটি ফেসবুক পোস্টকে কেন্দ্র করে গত রোববার সন্ধ্যার পর সেখানকার মাঝিপাড়ায় সহিংসতা চালানো হয়। প্রায় ৭০টি পরিবারের বাড়িঘর লুটপাট ও বেশ কিছু ঘরে আগুন দিয়েছে সংগঠিত দুর্বৃত্তরা। মাঝিপাড়া এখন আতঙ্কিত জনপদ। সরেজমিন দেখতে গত মঙ্গলবার গিয়েছিলাম সেখানে।
রংপুর থেকে প্রায় ৪০ কিলোমিটার দূরে ঢাকা-রংপুর মহাসড়কের পাশে পীরগঞ্জ বাসস্ট্যান্ডে নেমে যখন করিমপুরে প্রবেশ করি, তখনই দেখতে পেলাম, বাড়িগুলোর উঠানে থাকা খড়ের ঢিবিগুলো পুড়ে ছাই হয়ে আছে। আখিরা নদীর পাড় ঘেঁষে বাড়ি রোহিনী চন্দ্র দাসের। তার বাড়ির ভেতরে ঢুকতেই পোড়া উৎকট গন্ধ নাকে লাগল। ঘরের ভেতরে থাকা মোটরসাইকেলসহ সবকিছুই পুড়ে গেছে। কোনো কিছুই অবশিষ্ট নেই।
রোহিনী চন্দ্র দাস সন্ধ্যার পর চোখে দেখেন না। বাড়ির অন্য সবাই ঘর থেকে দ্রুত পালিয়ে গেলেও তিনি পালাতে পারেননি। তাঁকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়। জীবনসায়াহ্নে নিজের বাড়ির উঠানে দাঁড়িয়ে তিনি দেখলেন, দুর্বৃত্তরা তাঁর বাড়ি লুট করছে, কেরোসিন ঢেলে তাঁর ঘরে আগুন দিচ্ছে।
রোহিনী বলছিলেন, ‘সারা জীবনে এমন দেখি নাই। সন্ধ্যার পর মানুষ চিনবার পাই নাই। মানুষ আর মানুষ, হাজার হাজার মানুষ।’ রোহিনীর ছেলেবউ সোনালি দাস জানালেন, অন্য সবাই মিলে বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে ধানখেতে শুয়ে ছিলেন কয়েক ঘণ্টা। শুধু সোনালি দাসের পরিবার নয়, মাঝিপাড়ার সবাই জীবন বাঁচানোর তাগিদে সেদিন আশপাশে থাকা সবুজ ধানখেতেই শুয়ে আত্মগোপন করে ছিলেন। যারা পালাতে দেরি করেছে, তারা শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছে। তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া বৃষ্টি রানীও পালিয়ে ধানখেতে আশ্রয় নিয়েছিল।
আখিরা নদী ঘেঁষে বাড়ি সুবর্ণ দাসেরও। সুবর্ণের মেয়ে সুশীলা আর ছেলেবউ পুতুল। দুজনেই আট মাসের গর্ভবতী। সুশীলার মা শৈবা রানী। এঁরা তিনজনই আশ্রয় নিয়েছিলেন পার্শ্ববর্তী পাড়ার মুসলিম পরিবারে। সুশীলার স্বর্ণের অলংকার লুট হয়ে গেছে। ছেলে সুদর্শনের পিঠে মারের চিহ্ন। সুদর্শন, সুবর্ণ পার্শ্ববর্তী শ্মশানে পালিয়ে ছিল। পাশেই বাড়ি রুপিন চন্দ্র দাসের। তাঁর মেয়ে রীতা দাস জানালেন, তাঁর বাবাকে সেই রাতে অনেক মেরেছে।
ওই পল্লির দেবেন্দ্রনাথ চন্দ্র দাসের ছেলে একটুর জন্য আগুনের হাত থেকে বেঁচে গেছে। আরেক ছেলে মার খেয়ে পালিয়েছে। দেবেন্দ্রনাথের স্ত্রী সুমতি রানী ধানখেতে পালিয়ে থেকে নিজেদের বাড়ির আগুন দেখেছেন। তাঁদের বাড়ি পুড়ে ছাই। এই আগুনে ভস্মীভূত হয়েছে তাঁর পোষা দুটি গরু। আরেকটি গরু লুট হয়েছিল। ঘটনার পরের দিন থানা থেকে লুট হওয়া গরু নিয়ে এসেছে। ভস্মীভূত দুটি গরুর মধ্যে একটি গরু গর্ভবতী ছিল। আর কয়েক দিন পরই বাচ্চা হতো। একটি গরু দুধ দিচ্ছিল। সুমতি রানী কিছুতেই গরু দুটি ভস্মীভূত হওয়ার ঘটনা মেনে নিতে পারছেন না। এ জন্য আহাজারি করছেন।
মাঝিপল্লিতে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার দাগ মুছবে কী করে? এতগুলো পরিবারের ধন-সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তাদের মনে যে গভীর দাগ পড়েছে, তা কি সহজেই মুছে যাবে? পরিবারগুলোর ধন-সম্পদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া বর্ষা রানী কোন চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠবে? দাউ দাউ করে বাড়িঘর পুড়ে যাচ্ছে—এই দৃশ্য কি মানুষের মন থেকে মুছে যাবে?
পুড়ে যাওয়া বাড়ির টিনের স্তূপ উঠানে। সুমতি দেখাচ্ছিলেন, কোথায় গরু দুটি থাকত, কোথায় গরু পানি খেত, কিসে গরুর দুধ দোয়ানো হতো। তিনি বলছিলেন, ‘যেদিন বাড়িত আগুন দেইল, সেদিন ভাত খাওয়ার চাউল ছিল না। ভাত না খায়া আছি। আইজ পর্যন্ত আর ভাত খাই নাই। গরু দুইটা পোড়া গেইচে।’ সুমতির আহাজারি দেখে পাশেই দাঁড়ানো এক মহিলা বললেন, ‘গরুর জন্য পাগল হয়া গেইচে। নিজে পালছে তো। গরুর জন্য খুব মায়া। খাওয়া-দাওয়া ছাড়ি দিছে। দিনমান খালি গরুর কথা কয়।’
পীরগঞ্জের এই ঘটনায় প্রশাসনিক ব্যর্থতাকে উপেক্ষা করার সুযোগ নেই। একই গ্রামের ফেসবুকে পোস্ট দেওয়া পরিতোষ রায়ের বাড়িতে সালিস বসেছিল। সেই সালিসে জনপ্রতিনিধি এবং প্রশাসনের লোক উপস্থিত ছিলেন। সেই সময়ে পার্শ্ববর্তী পাড়ায় হাজারো মানুষ একত্র হয়ে এত বড় নৃশংসতা চালিয়েছে আর প্রশাসন কিছু জানল না, এটা কী করে হয়? এতগুলো মানুষ একত্র হতে সময় লেগেছে। এই সময়ে প্রশাসনিকভাবে পদক্ষেপ নেওয়ার সুযোগ ছিল। যদিও ঘটনার পরপরই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীসহ প্রশাসনের সব ব্যক্তি উপস্থিত হয়েছিলেন।
কুমিল্লায় একটি পূজামণ্ডপে কে বা কারা পবিত্র কোরআন রেখে যাওয়াকে কেন্দ্র করে গোটা দেশে অনেক মন্দির ও মণ্ডপে হামলা চালানো হয়। এরপর থেকে সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অনেকেই চরম উৎকণ্ঠায় দিনাতিপাত করছেন। এ রকম একটি সময়ে ফেসবুকের একটি পোস্টকে কেন্দ্র করে যখনই উত্তেজনা ছড়িয়েছে, তখনই প্রতিরোধ করার জন্য আরও অনেক বড় প্রস্তুতি নেওয়া প্রয়োজন ছিল।
মাঝিপল্লিতে যাঁদের বাড়িতে আগুন দেওয়া হয়েছে, তাঁরা পেশায় মৎস্যজীবী। যাঁরা পেশায় জেলে, রংপুর অঞ্চলে তাঁদের মাঝি বলে অভিহিত করা হয়। আখিরা নদী এবং নদ–সংলগ্ন প্রায় ১ হাজার ৫০০ একরের বড় বিলে মাছ ধরে বংশপরম্পরায় তাঁরা মাছ ধরে জীবিকা নির্বাহ করেন। এই মাঝিপল্লিতে ঘটে যাওয়া নৃশংসতার দাগ মুছবে কী করে? প্রায় ৭০টি পরিবারের ধন-সম্পদের ক্ষতি হয়েছে। কিন্তু তাদের মনে যে গভীর দাগ পড়েছে, তা কি সহজেই মুছে যাবে? পরিবারগুলোর ধন-সম্পদের ক্ষতি পুষিয়ে দেওয়া সম্ভব। কিন্তু তৃতীয় শ্রেণিতে পড়ুয়া বর্ষা রানী কোন চিন্তা নিয়ে বেড়ে উঠবে? দাউ দাউ করে বাড়িঘর পুড়ে যাচ্ছে—এই দৃশ্য কি মানুষের মন থেকে মুছে যাবে?
রাজনৈতিক ও সামাজিক সংগঠনের নেতারা অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়াচ্ছে। ক্ষতিগ্রস্তদের সাহস দিচ্ছে। সরকারিভাবেও সহায়তা দেওয়া হচ্ছে। এরমধ্যে নতুন ঘরের আশ্বাসও পেয়েছেন সরকার থেকে। তবে তখনো অধিকাংশ বাড়িতে রান্না করে খাওয়ার মতো ঘর-চুলা-বাসনপত্র ছিল না। মন্দিরের পাশে রান্না হচ্ছিল। বেলা সাড়ে ১১টায় রুপিন চন্দ্রের বাড়িতে শান্তি বালা এবং রওশন চন্দ্র দাসকে শুধু মুড়ি খেতে দেখলাম। সকাল থেকে অন্য কিছু খেয়েছেন কি না জিজ্ঞেস করলে রওশন চন্দ্র দাস বললেন, ‘রান্না হচ্ছে। এখনো খাবার হয় নাই।’
এই ধর্মীয় সহিংসতার পেছনে কারা জড়িত, তাদের অবশ্যই শনাক্ত করতে হবে। সংগঠিত চক্র নাকি সামাজিক ব্যাধি, তা চিহ্নিত করতে হবে। নয়তো ভবিষ্যতে ধর্মীয় সহিংসতা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। মাঝিপাড়ার জেলেরা ধানখেতে পালিয়ে বেঁচে ছিলেন; আরও ভয়াবহ কিছু ঘটে যেতে পারে, যদি না এ ঘটনার বিচার হয়।
তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের অধ্যাপক। [email protected]