ইসরায়েলে ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি ভূখণ্ড দখল করে রেখেছে। আর ২০০৭ সাল থেকে অবরুদ্ধ গাজা। এর ফলে ফিলিস্তিনিরা নিজেদের জ্বালানি সম্পদের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারিয়েছে। রাজস্ব ও রপ্তানি আয় থেকে বঞ্চিত তারা। দেশটির অর্থনীতি এখন ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে। আন্তর্জাতিক আইনে অবৈধ এই ইসরায়েলি দখলদারির কারণে ফিলিস্তিনের লোকজন ও পণ্য এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় যেতে পারে না, সম্পত্তি-সম্পদ ধ্বংস ও বাজেয়াপ্ত হয়ে যায়; এমনকি ভূমি, পানি ও অন্যান্য প্রাকৃতিক সম্পদও হারাতে হচ্ছে। অভ্যন্তরীণ বাজারব্যবস্থাসহ প্রতিবেশী দেশ ও আন্তর্জাতিক বাজার থেকে তারা বিচ্ছিন্ন।

নিজেদের অর্থনৈতিক ব্যবস্থা ও নীতির ওপর ফিলিস্তিনিদের নিয়ন্ত্রণ খুবই সীমিত। প্যারিস প্রটোকল অন ইকোনমিক রিলেশনস অনুযায়ী ইসরায়েল ফিলিস্তিনের মুদ্রানীতি, সীমান্ত ও বাণিজ্য নিয়ন্ত্রণ করে। আঙ্কটাডের হিসাবে ২০০৭ থেকে ২০১৭ সাল পর্যন্ত অধিকৃত ফিলিস্তিন বছরে ৪৭ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার আর্থিক রাজস্ব হারিয়েছে। এর মধ্যে ইসরায়েলে চলে যাওয়া রাজস্ব ও এর সুদ রয়েছে। গাজায় দীর্ঘস্থায়ী দখলদারির কারণে এখানকার অর্ধেকের বেশি জনগণ দারিদ্র্যসীমার নিচে বাস করে। দেশটি বছরে ১৬ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলার জিডিপি হারিয়েছে।

অর্থনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য ফিলিস্তিনকে নিজেদের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে হবে। তেল-গ্যাসের ওপর তাদের প্রাপ্ত হিস্যার ন্যায্যতা দিতে হবে।

পশ্চিম তীর ও গাজা নিয়ে ১৯৯৫ সালে ইসরায়েল-ফিলিস্তিনের মধ্যে দ্বিতীয় অসলো চুক্তি হয়। চুক্তিটিতে ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষকে সমুদ্রে জলসীমায় উপকূল থেকে ২০ নটিক্যাল মাইল পর্যন্ত অধিকার দেওয়া আছে। এ চুক্তির আওতায় ফিলিস্তিন ১৯৯৯ সালে গ্যাস অনুসন্ধানে ব্রিটিশ গ্যাস গ্রুপের সঙ্গে ২৫ বছরের চুক্তি করে। ওই বছরই ১৭ থেকে ২১ নটিক্যাল মাইলের মধ্যে গাজা মেরিন নামে বিশাল গ্যাসক্ষেত্রের সন্ধান মেলে। তবে এই গ্যাসের বিক্রি নিয়ে ইসরায়েল সরকার, ফিলিস্তিনি কর্তৃপক্ষ ও ব্রিটিশ গ্যাস কোম্পানির মধ্যে প্রাথমিক আলোচনা হলেও অধিকৃত অঞ্চলে যে রাজস্ব বিধান আছে, সে অনুযায়ী কোনো মুনাফা পায় না ফিলিস্তিন।

গাজাকে অবরুদ্ধ করে রাখার পর থেকে এর প্রাকৃতিক গ্যাসের ওপর প্রকৃত নিয়ন্ত্রণ নিয়ে নেয় ইসরায়েল। চুক্তিকারী ব্রিটিশ গ্যাসও ফিলিস্তিনকে এড়িয়ে ইসরায়েলের সঙ্গে কাজ করে যাচ্ছে। ইসরায়েল পশ্চিম তীরের ভেতর মেগেদ তেল ও গ্যাসক্ষেত্রের নিয়ন্ত্রণও নিয়ে নিয়েছে। ১৯৬৭ সাল থেকে ফিলিস্তিনি যেসব অঞ্চল দখল হয়ে গেছে, তার তলদেশে এটি।

ইসরায়েল অতি সম্প্রতি নিজেদের স্বার্থে পূর্ব ভূমধ্যসাগরীয় এলাকায় তেল-গ্যাসক্ষেত্রের উন্নয়নকাজ শুরু করেছে। ফিলিস্তিনের তেল ও গ্যাস–সম্পদের ওপর অধিকার প্রতিষ্ঠা করে অনুসন্ধান চালিয়ে ইসরায়েল হেগ রেগুলেশন, ফোর্থ জেনেভা কনভেনশন ও আন্তর্জাতিক মানবিক ও মানবাধিকার আইন ভঙ্গ করছে। দখলদারি শক্তিবলে দখলের শিকার লোকজনের স্বার্থ, অধিকার ও অংশীদারত্বের তোয়াক্কা না করে যৌথ সম্পদ অনুসন্ধান এসব আইনের লঙ্ঘন।

সাম্প্রতিক সংঘর্ষের পর আন্তর্জাতিক সম্প্রদায় গাজার পুনর্গঠনে ৮৬০ মিলিয়ন ডলার সহায়তা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দেয়। এর সঙ্গে তেল ও গ্যাস থেকে প্রাপ্ত রাজস্বের ন্যায্য হিস্যা পেলে ফিলিস্তিনকে দীর্ঘমেয়াদি অর্থনৈতিক পুনর্গঠনে বিনিয়োগের জন্য টেকসই অর্থায়নের সুযোগ দেবে। আর এ বিকল্প খুঁজতে গেলেই হয়তো আরেকটি যুদ্ধ ও সহিংসতা বাধতে পারে।

টেকসই অর্থনৈতিক পুনরুদ্ধার ও রাজনৈতিক মীমাংসাকে চলতে হয় হাতে হাত ধরে। আলোচনার মধ্য দিয়ে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের সামগ্রিক শান্তি অর্জন করা সম্ভব বলে জাতিসংঘ এখনো মনে করে। জাতিসংঘ স্বাধীন, গণতান্ত্রিক, সচ্ছল, সার্বভৌম ক্ষমতা এবং টেকসই রাষ্ট্র হিসেবে ফিলিস্তিন ও ইসরায়েলের মধ্যে শান্তি ও নিরাপত্তা স্থাপনে কাজ করে যাচ্ছে। অর্থনৈতিকভাবে বেঁচে থাকার জন্য ফিলিস্তিনকে নিজেদের অর্থনীতির নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে রাখতে হবে। তেল-গ্যাসের ওপর তাদের প্রাপ্ত হিস্যার ন্যায্যতা দিতে হবে।

আল–জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনূদিত

মাহমুদ আল খাফিফ আঙ্কটাডের সমন্বয়ক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন