default-image

একাত্তরে মুক্তিযুদ্ধের প্রথম প্রহরে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে গ্রেপ্তার করে। তার আগেই তিনি স্বাধীনতা ঘোষণা করেন। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ভেবেছিল, নেতাকে গ্রেপ্তার করে কারাগারে পাঠালে বাঙালির স্বাধীনতার আকাঙ্ক্ষা স্তব্ধ করা যাবে। কিন্তু তাদের দমনপীড়ন বা অপকৌশল কাজে আসেনি। ২৫ মার্চ পাকিস্তানি বাহিনী ঢাকায় হত্যাযজ্ঞ চালালে সর্বস্তরের বাঙালি প্রতিরোধ গড়ে তোলে। ইয়াহিয়া খান ২৬ মার্চের বেতার ভাষণে দম্ভভরে বলেন, শেখ মুজিব ও তাঁর দল পাকিস্তানের শত্রু। দেশদ্রোহের দায়ে তাঁকে শাস্তি পেতে হবে। বাঙালি তাঁর এই দম্ভের জবাব দিয়েছে ৯ মাসের রক্তক্ষয়ী যুদ্ধে পাকিস্তানি বাহিনীকে পরাস্ত করে।

সেনাবাহিনী বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করে পাকিস্তানে নিয়ে গেলেও ইয়াহিয়ার সরকার প্রথমে বিষয়টি গোপন রাখে। যদিও এপ্রিলের প্রথম সপ্তাহে ভারত গোয়েন্দা সূত্রে জেনে যায় যে তাঁকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। ৩ এপ্রিল আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক তাজউদ্দীন আহমদ ভারতের প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর সঙ্গে সাক্ষাৎ করতে গেলে তিনিই তাঁকে এই তথ্য দেন। এরপর ৯ এপ্রিল ভারতের রাষ্ট্রীয় বেতার আকাশবাণী অসমর্থিত সূত্রের বরাত দিয়ে প্রচার করে, শেখ মুজিবের নেতৃত্বে বাংলাদেশের স্বাধীনতাসংগ্রাম চলছে। এই খবর প্রচারের উদ্দেশ্য ছিল বঙ্গবন্ধুর অবস্থান সম্পর্কে পাকিস্তানের কাছ থেকে স্বীকারোক্তি আদায় করা। পরদিন পাকিস্তান সরকারের নির্দেশে ডন পত্রিকা বঙ্গবন্ধুর একটি ছবি প্রকাশ করে, যাতে দেখা যায়, তিনি করাচি বিমানবন্দরে অপেক্ষা করছেন এবং তাঁর দুই পাশে দুজন সশস্ত্র প্রহরী দাঁড়িয়ে আছেন।

সামরিক জান্তা সেদিন বঙ্গবন্ধুকে গ্রেপ্তার করেই ক্ষান্ত হয়নি, তাঁর বিচারের জন্য একটি প্রহসনমূলক আদালতও গঠন করেছিল। ১১ আগস্ট বিচারকাজ শুরু হলে এর বিরুদ্ধে বিশ্বজনমত প্রবল হয়ে ওঠে। ইন্দিরা গান্ধী বঙ্গবন্ধুর জীবনের নিরাপত্তা দাবি করে বিভিন্ন দেশের রাষ্ট্র ও সরকারপ্রধানদের কাছে চিঠি লেখেন। আন্তর্জাতিকভাবে খ্যাতিসম্পন্ন লেখক-শিল্পী-বুদ্ধিজীবীরা অবিলম্বে বঙ্গবন্ধুর বিচার বন্ধ এবং মুক্তি দাবি করেন।

অন্যদিকে পাকিস্তানের জনগণ যাতে এসব প্রতিক্রিয়া জানতে না পারে, সে জন্য ইয়াহিয়া খানের সরকার পাকিস্তানের সংবাদপত্রের ওপর কঠোর সেন্সরশিপ আরোপ করে। পত্রিকাগুলোতে শুধু সরকারের দেওয়া ভাষ্যই ছাপা হতো। জুলফিকার আলী ভুট্টোর পিপলস পার্টির পাশাপাশি ডানপন্থী জামায়াতে ইসলামী ও মুসলিম লিগ ইয়াহিয়ার সব কাজে সমর্থন জানাতে থাকে।

কিন্তু পাকিস্তানের লেখক-বুদ্ধিজীবীদের একাংশ, যাঁরা বামপন্থী নামে পরিচিত, তাঁরা সরকারের দমনপীড়নের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ জানান। ঘরোয়া পরিবেশে সভাসমাবেশ করেন। বামপন্থীরা এ রকম একটি সমাবেশ করতে গিয়ে পিপলস পার্টির কর্মীদের হামলার শিকার হয়েছিলেন।

১৯৭১ সালের ৪ নভেম্বর। পাকিস্তানের ৪২ জন বিশিষ্ট নাগরিক আওয়ামী লীগ নেতা শেখ মুজিবুর রহমানকে অবিলম্বে মুক্তি দেওয়া এবং ডিসেম্বরে নির্বাচনে নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের হাতে ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি জানিয়ে একটি বিবৃতি দেন। বিবৃতিদাতাদের মধ্যে ছিলেন লেনিন পুরস্কারজয়ী কবি ফয়েজ আহমেদ ফয়েজ, বামপন্থী শ্রমিকনেতা মির্জা মোহাম্মদ ইব্রাহিম, পাকিস্তান টাইমস–এর সাবেক সম্পাদক মজহার আলী খান, পাকিস্তান ট্রেড ইউনিয়ন ফেডারেশন নেতা চৌধুরী আসলাম, পাকিস্তান বিমানবাহিনীর সাবেক প্রধান ও ইশতেকলাল পার্টির প্রধান এয়ার মার্শাল (অব) আসগর খান, নারীনেত্রী তাহেরা মজহার আলী খান, নাসিম আখতার মালিক, হামিদ আখতার, সাংবাদিক আই এ রহমান, আবদুল্লাহ মালিক, কবি হাবিব জালিব, আমিন মোঘল, মাওলানা আশফাক, ন্যাপ নেতা জাফর মালিক, ইমতিয়াজ শাহ প্রমুখ। বিবৃতিটি লাহোরের একটি পত্রিকায় ছাপা হওয়ার পর সেটি আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমেও ছড়িয়ে পড়ে। সে সময় মুজিবনগর থেকে প্রকাশিত সাপ্তাহিক বাংলার বাণী ৯ নভেম্বরের সংখ্যায় এটি পুনর্মুদ্রিত হয়। (সূত্র: বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধ: দলিলপত্র: দশম খণ্ড)

পাকিস্তানি লেখক-বুদ্ধিজীবীদের এই বিবৃতির পেছনেও পটভূমি ছিল। বিবৃতিদাতাদের অনেকের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর ব্যক্তিগত পরিচয় ছিল। মার্চে অসহযোগ আন্দোলনকালে তঁাদের কেউ কেউ ঢাকায় এসে বঙ্গবন্ধুর সঙ্গে সাক্ষাৎও করেছিলেন। লাহোর তখন প্রগতিশীল লেখক-বুদ্ধিজীবীদের কেন্দ্র। আবার বাঙালিবিরোধী মনোভাবও তুঙ্গে। তাই বামপন্থীদের কাজ করতে হয়েছে খুব সতর্কতার সঙ্গে। সিন্ধুর মতো পাঞ্জাবেও ভুট্টোর পিপলস পার্টি সংখ্যাগরিষ্ঠতা লাভ করে। নভেম্বরের শুরুতে বামপন্থীরা জানতে পারেন, ইয়াহিয়া খান লাহোরে আসছেন। তাঁরা ভাবলেন, এটাই সুযোগ। লাহোরে অবস্থানরত লেখক-বুদ্ধিজীবীরা ইয়াহিয়া খানের উদ্দেশে একটি বিবৃতি তৈরি করেন।

ওই বিবৃতিতে স্বাক্ষরদাতাদের একজন নাসিম আখতার মালিক কয়েক বছর আগে ঢাকায় এলে তাঁর সঙ্গে ওই বিবৃতি এবং একাত্তরে বামপন্থীদের কার্যক্রম নিয়ে কথা হয়। ৪২ বিশিষ্ট নাগরিকের বিবৃতির পটভূমি ব্যাখ্যা করতে গিয়ে তিনি বলেছিলেন, সে সময় ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টির অনেক নেতা-কর্মীকে জেলে পাঠানো হয়েছিল। তারপরও দলের নেতারা ঘরোয়া বৈঠকে বসতেন, সরকারের অন্যায় আচরণের প্রতিবাদ জানাতেন। দলের কিছু তরুণ ‘পূর্ব পাকিস্তানে (বাংলাদেশে) অত্যাচার-নির্যাতন বন্ধ করো, শেখ মুজিবকে মুক্তি দাও’ সংবলিত প্রচারপত্র বিলি করতে গিয়ে ধরা পড়ে। মাওলানা আশফাক বুদ্ধিজীবীদের নিয়ে ‘আওয়ামী ফিকরি মাহাজ’ নামে একটি দল গঠন করেছিলেন। সাংবাদিক আবদুল্লাহ মালিক ছাত্রদের এক সমাবেশে বক্তৃতা দিয়েছিলেন, যে জন্য সামরিক আদালত তাঁকে জেলে দেন। হাবিব জালিদ লিখেছিলেন, ‘সবুজ দেখার জন্য আমার চোখ উন্মীলিত কিন্তু বাগানে বইছে রক্তের ধারা।’

নাসিম আখতারের ভাষ্য, ‘আমরা লাহোরে গিয়ে এখানকার পরিস্থিতি নিয়ে রাজনৈতিক সতীর্থ ও বন্ধুদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। কিন্তু খুব বেশি সাড়া পাইনি। পাকিস্তানের মানুষ এখানকার ঘটনা সম্পর্কে কিছু জানত না। বাঙালিদের সম্পর্কে নানা প্রচারণা চালিয়ে ভুট্টো ও তাঁর পার্টির কর্মীরা জনগণকে বিভ্রান্ত করেছেন। তারপরেও আমরা ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে আলোচনা করেছি। বলেছি, সামরিক অভিযানে সমস্যার সমাধান হবে না। বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবের মুক্তি দিতে হবে।

বাংলাদেশের স্বাধীনতা প্রশ্নে পাকিস্তান ন্যাশনাল আওয়ামী পার্টি বিভক্ত হয়ে পড়ে। ওয়ালি খান ইয়াহিয়া খানের বিরুদ্ধে অবস্থান নেওয়ার বিরোধী ছিলেন। আবার গাউস বক্স বিজেঞ্জো ও আতাউল্লাহ খান মেঙ্গল প্রমুখ দ্বিধাদ্বন্দ্বে ছিলেন। কিন্তু আজমল ঘটক মনে করতেন, ভুট্টোর সঙ্গে কোনো আপস হতে পারে না।

১৬ ডিসেম্বর পাকিস্তান সেনাবাহিনী ঢাকায় বাংলাদেশ ও ভারতের যৌথ বাহিনীর কাছে নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ করলে পাকিস্তানের ক্ষমতাকাঠামোয় দ্রুত পরিবর্তন ঘটে। ১৮ ডিসেম্বর ইয়াহিয়া খানকে সরিয়ে ভুট্টো প্রধান সামরিক আইন প্রশাসক ও প্রেসিডেন্টের দায়িত্ব নেন। সেনাবাহিনীর একাংশ ভুট্টোর সঙ্গে হাত মেলায়। তখনো বঙ্গবন্ধু পাকিস্তানের কারাগারে। পাকিস্তানের যেসব বামপন্থী কর্মী সামরিক আইনের বিরোধিতা করেছিলেন, তাঁরাও কারাগারে।

শেখ মুজিবুর রহমান যেদিন পাকিস্তানের জেলখানা থেকে ছাড়া পেলেন, সেদিনের অনুভূতির কথা জানিয়ে নাসিম আখতার মালিক বলেন, ‘বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ায় আমরা খুশি হয়েছিলাম । এরপর শেখ মুজিব মুক্তি পাওয়ায় একটি অধ্যায়ের অবসান হলো। একাত্তরে সামরিক শাসনের বিরুদ্ধে কথা বলায় আমাদের দলের যেসব কর্মী আটক হয়েছিলেন, তাঁদের সঙ্গে দেখা করতে জেলখানায় যেতাম। খাবার দিতাম। মনে পড়ে, যেদিন শেখ মুজিব মুক্তি পান, সেদিন জেলখানায় গিয়ে তাঁদের খবরটি দিলে তাঁরা “জয় বাংলা” বলে আনন্দ প্রকাশ করেন। আমিও তাঁদের সঙ্গে কণ্ঠ মিলিয়ে বললাম, “জয় বাংলা”।’ ভুট্টো ক্ষমতায় আসার পর তাঁদের ছেড়ে দেওয়া হলো। কিন্তু তাঁদের ওপর সরকারের হয়রানি-নজরদারি চলতে পারে, যে কারণে বামপন্থী অনেক তরুণ দেশ ছেড়ে বিদেশে চলে যান।

একাধিক সূত্রমতে, ইয়াহিয়া খানের গোপন সামরিক আদালত রাষ্ট্রদ্রোহের দায়ে বঙ্গবন্ধুকে মৃত্যুদণ্ড দিয়েছিলেন। কিন্তু সেই রায় কার্যকর করার আগেই তিনি ক্ষমতাচ্যুত হন। খণ্ডিত পাকিস্তানের নতুন কর্ণধার ভুট্টো বঙ্গবন্ধুকে মুক্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। তবে এই মুক্তির পেছনে যেমন আন্তর্জাতিক চাপ ছিল, তেমনি ছিল রাজনৈতিক হিসাব–নিকাশ।

বাংলাদেশে আটক পাকিস্তানিদের ফেরত আনা তাঁর কাছে জরুরি ছিল। আর বাঙালির বিজয়ী নেতা শেখ মুজিবকে নিঃশর্ত মুক্তি না দিলে যে সেটি কোনোভাবে সম্ভব নয়, অতিচালাক ভুট্টোর সে কথাটিও অজানা ছিল না।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য করুন