default-image

স্বামী–সন্তান নিয়ে হাতিজা মেহমেদোভিচের সুখের সংসার ছিল। স্বামী আবদুল্লাহ স্রেবেনিচার সংস্কৃতিকেন্দ্রে ইলেকট্রিশিয়ানের কাজ করতেন। তাঁদের ছিল দুই ছেলে: আজমির আর আলমির।

১৯৯৫ সালের ১১-১২ জুলাই জেনারেল রাতকো ম্লাদিচের বসনিয়ান সার্ব সেনাবাহিনী যে ৮ হাজারের বেশি বসনীয় মুসলমান পুরুষ ও কিশোরকে ঠান্ডা মাথায় হত্যা করে, আবদুল্লাহ আর তাঁর ছেলেরা তাদের অন্তর্গত। জার্মান নাৎসিরা যেমন ইওরোপীয় ইহুদিদের ঘৃণা করত, সার্ব উগ্র জাতীয়তাবাদীরাও ঘৃণা করত ইউরোপীয় মুসলমানদের। শ্রেষ্ঠত্ববাদী রাজনীতির এই পৃথিবীতে ঘৃণাই অনেকের অক্সিজেন, আর অনেকের জন্য তা বিষ।

ঘটনাটি ঘটেছিল স্রেবেনিচায়। হত্যাযজ্ঞের দুবছর আগে জাতিসংঘ স্রেবেনিচাকে নিরাপদ অঞ্চল ঘোষণা করেছিল এবং গণহত্যাটি ঘটেছিল জাতিসংঘের ডাচ রক্ষীদের চোখের সামনে। তারা কিছুই করেনি, তাকিয়ে তাকিয়ে দেখেছে।

হাতিজা তাঁর ছোট ছেলে আলমিরকে আদর করে লালো ডাকতেন—জানি না বসনীয় ভাষায় লালো শব্দের মানে কী। খুনিরা যখন তাদের কাছে আসছিল, লালো তখন তার মাকে শক্ত করে ধরে রেখেছিল, কিন্তু মুখে সে তাকে চলে যেতে বলছিল। হাতিজাকে একটা বাসে তুলে অন্য একটা শহরে পাঠিয়ে দেওয়া হয়, তিনি পরে রেডক্রসকে জানান তাঁর স্বামী–সন্তান নিখোঁজ।

পরে জানতে পারেন তাঁদের খুন করা হয়েছে। যুদ্ধের পরে কিছুদিন সারায়েভোর একটা শহরতলিতে ছিলেন। ২০০২ সালে হাহতিহজা গঠন করেন মাদারস অব স্রেবেনিচা। শুরু হয় ন্যায়বিচার নিশ্চিত করতে মায়েদের লড়াই। এক সুদীর্ঘ সংগ্রাম।

২০০৭ সালে সন্তান হারানো মায়েদের এই সংগঠন স্রেবেনিচার সিভিলিয়ানদের জীবন বাঁচাতে ব্যর্থ হওয়ায় জাতিসংঘ ও ডাচ সরকারের বিরুদ্ধে একটা দেওয়ানি মামলা ঠুকে দেয়।

২০১২ সালে জাতিসংঘের বিচারিক আওতার বাইরে থেকে গেলেও ডাচ সরকারকে ৩০০ জনের মৃত্যুর জন্য দায়ী করে রায় আসে।

২০১৭ সালের নভেম্বরে দ্য হেগ-এর ইন্টারন্যাশনাল ক্রিমিনাল ট্রাইব্যুনাল ফর দ্য ফর্মার যুগোস্লাভিয়া (আইসিটিওয়াই) বসনিয়ার কসাই জেনারেল রাতকো ম্লাদিচকে গণহত্যা, মানবতাবিরোধী অপরাধ ও যুদ্ধাপরাধের দায়ে যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেয়। হাতিজা স্বামী–সন্তানের খুনির বিচার দেখে যেতে পেরেছিলেন। ২০১৮ সালের ২২ জুলাই সারায়েভোর এক হাসপাতালে ৬৫ বছর বয়সী এই মানুষটি মৃত্যুবরণ করেন।

তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সার্বিয়ার উগ্র ডানপন্থী রাজনীতিবিদ ও সার্বিয়ান রেডিক্যাল পার্টির সদস্য জেরিচা রাদেতা একটা টুইট করেন। রাদেতার সেই পরবর্তী সময়ে সরিয়ে নেওয়া টুইটে হাতিজা মেহমেদেভিচকে স্রেবেনিচার ব্যবসায়ী নারী বলে তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা হয়। সঙ্গে বলা হয়, আমি ভাবছি ওকে কবর কে দেবে, ওর স্বামী না সন্তানেরা।

পৃথিবীতে হাতিহজারা যেমন আছে, রাদেতারাও তেমন আছে। সম্ভবত সব সময়ই থাকবে। হাতিজারা ন্যায়বিচারের জন্য লড়বে, রাদেতারা শ্রেষ্ঠত্ববাদের জন্য।তাই লড়াই করাটাই আসলে মূল কথা নয়, মূল কথা হচ্ছে, আপনি আসলে ঠিক কী কারণে লড়াই করছেন।

এই জুলাইয়ে স্রেবেনিচা গণহত্যার ২৫ বছর হলো।

বহু জাতি, ধর্ম ও ভাষা আছে পৃথিবীতে। কিন্তু চামড়ার নিচে আমাদের সবার রক্তই লাল। পরিচয় যেন আমাদের অন্ধ করে না ফেলে। শ্রেষ্ঠত্ববাদের মোহ আমাদের যেন আচ্ছন্ন করে না ফেলে। আমরা যেন কোনো কারণেই বিবেচনাবোধ না হারাই। আমরা যেন মানুষকে পরিচয়–নির্বিশেষে ভালোবাসতে পারি।

ইরফানুর রহমান: অনুবাদক, লেখক ও গবেষক।

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0