default-image

স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী এবং জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবার্ষিকীতে বাংলাদেশের জনগণকে অভিনন্দন জানানোর সেরা উপায় কী? স্বাধীনতা অর্জন এবং একটি নতুন জাতি গঠনের গুরুত্ব, অনিশ্চয়তা ও তাৎপর্যকে আমি আমার লেখায় ধরতে পারছি না। তাই আরেক প্রসিদ্ধ বাকপটু আমেরিকান, প্রয়াত সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডির কথা ধার করব। তার আগে গত পাঁচ দশকে আমাদের এই দুই মহান দেশের জনগণের মধ্যে গড়ে ওঠা কিছু অপরিমেয় বন্ধনের বিষয়ে আলোকপাত করতে চাই।

কোভিড মোকাবিলায় ৭৩ মিলিয়ন ডলারসহ বাংলাদেশকে এ পর্যন্ত আট বিলিয়ন ডলারের বেশি অর্থসহায়তা দিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। এই অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব প্রতিবছরই বাড়ছে। ২০১৯ সালে আমাদের দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্যের পরিমাণ রেকর্ড ৯ বিলিয়ন ডলার ছাড়িয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশি পণ্যের একক আমদানিকারক দেশ হিসেবে বৃহত্তম। বাংলাদেশে সরাসরি বৈদেশিক বিনিয়োগেরও সর্ববৃহৎ উৎস যুক্তরাষ্ট্র। আমেরিকা ও বাংলাদেশের জনগণকে আরও ব্যাপক অর্থনৈতিক সমৃদ্ধি অর্জনে অনুপ্রাণিত করতে আগামী মাসে আমরা একসঙ্গে যুক্তরাষ্ট্র-বাংলাদেশ বিজনেস কাউন্সিল উদ্বোধন করব।

বিজ্ঞাপন

রোহিঙ্গা শরণার্থীদের জন্য মানবিক সহায়তা প্রদানে আন্তর্জাতিক দাতা দেশ হিসেবেও শীর্ষে আছে যুক্তরাষ্ট্র। যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসের অন্যতম প্রধান অগ্রাধিকার হলো এই সংকটের একটি টেকসই সমাধান খুঁজে বের করতে বাংলাদেশের সঙ্গে কাজ করা। জলবায়ু পরিবর্তন, শান্তিরক্ষা, আঞ্চলিক নিরাপত্তা, শিক্ষা ও সাংস্কৃতিক বিনিময়সহ আরও বহু ক্ষেত্রে আমরা একসঙ্গে কাজ করি।

১৯৭২ সালের ১৪ ফেব্রুয়ারি সিনেটর এডওয়ার্ড কেনেডি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে হাজারো উল্লসিত শিক্ষার্থীর সামনে যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের মধ্যকার মিল তুলে ধরে বক্তব্য দিয়েছিলেন। যারা ভবিষ্যদ্বাণী করেছিল যে স্বাধীনতার পর আমেরিকার ধস নামবে এবং বাংলাদেশের পরিণতিও একই হবে, তাদের বিষয়েও বলেছিলেন তিনি। স্বাধীনতাকামী ছাত্রনেতারা বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের যে গাছের নিচে মিলিত হয়েছিলেন, পাকিস্তানি নিরাপত্তা বাহিনী বিখ্যাত সেই গাছটি ধ্বংস করে, সেই স্থানেই নতুন একটি বটগাছ রোপণে সহায়তা করেন সিনেটর। সেই গাছটি আজ মহিরুহ হয়ে বাংলাদেশের অদম্য চেতনা এবং আমাদের মহান দুই দেশের মধ্যকার দীর্ঘস্থায়ী বন্ধুত্ব ও সদা বর্ধমান অংশীদারত্বের জীবন্ত প্রতীকে পরিণত হয়েছে।

বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের গল্প আগামী প্রজন্মের কাছে শিক্ষণীয় হয়ে থাকবে। বাঙালি জাতির এই আত্মপ্রকাশ অন্যান্য ভূখণ্ডের মানুষের জন্য প্রেরণা হয়ে থাকবে। এখনো যারা আপনাদের মতো স্বাধীনতা পায়নি, তাদের সবার জন্য এটি একটি প্রতীক হয়ে থাকবে।

‘যুক্তরাষ্ট্র ও বাংলাদেশের মধ্যে বহু মিল। আমাদের শুরুটাও আপনাদের চেয়ে অনুকূল কিছু ছিল না। আপনাদের এখানে যেমন ছিল, তেমনি এক শক্তিশালী ও প্রতিষ্ঠিত সরকার আমাদের স্বাধীনতাকেও দমিয়ে রাখতে বদ্ধপরিকর ছিল। আপনাদের মতোই যখন নতুন আমেরিকান জাতি আত্মপ্রকাশ করে, তখন একদল বলতে শুরু করে, এ রকম দুর্বল ও দরিদ্র একটি দেশ আধুনিক বিশ্বে টিকতে পারবে না।

‘সবকিছুতেই আমরা দরিদ্র ছিলাম, তবে আশা ও সাহসিকতায় ছিলাম শক্তিশালী। আমাদের সম্পত্তি ছিল না, তবে দেশকে শক্তিশালী করে তোলার জন্য আমাদের ছিল উদ্যমী ও অঙ্গীকারবদ্ধ জনগণ। আর ছিল মানুষকে তাদের ভবিষ্যৎ গড়ে তুলতে সহায়তা দেওয়ার মতো দূরদৃষ্টিসম্পন্ন নেতারা।

‘আমেরিকার বিপ্লব ১৭৭৬ সালে শেষ হয়নি। ওয়াশিংটন ও জেফারসনেই এর মৃত্যু ঘটেনি। সব নাগরিকের জন্য স্বাধীনতা ও সমতা প্রতিষ্ঠার চেষ্টার মধ্যে সেই চেতনা আজও বেঁচে আছে। অন্যান্য দেশের নিপীড়িত মানুষের মধ্যে আশা জাগানোর মধ্যেও আমাদের সেই চেতনা বহমান। সে কারণেই বাংলাদেশের মানুষের সংগ্রাম আমেরিকার বিবেককে এত গভীরভাবে স্পর্শ করেছে।

বিজ্ঞাপন

‘বিগত কয়েক মাসে আমেরিকার জনগণ আপনাদের পক্ষে থাকলেও আমাদের সরকার আপনাদের পক্ষে ছিল না। এখন চেতনাগতভাবেই আমরা আপনাদের সঙ্গে আছি এবং আমেরিকার নেতারাও আর পেছনে পড়ে থাকবেন না।

‘আমেরিকার প্রকৃত পররাষ্ট্রনীতি হলো বিভিন্ন দেশের সঙ্গে ভ্রাতৃত্বের বন্ধন গড়ে তোলা, কোনো স্বৈরতন্ত্রের পক্ষে এটা প্রতিহত করা সম্ভব নয়। এক অর্থে আমরা সবাই বাঙালি, আবার আমরা সবাই আমেরিকান, আমরা সবাই মানবতার মহান মৈত্রীর অংশ। কাজের জন্য স্বাধীনতা ও আত্মপরিচয় যে সবচেয়ে বড় শক্তি, এতে যারা এখনো সন্দেহ পোষণ করে, তারা যেন বাংলাদেশে এসে দেখে যায়।

‘আপনাদের জাতির পিতা শেখ মুজিবুর রহমানের কাছ থেকে আমি শিখতে এসেছি। শরণার্থীশিবিরগুলোতে যাঁরা বহু কষ্ট সহ্য করেছেন, তাঁদের সঙ্গে আমি আবার কথা বলতে এসেছি। আমি জানতে চাই, যাঁরা বেঁচে আছেন এবং স্বাধীনতা সুরক্ষার জন্য বহু ত্যাগ স্বীকার করেছেন, তাঁদের যন্ত্রণা লাঘবে আমার দেশবাসী ও আমি কী করতে পারি।

‘যে শব্দমালা আপনাদের এই গভীর ক্ষত সারিয়ে তুলতে এবং আপনাদের মধ্যে যাঁরা বিচ্ছিন্ন হয়ে আছেন, তাঁদের আপনজনদের সঙ্গে মিলিত হতে সহায়তা করতে পারে, এক শতাব্দী আগে আমাদের মহান গৃহযুদ্ধের শেষ প্রান্তে এসে সেটা বলেছিলেন আব্রাহাম লিংকন।

‘প্রেসিডেন্ট লিংকন বলেন, “কারও প্রতি বিদ্বেষ নয়, সবার জন্য সহায়তার মনোভাব নিয়ে আমরা সত্যের প্রতি অবিচল থাকব, কেননা ঈশ্বর আমাদের সত্য প্রত্যক্ষ করার শক্তি দিয়েছেন। আমরা যে কাজের মধ্যে আছি, সেটা শেষ করার জন্য আমাদের প্রচেষ্টা নিতে হবে, জাতির ক্ষতগুলো সারিয়ে তুলতে হবে। যারা যুদ্ধের ভার বহন করেছে তাদের, কিংবা বিধবা হওয়া স্ত্রী এবং এতিম হওয়া সন্তানদের যত্ন নিতে হবে। আমাদের নিজেদের ও আমাদের সকল জাতির মধ্যে আকাঙ্ক্ষিত দীর্ঘস্থায়ী শান্তি প্রতিষ্ঠায় আমাদের সম্ভাব্য সবকিছু করতে হবে।”

‘আমেরিকার সর্বোত্তম চেতনা থেকে এবং আমাদের সংবিধান ও আমাদের স্বাধীনতার ঘোষণার চেতনা থেকে আমি আপনাদের মহান স্বাধীনতার প্রতি অভিবাদন জানাই এবং বাংলাদেশের বিজয় উদ্‌যাপন করে বলতে চাই—জয় বাংলা!’

ঢাকায় যুক্তরাষ্ট্র দূতাবাসে কর্মরত আমেরিকান ও বাংলাদেশিদের পক্ষ থেকে আমি বলব, বাংলাদেশের অভ্যুদয়ের ৫০তম বার্ষিকীতে শুভেচ্ছা! আপনাদের সঙ্গে দিনটি উদ্‌যাপন করে আমরা আনন্দিত। আমরা বাংলাদেশ নিয়ে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের স্বপ্নকে শ্রদ্ধা এবং এ দেশের জনগণের অসামান্য অগ্রযাত্রাকে অভিবাদন জানাই। বাংলাদেশের সকল ত্যাগ ও প্রতিষ্ঠাকালীন গণতান্ত্রিক মূলনীতির প্রতি সম্মান জানিয়ে এ দেশের জনগণের উজ্জ্বল ও সমৃদ্ধ ভবিষ্যৎ কামনায় আমাদের সর্বোত্তম শুভেচ্ছা জানাই।

আমার প্রিয় কবিতা ‘নাই বুঝি পথ’-এ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর যেমন লিখেছেন,

পুরাতন ভাষা মরে এল যবে মুখে,

নবগান হয়ে গুমরি উঠিল বুকে,

পুরাতন পথ শেষ হয়ে গেল যেথা

সেথায় আমারে আনিলে নূতন দেশে।

তেমনি আগামী ৫০ বছর বা আরও পরে প্রতিদিন এভাবেই আমাদের আশাবাদ জেগে উঠুক এবং সেই নতুন দেশ নতুন নতুন বিস্ময় নিয়ে আমাদের কাছে ধরা দিক।

আর্ল আর মিলার: বাংলাদেশে যুক্তরাষ্ট্রের রাষ্ট্রদূত

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন