২০০৮ সালে অর্থনৈতিক মন্দায় পড়ে যুক্তরাষ্ট্র। বিলিয়ন বিলিয়ন ডলার ছাপিয়ে অর্থনীতি সচল করার চেষ্টা করে যুক্তরাষ্ট্র। বাইরে থেকে অনেকে যুক্তরাষ্ট্রের অর্থনৈতিক শক্তি ও স্থিতিশীলতা নিয়ে যে ধারণা পোষণ করেন, প্রকৃত অবস্থাটা সে রকম নয়। আবার বাইডেন প্রশাসন একতরফাভাবে আফগানিস্তান ও রাশিয়ার বৈদেশিক মুদ্রার তহবিল আটকে দিয়েছে। এতে করে জিম্মাদার হিসেবে তাদের বিশ্বস্ততা বড় প্রশ্নের মুখে পড়েছে। বাকি বিশ্বের কাছে যুক্তরাষ্ট্র সরকারের বিশ্বাসযোগ্যতা ও আস্থার সংকট তৈরি হওয়ায় অনেক ধরনের মানে রয়েছে।

আফগানিস্তানে বিশ বছরের যুদ্ধ এবং বাজে ধরনের পরাজয়ের পর যুক্তরাষ্ট্রের সেই রসদ ফুরিয়ে এসেছে। চাবুকটাও এখন কুঁচকে গেছে, সেটা এখন আর ততটা ভয় দেখাতে পারে না। সে কারণেই ইউক্রেনে সেনা না পাঠিয়ে শুধু সমরাস্ত্র পাঠিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। সরাসরি যুদ্ধে যুক্ত না হয়ে আমেরিকা সেখানে শুধু প্রক্সি যুদ্ধ চালিয়ে যেতে চায়।

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে যুদ্ধে নামিয়ে দিতে সফল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিয়েভকে আরও ৪০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের জোগান দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যাতে করে লড়াইটা আরও রক্তক্ষয়ী হয়। হোয়াইট হাউস এখন ভাবতে শুরু করেছে, তারা তাইওয়ানে একই রকম ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারবে।

বিশ্বনেতৃত্বের আগের সেই অবস্থান থেকে যুক্তরাষ্ট্রের যে ক্ষয় হয়েছে, সেটা এখন বাইডেন প্রশাসন ভুলে গেছে। তারা এখন বিশ্বের সব প্রান্তে যাচ্ছে, দেশগুলোর কাছে আমেরিকার ভূরাজনৈতিক অবস্থানের বিচারে পক্ষ ও মিত্র বেছে নেওয়ার চাপ দিচ্ছে। যুক্তরাষ্ট্র চীনকে নিজেদের ভবিষ্যতের জন্য প্রধান প্রতিদ্বন্দ্বী বলে মনে করছে। যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র বা হবু মিত্র হওয়ার শর্ত হচ্ছে, তাদেরও চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

যুক্তরাষ্ট্র এসব দেশকে একটা উভয় সংকটের মুখে ফেলে দিয়েছে। কেননা, চীনকে প্রতিদ্বন্দ্বী ভাবা তাদের জাতীয় স্বার্থের পরিপন্থী। চীন এসব দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বাণিজ্য সহযোগী ও প্রধান বিনিয়োগকারী। বেল্ট অ্যান্ড রোডস প্রকল্পের আওতায় তাদের অবকাঠামো তৈরির প্রধান সহায়ক এখন চীন।

যুক্তরাষ্ট্র তাদের আধিপত্য খুইয়ে ফেলুক, এমন কোনো কিছু করার আগ্রহ নেই চীনের। কোনো দেশকেই নিজেদের পক্ষে আসার চাপ দেয়নি চীন, সে প্রত্যাশাও তাদের নেই। চীনের সঙ্গে বন্ধুত্বের কারণে যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বন্ধুত্ব করা যাবে না, এমন কোনো শর্তও কাউকে দেয়নি চীন। বেইজিংয়ের পররাষ্ট্র কূটনীতি এমন যে কোনো দেশের পক্ষে একই সঙ্গে চীন ও যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা সহজ। অন্যদিকে মার্কিন জোটের সহযোগী দেশ হতে গেলে বেইজিংয়ের সঙ্গে সম্পর্ক পুরোপুরি বিচ্ছিন্ন করার অঙ্গীকার করতে হবে।

এ মাসে লস অ্যাঞ্জেলেসে অনুষ্ঠিত হতে যাওয়া ‘আমেরিকান সম্মেলন’-এ যুক্তরাষ্ট্রের এই দৃষ্টিভঙ্গির প্রতিফলন ঘটছে। মেক্সিকোসহ লাতিন আমেরিকার অনেক দেশই এ কারণে এ সম্মেলনে যোগ দেবে না। আমেরিকা নিজেদের কোন জায়গায় নিয়ে এসেছে যে তাদের আয়োজিত সম্মেলনে আমন্ত্রিতরা না যাওয়ার সিদ্ধান্ত নিচ্ছে!

দুই.
রাশিয়ার আইনসভার (ডুমা) স্পিকার ভ্যাচেস্লাভ ভলোদিন সম্প্রতি বিশ্বের উন্নত অর্থনীতির প্রতিনিধিত্বকারী জি-৭ সম্পর্কে বলেছেন, ‘একসময় বিশ্বের নেতৃত্বদায়ী অর্থনৈতিক শক্তির দেশ বলে বিবেচিত হওয়া জি-৭ রাশিয়ার বিরুদ্ধে আরোপ করা নিষেধাজ্ঞার ভারে ফাটলের মুখে।’ অন্য দেশগুলো নিশ্চিতভাবেই যুক্তরাষ্ট্রের চাপের মুখে নিজেদের অর্থনৈতিক স্বার্থ বিসর্জন দিতে বাধ্য হচ্ছে। জি-৭–এর বিপরীতে ভলোদিন উদীয়মান দেশগুলোকে নিয়ে ‘নতুন জি-৮’ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিয়েছেন। এর সদস্যদেশ হিসেবে রাশিয়া, চীন, ভারত, ইন্দোনেশিয়া, ব্রাজিল, মেক্সিকো, ইরান ও তুরস্কের নাম প্রস্তাব করেছেন তিনি।

এর কারণ হচ্ছে, এসব দেশের সম্মিলিত জিডিপি বিশ্বের মোট জিডিপির ২৪ দশমিক ৪ শতাংশ, জি-৭–এর জিডিপি এর চেয়ে কম। উপরন্তু, সম্ভাব্য জি-৮–এর অন্তর্ভুক্ত দেশগুলোর জনসংখ্যা বিশ্বের মোট জনসংখ্যার অর্ধেকের বেশি। ফলে এটি (জি-৮) বিশ্বের সবচেয়ে বড় অংশের মানুষের স্বার্থ ও মতামতের প্রতিফলন ঘটায়। কূটাভাষ হচ্ছে, যে রাশিয়া ২০১৪ সালে জি-৭ থেকে বেরিয়ে এসেছিল, সেই রাশিয়াই আবার জি-৮ গড়ে তোলার প্রস্তাব দিচ্ছে। এক মেরুর বিশ্বে নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব ধরে রাখতে যুক্তরাষ্ট্রের যে গোয়াতুর্মি, তার অনিবার্য ফলাফল হিসেবে আসছে জি-৮। এক মেরুর বিশ্ব এখন স্টার-ট্রেকের মতোই এক কল্পবিজ্ঞান।

default-image

রাশিয়ার বিরুদ্ধে ইউক্রেনকে যুদ্ধে নামিয়ে দিতে সফল হয়েছে যুক্তরাষ্ট্র। কিয়েভকে আরও ৪০ বিলিয়ন ডলারের অস্ত্রের জোগান দিতে চায় যুক্তরাষ্ট্র, যাতে করে লড়াইটা আরও রক্তক্ষয়ী হয়। হোয়াইট হাউস এখন ভাবতে শুরু করেছে, তারা তাইওয়ানে একই রকম ঘটনা ঘটিয়ে ফেলতে পারবে।

চীনকে যুদ্ধে প্ররোচিত করতে হলে তাইওয়ান সরকারকে স্বাধীনতার ঘোষণা দিতে হবে। ওয়াশিংটন তাইপের শাসক দল ডেমোক্রেটিক প্রগেসিভ পার্টিকে নিষেধরেখা পেরোনোর সাহস জোগাচ্ছে। দলটির নেতাদের বোঝানোর চেষ্টা চলছে, তাইওয়ানের পক্ষে যুদ্ধ করতে প্রস্তুত যুক্তরাষ্ট্র। কিন্তু তাইওয়ানের সংখ্যাগরিষ্ঠ মানুষ যুক্তরাষ্ট্রের এই নিশ্চয়তায় আস্থা পান না। চীনের সঙ্গে প্রক্সি যুদ্ধে তাইওয়ান জিততে পারবে, এমনটাও তারা বিশ্বাস করেন না। নিজ জনগণের ওপর চীন সত্যি সত্যি হামলা চালাতে পারে, এমন ধারণাও তাইওয়ানের বাসিন্দাদের কাছে অকল্পনীয়।

এরই মধ্যে বেইজিং জাতিসংঘের সমুদ্র আইনবিষয়ক সনদের (ইউএনসিএলওএস) শরণাপন্ন হচ্ছে। তারা ঘোষণা দিয়েছে, তাইওয়ান প্রণালির জলসীমা চীনের মূল ভূমির জলসীমা থেকে আলাদা নয়। এখন থেকে চীনের মূল ভূমি ও তাইওয়ানের মধ্যে যদি অন্য কোনো দেশের পতাকাবাহী জলযান নোঙর করে এবং চীনের সার্বভৌমত্বের ওপর হুমকি তৈরি করে, তাহলে কোনো সতর্কতা ছাড়াই সেটি চীনের আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু হিসেবে বিবেচিত হবে।

চীন ইউএনসিএলওএসরর স্বাক্ষরকারী দেশ কিন্তু যুক্তরাষ্ট্র এতে সই করেনি। আন্তর্জাতিক আইনের মাধ্যমেই এই নিষেধারেখা টানছে বেইজিং।

এশিয়া টাইমস থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে অনুবাদ মনোজ দে
জর্জ কো ইন্টারন্যাশনাল স্ট্র্যাটেজিক অ্যালায়েন্সের প্রতিষ্ঠাতা ও সাবেক মহাব্যবস্থাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন