বাঘ-ভাল্লুক নেই, পথঘাটে তবু কেন এত ভয়?

এই দেশের পথেঘাটে কোথাও হায়েনা নেই, বাঘ-ভাল্লুক নেই, মানুষখেকো দৈত্য-দানো নেই। তবু আতঙ্কের জপমালা হাতে নিয়ে নিশুতি রাত কি রৌদ্রোজ্জ্বল দিন, পথে বের হতে হয় নারীর। যেন কাছেধারেই ওত পেতে আছে নখর, এক্ষুনি ছিন্নভিন্ন করে ফেলবে শরীর, এক টানে ছিঁড়ে আনবে হৃদ্যন্ত্র, ব্লেডের পোঁচ দেবে পরনের কাপড়ে, হাতে ছুঁয়ে দেবে লজ্জা, দৃষ্টির মাপজোকে মুষড়ে ফেলবে অস্তিত্বকে, আঁধারে আজীবনের দুঃস্বপ্ন এঁকে দেবে চোখে। এই দুঃসহ অভিজ্ঞতার কথা আমরা সংবাদপত্রে পড়ছি। আমরা জেনে গেছি যৌন সহিংসতায় ঢাকা বিশ্বের মধ্যে চতুর্থ শীর্ষে।
পরিবার থেকে রাষ্ট্র, রাষ্ট্র থেকে সীমান্তের ওপার, ওপার থেকে আকাশ প্রলম্বিত অদৃশ্য হাত। হাতে লেগে থাকে অভব্যতার চিহ্ন। নারী টের পায় কাছে এলেই সেই চিহ্ন প্রকট হবে। কখনো টেরও পায় না চিহ্ন আছে কি না, যে ছুঁল তার হাতে চিহ্ন থাকে কি না তাও জানা নেই। কিন্তু খুনির হাতে যেমন আপাত অদৃশ্য ধারালো অস্ত্র, ধারালো দৃষ্টি, সেটাও কি টের পায় কেউ? তারপর তটস্থ নারী ততোধিক তটস্থ বস্ত্রখানি পাতালের দিকে টানতে টানতে নিশ্চিত হতে চায়, সমাজের মানদণ্ডে তার কোথাও শালীনতার ঘাটতি নেই তো! নিশ্চিত হতে চায়, ঠিক কতখানি শালীন হলে চলার পথ তার আপন হবে। একটা পথ, যেখানে নির্বিঘ্নে-নির্ভয়ে নারী হাঁটতে পারে, দাঁড়াতে পারে, দৌড়াতে পারে!
একটা স্বাধীন সার্বভৌম দেশ তার অর্ধেক জনসংখ্যাকে নিরাপত্তা দিতে পারে না! নিরাপত্তার বোধও ধীরে ধীরে বিলোপ হচ্ছে তার। নিরাপত্তা বলে যে এক মহামূল্যবান রত্ন আছে, রাষ্ট্র তাকে আরও দুর্লভ করে দেয় নারীর জন্য। বাধ্য হয়ে কেউ বাদ দিচ্ছে পছন্দের পোশাক, কেউ ছাড়ছে টিউশনি, কেউ ছাড়ছে হাতখরচের সন্ধেবেলা, ছাড়ছে চাকরি-ক্যারিয়ার, প্রিয় নাটক-কবিতার আসর। এই ছেড়ে দেওয়ার তালিকা রোজ বাড়ছে। কারও তবু মাথাব্যথা নেই। নারী থাকলে নারী নিপীড়নের ঘটনা ঘটবে, এ যেন সমাজসিদ্ধ, রাষ্ট্রসিদ্ধ ব্যাপার। চেয়ে চেয়ে খবরের কাগজ দেখা, নতুন নতুন কাগজের কালির গন্ধে মিশে থাকা নতুন নতুন হয়রানির খবরে নিজের অভিজ্ঞতাটাও কখনো কখনো মনে পড়ে যায়। কেমন লাগে তখন? কেমন লাগে যখন সংবাদপত্রের প্রতিবেদনে শতকরা ৯৪ ভাগ নারী গণপরিবহনে আর ৫০ ভাগ নারী কেনাকাটা করতে গিয়ে জনসমাগমে যৌন হয়রানির তথ্য প্রকাশ করে তখন? এসব তথ্য তো বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থা বছর বছর প্রকাশ করে। কিছু কি হয়? সংশ্লিষ্টরা নড়েচড়ে বসেন? নারীকে তার পথের সুরক্ষা নিশ্চিত করে দেওয়া হয়? একজন নারীর ওপর আক্রমণ কি শুধুই একজনের ওপর আক্রমণ তবে? নারী এককভাবে লাঞ্ছনার শিকার হলেও সেই আক্রমণ সমস্ত নারীর ওপর কি আসে না?
শিক্ষা, সাংস্কৃতিক, অর্থনৈতিক, রাজনৈতিকসহ বিভিন্ন সামাজিক সূচকে নারীর বর্তমান অবস্থান খানিকটা সন্তোষজনক। নারীর এত সব উন্নয়ন নিশ্চয়ই ঘরে বসে থেকে হয়নি। নিজের একটা স্বপ্নকে বাস্তবে রং-তুলিতে জীবন্ত করে তুলতে উপেক্ষা করতে হয়েছে কত কত চোখ-রাঙানি, দেখেও না দেখার ভান করতে হয়েছে হিংসুকের মুখ ঝামটানি, প্রত্যাখ্যান করতে হয়েছে মন্দ ঐতিহ্যের টান। আর তারই সঙ্গে পুরুষশাসিত সমাজে উদ্ভাবিত হয়েছে নারীকে অত্যাচার-নির্যাতনের নিত্যনতুন মাত্রা, হয়রানি আর হেনস্তার যুগোপযোগী কায়দা। কিন্তু ভয়ে নিজের ভেতর দুর্ভেদ্য দুর্গ গড়ে এক কোণে আর ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে না নারী। কখনো চুপ করে সয়ে নেয়, কখনো স্থান পরিবর্তন করে দাঁড়ায় অন্য কোনোখানে, আবার কখনো ঘুরে দাঁড়ায়। বদলে যায় চিরাচরিত স্বভাবজাত ভয়, লজ্জা, দ্বিধা। শক্ত হাতের বিবমিষা জাগানো ছোঁয়াকে কোমল অথচ বলশালী হাতে চপেটাঘাত করে, উগরে দেয় নোংরাকে। বুঝিয়ে দেয়, আমি কারও হাতের মুঠোয় থাকি না, চাইলেই আমার শরীরকে নিজের মনে করা যায় না।
নারীর এ ঘুরে দাঁড়ানো দাপুটে পুরুষের মাথায় আগুন জ্বালে, নারীর সাহস তাকে একই সঙ্গে করে তোলে বিচলিত, বিপর্যস্ত ও হিংস্র। ‘পৌরুষের’ অপমানের প্রতিশোধাগ্নি দপ করে শিখা বাড়িয়ে দেয়। চারপাশে অসংখ্য দুর্গ থেকে বেরিয়ে আসে আরও আরও অজস্র কীটপতঙ্গ। নারী-পুরুষের অহম ও স্বার্থের সংঘাতে ঘটতে থাকে আগ্রাসন, অত্যাচার-নির্যাতন। কালে কালেই স্বার্থে ব্যাঘাত ঘটলেই আচার-আচরণ, পোশাক-আশাক, ধর্মীয় রীতিনীতি, বিশ্বাস-ভালোবাসাসহ নানাবিধ উপায়ে নারীর ওপর দমন-পীড়ন চলেছে। পরিবারের ভেতরেই যখন মোকাবিলা করতে হচ্ছে দমনকারীকে, তখন পথেঘাটে অচেনা লোকের নিপীড়ক হয়ে ওঠা আর এমন কী! সাধারণ নিপীড়ন আর যৌন নিপীড়নের মাধ্যমে নারীকে ভয় পাইয়ে রাখতে চায় তারা। পাশে নীরব নির্লিপ্ত দর্শক হয়ে দাঁড়িয়ে থাকে রাষ্ট্র।
যে দেশের প্রধানমন্ত্রী, বিরোধীদলীয় নেতা, স্পিকারসহ বিভিন্ন মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বে ও উচ্চপদে যখন নারীরাই বসে আছেন, তখন আরেকজন নারী শ্রেণিগত অবস্থানের কারণে কতটা উপেক্ষিত, তা সেসব ভুক্তভোগী নারী কিন্তু ভাবে। নারী ভাবে, নারীর ক্ষমতায়ন নিয়ে যে বিরাট সন্দর্ভ রচনা হচ্ছে, তার কোনো এক পাতায় কি সেও আছে! ‘লড়াই করব’ বলে ঘর থেকে বেরিয়ে রাতে আর কোনো দিন যাদের বাড়ি ফেরা হয় না, তাদের কথা কি এই প্রকাণ্ড ক্ষমতায়নের অন্তর্ভুক্ত? অসংখ্য রূপার, তনুর, বিউটির কিংবা ইয়াসমিনের লড়াইয়ের গল্প কি সেখানে লেখা হয়? ক্ষমতায়নের বাইরে নিগ্রহের শিকার একজন বিচ্ছিন্ন নারী কি কেবল বিচ্ছিন্নই! সে কি কোনো কিছুর প্রতিনিধিত্ব করে না? যদি করে, তবে কার? রাষ্ট্র, সমাজ, নারী, অধস্তনতার নাকি কিছু দরকারি পণ্যসামগ্রীর!
প্রতিনিধিত্ব যারই করুক, এখন থেকে পাল্টে যাক সে দৃশ্যপট। নারীরাও পুরুষের নোংরা ইঙ্গিতের জবাবে পথেঘাটে রুখে দাঁড়াক। নারীর এই বিদ্যমান শ্রেণিসংগ্রাম আরও ধারালো হোক, অচলায়তন ধসে পড়ুক। নারীকে পণ্য ভাবার মানসিকতার মেরুদণ্ড ভেঙে দিক, নিপীড়নকারীদের মানসিকতার মৌলিক কাঠামো ভেঙে আশু পরিবর্তন দ্রুত সম্ভব নয় হয়তো। কিন্তু ধীরে হলেও এই কাজটা নারীর নিজেরই করতে হবে। নিজের জীবন, শরীর, পেশা, আত্মসম্মান অন্য কারও ভরসায় না রেখে নিজের দায়িত্ব নিজেরই নিতে হবে। যার ওপর দায়িত্ব চাপিয়ে নিজের স্বনির্ভরতার কথা, সামাজিক অবস্থান তৈরির কথা নারীরা ভাবে না, হঠাৎ সে অবলম্বন হারিয়ে গেলে অকূলপাথারে না পড়ে নিজেকেই নিজের সবচেয়ে বড় অবলম্বন বাড়ানোর দিকে মনোযোগী হতে হবে। বাইরের পৃথিবীর সঙ্গে ঠিকঠাক বোঝাপড়া করে নিজের বসবাসের উপযোগী পৃথিবী বিনির্মাণের কাজটা যার যার নিজেরই করতে হয়। সব শ্রেণি-পেশার নারীর তাই ঘরের বাইরে এসে দাঁড়াতে হবে।
আক্রান্ত নারীরা হাতে হাত ধরে একজন আরেকজনের পাশে এসে দাঁড়াক, ঘরে-বাইরের সব নারীর ঐক্যবদ্ধ প্রতিবাদ-প্রতিরোধে পিছু হটে যাক নিপীড়কের দল। নারীর আকাশ হোক মুক্ত। উড়ে যাক পথঘাটের ভয়-আতঙ্ক।
বীথি সপ্তর্ষি: সাংবাদিক ও লেখক।