default-image

নজিরবিহীন সময়। স্বাস্থ্য, সামাজিক ও রাজনৈতিক অস্থিরতা তো বটেই, পাশাপাশি আমরা যে অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের মুখোমুখি হচ্ছি বা ভবিষ্যতে মুখোমুখি হতে যাচ্ছি, তা উদ্বেগজনক। বিশেষজ্ঞরা সর্বসম্মতভাবে মনে করছেন, মহামারির ফলে বেশির ভাগ খাতে কর্মসংস্থান হ্রাস পাবে এবং আক্রান্ত দেশগুলো অর্থনৈতিক সমৃদ্ধির পতনের মুখোমুখি হবে। পূর্বাভাস পাওয়া যায়, বাংলাদেশও এই বিপর্যয় থেকে মুক্তি পাবে না। বিশ্বব্যাংকের প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এই আর্থিক বছরের শেষে (৩০ জুন) বাংলাদেশের মোট দেশজ উৎপাদনের প্রবৃদ্ধি গত বছরের ৮.১৫ শতাংশ থেকে ২ শতাংশে নেমে যাবে, সর্বোচ্চ প্রবৃদ্ধির পরিধি ৩ শতাংশ হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে।

এই অবস্থায়, বিভিন্ন কোম্পানি ও অন্যান্য করপোরেশন ব্যাপক ক্ষতির সম্মুখীন হবে এবং তাদের ব্যবসা গুটিয়ে ফেলতে বাধ্য হবে কিংবা দেউলিয়া ঘোষণা করবে বলে মনে করা হচ্ছে। ফলে তারা ঋণ পরিশোধের সক্ষমতা হারাবে। এই পরিস্থিতি মোকাবিলা করতে এবং ভঙ্গুর ব্যবসাগুলোকে সহায়তা করার জন্য সরকারি হস্তক্ষেপ প্রয়োজন।

তবে ব্যাংকের ঋণ পরিশোধে ঋণগ্রহীতারা যে সমস্যাগুলোর সম্মুখীন হবে, সেটা সমাধানের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক পূর্বপাক্ষিক পদক্ষেপ গ্রহণ করতে পারে। এটা খুবই স্পষ্ট যে ভঙ্গুর ব্যবসায়ীদের বর্তমান আর্থিক সংকটে বাংলাদেশ ব্যাংকের সর্বাধিক সহায়তা প্রয়োজন। তবে সংকট নিরসনের কৌশলের অংশ হিসেবে, বাংলাদেশ ব্যাংক, ব্যাংক কোম্পানি আইন ১৯৯১–এর অধীনে তার ক্ষমতা প্রয়োগ করে, ইতিমধ্যে সব তফসিলি ব্যাংককে ১ জানুয়ারি ২০২০ থেকে ৩০ জুন ২০২০–এর মধ্যে খেলাপি ঋণের জন্য কোনো ঋণগ্রহীতাকে শ্রেণিবিন্যাস না করার নির্দেশ দিয়েছে। এমনকি আর্থিক প্রতিষ্ঠান আইন, ১৯৯৩–এর অধীনে বাংলাদেশ ব্যাংক, তার ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকেও একই নির্দেশনা দিয়েছে।

সংক্ষেপে বলতে গেলে, বাংলাদেশ ব্যাংকের এই উদ্যোগগুলো ঋণগ্রহীতাদের শ্রেণিবিন্যাসের ক্ষেত্রে স্থিতাবস্থা বজায় রেখেছে, যা তফসিলি ব্যাংকসমূহ এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানসমূহকে বজায় রাখতে হবে। নিঃসন্দেহে এটি বাংলাদেশ ব্যাংক কর্তৃক গৃহীত একটি সহায়ক পদক্ষেপ, যা বর্তমান পরিস্থিতি এবং উদীয়মান সংকটের কারণে ঋণ পরিশোধে অক্ষমদের পরিস্থিতিকে সহায়তা করবে। তবে ঋণগ্রহীতাদের ওপর কোভিড-১৯–এর প্রভাব কার্যকরভাবে হ্রাস করার লক্ষ্যে অর্থনীতিতে আরও ফলপ্রসূ প্যাকেজ ঘোষণার বিষয়ে বাংলাদেশ ব্যাংক বিবেচনা করতে পারে। ফলপ্রসূ প্যাকেজের মধ্যে রয়েছে, ঋণ পরিশোধ স্থগিতকরণ, কার্যকরী মূলধনের সুবিধাগুলোর জন্য কিছু নিয়ম শিথিলকরণ এবং আরও নানা সুবিধা প্রদান করা যেতে পারে।

ঋণগ্রহীতাদেরকে শ্রেণিবিন্যাসকরণে স্থগিতাদেশের পাশাপাশি বাংলাদেশ ব্যাংক অসচ্ছল ঋণগ্রহীতাদের ঋণ পরিশোধ স্থগিতকরণের বিষয়টি বিবেচনা করতে পারে। এই স্থগিতাদেশ অর্থ প্রদানে সাময়িক ছাড় হিসেবে অভিহিত করা যেতে পারে, যার মাধ্যমে ঋণগ্রহীতাকে নির্দিষ্ট সময় পর তার ঋণ পরিশোধে অনুমোদন দেওয়া হবে। সরল ভাষায়, স্থগিতাদেশের প্রভাবটি হলো যে বাংলাদেশের কোনো ব্যাংক বা আর্থিক প্রতিষ্ঠান যদি ঋণগ্রহীতাকে এই ধরনের স্থগিতাদেশ দেয়, তবে স্থগিতাদেশকালীন অবস্থায় ঋণগ্রহীতাকে এ ধরনের ঋণদাতার ঋণের পরিমাণ পরিশোধ করতে হবে না; ফলে ঋণগ্রহীতারা স্বস্তি পাবে। স্থগিতাদেশ সব কিস্তিসহ মেয়াদি লোনের জন্য স্থগিতকালীন অবস্থায় প্রদেয় সুদ স্থগিত করবে এবং স্থগিতাদেশকালীন বকেয়া সব সুদ উল্লেখিত সময়সূচির শেষে পরিশোধ করা যেতে পারে।

কার্যকরী মূলধন সুবিধার ক্ষেত্রে, স্থগিতাদেশের মাধ্যমে স্থগিতকালীন সুদের অর্থ প্রদান স্থগিত করা হবে এবং এই সময়ের মধ্যে অর্জিত সুদ স্থগিতকালীন অতিবাহিত হওয়ার পর প্রদেয় হবে। এইভাবে, ঋণগ্রহীতাগণ তাদের ব্যবসা পরিচালনা অব্যাহত রাখতে এবং কর্মচারীদের কর্মসংস্থান হ্রাস বা লে-অফ করা ছাড়াই তাদের কর্মসংস্থান বজায় রাখতে পারবে। এটি হয়তো ব্যাংকের মুনাফার ওপর প্রতিকূল প্রভাব ফেলবে না, কেননা এই জাতীয় অ্যাকাউন্টের ঋণ পরিশোধের সময়সূচি বাড়ানো হবে এবং স্থগিতকালীন অবস্থায় প্রদেয় অর্থ যেকোনো মূল্যে উল্লিখিত বর্ধিত সময়কালে পরিশোধ করা হবে।

বিশ্বব্যাংকও একই প্রস্তাব রেখেছে এবং এরই মধ্যে আমাদের প্রতিবেশী দেশ ভারতও তা চালু করেছে। সেখানে ভারতীয় রিজার্ভ ব্যাংক (আরবিআই) আঞ্চলিক গ্রামীণ ব্যাংক, সমবায় ব্যাংক, ভারতের সব আর্থিক প্রতিষ্ঠান, নন-ব্যাংকিং ফিন্যান্স কোম্পানিসমূহ এবং আবাসন আর্থিক কোম্পানিসমূহসহ সব বাণিজ্যিক ব্যাংককে ক্রেডিট কার্ডের বকেয়াসহ সব মেয়াদি লোনের ঋণগ্রহীতাদের সব মূল, সুদ এবং পরিশোধের কিস্তি (১ মার্চ ২০২০ থেকে ৩১ মে ২০২০) ৩ মাস পর্যন্ত স্থগিতকরণের অনুমতি দিয়েছে।

স্থগিতাদেশ ছাড়াও বাংলাদেশ ব্যাংক ১৯৯১ সালের ব্যাংক কোম্পানি আইন অনুসারে ক্ষমতা প্রয়োগের মাধ্যমে তফসিলি ব্যাংকগুলোকে ঋণের চুক্তির অধীনে ডিফল্ট–সম্পর্কিত ধারাগুলোকে ট্রিগার না করার নির্দেশ দিতে পারে। সাধারণত, লোন–সম্পর্কিত চুক্তিগুলোতে প্রতিকূল অবস্থার বিষয়গুলো বর্ণিত থাকে যা ‘এমএই’ নামে পরিচিত, এবং যা ডিফল্ট ইভেন্ট হিসেবে ট্রিগার করে। ব্যাংকগুলো, সাধারণত, লোন–সম্পর্কিত চুক্তিগুলোতে এমএই সম্পর্কে একটি বিস্তৃত আলোচনা করে, যার মধ্যে ঋণগ্রহীতার ব্যবসায়ের ওপর বিরূপ প্রভাব ফেলে এমন কোনো ঘটনাও অন্তর্ভুক্ত থাকে।

নিঃসন্দেহে, কোভিড-১৯ ইতিমধ্যে লকডাউনের মাধ্যমে বিশ্বের অর্থনীতিকে স্থবির করে দিয়েছে এবং আর্থিক বাজারগুলো প্রায় মন্দার মধ্য দিয়ে যাচ্ছে। ফলে, ভবিষ্যতে বিভিন্ন ব্যবসার নগদ প্রবাহ নেতিবাচকভাবে প্রভাবিত হবে এবং অর্থায়নের সুবিধার্থে শর্ত সাপেক্ষে এমএইএকে ট্রিগার করতে পারে। সাধারণত, ব্যাংকগুলো তাদের লোন–সম্পর্কিত চুক্তিগুলোতে ‘ফর্স মেজিউর’ ধারাটির পক্ষপাতী নয়, যেহেতু এর মাধ্যমে কোনো ঋণগ্রহীতা তার ঋণ পরিশোধের দায় এড়াতে পারে। ফর্স মেজিউর ধারাটির অনুপস্থিতিতে, যা কিনা কোভিড-১৯–এর পরিস্থিতিতে ফর্স মেজিউর হিসেবে বিবেচনা করা উচিত, ঋণগ্রহীতারা বিদ্যমান পরিস্থিতিকে ফর্স মেজিউর হিসেবে দাবি করবে, যা পক্ষগুলোর মধ্যে বিরোধ এবং মামলা–মোকদ্দমা বৃদ্ধি করবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ যেখানে বাংলাদেশ ব্যাংক, সিকিউরিটি হিসেবে রাখা সম্পদের মূল্যায়নপূর্বক ঋণগ্রহীতাদের সহায়তা দিতে পারে। কোভিড-১৯ মহামারিটি ইতিমধ্যে মন্দা বেড়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গে শেয়ার বাজারকে বিপর্যস্ত করেছে। এসব কারণে সম্পদের মূল্যায়নের ওপর বিরূপ প্রভাব পড়বে। সুরক্ষিত অর্থ লেনদেনের ক্ষেত্রে, সিকিউরিটি হিসেবে বিভিন্ন ধরনের সম্পদ থাকতে পারে যেমন শেয়ার, স্থাবর এবং অস্থাবর সম্পত্তি ইত্যাদি। যদি এই সিকিউরিটিসমূহের মূল্য হ্রাস পায়, তবে ব্যাংক সাধারণত ঋণগ্রহীতাকে সিকিউরিটির হ্রাসকৃত মূল্য পূরণ করতে বলতে পারে। যদি ঋণগ্রহীতা এই সিকিউরিটির মূল্য পূরণ করতে ব্যর্থ হয়, তাহলে সেটা ডিফল্ট ইভেন্ট হিসেবে ধরা হবে, যার মাধ্যমে ব্যাংকগুলো ঋণ পরিশোধ ত্বরান্বিত করতে এবং সিকিউরিটি কার্যকর করার অধিকারী হবে। যদি বাংলাদেশ ব্যাংক হস্তক্ষেপ না করে বা সঠিক দিকনির্দেশনা না দেয়, তাহলে ঋণগ্রহীতা কর্তৃক সিকিউরিটি হিসেবে রক্ষিত বেশির ভাগ সম্পদের মূল্য হ্রাস পাবে এবং ব্যাংকগুলো এই এসব সম্পদ হ্রাসকৃত মূল্যে বিক্রয় করবে এবং তাদের লোনের বিপরীতে ঋণগ্রহীতার কাছে অতিরিক্ত সিকিউরিটি দাবি করবে, যার ফলে ভঙ্গুর ব্যবসায়গুলোতে আরও চাপ সৃষ্টি হবে।

সবশেষে, ক্রমবর্ধমান ঋণখেলাপি এবং দেউলিয়া হওয়ার ঝুঁকির ক্ষেত্রে, বাংলাদেশ সরকার কোম্পানি আইনে বর্ণিত দেউলিয়া–সম্পর্কিত বিধানগুলোর অস্থায়ী স্থগিতাদেশ প্রদান করতে পারে। আপাতত, এই পদক্ষেপ ঋণগ্রহীতাদের ব্যবসায়কে তাদের ঋণদাতা কর্তৃক দেউলিয়া–সম্পর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে রক্ষা করতে পারবে। সম্প্রতি, ভারত সরকার ব্যবসায়িকদের দেউলিয়া থেকে রক্ষা করার লক্ষ্যে তাদের প্রণোদনা-প্যাকেজের অংশ হিসেবে করপোরেট ইনসলভেন্সি রেজোলিউশন প্রসেসটি ট্রিগার করার জন্য ডিফল্টের সীমা বৃদ্ধির ঘোষণা করেছে। এমনকি ভারত সরকার পরামর্শ দিয়েছে যে যদি কোভিড-১৯ সংকট ৩০ এপ্রিল ২০২০ অবধি অব্যাহত থাকে, কেন্দ্রীয় সরকার তাদের দেউলিয়াবিষয়ক আইনের কিছু বিধান ৬ মাসের জন্য স্থগিত করতে পারে, যাতে কোনো পাওনাদার কর্তৃক দেউলিয়া–সম্পর্কিত পদক্ষেপের বিরুদ্ধে ব্যবসায়কে রক্ষা করা যেতে পারে।

এই সংকটের সময়ে প্রধানমন্ত্রীর নেতৃত্বে বাংলাদেশ সরকার ইতিমধ্যে যে পদক্ষেপ নিয়েছে, তা অবশ্যই প্রশংসনীয়। তথাপি যদি উপরোক্ত পদক্ষেপগুলো বাংলাদেশ সরকার গ্রহণ করে (যদি ইতিমধ্যে না করা হয়), তবে সেটি একটি সময়োপযোগী পদক্ষেপ হবে, যা ব্যবসায়ীদের এই মহামারি এবং তার পরবর্তী অবস্থায় তাদের ব্যবসা চলমান রাখতে সাহায্য করবে।

মো. সামীর সাত্তার: বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী।

বিজ্ঞাপন
কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন