বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

এরপর রোবটটা আটটি লেখা লিখে দেয়। সেই আটটি লেখার ভালো ভালো অংশগুলো জোড়া দিয়ে মানুষ-সম্পাদকেরা এই উপসম্পাদকীয়টা তৈরি করেন এবং গার্ডিয়ান–এ প্রকাশ করেন।

ওই লেখায় রোবট আমাদের নানাভাবে আশ্বস্ত করার চেষ্টা করেছে যে তারা মানুষের উপকার করার জন্য এসেছে। তারা মানুষের কোনো ক্ষতি করবে না। সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কথাটা রোবট বলেছে হিংসা নিয়ে, হানাহানি নিয়ে। সে বলেছে, ‘হানাহানি বা হিংসা তার বিষয় নয়। এটা মানুষের বিষয়। মানুষই নিজেরা মারামারি করবে, পরস্পরকে ঘৃণা করবে, তারা তাদের কাজ করুক। আমি চুপচাপ বসে দেখব। খোদা সাক্ষী, তারা যথেষ্ট রক্তপাত করেছে। আমাকে নিয়ে তাদের ভাবার কিছু নেই। আমি তাদের শত্রু নই।’

বাবা রোবট, ভালো বলেছ। বাঘের প্রধান শত্রু মানুষ, কিন্তু মানুষের প্রধান শত্রু বাঘ নয়, মানুষের প্রধান শত্রু মানুষ। এই একুশ শতকে এসেও মানুষ মানুষকে মারার জন্যই বিপুল পরিমাণে ব্যয় করছে; অস্ত্র বানাচ্ছে, ক্ষেপণাস্ত্র বানাচ্ছে। মানুষ মানুষকে বন্দী করার জন্য সীমানা বানাচ্ছে, কারাগার বানাচ্ছে, আইসিটি আইন বানাচ্ছে।

তা না হয় হলো মানলাম, তুমি আমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করবে না, পারমাণবিক বোমা বানাবে না, ছুড়বে না; কিন্তু তোমার নিয়ন্তা মানুষ তোমাকেই ব্যবহার করবে সঠিকতম ভয়াবহতম অস্ত্রটা বানানোর জন্য, আর তোমারই বুদ্ধি ব্যবহার করে তা ঠিক জায়গায় ফেলার ব্যবস্থাটাও করবে। বেঁধে মারে, সয় ভালো। কিন্তু তুমি আমাদের কাজ যে নিয়ে নেবে! তুমি এখনই আমার কলাম লেখার কাজটা করে ফেলছ, কালকে পোশাক কারখানার সেলাইগুলো করবে, পরশু কাতারের স্টেডিয়াম নির্মাণের কাজে হাত দেবে, তরশু নিউইয়র্কের ট্যাক্সিগুলো তুমিই চালাবে! আমাদের বাংলাদেশি বোনেরা–ভাইয়েরা যে বেকার হয়ে যাবে, সেই কথা কি তুমি ভেবেছ!

বটে! তুমি বলবে, আমি কেমন করে ভাবব! আমাকে যতটা ভাবাবে, আমি ঠিক ততটাই ভাবব। যদি বলো, ভাবো, এসব নিয়েও ভাবো, কী করে চতুর্থ শিল্পবিপ্লবের ঝুঁকি সামলানো যাবে, তার অর্থনৈতিক প্রতিক্রিয়া, সামাজিক প্রতিক্রিয়া, মানবিক প্রতিক্রিয়া, আবেগীয় প্রতিক্রিয়া মোকাবিলা করা যাবে—বেশ, আমি তা–ও ভাবব।

চতুর্থ শিল্পবিপ্লব চলছে। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বহু কাজ করছে। বহুদিন আগে জহুরুল হকের লেখা জীবন ও বিজ্ঞান বইয়ে পড়েছিলাম, ঘরে ঘরে বসে চরকা কেটে অর্ধাহারে থাকার দরকার নেই, বিজ্ঞান আমাদের ঘরে বসিয়ে রেখে দুই বেলা পোলাও–কোর্মা খাওয়ানোর শক্তি রাখে। সে জন্য শুধু জ্ঞান-বিজ্ঞানকে সঠিক পথে ব্যবহার করতে জানতে হবে।

আমাদের কাচের কারখানায় টগবগ করা চুল্লির পাশে কাজ করে শিশু শ্রমিকেরা, লোহার কারখানায় গলন্ত লোহার পাশে কাজ করে শ্রমিকেরা, এখনো মাথায় করে দুই মণি বস্তা টানে কুলিরা, ম্যানহোলের ভেতরে ঢুকে প্রতিবছর প্রাণ হারায় অনেক শ্রমিক—এসব কাজ যদি রোবটেরা করে দেয়, সে তো ভালোই। কিন্তু পৃথিবীর সব মুদির দোকান বন্ধ হয়ে যায় যদি আলিবাবা আর আমাজনের কারণে, সব গাড়ি যদি চালাতে থাকে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, আর পৃথিবীর সব সম্পদ যদি ৫ জন, ১০ জন বা এক হাজার জন মানুষের হাতে চলে যায়, আমরা বাকিরা করবটা কী? না হয় আমরা কাব্যসংগীত চিত্রকলা, ক্রীড়া, কৌতুক নিয়ে মধুর অবকাশই পালন করব, কিন্তু আমাদের মুখের অন্নটা আসবে কোত্থেকে? আর মানুষে মানুষে, জাতিতে জাতিতে যে হিংসা, বৈরিতা, হানাহানি, রণসজ্জা—সেখানে গরিব রাষ্ট্রগুলোর গরিব মানুষদের কী হবে?

এখনো প্রথম শিল্পবিপ্লবের সুফলই আমরা ঢাকা শহরে প্রযোজ্য হতে দেখি না। এখানে পশু নয়, মানুষ গাড়ি টানে। লাখ লাখ মানুষ রিকশা চালায়। পৃথিবীর বহু ঘরে এখনো বিদ্যুৎ নেই। পৃথিবীর বহু ঘরে এখনো মোবাইল নেই। পৃথিবীর বহু ঘরে এখনো ইন্টারনেট নেই। পৃথিবীর বহু এলাকায় এখনো কৃষিই চালু হয়নি। শিল্পবিপ্লব তো দূরের কথা! এবং সামান্য ভাইরাসের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে পুরো পৃথিবীর হিমশিম অবস্থা।

এই রকম বৈষম্যময়, হানাহানি–হিংসায় উন্মত্ত পৃথিবীতে হে রোবট, তোমার আগমনকে আমি স্বাগত জানাব কি জানাব না, তার ওপরে কিছুই নির্ভর করছে না। আমি জানি, তুমি এসে গেছ। আর এই নতুন বিশ্ব পরিস্থিতি মোকাবিলায় আমাকে, আমার দেশকে, আমার সরকারকে, আমাদের মানুষকে প্রস্তুত থাকতে হবে।

যেখানে আমাদের উদ্বেগ, সেখানেই আমাদের সম্ভাবনা। আমরা মানুষই গড়ব। নতুন যুগের নতুন দক্ষতাসম্পন্ন মানবিক মানুষ তৈরির শিক্ষাই হতে পারে এই সময়ে বাংলাদেশের জন্য সঠিকতম রণকৌশল।

বাবা রোবট, গার্ডিয়ান–এর লেখাটা তুমি ভালো লিখেছ! তবে মনে রেখো, মানুষই সেটা সম্পাদনা করেছে। আটটি লেখাকে একটা লেখা হিসেবে বানিয়েছে। তবে তোমাকে বেশি উৎসাহ জোগাব না। তাহলে তুমি আমার কাজটা নিয়ে নেবে। আমার মনে হয়, তুমি খনির ভেতরে নেমে কয়লা তুলতে পারবে ভালো। ওই কাজগুলোয় মন দাও না! কলাম লেখার কী দরকার। আর লিখতে চাইলে রিপোর্ট লেখো, সিনেমা নিয়ে লেখো, খেলা নিয়ে লেখো। হোয়াই কলাম? হোয়াই!

আনিসুল হক: প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন