সাহাবুদ্দীন আহমদ সাবেক রাষ্ট্রপতি ও প্রধান বিচারপতি। দুটি পদেই তিনি দুবার অধিষ্ঠিত ছিলেন। অনেকে একাধিকবার রাষ্ট্রপতি হয়েছেন। কিন্তু একাধিকবার প্রধান বিচারপতির আসন অলংকৃত করেছেন একমাত্র সাহাবুদ্দীন আহমদই।

১৯৯০ সালের শেষ দিকে স্বৈরাচারী শাসক এরশাদের বিরুদ্ধে গণ-আন্দোলন রূপ নেয় গণ-অভ্যুত্থানে। এরশাদ চেয়েছিলেন ক্ষমতায় থেকে তিনি আরেকটি নির্বাচন করবেন। কিন্তু আওয়ামী লীগের নেতৃত্বে আট দল, বিএনপির নেতৃত্বে সাত দল ও পাঁচদলীয় বাম জোট তঁার পদত্যাগের দাবিতে অনড় থাকে। বিরোধী দলের আন্দোলন দমনে এরশাদ ২৭ নভেম্বর জরুরি অবস্থা ঘোষণা করেন, কারফিউ জারি করেন। কিন্তু মানুষ তাঁর নির্দেশ মানেনি। তারা কারফিউ ভেঙে রাজপথে নেমে আসে। ৪ ডিসেম্বর উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ যখন বিটিভিতে এরশাদকে ছুটিতে পাঠিয়ে নির্বাচন করার তত্ত্ব প্রচার করছিলেন, তখনই স্ক্রলে তাঁর (এরশাদ) নিঃশর্ত পদত্যাগের ঘোষণাটি আসে।

এরপর কাকে নির্দলীয় তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান করা যায়, সে বিষয়ে আলোচনায় বসেন তিন জোটের নেতারা। আওয়ামী লীগ যাঁর নাম প্রস্তাব করে, বিএনপির পছন্দ হয় না। বিএনপি যাঁর নাম প্রস্তাব করে, আওয়ামী লীগ নাকচ করে দেয়। ধানমন্ডিতে আওয়ামী লীগ নেতা মহিউদ্দিন আহমদের বাসায় বৈঠক চলছিল। বাইরে ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের নেতারা জানিয়ে দেন, আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে, দেরি করা যাবে না। অনেক আলোচনার পর তিন জোটের নেতারা ঐকমত্যে পৌঁছান যে সুপ্রিম কোর্টের প্রধান বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদই তত্ত্বাবধায়ক সরকারের প্রধান হবেন। সাহাবুদ্দীন সাহেব একটি শর্তে রাজি হলেন, নির্বাচনের পর তাঁকে প্রধান বিচারপতি পদে ফিরে যাওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে।

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন। সেই থেকে তিনি নিজ বাসায় প্রায় স্বেচ্ছাবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কোনো নেতা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করারও প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি কেমন আছেন জানতে চেষ্টা করেননি। ‘গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীদের’ কাছে এ আচরণ প্রত্যাশিত নয়।

তখন দেশে রাষ্ট্রপতিশাসিত ব্যবস্থা ছিল। প্রথমে উপরাষ্ট্রপতি মওদুদ আহমদ পদত্যাগ করলেন। এরশাদ সেই পদে বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদকে নিয়োগ দিলেন। এরপর নিজে পদত্যাগ করলেন, ফলে সাংবিধানিকভাবে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনের ওপর অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব এসে পড়ে। তিন জোটের নেতাদের পরামর্শ ও সম্মতিতেই তিনি দেশের কৃতী ব্যক্তিদের নিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করলেন।

১৯৯১ সালের ২৭ ফেব্রুয়ারি অনুষ্ঠিত নির্বাচনে বিএনপি জয়ী হয়ে সরকার গঠন করে। খালেদা জিয়া হন প্রধানমন্ত্রী। তখনো সংবিধান অনুযায়ী রাষ্ট্রপতি সর্বময় ক্ষমতার অধিকারী। মন্ত্রিসভার বৈঠকেও তাঁর সভাপতিত্ব করার কথা; কিন্তু বিচারপতি সাহাবুদ্দীন নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে সজাগ ছিলেন। সংবিধানে রাষ্ট্রপতির হাতে যে ক্ষমতাই থাকুক না কেন, তিনি বললেন, নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিরাই দেশ চালাবেন। সাহাবুদ্দীন আহমদ দ্রুত নতুন রাষ্ট্রপতি নির্বাচনেরও তাগিদ দিলেন। তখনো বিএনপির নীতিগত অবস্থান ছিল রাষ্ট্রপতিশাসিত পদ্ধতির সরকারের পক্ষে। আওয়ামী লীগ ও এর সহযোগী দলগুলো সংসদীয় ব্যবস্থা চালু করার দাবি জানিয়ে আসছিল। এরই মধ্যে উচ্চপর্যায়ে নিয়োগসহ নানান বিষয়ে সরকারের সঙ্গে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতির মতভেদ দেখা দেয়। ক্ষমতাসীন দলের নেতারা প্রকাশ্যে তাঁর সমালোচনা করতে থাকেন। একপর্যায়ে বিএনপি নেতা ও তথ্যমন্ত্রী নাজমুল হুদা বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ সম্পর্কে অসম্মানজনক কথাবার্তা বললে তিনি জাতির উদ্দেশে দেওয়া ভাষণে তার কড়া জবাব দেন। অনেক দ্বিধাদ্বন্দ্বের পর বিএনপি সংসদীয় পদ্ধতির শাসন প্রতিষ্ঠায় রাজি হয়। সে সময় সেনাবাহিনীর পদাধিকারীরাও সংসদীয় ব্যবস্থার পক্ষে মত দেন। ৬ আগস্ট সংসদে সর্বসম্মতিক্রমে দ্বাদশ সংশোধনীর মাধ্যমে পুনরায় সংসদীয় ব্যবস্থা চালু হয় এবং বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি পদে ইস্তফা দিয়ে আগের দায়িত্বে ফিরে যান। বিস্ময়কর হলো সে সময় বিএনপি বা আওয়ামী লীগের কোনো নেতা তাঁর সঙ্গে সৌজন্য সাক্ষাৎটুকু করেননি।

১৯৯৬ সালের ১২ জুন অনুষ্ঠিত নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসে। শেখ হাসিনা প্রধানমন্ত্রী হন। এবার আওয়ামী লীগ নির্দলীয় ব্যক্তিকে রাষ্ট্রপতি করার সিদ্ধান্ত নেয় এবং সে ক্ষেত্রে বিচারপতি সাহাবুদ্দীনই তাদের এক নম্বর পছন্দ। আওয়ামী লীগের নেতারা এ-ও বললেন যে তিনি রাজি না হলে বাড়ির সামনে বসে অনশন করবেন। শেষ পর্যন্ত সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিতে রাজি হলেন। যদিও তিনি জানতেন ‘কবর জিয়ারত ও মিলাদ পড়া’ ছাড়া তাঁর কোনো কাজ নেই। তাঁর রাষ্ট্রপতির পাঁচ বছর মোটামুটি ভালোই চলছিল। আওয়ামী লীগ সরকার তঁার সব পরামর্শ না মানলেও একটি পরামর্শ মেনেছিল। প্রচলিত আইনে বঙ্গবন্ধু হত্যার বিচার। ফলে এ বিচার নিয়ে কেউ প্রশ্ন তুলতে পারেনি। কিন্তু গোল বাধল সরকারের শেষ সময়ে ২০০১ সালের নির্বাচনকে ঘিরে। নির্বাচনে আওয়ামী লীগ পরাজিত হলে দলের নেতারা অন্যায়ভাবে এর দায় চাপালেন বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদের ওপর। তঁারা প্রধান উপদেষ্টা লতিফুর রহমান ও প্রধান নির্বাচন কমিশনার এম এ সাঈদের সঙ্গে তাঁকেও ব্র্যাকেটবন্দী করলেন। আবদুস সামাদ আজাদের নেতৃত্বে আওয়ামী লীগের একটি প্রতিনিধিদল তাঁর সঙ্গে দেখা করে নির্বাচন বাতিল করার দাবি জানিয়েছিলেন।

নব্বইয়ে ক্ষমতার পালাবদলের পর এরশাদ সেনানিবাসে গৃহবন্দী ছিলেন। তিনি গৃহবন্দী অবস্থায় বিবিসিকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে উসকানিমূলক কথাবার্তা বললে আওয়ামী লীগ, বিএনপিসহ সব দল তাঁকে গ্রেপ্তারের দাবি করে। এরপর তাঁকে গৃহবন্দী অবস্থা থেকে কারাগারে পাঠানো হয়। ফলে জাতীয় পার্টি তাঁর বিরোধিতা করবে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু যাঁদের অনুরোধে তিনি প্রথমে অস্থায়ী রাষ্ট্রপতি ও পরে রাষ্ট্রপতির দায়িত্ব নিলেন, সেই আওয়ামী লীগ ও বিএনপির কাছ থেকেও তিনি যথাযথ সম্মান পাননি। বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ চেয়েছিলেন দেশে সুষ্ঠু গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা গড়ে উঠুক, সরকার ও বিরোধী দলের মধ্যে একটা কর্মসম্পর্ক থাকুক। এ কারণে সংসদে লিখিত ভাষণের শেষে নিজের ব্যক্তিগত মত তুলে ধরতেন, অনেকটা যাত্রা দলের বিবেকের মতো।

কোনো দল তাঁর কথা শোনেনি। বরং তাঁকে ‘শত্রুপক্ষের লোক’ প্রমাণ করতে সচেষ্ট থেকেছে। এসব নিয়ে এই মানুষটির কোনো খেদ ছিল না। বঙ্গভবনে সাংবাদিকদের সঙ্গে বিদায়ী অনুষ্ঠানে তিনি জানিয়েছিলেন, নির্বাচনের দিন (১ অক্টোবর ২০০১) বিকেল চারটায় আওয়ামী লীগের এক শীর্ষ নেতার সঙ্গে কথা হয় এবং তিনি ‘খুব ভালো ভোট হচ্ছে’ বলে তাঁকে আশ্বস্ত করেন।

কিন্তু ফলাফল ঘোষণার পর যখন দেখা যায়, বিএনপি বিপুল ভোটে জয়ী হয়েছে, তখনই আওয়ামী লীগ নেতারা প্রধান উপদেষ্টা ও প্রধান নির্বাচন কমিশনারের সঙ্গে রাষ্ট্রপতি সাহাবুদ্দীনকেও আক্রমণের লক্ষ্যবস্তু করেন। ওই অনুষ্ঠানে তিনি বলেছিলেন, ‘চেয়ার একটি, ভাগীদার দুজন।’ সেই চেয়ারের জন্য লড়াই এখনো চলছে।

২০০১ সালের ১৪ নভেম্বর বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ রাষ্ট্রপতির পদ থেকে বিদায় নেন। সেই থেকে তিনি নিজ বাসায় প্রায় স্বেচ্ছাবন্দী জীবন কাটাচ্ছেন। আওয়ামী লীগ বা বিএনপির কোনো নেতা তাঁর সঙ্গে সাক্ষাৎ করারও প্রয়োজন বোধ করেননি। তিনি কেমন আছেন জানতে চেষ্টা করেননি। ‘গণতন্ত্রের অতন্দ্র প্রহরীদের’ কাছে এ আচরণ প্রত্যাশিত নয়।

বিচারপতি সাহাবুদ্দীন আহমদ গণতন্ত্র উত্তরণে যে ভূমিকা রেখেছেন, আজ যদি আমরা স্বীকার না করি, তা চরম অকৃতজ্ঞতা হবে। যে দেশ মহৎ মানুষকে সম্মান জানাতে পারে না, সে দেশে মহৎ মানুষ তৈরি হয় না।

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন