পাকিস্তানের আদালতের ইতিহাসের এ দুই ধারার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা অনুমান করতে সক্ষম হবেন যে গত কয়েক দিনে প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল এবং সুপ্রিম কোর্টের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অভূতপূর্ব নয়। পাকিস্তানে আদালত দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হন না, তা দাবি করা যাবে না। কিন্তু ইমরান খানের সরকারের আচরণের সাংবিধানিক দিক বিচারে পাকিস্তানের আদালত অন্য শক্তির দ্বারা প্ররোচিত বা প্রভাবিত—এমন দাবির পক্ষে যুক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না।

পাকিস্তানের বিচার বিভাগের ইতিহাস দুই রকমের। ইতিহাসের একটি দিক হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের কার্যকলাপের প্রতি অকুণ্ঠ সমর্থন এবং তাকে বৈধতা প্রদান। অন্য দিকটি হচ্ছে নির্বাহী বিভাগের সংবিধানবিরোধী কার্যকলাপের বিরুদ্ধে অবস্থান গ্রহণ। পাকিস্তানের প্রতিষ্ঠাকালীন প্রতিশ্রুতি ছিল যে দেশটিতে বিচার বিভাগ নিরঙ্কুশ স্বাধীনতা ভোগ করবে। ১৯৪৯ সালে দেশের গণপরিষদে পাস হওয়া ‘অবজেকটিভ রেজল্যুশন’, যা ১৯৫৬ সাল পর্যন্ত কার্যত সংবিধানের ভূমিকা পালন করেছে, তাতেই এ কথা বলা হয়েছিল। কয়েক দশক পর, রাজনীতিতে অনেক ধরনের উত্থান-পতন এবং পাকিস্তানের এক নতুন ভৌগোলিক কাঠামো তৈরি হওয়ার পটভূমিকায় ১৯৭৩ সালের সংবিধানেও তা–ই বলা হয়েছিল। কিন্তু এ প্রতিশ্রুতি পালিত হয়নি। বরং দেখা গেছে যে পাকিস্তানের বিচার বিভাগ নির্বাহী বিভাগের কাজকে বৈধতা দেওয়ার কাজই করেছে। পাকিস্তানের আদালত সরাসরি নির্বাহী বিভাগের পক্ষে যৌক্তিকতা তৈরি করার ঘটনা ঘটিয়েছেন একাধিকবার।

প্রথম ঘটনাটি ঘটে ১৯৫৫ সালে। আগের বছর অক্টোবর মাসে গভর্নর জেনারেল গোলাম মোহাম্মদ গণপরিষদ ভেঙে দেন এবং জরুরি অবস্থা জারি করেন ‘পার্লামেন্টে অচলাবস্থা’র অজুহাতে। কিন্তু আসল ঘটনা ছিল—মন্ত্রীদের চাকরিচ্যুত করার যে ক্ষমতা গভর্নর জেনারেলের ছিল, গণপরিষদ চাইছিল তা বাতিল করে দিতে। মৌলভি তমিজউদ্দিন খান গণপরিষদ ভেঙে দেওয়ার এ আদেশের বিরুদ্ধে সিন্ধুর আদালতে চ্যালেঞ্জ করলে আদালত তাঁর পক্ষে রায় দেন। কিন্তু বিচারপতি মুনিরের নেতৃত্বাধীন সুপ্রিম কোর্ট সিন্ধুর আদালতের এ রায় খারিজ করে দেন। প্রচলিত তথ্য হচ্ছে, গভর্নর জেনারেল প্রধান বিচারপতির কাছ থেকে আগেই এই মর্মে নিশ্চয়তা লাভ করেছিলেন যে সিন্ধুর আদালতে যা–ই হোক, সুপ্রিম কোর্ট গভর্নর জেনারেলের পক্ষেই রায় দেবেন। এরপর সংশ্লিষ্ট আরেকটি রায়ে এটা স্বীকার করা হয় যে তমিজউদ্দিন খানের মামলায় গভর্নর জেনারেলের আইন প্রণয়নের ক্ষমতা সীমিত করে দিয়েছে। কিন্তু তৃতীয় আরেক মামলায় গণপরিষদের অনুপস্থিতি এবং দেশে তখনো সংবিধান প্রণীত না হওয়ার অজুহাতে সুপ্রিম কোর্ট গভর্নর জেনারেলকে আইন প্রণয়নের অধিকার প্রদান করেন। আদালতের যুক্তি ছিল ‘ডকট্রিন অব স্টেট নেসেসিটি’ বা রাষ্ট্রের প্রয়োজনে অসাংবিধানিক পদক্ষেপের বৈধতা প্রদান। এ ‘ডকট্রিন অব নেসেসিটি’র আওতায় অবৈধ পদক্ষেপের প্রতি সমর্থন পাকিস্তানে এবং দক্ষিণ এশিয়ার অন্য রাষ্ট্রে পরও দেখা গেছে। এ তিন মামলার মধ্য দিয়ে পাকিস্তানে বিচার বিভাগ যে নির্বাহী বিভাগেরই তাঁবেদার, সেটা স্পষ্ট হয়।

এরপর পাকিস্তানে তিনবার সামরিক শাসন জারি করা হয়েছে এবং প্রতিবারই তাকে বৈধতা দিয়েছেন আদালত। পাকিস্তানে প্রথম সামরিক শাসনের সূচনা হয় ৮ অক্টোবর ১৯৫৮ সালে, জেনারেল আইয়ুব খানের সেনাশাসন। প্রধান বিচারপতি মুনির তাকে বৈধতা দেন ‘বিপ্লবী বৈধতা’র তত্ত্ব দিয়ে। বলা হয়েছিল যে আদালত একটি সামরিক অভ্যুত্থানকে বৈধতা দেবেন, যদি তা কার্যকারিতার পরীক্ষায় উতরে যায় এবং আইন প্রণয়নের বাস্তবতায় পরিণত হয়। পাকিস্তানের আদালত ইয়াহিয়া খানের সামরিক অভ্যুত্থানকেও বৈধতা দিয়েছিলেন। যদিও দেশে বেসামরিক শাসন প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর বলেছেন যে ওই সামরিক শাসনের কোনো সাংবিধানিক বৈধতা ছিল না। কিন্তু তারপর ১৯৭৭ সালে যখন জিয়াউল হক সেনাশাসন জারি করেন, তখন আদালত তাঁকে কিছুই বলেননি, উপরন্তু বেগম নুসরাত ভুট্টো তা চ্যালেঞ্জ করলে আদালত ‘ডকট্রিন অব নেসেটিটি’র কথা বলেই তা খারিজ করে দিয়েছিলেন। ১৯৯৯ সালে পারভেজ মোশাররফের ক্ষমতা দখলের পর আদালতে দায়ের করা মামলাগুলো যখন জমে উঠছিল, তখন আদালতের বিচারকদের বাধ্য করা হয়েছে জেনারেল জিয়ার মতোই এক আইনের আওতায় পারভেজ মোশারফের করা আইনের প্রতি আনুগত্য প্রকাশে।

পাকিস্তানের আদালতের এই সব ভূমিকার পাশাপাশি আদালতের এবং বিচারকদের অন্য ধরনের ভূমিকাও আছে। জেনারেল জিয়া ১৯৮১ সালের সাময়িক সংবিধান আইন (পিসিও) জারির মাধ্যমে এই আদেশের সঙ্গে সম্মত হয়ে সব বিচারকের জন্য নতুন করে শপথ নেওয়া বাধ্যতামূলক করেন। কিন্তু তাতে অসম্মত হওয়ায় ১৬ জন বিচারক বরখাস্ত হন এবং ৩ জন শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। বাকিরা অবশ্য চাপের মুখে আত্মসমর্পণ করেন। প্রাতিষ্ঠানিকভাবে না হলেও বিচারকদের মধ্যে সংবিধান এবং আইনের শাসনের প্রতি শ্রদ্ধার একটি উদাহরণ হয়ে ওঠে এই ঘটনা। ১৯৮৮ সালে জিয়াউল হক যখন সংসদ ভেঙে দেন, তার আগে সংবিধানের অষ্টম সংশোধনীর মাধ্যমে যুক্ত ৫৮(২) অনুচ্ছেদ তাঁকে দিয়েছে অসীম ক্ষমতা। তা সত্ত্বেও তাঁর মৃত্যুর পর আদালত বলেছিলেন যে ওই আদেশ সাংবিধানিক ছিল না।

তবে আদালতের বড় ধরনের ভূমিকা দেখা যায় ১৯৯৩ সালে। এপ্রিল মাসে নওয়াজ শরিফ সরকারকে ক্ষমতাচ্যুত করতে পার্লামেন্ট ভেঙে দেন প্রেসিডেন্ট গুলাম ইসহাক খান। আদালতের রায়ে নওয়াজ শরিফ ক্ষমতায় ফেরেন মে মাসে। নির্বাহী বিভাগ, বিশেষ করে প্রেসিডেন্টের বিরুদ্ধে পাকিস্তানের বিচারপতি এবং আদালতের অবস্থান কতটা শক্তিশালী, তা বোঝা যায় ২০০৭ সালের মার্চ মাসে প্রধান বিচারপতি ইফতেখার মুহাম্মদ চৌধুরীকে বরখাস্ত করার পর। প্রেসিডেন্ট পারভেজ মোশাররফের এ সিদ্ধান্তের বিরুদ্ধে সারা দেশে গড়ে ওঠে আন্দোলন। সুপ্রিম কোর্টের পূর্ণাঙ্গ বেঞ্চ জুলাই মাসে ১০-৩ ভোটে প্রেসিডেন্টের এ সিদ্ধান্তকে অসাংবিধানিক বলে চিহ্নিত করে প্রধান বিচারপতিকে স্বপদে বহাল করেন, তাঁর বিরুদ্ধে সুপ্রিম জুডিশিয়াল কাউন্সিলে আনীত অভিযোগ এবং যে আইনের ভিত্তিতে প্রেসিডেন্ট প্রধান বিচারপতিকে বরখাস্ত করেছিলেন, সেটা বাতিল করে দেন।

পারভেজ মোশাররফের সঙ্গে আদালতের প্রত্যক্ষ বিরোধের দ্বিতীয় পর্ব ঘটে ২০০৭ সালের শেষ দিকে। অক্টোবরে অনুষ্ঠিত প্রেসিডেন্ট নির্বাচনের বৈধতাকে আদালত চ্যালেঞ্জ করলে মোশাররফ প্রধান বিচারপতি ইফতেখার চৌধুরীসহ ষাট বিচারপতিকে বরখাস্ত করেন এবং প্রধান বিচারপতিসহ শীর্ষস্থানীয় বিচারপতিদের গৃহবন্দী করেন। এ অবস্থার বিরুদ্ধে গড়ে ওঠা আন্দোলনের ধারাবাহিকতায় পতন ঘটে মোশাররফের।

২০০৭ সালের এ ঘটনাপ্রবাহ থেকে আদালতের স্বাধীন আচরণের যে লক্ষণ দেখা যায়, তার আরেকটি প্রমাণ পাওয়া যায় ২০১২ সালে, যখন আদালত প্রধানমন্ত্রী ইউসুফ রাজা গিলানির বিরুদ্ধে আদালত অবমাননার অভিযোগে তাঁকে শাস্তি প্রদান করেন এবং শেষ পর্যন্ত তাঁকে পদত্যাগ করতে বাধ্য করেন।

পাকিস্তানের আদালতের ইতিহাসের এ দুই ধারার সঙ্গে যাঁরা পরিচিত, তাঁরা অনুমান করতে সক্ষম হবেন যে গত কয়েক দিনে প্রধান বিচারপতি উমর আতা বান্দিয়াল এবং সুপ্রিম কোর্টের আচরণ গুরুত্বপূর্ণ হলেও তা অভূতপূর্ব নয়। পাকিস্তানে আদালত দেশের রাজনৈতিক শক্তিগুলোর অবস্থান দ্বারা প্রভাবিত হন না, তা দাবি করা যাবে না। কিন্তু ইমরান খানের সরকারের আচরণের সাংবিধানিক দিক বিচারে পাকিস্তানের আদালত অন্য শক্তির দ্বারা প্ররোচিত বা প্রভাবিত—এমন দাবির পক্ষে যুক্তি বা প্রমাণ পাওয়া যাচ্ছে না। আদালত অনাস্থা ভোটের জন্য সময় বেঁধে দিয়েছিলেন, তা পালনে স্পিকারের অনাগ্রহের কারণেই প্রধান বিচারপতি মধ্যরাতে আদালত বসানোর ব্যবস্থা করেছিলেন। অন্যদিকে তেহরিক-ই-ইনসাফ যেন দলত্যাগীদের কারণে পতনের মুখে না পড়ে, সে জন্য আদালত বলেছিলেন, এ অনাস্থা ভোটের সময় সংবিধানের ৬৫(এ) অনুচ্ছেদ বিবেচনায় নিতে হবে। ওই অনুচ্ছেদে দলের বিরুদ্ধে ভোট দিলে সদস্যপদ হারানোর বিধান আছে। ফলে আদালত সংবিধান রক্ষার নামে সরকারের পতনের সব রাস্তা খুলে দিয়েছিলেন তা নয়, বরং আদালতের আচরণ সংবিধানে রক্ষার চেষ্টা বলেই প্রতীয়মান হয়।


আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট