গত ১১ বছরে বিদ্যুতের পাইকারি দাম বেড়েছে ১১৬ শতাংশ এবং গ্রাহক পর্যায়ে ৯০ শতাংশ। ইতিমধ্যেই সরকারের পক্ষ থেকে মন্ত্রী ইঙ্গিত দিয়েছেন, খুব শিগগিরই জ্বালানি ও বিদ্যুতের দাম বাড়বে। এর মানে হচ্ছে এক দশকের বেশি সময় ধরে নাগরিকেরা অর্থ দিয়েই যাচ্ছেন। একবার তাঁদের করের টাকা যাচ্ছে ভর্তুকি হিসেবে, আরেকবার গ্রাহক হিসেবে। এখন মরার উপর খাড়ার ঘা নামতে যাচ্ছে।

জ্বালানি খাতের এই সংকট ইতিমধ্যেই বাজারের ওপর এসে পড়েছে। প্রায় এক বছর ধরেই দ্রব্যমূল্য পরিস্থিতি দরিদ্র ও মধ্যবিত্তদের এমন জায়গায় নিয়ে দাঁড় করিয়েছে, যা তাঁদের জন্যে অস্বিত্বের সংকট তৈরি করেছে। এর সঙ্গে পরিস্থিতির আরও অবনতি ঘটিয়েছে সাম্প্রতিক বন্যা । সরকার দাবি করে যে মূল্যস্ফীতি ৭ দশমিক ৪২ শতাংশ। যাঁরা বাজারে যান, তাঁরা এই হিসাব নিয়ে ঠাট্টা-তামাশা করতেন, কিন্ত পাছে আরও বিপদ হয়, তাই নীরব থাকেন। অর্থনীতিবিদেরা বলেন, মূল্যস্ফীতি অনেক আগেই ১০ শতাংশ ছাড়িয়েছে।

বিদ্যুত ও জ্বালানিসংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট সহায়তার জন্যে আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঋণের আবেদন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এগুলো ক্ষমতাসীনদের উন্নয়নদর্শনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবেই জড়িত। ফলে সেই উন্নয়নদর্শনকে বাদ দিয়ে কেবল বিদ্যুৎ খাতের খুঁটিনাটি আলোচনা প্রকৃত কারণ বুঝতে সাহায্য করবে না, আগামীতে আরও কী ধরনের সংকট আসতে পারে, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যাবে না।

এক দশকের বেশি সময় ধরে উন্নয়নের যে কাহিনি শোনানো হয়েছে, প্রবৃদ্ধির পরিসংখ্যানে বলা হয়েছে, তার দৃশ্যমান স্তম্ভ হচ্ছে দুটি—নিরবিচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ–সরবরাহ এবং অবকাঠামো তৈরি। সরকারের উন্নয়নদর্শনের মোট কথা হচ্ছে দৃশ্যমান বিষয়ে মনোনিবেশ। এগুলোয় সাফল্য মানেই তাদের শাসন সফল। এখন বিদ্যুৎ–সংকটের সবটাই আন্তর্জাতিক বাজার এবং ইউক্রেন-রাশিয়া যুদ্ধের ওপর চাপিয়ে দেওয়া হচ্ছে। কিন্ত গত বছরগুলোয় সরকারের জ্বালানিনীতির বিষয়ে আলোচনায় এই খাতে যে অভাবনীয় লুণ্ঠনের ব্যবস্থা করা হয়েছে এবং এর পরিণতি যে ভালো হবে না, সেটা বারবার স্মরণ করিয়ে দেওয়া হয়েছে। সরকার তাতে কর্ণপাত করেনি।

না শোনার কারণ হচ্ছে, সরকারের অনুসৃত উন্নয়নদর্শনের ভিত্তি হচ্ছে লোকদেখানো ঔজ্জ্বল্য। এই দর্শনে দরিদ্রের কথা বিবেচ্য নয়, দীর্ঘমেয়াদে প্রতিক্রিয়া কী, সেটা বিবেচ্য নয়। উপরন্ত ধনিক শ্রেণির জন্যে সুবিধা প্রদানে সরকারের আগ্রহের অভাব নেই। এই বছরের বাজেটে করপোরেট কর হ্রাসের ব্যবস্থা এর একটি উদাহরণ। অর্থ পাচারকারীদের দায়মুক্তি দেওয়ার ব্যবস্থাও করা হয়েছে। দেশের জ্বালানিনীতির ক্ষেত্রে তার অন্যথা হয়নি। বসিয়ে বসিয়ে কুইক রেন্টালে টাকা ঢালার ইতিহাস সবাই জানেন। এ থেকে কারা সুবিধা পেয়েছেন, তা সবিস্তার বলার দরকার নেই। অত্যন্ত নিম্ন কণ্ঠে হলেও কেউ কেউ স্মরণ করিয়ে দিচ্ছেন যে দেশে প্রয়োজনের চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদন সত্ত্বেও ভারতের আদানি গোষ্ঠীর কাছ থেকে বিদ্যুৎ আমদানি, বিশেষ করে ক্যাপাসিটি চার্জের নামে অর্থ দেওয়ার ২৫ বছরের চুক্তির কথা। আমদানিনির্ভরতা দেশে জ্বালানিসংকটের অন্যতম কারণ।

সরকারের উন্নয়নদর্শনের আরেক স্তম্ভ হচ্ছে অবকাঠামো নির্মাণ। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর থেকেই অবকাঠামো তৈরিকেই উন্নয়ন বলে হাজির করা হচ্ছে। এই উন্নয়নের নামে এমন সব খাতে ব্যয় করা হয়েছে এবং হচ্ছে, যেগুলো একশ্রেণির মানুষের জন্য অর্থ লাভের সুযোগ করে দেয়। কিন্ত এর ভার বইতে হয় সাধারণ মানুষকে। অবকাঠামো খাতের প্রকল্পগুলোর অনেকগুলো এমন যেগুলোর প্রয়োজন প্রশ্নসাপেক্ষ, এমন সব অবকাঠামো প্রকল্প আছে, যেগুলো প্রায় প্রতিদিন আরও বেশি ব্যয়বহুল হয়ে উঠেছে দুর্নীতি ও সময়ক্ষেপণের কারণে। যুক্তরাষ্ট্রভিত্তিক ইনস্টিটিউট ফর এনার্জি ইকোনমিকস অ্যান্ড ফিন্যান্সিয়াল অ্যানালিস্টসের (আইইইএফএ) প্রতিবেদন থেকে জানা গেছে, ‘জাপানের অর্থায়নে বাংলাদেশে কয়লাচালিত মাতারবাড়ী বিদ্যুৎকেন্দ্রের খরচ চীনের তুলনায় বৃদ্ধি পাচ্ছে আট থেকে দশ গুণ। এমনকি এশিয়ার সবচেয়ে ব্যয়বহুল কয়লাচালিত বিদ্যুৎকেন্দ্রের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে এই প্রকল্প’। যুগান্তর, ৩ জুন ২০২২)। নির্মাণাধীন ঢাকার প্রথম মেট্রো ‘এমআরটি-৬’- সারা পৃথিবীর দ্বিতীয় ব্যয়বহুল মেট্রোরেলে পরিণত হয়েছে (বণিক বার্তা, জানুয়ারি ১৫, ২০২২)। মেগা প্রজেক্ট থেকে শুরু করে একেবারে গ্রামাঞ্চলের কালভার্ট নির্মাণ পর্যন্ত কোথাও এর ব্যতিক্রম নেই। ফলে এসব খবর এখন গা–সওয়া হয়ে গেছে।

এসব করতে গিয়ে সরকার ক্রমাগত ঋণ নিচ্ছে, যা প্রতিদিন নাগরিকেরা বিভিন্ন করের মাধ্যমে শোধ করছেন। এবারের বাজেটেও তার প্রতিফলন দেখতে পাই। বাজেটে সবচেয়ে বেশি অর্থ (৮০ হাজার ৩৭৫ কোটি টাকা) বরাদ্দ করা হয়েছে সুদ পরিশোধে, যা মোট রাজস্ব বাজেটের ১৯ দশমিক ২০ শতাংশ। এর মধ্যে ৭৩ হাজার ১৭৫ কোটি টাকা চলে যাবে অভ্যন্তরীণ ঋণের সুদ পরিশোধে। বাকি ৭ হাজার ২০০ কোটি টাকা ব্যয় হবে বিদেশি ঋণের সুদ শোধে। যাঁরা বাংলাদেশের ইতিমধ্যে নেওয়া ঋণগুলোর হিসাব জানেন, তাঁরা এটাও জানেন যে সুদ ফেরত দেওয়ার পরিমাণ আগামীতে আরও বাড়বে।

ইতিমধ্যে বাংলাদেশের অর্থনীতির সংকট সবার কাছেই দৃশ্যমান হয়ে উঠেছে। যেসব বিষয় নিয়ে এত দিন গর্ব করা হতো, সেগুলোয় টান পড়তে শুরু করেছে। তার অন্যতম উদাহরণ হচ্ছে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ পরিস্থিতি। ঈদের আগে প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্সের কারণে দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ‘সাময়িক স্বস্তি’ ফিরে এসেছে এই অর্থে যে তা ৪০ বিলিয়ন ডলারের নিচে নেমে যায়নি। এই হিসাব সরকারের দেওয়া এবং এই অঙ্ক নিয়ে প্রশ্ন তোলা যায়। কেননা এর মধ্যে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের একটা ফাঁকি আছে। এই ফাঁকির কথা সরকারের সমালোচকদের নয়, আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফের।

জুন মাসে বাংলাদেশ ব্যাংক হিসাব দিয়েছিল যে রিজার্ভের পরিমাণ ৪১ দশমিক ৭ বিলিয়ন ডলারের মতো। আইএমএফ এ তথ্য নিয়ে আপত্তি করেছিল। কারণ, এতে রপ্তানি উন্নয়ন তহবিল বা এক্সপোর্ট ডেভেলপমেন্ট ফান্ড (ইডিএফ) নাম দিয়ে বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ থেকে সরকারের আদেশে বাংলাদেশ ব্যাংক যে সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলারের ‘রিফাইন্যান্সিং স্কিমের’ অধীনে বিভিন্ন ব্যাংকের মাধ্যমে দেশের প্রভাবশালী রপ্তানিকারকদের বৈদেশিক মুদ্রায় ঋণ দিয়েছে, সেটাকেও ধরা হয়েছিল। আইএমএফ বলছে, বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে এই অর্থ অন্তর্ভুক্ত করা যথাযথ নয়। এর মানে হচ্ছে, বাংলাদেশের প্রকৃত বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ জুন মাসে ছিল ৩৪ দশমিক ২ বিলিয়ন ডলার। এখন যে ৪০ বিলিয়ন ডলার বলা হচ্ছে, তা থেকে এই ৭ বিলিয়ন ডলার বাদ দিলে কত দাঁড়ায়, সেই হিসাব সবাই করতে পারেন। আরও উদ্বেগের বিষয় হচ্ছে, এই অর্থ আগামীতে কী হবে? অর্থনীতিবিদ মইনুল ইসলাম বলছেন, ‘এই সাড়ে সাত বিলিয়ন ডলার বৈদেশিক মুদ্রার অবয়বে আর দেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভে ফিরে আসার সম্ভাবনা নেই বললেই চলে’ (বণিক বার্তা, ২ জুলাই ২০২২)।

এসব ফাঁকিঝুঁকি সত্ত্বেও গত ১১ মাসের হিসাব দেখলে বোঝা যায় যে রিজার্ভের পরিমাণ কমছেই। ১১ মাসে বাণিজ্য ঘাটতি আগের সব রেকর্ড ছাপিয়ে গেছে। এটাও লক্ষণীয় যে রেমিট্যান্স গত বছরের তুলনায় এ বছর কমেছে ১৯ শতাংশ। এই অবস্থার অচিরেই পরিবর্তন হবে না। সেটা সরকার যে বুঝতে পারছে, ফলে তাঁরা এখন বিশ্বব্যাংক এবং আইএমএফের দ্বারস্থ হয়েছে। বাজেটসহায়তা হিসেবে সরকার বিশ্ব ব্যাংকের কাছ থেকে সুদমুক্ত এক বিলিয়ন ডলার এবং আইএমএফের কাছ থেকে কম সুদে সাড়ে চার বিলিয়ন ডলার ঋণ চেয়েছে। এই ঋণ নেওয়া হবে আগামী তিন বছরে। আলোচনায় যথেষ্ট অগ্রগতি হয়েছে, ১২ জুলাই আইএমএফের প্রতিনিধিদের সঙ্গে ঢাকায় বৈঠক হওয়ার কথা। কী শর্তে সরকার এই ঋণ নেবে, সে বিষয়ে নাগরিকেরা অবগত নন। এই ঋণের ব্যবহার কতটা স্বচ্ছ থাকবে, তা সহজেই অনুমেয়!

বিদ্যুত ও জ্বালানিসংকট, মূল্যস্ফীতি এবং বাজেট সহায়তার জন্যে আইএমএফের কাছে বাংলাদেশের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় ঋণের আবেদন কোনো বিচ্ছিন্ন বিষয় নয়। এগুলো ক্ষমতাসীনদের উন্নয়নদর্শনের সঙ্গে প্রত্যক্ষভাবেই জড়িত। ফলে সেই উন্নয়নদর্শনকে বাদ দিয়ে কেবল বিদ্যুৎ খাতের খুঁটিনাটি আলোচনা প্রকৃত কারণ বুঝতে সাহায্য করবে না, আগামীতে আরও কী ধরনের সংকট আসতে পারে, তারও ইঙ্গিত পাওয়া যাবে না। বরং মূল আলোচনার জায়গা থেকে দৃষ্টি অন্যত্র সরিয়ে দেবে। ইংরেজিতে প্রচলিত প্রবাদের অনুকরণে বলি, ‘গাছ দেখতে গিয়ে বনের চেহারা ভুলে যাওয়া’র পথে অগ্রসর হওয়ার এটাই হচ্ছে উদাহরণ। অর্থনীতি নিয়ে যাঁরা আলোচনা করছেন, পুরো বনের ছবিটা বোঝা এবং জনগণকে বোঝানো তাঁদের দায়িত্ব।

আলী রীয়াজ যুক্তরাষ্ট্রের ইলিনয় স্টেট ইউনিভার্সিটির রাজনীতি ও সরকার বিভাগের ডিস্টিংগুইশড প্রফেসর, আটলান্টিক কাউন্সিলের অনাবাসিক সিনিয়র ফেলো এবং আমেরিকান ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশ স্টাডিজের প্রেসিডেন্ট

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন