বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

তবে তেমন নিরীহ ছবি এটা একেবারেই নয়। বরং এমন এক ছবি, আমাদের বিবেককে যেটা সহজেই আলোড়িত করতে পারে এবং এমনকি অনুভূতিপ্রবণ মানুষ আমরা হলে চোখের জলেও আমাদের ভাসিয়ে দিতে পারে ছবির সেই অজানা বালক। ফলে জাপানে নাগাসাকি শহরের ওপর আণবিক বোমা হামলার ৭৬তম বার্ষিকীতে নাগাসাকির এই বালককে নিয়ে কিছু বলার মধ্য দিয়ে স্মরণ করা যেতে পারে সেদিনের সেসব হতভাগ্য শহরবাসীকে, ইতিহাসের ভয়ংকর এক মর্মান্তিকতার শিকার দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের একেবারে শেষ দিকে যাদের হতে হয়েছিল।

ইতিহাসবিদদের অনেকেই আজকাল এ রকম ভাষ্য দিয়ে দ্বিমত পোষণ করেন না যে জাপানের ওপর আণবিক বোমা নিক্ষেপ ছিল একেবারেই বিবেকবর্জিত এ রকম এক কাজ, যার প্রয়োজন আদৌ ছিল না। বিশেষ করে নাগাসাকি শহরের ওপর হিরোশিমার তিন দিন পর নিক্ষিপ্ত দ্বিতীয় বোমা সার্বিক অর্থেই ছিল একেবারে অযৌক্তিক এক পদক্ষেপ, ঠান্ডা মাথায় মানুষ খুন করার বাইরে অন্য কোনো পরোক্ষ উদ্দেশ্য যার পেছনে খুঁজে পাওয়া মুশকিল।

১৯৪৫ সালের আগস্ট মাসের শুরুতে জাপান এমনিতেই যুদ্ধে কোণঠাসা হয়ে পড়েছিল। জাপানের নিঃশর্ত আত্মসমর্পণ ছিল সময়ের ব্যাপার মাত্র। তবে তারপরও কেন পরপর দুটি আণবিক বোমা জাপানের দুই শহরের ওপর বর্ষণ করতে হয়েছিল, তার কারণ খুঁজে দেখার প্রচেষ্টায় অনেক গবেষক স্পষ্ট যে ইঙ্গিত দিয়ে থাকেন, তা হলো যুদ্ধ শেষ হয়ে যাওয়ার পর শুরু হতে যাওয়া শীতল যুদ্ধ সম্পর্কে আঁচ করতে পেরে যুক্তরাষ্ট্রের নেতৃত্ব সোভিয়েত ইউনিয়নকে নিজেদের সামরিক শক্তি সম্পর্কে আগে থেকে সতর্ক করে দিতে চেয়েছিল বলেই জাপানকে বলির পাঁঠার শিকার হতে হয়।

তবে সেই বিতর্কে না গিয়েও বলতে হয় দুই বোমা হামলায় হিরোশিমায় তাৎক্ষণিকভাবে প্রাণ হারিয়েছিলেন এক লাখের কিছু বেশি মানুষ এবং নাগাসাকিতে সেই সংখ্যা ৭০ হাজার ছাড়িয়ে গিয়েছিল। নাগাসাকির তুলনামূলক কম প্রাণহানির পেছনে আবহাওয়ার অনুকম্পা সেদিন কাজ করেছে। তবে দুই শহরেই বোমা থেকে ছড়িয়ে পড়া তেজস্ক্রিয়তার সংস্পর্শে আসার কারণে অনেক মানুষকে দীর্ঘদিন ধরে অসুস্থতায় ভুগে প্রাণ হারাতে হয়েছে এবং অনেকে বৃদ্ধ হয়ে যাওয়ার পর এখন পর্যন্ত নানা রকম শারীরিক সমস্যায় ভুগছেন।

সেদিনের সেই মর্মান্তিকতা কতটা গভীর ছিল, তার অন্তত কিছুটা আঁচ পাওয়ার জন্য আসুন আমরা ফিরে যাই সেই বালকের ছবির ঘটনায়। ১৯৪৫ সালের অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে, অর্থাৎ বোমা হামলার মাস দু-এক পরে নাগাসাকি শহরের কোনো এক জায়গায় ছবিটি তুলেছিলেন মার্কিন বিমানবাহিনীতে কর্মরত ফটোগ্রাফার, মেরিন সার্জেন্ট জো ও’ডনেল। কিউশু দ্বীপের উত্তরাঞ্চলে একই বছর সেপ্টেম্বর মাসের শেষ দিকে তাঁকে পাঠানো হয়েছিল আত্মসমর্পণের পর জাপানের সব রকম যুদ্ধাস্ত্র ধ্বংস করে ফেলার সচিত্র দলিল ধরে রাখার জন্য। তিন মাসের কিছু কম সময় কিউশু দ্বীপের সাসেবো শহরে তিনি অবস্থান করেছিলেন এবং সরকারি দায়িত্ব পালনের পাশাপাশি কয়েকবার নাগাসাকিতে গিয়ে বোমা হামলার ক্ষয়ক্ষতির ছবিও তিনি তখন তুলেছেন। সে রকম ছবি তোলার একপর্যায়ে তড়িঘড়ি তৈরি করে নেওয়া একটি শ্মশানের কাছে হঠাৎ করে এই বালকের দেখা তিনি পান। পাঠক, এবার ভালো করে আরও একবার সেই ছবির দিকে তাকিয়ে দেখুন।

বালকের বয়স সাত কিংবা আট বছরের বেশি হবে না। যে হাফপ্যান্ট ও জামা সে পরে আছে, তা জরাজীর্ণ। তবে পোশাকের সঙ্গে বেল্ট দিয়ে শক্ত করে বালকের পিঠে বাঁধা আছে একটি শিশু, মুখটা যার হেলে পড়েছে একদিকে। ছবির দেখায় সেই শিশু ঘুমিয়ে আছে বলেও আমাদের মনে হতে পারে। তবে এতে অবশ্য ভুল কিছু নেই। শিশুরা তো মৃত্যুতেও ঘুমিয়ে থাকে, হয়তোবা যে জীবনে পরিপূর্ণতা লাভের সুযোগ পায়নি বলে সেই জীবনের জন্য আক্ষেপ নিয়ে ওদের এই ঘুমিয়ে পড়া।

যেহেতু মার্কিন সামরিক বাহিনীর দায়িত্ব পালনের সময় তোলা সেই ছবি, ফলে ও’ডনেল অনেক দিন ধরে সেটা প্রকাশ করেননি এবং ১৯৮০-এর দশকের মাঝামাঝি সময়ে ছবিটি প্রথম প্রকাশিত হওয়ার পর থেকে এখনো আলোড়ন ফেলে যাচ্ছে এই ছবি। ২০০৭ সালে মারা যাওয়ার আগে দেওয়া একাধিক সাক্ষাৎকারে ছবি এবং ছবির সেই বালক সম্পর্কে যে তথ্য ও’ডনেল দিয়েছিলেন, তা থেকে আমরা জানতে পারি বালকের পিঠে বেঁধে রাখা সেই শিশু ছিল ওর ভাই কিংবা বোন। মৃত সেই শিশুর সৎকার করাতে শ্মশানে বালকের আগমন। পিঠে মৃত অনুজকে বেঁধে রেখে সটান সে দাঁড়িয়ে আছে গভীর কোনো অনুভূতি ছাড়াই। যেন মৃত সেই অনুজের প্রতি এভাবেই সে জানাচ্ছে শেষ শ্রদ্ধা। আরও একটু ভালো করে বালকের মুখের দিকে তাকালে আর যা আমাদের চোখে পড়বে, তা হলো চোখ আর মুখে থেকে যাওয়া গভীর বেদনার ছাপ। আমরা ধরে নিতে পারি বোমা হামলার ঠিক পরপর বালক এবং ওর অনুজ বেঁচে গেলেও বেঁচে নেই ওদের মা-বাবা কিংবা অন্য কোনো নিকটাত্মীয়। কেননা, তাঁরা কেউ বেঁচে থাকলে অল্প বয়সী এই বালককে বহন করতে হতো না এতটা বড় এক দায়িত্ব।

শ্মশানের লোকজন একসময় কাছে এসে বালকের কাঁধ আর পেটের সঙ্গে বেঁধে রাখা বেল্ট খুলে নিয়ে শিশুটিকে তুলে নেয় এবং বালক এদের পেছনে হেঁটে গিয়ে কয়লার আগুনে জ্বলতে থাকা চিতার সামনে এসে দাঁড়ায়। শ্মশানকর্মীরা এরপর যত্নের সঙ্গে শিশুটিকে আগুনে তুলে দিলে একসময় আওয়াজ তুলে পুড়তে থাকে শিশুর দেহ।

ছবিটি যেহেতু তোলা হয়েছে অক্টোবর মাসের মাঝামাঝি সময়ে, ফলে আমরা ধরে নিতে পারি কষ্টে বেঁচে থাকা সেই সময়ে মৃত সেই ভাই কিংবা বোনকে বাঁচিয়ে রাখতে চেষ্টার কোনো ত্রুটি সে করেনি। তবে শেষ রক্ষা করা সম্ভব হয়নি বলে মরদেহের সৎকারের জন্য শ্মশানে সেটাকে ওর নিয়ে আসা।

এরপরে কী হয়েছিল সেই বর্ণনাও ও’ডনেল দিয়ে গেছেন, এই আশায় যে পরে কোনো এক সময়ে হয়তো পাওয়া যাবে সেই বালকের সন্ধান। জাপানি ভাষা জানা ছিল না বলে কোনো কথাই ফটোগ্রাফার সেদিন বালকের সঙ্গে বলতে পারেননি। অস্থায়ী সেই শ্মশানে সেদিন ছিল মানুষের ভিড় এবং লাইনে দাঁড়িয়ে বালক অপেক্ষা করছিল ওর পালা আসার। শ্মশানের লোকজন একসময় কাছে এসে বালকের কাঁধ আর পেটের সঙ্গে বেঁধে রাখা বেল্ট খুলে নিয়ে শিশুটিকে তুলে নেয় এবং বালক এদের পেছনে হেঁটে গিয়ে কয়লার আগুনে জ্বলতে থাকা চিতার সামনে এসে দাঁড়ায়। শ্মশানকর্মীরা এরপর যত্নের সঙ্গে শিশুটিকে আগুনে তুলে দিলে একসময় আওয়াজ তুলে পুড়তে থাকে শিশুর দেহ।

আগুনের শিখা একসময় ওপরে উঠে যায় এবং সেই আলো বালকের মুখের ওপর এসে পড়লে তাকে দেখা যায় সব রকম অনুভূতি চেপে রেখে সটান দাঁড়িয়ে থাকতে। যেন সে জানাচ্ছে শেষ শ্রদ্ধা তার সেই ভাই কিংবা বোনের প্রতি এবং হয়তো মনে মনে ভাবছে মৃত্যু এসে মুক্ত করে গেছে সেই শিশুকে মানব বিশ্বের যন্ত্রণা থেকে। আগুন যতক্ষণ জ্বলছিল, বালক ততক্ষণ ছিল এর সামনে সটান দাঁড়িয়ে। এরপর একসময় ঘুরে সে পথ ধরে হাঁটা দেয় এবং সেই চলায় একবারের জন্যও সে পেছনে ফিরে তাকায়নি। আর এভাবেই হারিয়ে গিয়ে ইতিহাসে মিশে যায় ছবির সেই বালক।

২০১৭ সালে পোপ ফ্রান্সিস নাগাসাকি সফর করার সময় শান্তির গুরুত্ব যেন মানুষ অনুধাবন করতে সক্ষম হয়, সে জন্য সেই বালকের পিঠে বেঁধে রাখা অনুজের ছবিসহ একটি বার্তা প্রচার করেছিলেন। এরপর থেকে বালককে নিয়ে নতুন করে উৎসাহের সৃষ্টি জাপানে হয় এবং অনেকেই বালকের পরিচয় খুঁজে বের করার চেষ্টা চালান। জাপানের নাগরিক সম্প্রচার কেন্দ্র গত বছর সেই ছবি এবং বালকের পরিচয় খুঁজে পাওয়া নিয়ে চমৎকার একটি প্রামাণ্য ছবি তৈরি করেছে। তবে পাওয়া যায়নি সেই বালকের সঠিক কোনো পরিচয়।

নাগাসাকির সেদিনের সেই বালক পরিচয়হীন থেকে গেলেও বলিষ্ঠ এক বার্তা সে আমাদের জন্য রেখে গেছে। সেই বার্তা হচ্ছে যুদ্ধের অর্থহীনতার বার্তা। যুদ্ধ এবং হানাহানিতে সবচেয়ে বেশি কষ্ট পেতে হয় জীবন যাদের এখনো প্রস্ফুটিত হয়নি তাদের। যে বয়স মাঠে দাবড়ে বেড়ানো কিংবা মা-বাবার নেওটা হয়ে এটা-সেটা চাওয়ার আবদার করার বয়স, সেই বয়সে পিঠে মৃত ছোট বোনকে নিয়ে শ্মশানের দিকে হেঁটে যাওয়ার চেয়ে মর্মান্তিক কোনো কিছু তো হতে পারে না।

বালক হয়তো পরে বেঁচেছিল বুকের গভীরে সেই বেদনাকে চেপে রেখে, অথবা সে মরে গিয়েছিল এর অল্প কিছুদিন পর। তবে এর কোনোটাই এখন আর সেভাবে প্রাসঙ্গিক নয়, যতটা প্রাসঙ্গিক তার কাছ থেকে আসা বেদনার বার্তা। নাগাসাকির বোমা হামলার বার্ষিকীতে অসহায় সেই বালকের কথা স্মরণ করে নীরবে চোখের জল ফেলার বাইরে যুদ্ধের বিরুদ্ধে আমাদের প্রত্যয় দৃঢ় করে নিতে পারার মধ্য দিয়েই সম্ভব হবে সেই বালকের মতো অসহায় যারা যুদ্ধ আর বোমা হামলার শিকার, তাদের প্রতি আমাদের শ্রদ্ধা জানানো।

মনজুরুল হক জাপান প্রবাসী শিক্ষক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন