সেদিনের সমাবেশে আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক বিএনপিকে নিয়ে দেশবাসীকে একটি ‘সুসংবাদ’ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, ‘বিএনপির আন্দোলনের কথা শুনে মানুষ এখন হাসে। তারা গত ১৩ বছরে ২৬ বার আন্দোলনের ডাক দিয়ে ব্যর্থ হয়েছে। ভবিষ্যতেও সফল হবে না।’ আওয়ামী লীগের নেতা-মন্ত্রীরা সব সময় বলে আসছেন, বিএনপির আন্দোলন করার মুরোদ নেই। তারা জনগণ দ্বারা পরিত্যক্ত। যে দলের আন্দোলন করার মুরোদ নেই ও জনগণ দ্বারা পরিত্যক্ত, সেই দল নিয়ে তাঁরা এত বিচলিত কেন?

নোয়াখালীতে ওবায়দুল কাদেরের ঈদের শুভেচ্ছা বিনিময়ের খবর যখন গণমাধ্যমে দেখলাম, তখন বরিশালে ভিন্ন ধরনের শুভেচ্ছা বিনিময়ের খবর নজরে এল। বরিশাল-১ আসনের সাবেক সাংসদ ও বিএনপির কেন্দ্রীয় নেতা জহির উদ্দিন স্বপন ঈদের দিন নিজ নির্বাচনী এলাকায় যেতে চেয়েছিলেন স্বজন ও দলের নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে। এই বার্তা রাষ্ট্র হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে উপজেলার সরিকল বাজারে স্থানীয় আওয়ামী লীগ ও সহযোগী সংগঠনের কয়েক শ নেতা-কর্মী সমাবেশ করে তাঁকে প্রতিরোধের ঘোষণা দেন। এ অবস্থায় সহিংসতা এড়াতে জহির উদ্দিন স্বপন বাড়িতে যাওয়ার কর্মসূচি বাতিল করেন। এর আগেও এমনটি হয়েছে। একে বলা যায় বিরস শুভেচ্ছা বিনিময়।

অন্যদিকে ফেনীতে বিএনপির সাবেক সাংসদ ভিপি জয়নাল আবেদীনের বাড়িতে যাওয়ার পথে স্থানীয় বিএনপি নেতা-কর্মীদের ওপর হামলা চালিয়েছেন সেখানকার যুবলীগের নেতা-কর্মীরা। হামলাকারীরা বিএনপির নেতা-কর্মীদের পিটিয়ে ও কুপিয়ে মারাত্মক জখম করার পর পুলিশেও সোপর্দ করেন বলে পত্রিকায় খবর এসেছে। ২০১৮ সালের নির্বাচনের আগে ফেনীতে গিয়ে দেখলাম, ভিপি জয়নালের বাড়ির চারপাশে অবরুদ্ধ অবস্থা। বিএনপি, ছাত্রদল বা যুবদলের নেতা-কর্মী সেখানে গেলেই আওয়ামী লীগের অতি উৎসাহী কর্মীরা তাঁদের মারধর করে পুলিশের কাছে হস্তান্তর করেন। নির্বাচনের সোয়া তিন বছর পরও সেই ধারা অব্যাহত আছে।

জহির উদ্দিন স্বপন একসময় বাম রাজনীতি করতেন। বামপন্থা থেকে তাঁর ডানপন্থায় যাওয়া অনেকেই পছন্দ করেননি। কিন্তু তিনি ঈদের দিন নিজ নির্বাচনী এলাকায় স্বজন ও নেতা-কর্মীদের সঙ্গে শুভেচ্ছা বিনিময় করতে যেতে পারবেন না কেন?

নির্বাচনের আগে দুই বড় দলই নিজ নিজ জোটের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা বৃহত্তর জোট করে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবেন। আওয়ামী লীগের নেতারা আশা করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব দল তঁাদের জোটে আসবে। এখন দেখার বিষয় কোন জোট কত বেশি দলের সমর্থন আদায় করতে পারে।

ঈদ সামনে রেখে গৌরনদীতে আওয়ামী লীগের নেতারা যখন বিএনপির নেতাকে প্রতিরোধ করেছেন, ফেনীতে বিএনপির নেতা-কর্মীদের মারধর করছেন, তখন নিজ দলের মধ্যে কী চলছে? ঈদের ছুটিতে তিনটি স্থানে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে অন্তত সাতজন নিহত হয়েছেন। প্রথম আলোর খবর অনুযায়ী, ঈদের আগের দিন কুষ্টিয়া সদর উপজেলায় আধিপত্য বিস্তার নিয়ে আওয়ামী লীগের দুই পক্ষে সংঘর্ষে চারজন নিহত হন। সোমবার বিকেলে ঝাউদিয়া ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি কেরামত উল্লাহ এবং আওয়ামী লীগ-সমর্থিত সাবেক ইউনিয়ন পরিষদ সদস্য ফজলুর রহমানের অনুসারীদের মধ্যে এই সংঘর্ষ হয়। ফরিদপুরের বোয়ালমারীতেও পূর্ববিরোধ ও বিদ্যালয় ব্যবস্থাপনা কমিটির নির্বাচনে পরাজয়ের জেরে দুজনকে কুপিয়ে হত্যা করেছে প্রতিপক্ষ। শরীয়তপুর সদর উপজেলার চিতলিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দুই গ্রুপের সংঘর্ষে ওয়ার্ড আওয়ামী লীগের সভাপতি আবদুল কুদ্দুস ব্যাপারী নিহত হন।

ঈদের কয়েক দিন আগে নিউমার্কেট এলাকায় ব্যবসায়ী ও ঢাকা কলেজ ছাত্রলীগের মধ্যকার সংঘর্ষে দুই তরুণ মারা যান। পুলিশের তদন্ত ও ভিডিও ফুটেজে দেখা যায়, ঢাকা কলেজের ছাত্রলীগের নেতা-কর্মীরা পিটিয়ে ও কুপিয়ে তাঁদের হত্যা করেছেন।

‘অতি সবল’ আওয়ামী লীগের নেতারা ‘অতি দুর্বল’ বিএনপিকে নিয়ে অহোরাত্র ব্যস্ত না থেকে যদি নিজের ঘরের দিকে নজর দিতেন, তাহলে হয়তো ক্ষমতার ছত্রচ্ছায়ায় এ রকম দানব তৈরি হতে পারত না, আর এতগুলো মানুষকে জীবনও দিতে হতো না।

নির্বাচনের পৌনে দুই বছর বাকি থাকতেই নির্বাচনকেন্দ্রিক রাজনীতি জমে উঠেছে, চলছে নানামুখী তৎপরতা। আওয়ামী লীগ ডিসেম্বরের জাতীয় সম্মেলন ও পরবর্তী জাতীয় নির্বাচন সামনে রেখে দল গোছানোর চেষ্টা করছে। শুক্রবার গণভবনে কেন্দ্রীয় কমিটি বৈঠকে বসেছে। প্রায় প্রতিটি জেলা ও উপজেলায় কমিটি নিয়ে ক্ষমতাসীন দলে অন্তর্বিরোধ, পাল্টাপাল্টি গ্রুপিং আছে। নতুন সাধারণ সম্পাদক নিয়েও বাতাসে নানাজনের নাম ভেসে বেড়াচ্ছে।

প্রধান বিরোধী দল বিএনপি আন্দোলনের আওয়াজ তোলার পাশাপাশি দল গোছানোর চেষ্টা করছে। কিন্তু কেন্দ্রীয় কমিটি থেকে শুরু করে, বিভাগীয় ও জেলা পর্যায়ে সাম্প্রতিক রদবদলের যৌক্তিকতা নিয়েও প্রশ্ন উঠেছে। এ বিষয়ে বিএনপির একাধিক নেতার দৃষ্টি আকর্ষণ করলে তঁারা বলেন, ‘আমরা কিছু জানি না। সব সিদ্ধান্ত আসে লন্ডন থেকে।’ তাঁরা এ–ও স্বীকার করছেন, সব রদবদলও ঠিক হয়নি। কিন্তু এই ঠিক কথা বলার সাহস কারও নেই।

এরই প্রেক্ষাপটে মঙ্গলবার রাতে বিএনপির জ্যেষ্ঠ নেতারা খালেদা জিয়ার সঙ্গে দেখা করেছেন এবং দীর্ঘ সময় কথা বলেছেন। খালেদা জিয়ার শারীরিক অবস্থা আগের চেয়ে ভালো। তিনি এখন পত্রিকা পড়তে পারেন বলে দলের মহাসচিব জানিয়েছেন। সে ক্ষেত্রে তঁাদের আলোচনা কুশল বিনিময়ে সীমাবদ্ধ ছিল বলে মনে হয় না।

নির্বাচনের আগে দুই বড় দলই নিজ নিজ জোটের পরিধি বাড়ানোর চেষ্টা করছে। বিএনপির নেতারা বলেছেন, তাঁরা বৃহত্তর জোট করে আন্দোলনের মাধ্যমে সরকারকে পদত্যাগে বাধ্য করবেন। আওয়ামী লীগের নেতারা আশা করেন, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষের সব দল তঁাদের জোটে আসবে। এখন দেখার বিষয় কোন জোট কত বেশি দলের সমর্থন আদায় করতে পারে।

বাম গণতান্ত্রিক জোট এত দিন আওয়ামী লীগ ও বিএনপি থেকে সমদূরত্বে থাকার নীতি নিয়েছিল। অতি সম্প্রতি সেই জোটের কোনো কোনো শরিক সেই নীতি থেকে সরে গিয়ে আলাদা জোট করতে তৎপর। ঈদের আগে ডা. জাফরুল্লাহ চৌধুরীর পৌরোহিত্যে একটি বৈঠকও করেছেন তঁারা। ইসলামি দলগুলোর মধ্যেও টানাপোড়েন চলছে।

কোনো দল স্বপক্ষ ত্যাগ করেছে কিংবা করার চেষ্টায় আছে। এই রাজনৈতিক অস্থিরতার মধ্যে সবচেয়ে সুবিধাজনক অবস্থায় আছে জাতীয় পার্টি। আওয়ামী লীগ ১৪ দলের শরিকদের চেয়ে কৌশলগত মিত্র হিসেবে জাতীয় পার্টিকে সঙ্গে রাখতে বেশি আগ্রহী। আবার বিএনপিও তাদের সঙ্গে অনানুষ্ঠানিক আলোচনা চালাচ্ছে বলে রাজনৈতিক মহলে গুঞ্জন আছে। সে কারণেই কি জাতীয় পার্টির চেয়ারম্যান জি এম কাদের বলেছেন, তঁারা অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা নেবেন?

সোহরাব হাসান প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি

[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন