বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় প্রশাসনের এই সিদ্ধান্ত সুষ্ঠুভাবে বাস্তবায়নের জন্য সংশ্লিষ্ট সবাইকে সর্বোচ্চ সহায়তা দেওয়া প্রয়োজন। এবারে পরীক্ষা ভালোভাবে সম্পন্ন করা সম্ভব হলে আগামী বছরে অন্যান্য বিশ্ববিদ্যালয়ও এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা গ্রহণ করতে পারবে। শিক্ষার্থীরা কীভাবে পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করলে সবচেয়ে কম ভোগান্তিতে ভালোভাবে পরীক্ষা দিতে পারেন, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর তো সেই ভাবনাই করা উচিত সবার আগে। বিলম্বে হলেও এ বছর তার বিস্তর প্রস্তুতি দেখা যাচ্ছে। এর আগে গুচ্ছ পদ্ধতিতে কয়েকটি প্রকৌশল এবং কৃষি বিশ্ববিদ্যালয় পরীক্ষা গ্রহণ করেছিল। এ বছর সেই পরীক্ষা পদ্ধতিতে যুক্ত হয়েছে মোট ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়।

১ অক্টোবর থেকে শুরু হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা। গুচ্ছ পদ্ধতির ২০টি বিশ্ববিদ্যালয়ের পরীক্ষা হবে ১৭, ২৪ অক্টোবর ও ১ নভেম্বর। বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি পরীক্ষায় প্রতিবছর ভর্তি-ইচ্ছুকদের অবর্ণনীয় কষ্টের কথা কম–বেশি আমরা সবাই জানি। এমনও হয়েছে, শুক্রবার ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ভর্তি পরীক্ষা শেষ করে শনিবার চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ে, রোববার রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ে, সোমবার পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে যেতে হয়েছে পরীক্ষা দেওয়ার জন্য। পরীক্ষার সময়টুকু বাদ দিয়ে একটানা সাত দিন বাসে বসে থাকতে হয়েছে অনেক পরীক্ষার্থীকে। ৪০-৫০ জন অভিভাবক-শিক্ষার্থী মিলে বাস রিজার্ভ করে সাত-আট দিন একটানা পরীক্ষার জন্য ছুটতে হয়েছে দেশের এ মাথা থেকে ও মাথা। সেই ভোগান্তি এ বছর অনেক কমে আসবে। গুচ্ছ পদ্ধতির আওতায় এক পরীক্ষার মাধ্যমে ২০টি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি সম্পন্ন হবে। পরীক্ষার্থীরা তাদের কাছের বিভাগীয় বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা দিতে পারবে। অর্থ, সময়, শ্রম সব সাশ্রয় হবে। অনেক সময় পরপর দুই বিশ্ববিদ্যালয়ের দূরত্ব এত বেশি ছিল যে, গিয়ে আর পরীক্ষা দেওয়া সম্ভব হতো না। এক দিনে একাধিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পরীক্ষা হওয়ারও দৃষ্টান্ত রয়েছে। গুচ্ছ পদ্ধতি হলে এসব সমস্যায় পড়তে হবে না।

অর্থবিত্তশালী পরিবারের ভর্তি–ইচ্ছুকেরা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ না পেলে বিদেশে কিংবা বিশাল অঙ্কের টাকা নিয়ে বেসরকারি প্রতিষ্ঠানের দ্বারস্থ হয়। গরিব শিক্ষার্থীদের স্বপ্ন থাকে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার। অনেক বিত্তশালী পরিবারের মেধাবী সন্তানও যে পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার জন্য পরম-চরমতম চেষ্টা করে না, তা নয়। নিম্ন আয়ের পরিবারের সন্তানদের যারা পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়ার স্বপ্ন দেখে বা এ ছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নেই, আর্থিক সংকটের মধ্যেও ধারকর্জ করে ভর্তি লড়াইয়ে নামতে হয় তাদের। মেধার পরীক্ষার পাশাপাশি তাদের ভর্তি পরীক্ষার টাকা সংগ্রহ করার মতো কঠিন পরীক্ষাও দিতে হয়। যে মা–বাবা দিনে আনেন দিন খান, তাঁদের পক্ষে সন্তানের ভর্তি পরীক্ষার টাকার সংস্থান করা অসম্ভব হয়ে পড়ে। এনজিও থেকে ঋণ নিয়ে কিংবা উচ্চ সুদে মহাজনদের কাছ থেকে টাকা নিয়ে যে কটা বিশ্ববিদ্যালয়ে সম্ভব হয় পরীক্ষা দেয়। কখনো কখনো পোষা গবাদিপশুও বিক্রি করতে হয়।

অনেক শিক্ষার্থী শুধু যাতায়াতের টাকার অভাবে আবেদন করেও পরীক্ষা দিতে যেতে পারে না। আর যাদের আবেদনেরই টাকা থাকে না, তাদের পক্ষে অনেক প্রতিষ্ঠানে পরীক্ষার কথা ভাবা বাতুলতা মাত্র। তারা তাদের নিয়তির কাছে নিজেদের সঁপে দেয়। এ বছর এ রকম অনেকেই অনেকগুলো বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির পরীক্ষা দিতে পারবে।

এ বছর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঁচটি ইউনিটে প্রায় সোয়া তিন লাখ পরীক্ষার্থী পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় আগামী বছরগুলোতে এই পদ্ধতিতে পরীক্ষা নেওয়ার ঘোষণা আগেই দিলে পরীক্ষার্থী সংখ্যা আরও বাড়বে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষসহ গুচ্ছ পদ্ধতিতে যুক্ত হওয়া বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে সাধুবাদ জানাতে হয় যুগান্তকারী সিদ্ধান্তের জন্য। এ বছর অনেক শিক্ষার্থী ঘর থেকে বের হয়েই পরীক্ষায় অংশগ্রহণ করতে পারবে। অনেকে পরীক্ষা দিয়ে দিনে দিনে ঘরে ফিরে আসতে পারবে। বাকিরা আগের দিন গিয়ে পরের দিনই।

নতুন পদ্ধতিতে মেয়ে পরীক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘব হবে বেশি। ছেলেরা যত সহজে দিনরাত একাকার করে বারবার গাড়ি পরিবর্তন করে যাতায়াত করতে পারে, মেয়েদের পক্ষে তা সম্ভব হয় না। ছেলেদের মতো যত্রতত্র রাত্রিযাপনও মেয়েদের পক্ষে অসম্ভব। যখন বাস রিজার্ভ করে ভর্তি পরীক্ষায় যাওয়া–আসা হয়েছে, তখন মেয়েদের প্রাকৃতিক কাজ সারার উপযুক্ত পরিবেশ পাওয়া কঠিন হয়ে যেত।

একজন শিক্ষার্থী একটি মাত্র বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তির সুযোগ পায়। আগের বছরগুলোতে দেখা গেছে, একজন শিক্ষার্থী শুরুতেই তার পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় ও পছন্দের বিভাগে ভর্তির সুযোগ পেলে কোনো কথাই নেই। তাকে আর কোথাও ছুটতে হতো না। যদি সে প্রথমে কোথাও ভর্তি হওয়ার পর অন্য কোনো পছন্দের বিশ্ববিদ্যালয় কিংবা বিভাগে ভর্তির সুযোগ পায়, তখন প্রথমে কোথাও ভর্তি হলে সেই টাকা গচ্চা যেত। এ বছর গুচ্ছ পদ্ধতি সেই অসুবিধা অনেকটাই কমাবে। এমনকি আগের দিনে বিশ্ববিদ্যালয় পরিবর্তনের কারণে অনেক আসন শূন্য থাকত। এবার শূন্য থাকার হারও অনেক কমে আসবে।

পিএসসি (পাবলিক সার্ভিস কমিশন) বিভাগীয় শহরগুলোতে কিছু পরীক্ষা গ্রহণ করে থাকে। অনেক নিয়োগ পরীক্ষার মূল আয়োজন কেন্দ্রীয়ভাবে করা হলেও পরীক্ষা বিভাগীয় কিংবা জেলা পর্যায়ে গ্রহণ করা হয়ে থাকে। সেগুলো ভালোভাবেই সম্পন্ন হচ্ছে। আমরা আশা করি, এ বছরে ভর্তি পরীক্ষাও সুষ্ঠুভাবেই সম্পন্ন হবে।

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোর আচার্য মহামান্য রাষ্ট্রপতি চান শিক্ষার্থীদের ভোগান্তি লাঘব হোক। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যাগ এবং গুচ্ছ পদ্ধতির ভর্তি পরীক্ষা রাষ্ট্রপতি তথা আচার্যের অভিপ্রায়েরও বাস্তবায়ন। আমরা চাই, ব্যাংকের নিয়োগ পরীক্ষাসহ যেসব পরীক্ষায় প্রতিদ্বন্দ্বী সংখ্যা অনেক, সেগুলোর নিয়োগ পরীক্ষা বিভাগীয় শহরে অনুষ্ঠিত হোক। এটি চাকরিপ্রার্থীদের জন্য এবং ভর্তি পরীক্ষার্থীদের জন্য হবে পরম কল্যাণের।

তুহিন ওয়াদুদ বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ের বাংলা বিভাগের শিক্ষক
[email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন