বিশ্বায়নের পক্ষে আমার অবস্থান

জিম ও’নিল
জিম ও’নিল

সম্প্রতি ফিউচার্স কংগ্রেসে যোগ দিতে সুন্দর দেশ চিলিতে গিয়েছিলাম, তখন লাতিন আমেরিকার একদম প্রান্ত পর্যন্ত যাওয়ার সুযোগ হয় আমার। একই সঙ্গে আমি বিবিসি রেডিওর জন্য ‘ফিক্সিং গ্লোবালাইজেশন’ শীর্ষক একটি ‘প্রামাণ্য অনুষ্ঠান’ বানিয়েছি। এর জন্য আমি যুক্তরাজ্যের এ মাথা থেকে ও মাথা পর্যন্ত ভ্রমণ করে বিশ্বায়নের নানা দিকের উন্নতির জন্য ধারণার খোঁজ করেছি। এ ছাড়া আমি সুপরিচিত বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে সাময়িকভাবে উৎসাহব্যঞ্জক নানা বিষয়ে আলাপ করেছি। উভয় ক্ষেত্রেই যা দেখলাম, তাতে এ ব্যাপারে আমি নিশ্চিত, এখন আমাদের বিশ্বায়নের পক্ষে কথা বলার সময় এসেছে।
বলে রাখি, চিলি এখন লাতিন আমেরিকার সবচেয়ে ধনী দেশ, যার মাথাপিছু আয় প্রায় ২৩ হাজার ডলার। অর্থাৎ দেশটির মাথাপিছু আয় মধ্য ইউরোপের দেশগুলোর সমান। যে দেশটি কপার উৎপাদনের ওপর ব্যাপকভাবে নির্ভরশীল, তার জন্য এটা বেশ বড় অর্জনই বলতে হয়। এতে সে বৈশিষ্ট্যমণ্ডিত হয়ে উঠেছে, যেটা তাকে আশপাশের দেশগুলো থেকে আলাদা করেছে। অন্য অনেক দেশের মতো চিলিও অর্থনৈতিক চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে। তার প্রবৃদ্ধির হার অন্যদের আকাঙ্ক্ষা করার মতো। আবার আন্তর্জাতিক পরিসরে তার কিছু সুযোগ আছে।
উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আমি যখন অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেসিস্ট্যান্স-বিষয়ক একটি পর্যালোচনার নেতৃত্ব দিয়েছি, তখন দেখেছি, কপারের মধ্যে শক্তিশালী ব্যাকটেরিয়া প্রতিরোধী উপাদান আছে। যেখানে ব্যাকটেরিয়া সংক্রমণের প্রকোপ দেখা যায়, সেখানে এটা ব্যবহার করা আদর্শ হতে পারে। অর্থাৎ কপার উৎপাদক দেশ, যেমন চিলি, অস্ট্রেলিয়া, কানাডা হাসপাতালে কপার অবকাঠামো যুক্ত করে বৈশ্বিক স্বাস্থ্যসূচকের উন্নতি ঘটাতে পারে, যদি এটার মূল্য সবার আয়ত্তের মধ্যে থাকে। এতে রপ্তানিও বেড়ে যেতে পারে।
ভূমিকম্প ও সুনামি ব্যবস্থাপনার ক্ষেত্রে চিলি জ্ঞানভান্ডার হয়ে উঠেছে। আমি যখন দেশটিতে ছিলাম, তখন লা সারেনা সফর করেছি, যে শহরটিতে ২০১৫ সালে পৃথিবীর ইতিহাসের ষষ্ঠ শক্তিশালী ভূমিকম্প হয়েছে। কিন্তু ভূমিকম্প-পরবর্তী সুনামিতে মাত্র ১১ জন মানুষ মারা গিয়েছিল, অন্য কোথাও এই সুনামি হলে আরও অনেক বেশি মানুষ মারা যেতে পারত। কিন্তু চিলির সরকারি কর্মকর্তাদের আগাম প্রস্তুতি ও দ্রুত প্রতিক্রিয়া অন্য দেশের সঙ্গে তাদের পার্থক্য গড়ে দেয়। বিষয়টা এমন দাঁড়িয়েছে যে, চিলির প্রাতিষ্ঠানিক অভিজ্ঞতা এত সমৃদ্ধ যে অন্য যেসব দেশ ভূমিকম্পের ঝুঁকিতে রয়েছে, তারা চিলির অভিজ্ঞতা থেকে শিক্ষালাভ করতে পারে।
একই সঙ্গে লা সারেনার অবস্থান পৃথিবীর অন্যতম সেরা তারা অবলোকন কেন্দ্রের কাছাকাছি, যেখানে বিশ্বের শীর্ষস্থানীয় জ্যোতির্বিদেরা এসে থাকেন। বস্তুত, বৈশ্বিক পরিসরে বিজ্ঞানীদের যত গুরুত্বপূর্ণ আদান-প্রদান হয়, তার অন্যতম কেন্দ্র হচ্ছে চিলি। কারণ, তার ভৌগোলিক অবস্থান অ্যান্টার্কটিকার ঠিক উত্তরে, যেটা দীর্ঘদিন ধরে বৈজ্ঞানিক ও পরিবেশগত সহযোগিতার ক্ষেত্র হিসেবে পরিচিত।
এবার একটু চিলির বাইরে যাই। দাভোসে ওয়ার্ল্ড ইকোনমিক ফোরামের যে বার্ষিক সম্মেলন হচ্ছে, সেখানে চীনা প্রেসিডেন্ট
সি চিন পিং অংশ নিচ্ছেন—ব্যাপারটা কৌতূহলোদ্দীপক। একদিকে ডোনাল্ড ট্রাম্প মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিচ্ছেন, অন্যদিকে ব্রিটেন ইউরোপীয় ইউনিয়ন থেকে বেরিয়ে যাচ্ছে। তাই আমি ভেবেছিলাম, এই অভিজাত অনুষ্ঠানটির গৌরবের অবসান ঘটেছে। সির উপস্থিতির মানে হলো, চীন অনুসন্ধান করছে, বিশ্বদরবারে সে নিজেকে কোথায় স্থাপন করতে পারে এবং বিশ্বায়নের কোন দিকগুলো সে নিজের কাজে লাগাতে পারে, যেখানে পশ্চিমা শক্তিগুলো নিজের খোলসে ঢুকে যাচ্ছে।
ওপরে যে রেডিও অনুষ্ঠানের কথা বলেছি, তার জন্য যুক্তরাজ্যে নিযুক্ত চীনা রাষ্ট্রদূতের সাক্ষাৎকার নিয়েছিলাম। তিনি বলেছেন, চীন ইতিমধ্যে বিশ্বের সবচেয়ে বড় আমদানিকারক হয়ে গেছে। হ্যাঁ পাঠক, আমদানিকারক, অন্তত ৭০টি দেশ থেকে সে আমদানি করছে; এমনকি এখন বিশ্বের মোট আমদানির ১০-১১ শতাংশ করছে চীন।
হ্যাঁ, চীন নানা চ্যালেঞ্জের মুখে পড়েছে, কিন্তু তা সত্ত্বেও এই দশকের মধ্যেই সে ইউরোপীয় ইউনিয়নের চেয়ে বড় আমদানিকারক হয়ে যাবে।
এ ছাড়া গত ২০ বছরে দেশগুলোর মধ্যে অসমতা অনেকটা কমে গেছে, যার আংশিক কারণ হচ্ছে চীনের উত্থান, তার সঙ্গে আছে এশিয়া, লাতিন আমেরিকা ও অন্যান্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক উন্নয়ন।
বস্তুত, জাতিসংঘ তো ২০১০ সালের মধ্যে দারিদ্র্যের হার অর্ধেকে নামিয়ে আনার মিলেনিয়াম ডেভেলপমেন্ট গোল অর্জন
করে ফেলেছে। আর সাম্প্রতিক প্রবণতা থেকে বোঝা যায়, ২০৫০ সালের মধ্যে আফ্রিকা ছাড়া পৃথিবীর অন্য সব জায়গা থেকে দারিদ্র্য দূর হবে।
এটা বিশ্বায়ন ছাড়া সম্ভব হবে না। বিশেষ করে, আফ্রিকার দেশগুলোকে আরও বেশি করে একে অপরের সঙ্গে বাণিজ্য করতে হবে। কথা চলছে, আফ্রিকাতে একটি মুক্তবাণিজ্য অঞ্চল গড়ে তুলতে হবে। কিন্তু এখন যেহেতু বাণিজ্যবিরোধী মনোভাব তুঙ্গে, তাই এটা করা কঠিন হতে পারে। বিশ্বায়নবিরোধীরা কি বৈশ্বিক দারিদ্র্য বিমোচনের বিপক্ষে? যারা এটাকে জিরো সাম গেম (যেখানে এক পক্ষ ঠিক ততটাই জেতে, অন্য পক্ষ যতটা হারে) মনে করে।
নীতিপ্রণেতারা এখন বিশ্বায়ন-বিষয়ক উদ্বেগ দূর করতে কাজ করতে পারেন। প্রথমত, জিডিপিতে মুনাফার পরিমাণ যে হারে বাড়ছে, তা অবশ্যই বন্ধ করতে হবে। যাঁরা মনে করেন, এটা বিপ্লবী কর্মসূচি, তাঁদের অর্থনীতির জ্ঞান ঝালিয়ে নিতে হবে। উচ্চ মুনাফার কারণে বাজারে প্রতিযোগীর সংখ্যা বাড়া উচিত, যাতে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে মুনাফাধারীর মুনাফা কমে আসে।
সত্য হচ্ছে, এটা যে হচ্ছে না তাতে বোঝা যায়, কিছু কিছু বাজারে জালিয়াতি হচ্ছে বা সেগুলো স্রেফ সফল হয়নি। কিছু কিছু ক্ষেত্রে নীতিপ্রণেতাদের কঠোর বিধিবিধান করে এসব আমলে নিতে হবে।
একই সঙ্গে নীতিপ্রণেতাদের নিম্ন মজুরির শ্রমিকদের মজুরি বাড়ানোর পদক্ষেপ নিতে হবে, যেটা উৎপাদনশীলতা বাড়িয়ে দিতে পারে। কারণ, শ্রমশক্তির জন্য পুঁজি বিনিয়োগ ব্যয়বহুল ব্যাপার নয়।
বিশ্বব্যাংকের প্রেসিডেন্ট জিম ইয়ং কিং আমাকে বলেছিলেন, বাণিজ্য চুক্তির ক্ষেত্রে কঠোরভাবে আইন প্রয়োগ করতে হবে; এসব চুক্তির কারণে দেশীয় খাত যে ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, তাকে সহায়তা করতে আরও বেশি কিছু করতে হবে।
বিশ্বায়নের কারণে নানা চ্যালেঞ্জ সৃষ্টি হয়েছে, কিন্তু তা একই সঙ্গে পৃথিবীকে অধিকতর বসবাসযোগ্য করে তুলেছে। আমাদের দারিদ্র্য বিমোচনসহ সবার জন্য উচ্চজীবনমান নিশ্চিত করতে হবে।

অনুবাদ: প্রতীক বর্ধন, স্বত্ব: প্রজেক্ট সিন্ডিকেট।
জিম ও’নিল: গোল্ডম্যান স্যাকস অ্যাসেট ম্যানেজমেন্টের সাবেক চেয়ারম্যান।