default-image

গেন্ডারিয়ার দীননাথ সেন রোড ও সতীশ সরকার রোডে আমার কয়েকজন ঘনিষ্ঠ বন্ধুর পৈতৃক বাড়ি ছিল। ষাটের দশকে তাদের বাসায় যাওয়ার সময় দীননাথ সেন রোডে আয়ুর্বেদ ঔষধালয়ের কাছে ডাস্টবিনের আশপাশে দেখতাম দু-একটি মোটাতাজা কুকুর প্রায় অচেতন হয়ে পড়ে রয়েছে। দুষ্টু ছেলেদের কেউ লেজ ধরে টানলেও সারমেয়গুলো সাড়া দিত না। কুকুরগুলো ছিল নেশাগ্রস্ত। যেসব মাদক উপকরণ দিয়ে সালসাজাতীয় ওষুধ তৈরি হতো, তার বর্জ্য রাস্তার ডাস্টবিনে ফেলা হতো। ওসব চেটে খেয়েই প্রাণীগুলো নেশায় বুঁদ হয়ে পড়ে থাকত। মাদকদ্রব্যে মানুষের মতো অন্য প্রাণীও নেশাগ্রস্ত হয় বটে, মানুষ হয় মাতাল। নেশাগ্রস্ত মাতালের পক্ষে কাণ্ডজ্ঞানহীন যা-খুশি তাই করা সম্ভব। খুনখারাবি পর্যন্তও।

বাংলাদেশে মদজাতীয় মাদক প্রধানত দুই প্রকার: একটি বিষাক্ত ও আরেকটি অবিষাক্ত। অবিষাক্ত মদে দেশ সয়লাব হয়ে গেলেও তা নিয়ে মাদক নিয়ন্ত্রণ কর্তৃপক্ষের মাথাব্যথা নেই। অবিষাক্ত বা বাংলা মদ পিপা পিপা বিক্রিবাট্টা হোক, তাতে কিছু আসে-যায় না, কিন্তু বিষাক্ত মদ পান করে দু-চারজন মারা গেলে কর্তৃপক্ষ কিঞ্চিৎ তৎপর হয়। সেটাও দিন কয়েকের জন্য। বিষাক্ত মদ পান করে গত আড়াই দশকে মারা গেছে আনুমানিক আড়াই হাজারের মতো মানুষ। লাখ লাখ ভোক্তা অবিষাক্ত মদ পান করে দিব্যি বেঁচেবর্তে আছে। তবে পরিবার-পরিজন নিয়ে তাদের ঘরসংসার কেমন চলছে, তা জানা সম্ভব নয়। মারা গেলেই খবরের কাগজে নামটা ছাপা হয়।

বিজ্ঞাপন

১৯৯৮ সালে নরসিংদীতে বিষাক্ত মদ পান করে ৫৪ জন পরিচ্ছন্নতাকর্মী মারা যান। তাঁদের পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে দেখা করতে আমি নরসিংদী যাই। গিয়ে দেখি বস্তিটি শোকে স্তব্ধ। বেঁচে আছে বেশির ভাগই শিশু ও নারী। শুধু শোকার্ত নয়, তারা লজ্জিতও। যাহোক, শোকসন্তপ্ত পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে কথা বলার বিশেষ কিছু ছিল না। আমি জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপারের সঙ্গে ভেজাল মদের বিষয় নিয়ে কথা বলি। এ বিষয়ে তখন দৈনিক মানবজমিন-এ একটি বড় নিবন্ধ লিখেছিলাম।

ভোগ্যপণ্য হিসেবে দেশি মদের বাজার বাংলাদেশে জমজমাট। ভোক্তার সংখ্যা বেশুমার বলেই এর চাহিদা ও সরবরাহ চমৎকার। দ্রব্যটির প্রস্তুতকারী ও তার ব্যবসায়ীদের প্রতি উদার ও ক্ষমাশীল দৃষ্টি রয়েছে কর্তৃপক্ষের এবং তাদের কর্মকর্তাদের। ফলে ভেজাল মদের কারবারিদের পোয়াবারো।

মদ্যপায়ীদের কে বাংলা মদ খাবে আর কে অস্ট্রেলিয়ান ওয়াইন খাবে, কে শ্যাম্পেন খাবে আর কে ভদকা খাবে, সেটা তার ব্যক্তিগত ব্যাপার। সেখানে হস্তক্ষেপ করা যায় না। রাষ্ট্র দেখবে কে মদ বানাচ্ছে, তার কারখানা কোথায় এবং কী দিয়ে বানানো হচ্ছে। রেকটিফায়েড স্পিরিট দিয়ে বানালে এক কথা, তার সঙ্গে ইথানল অ্যালকোহল মিশিয়ে মদ তৈরি করলে অন্য কথা। বিশেষ করে স্পিরিটের সঙ্গে পোড়া চিনি, মিনারেল ওয়াটার এবং রং মিশিয়ে নকল স্টিকার লাগিয়ে দামি ব্র্যান্ডের ‘মদ’ তৈরি করে ক্রেতাদের সরবরাহ করলে একেবারেই অন্য কথা।

বগুড়ার ভেজাল মদ ট্র্যাজেডির ঘটনায় গত সপ্তাহে ১৮ জন মারা যাওয়ার পর ‘নড়েচড়ে বসে প্রশাসন’ এবং ‘বগুড়া ও গাইবান্ধায় ভেজাল মদ তৈরির সরঞ্জাম জব্দ করেন আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যরা।’ ‘বগুড়ার জেলা প্রশাসনও শহরের হোমিওপ্যাথি ওষুধের দোকানে সাঁড়াশি অভিযান চালায়।’ যেখানে-সেখানে সাঁড়াশি অভিযান না চালিয়ে জায়গামতো সোজা অভিযান চালালেই ভেজাল মদের অস্তিত্ব থাকত না বাংলার মাটিতে, বিষাক্ত মদ তো নয়ই।

হবু মধ্যম আয়ের দেশ বাংলাদেশ। এখন টাকাকড়ি অনেকের হাতেই আছে যথেষ্ট। এমনকি স্কুল-কলেজের ছেলেমেয়েদের হাতেও। তারা হোটেল-রেস্তোরাঁয় পার্টি দেওয়ার সক্ষমতা রাখে। গত সপ্তাহে উত্তরার এক দামি রেস্তোরাঁয় একটি পার্টিতে অংশ নেন বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঁচ শিক্ষার্থী। বিষাক্ত ও নকল মদ পান করার পর এক শিক্ষার্থী ও তাঁর এক বান্ধবী মারা যান। গাজীপুরের এক রিসোর্টে অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছিল একটি বেসরকারি প্রতিষ্ঠান। সেখানে অংশ নেওয়া তিনজন বিষাক্ত মদ পান করে মারা গেছেন। অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরও ১০ জন।

মাদক নিয়ন্ত্রণ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক সমকালকে বলেছেন, ‘যাদের আমরা বৈধভাবে মদ আমদানির লাইসেন্স দিয়েছি, তাদের চাহিদা অনুযায়ী বিদেশ থেকে মদ আনার কথা। বৈধ লাইসেন্স থাকার পরও তারা কেন আনছে না, এটা বোধগম্য নয়। বৈধ ব্যবসায়ীরা চাহিদা অনুযায়ী মদ আনলে চলমান সংকটও থাকার কথা নয়। মদ পানে যারা মারা গেছে, তারা কোথা থেকে মদ সংগ্রহ করেছিল, সেটি খতিয়ে দেখা হচ্ছে।’ [সমকাল, ৪ ফেব্রুয়ারি]

বিজ্ঞাপন

অর্থাৎ বিষাক্ত ও ভেজাল মদ খেয়ে কয়েকজন মারা যাওয়ার পরই তার উৎসের সন্ধান হবে, তার আগে নয়। ভেজাল মদ পানের পরও যদি মদ্যপেরা মারা না যায়, তাহলে কারও দোষ নেই।

চিরকাল সমাজের অতি অল্প কিছু মানুষ নেশা করত। মদ, গাঁজা, ভাং, তাড়ি খেত। মাদকদ্রব্যের যথেচ্ছ উৎপাদন ও ব্যবহার যাতে না হয়, তা নিয়ন্ত্রণের কর্তৃপক্ষ আবগারি বিভাগ ছিল ব্রিটিশ আমলেও। বর্তমানে ইয়াবাসহ বিচিত্র সব মাদকদ্রব্যের ব্যাপক প্রচলন হয়েছে। মাদক ব্যবসা বর্তমানে পৃথিবীতে সবচেয়ে লাভজনক ব্যবসা। ইয়াবার ব্যবসায়ী ও ভেজাল মদের কারখানায় মাঝেমধ্যে র‌্যাব ও গোয়েন্দারা অভিযান চালান। অপরাধীরা কেউ গ্রেপ্তার হয়, তাদের জেল-জরিমানাও হয়। তা সত্ত্বেও ইয়াবা ব্যবসা ও ভেজাল মদ তৈরি নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব হয়নি।

মাদক ব্যবসার সঙ্গে দুর্নীতি ও কালোটাকার সম্পর্ক রয়েছে। নষ্ট রাজনীতির সম্পর্কও ঘনিষ্ঠ। নিষিদ্ধ বস্তুর ব্যবসার সঙ্গে ক্ষমতাসীনদের কেউ কেউ জড়িত। ক্ষমতার দাপট ও কালোটাকার দাপটে তারা খুবই প্রভাবশালী। ধরা পড়লে তাদের কর্মচারী ও ক্যাডাররা হাজতে যায়, তারা থাকে ধরাছোয়াঁর বাইরে।

বিষাক্ত মদের মতো অবিষাক্ত মদও কম ক্ষতিকর নয়। বিষাক্তটি মৃত্যু ঘটাচ্ছে। অবিষাক্তে মৃত্যু হয় তিলে তিলে। নেশাখোর হারায় কর্মক্ষমতা। নেশাখোরেরা লিপ্ত হয় অপরাধে, যা শান্তিপূর্ণ সমাজ প্রতিষ্ঠার পথে বড় বাধা। এ অভিশাপের প্রধান শিকার যুবসমাজ। রাষ্ট্রযন্ত্র ও সমাজের সমন্বিত প্রচেষ্টা ছাড়া শুধু বিষাক্ত মদ নয়, যেকোনো মাদকের অভিশাপ থেকে জাতিকে বাঁচানো সম্ভব নয়।


সৈয়দ আবুল মকসুদ: লেখক ও গবেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন