কিন্তু অধ্যক্ষ স্বপন কুমারের মর্যাদার যে মৃত্যু হলো! শিক্ষক হৃদয় মণ্ডলের সততা-নিষ্ঠা-দক্ষতার ওপর যে মারণ আঘাত হানা হলো, তার বিচারের কী হলো? বিচার কি হবে? আমাদের মনে সন্দেহ জাগে। কারণ, আপসপ্রবণ সমাজ ও রাজনীতি হৃদয় মণ্ডলকে জেল থেকে মুক্তি দিয়ে, চাকরিতে পুনর্বহাল করে হয়তো একটু সম্মান জানিয়েছে, আর তাতেই হাত ঝেড়ে ফেলেছে। আইন কখন নিজের গতিতে চলে আর কখন থমকে যায়, তার হিসাব কে রাখে! এ ধরনের প্রতিটি ঘটনায় অনেক নেপথ্য আয়োজকের সন্ধান পাওয়া যায়। বোঝাও যায়, কোনো ঘটনাই নিছক উত্তেজনার ফল নয়, সুপরিকল্পিত কাজ। অধ্যক্ষ স্বপন কুমার বিশ্বাসের হেনস্তার সময় শিক্ষকদের চারটির মধ্যে তিনটি মোটরসাইকেল পোড়ানো হয়েছিল। তিনটিই কলেজের তিন হিন্দু শিক্ষকের আর সযত্ন সরিয়ে রাখা যানটি কেবল একজন মুসলিম শিক্ষকেরই নয়, তিনিই সেই ব্যক্তি, ঘটনার যাঁর দিকে মুখ্য কারিগর হিসেবে আঙুল উঠেছে। আওয়ামী লীগ তাঁকে দল থেকে বহিষ্কার করে পরিষ্কার হয়ে যাওয়ার পথ ধরেছে। কিন্তু ঘটনাগুলোর পর ঘটনায় এ রকম ময়লা এত লাগছে, যে ঝাড়লেই তা যাবে না। ফলে পুরো ন্যক্করজনক ঘটনাগুলোর যাঁরা আয়োজক, তাঁদের বিচারের অপেক্ষা যেন দীর্ঘায়িত না হয়।

দেখি, সরকার সেই কাজে হাত দিক তো, সমাজের একটা জাদুকরি রূপান্তর না হয়ে যায় কি না! দুঃখী মানুষের দেশ সুখী মানুষের দেশে উন্নীত হয় কি না। যে দেশের জনসংখ্যার মূল অংশ তরুণ, সে দেশ কেন দুঃখী দেশ হবে? প্রয়োজন একটা ঝাঁকুনির, যাতে বাঁধ ভেঙে শুকনো গাঙে জীবনের জোয়ার আসে। এই রূপান্তরের বড্ড প্রয়োজন আজ।

স্কুল-কলেজে গভর্নিং বডির নেতাদের হাতে, যাঁরা প্রায়ই ক্ষমতাবান দলের নেতা-উপনেতা, প্রতিষ্ঠানপ্রধান ও শিক্ষকদের দুর্ব্যবহার এবং লাঞ্ছনা–নির্যাতনের শিকার হওয়ার খবর আর নতুন নয় এবং বিরলও নয়। বোঝা যাচ্ছে, সমাজের নানা ক্ষেত্রে ক্ষমতার আশীর্বাদ নিয়ে নানা ধরনের বীরবাহাদুররা দাপিয়ে বেড়াচ্ছেন। সবাই জানি, গত কয়েক দশকে বিভিন্ন এলাকায় এমন সব নেতার উদ্ভব ঘটেছে, যাঁরা নিজ এলাকার সব ভালো কাজ এবং সব মন্দ কাজের দায়িত্ব পালন করেন। মন্দের তো তিনি সহায়, কিন্তু ভালোর পক্ষেও তাঁকে এড়িয়ে চলা দুষ্কর। কারণ, দারাপুত্র-পরিবার নিয়ে যে জীবন, তাতে সব সময় সব বয়সে ঘরের উঠানের বাস্তবতাকে অস্বীকার করা যায় না। উপরন্তু সাধারণত প্রশাসন ও পুলিশ তাঁদের সহচর হিসেবেই কাজ করে থাকে।

ফলে সমাজে কে ভালো থাকবে, কখন কার ভাগ্যবিপর্যয় হবে, তা নিজের কৃতকর্মের চেয়ে অনেকাংশে এ ধরনের স্থানীয় ব্যক্তিদের মূল্যায়ন ও প্রতিক্রিয়ার ওপরই নির্ভর করে। সমাজে নিয়ম ভাঙার চল হয়েছে অনেক দিন ধরেই। স্বাধীনতার পর তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী বঙ্গবন্ধুর বিভিন্ন ভাষণ মনোযোগ দিয়ে পড়লেই প্রমাণ মিলবে যে তখন থেকেই প্রশাসনযন্ত্র মসৃণভাবে চলতে পারেনি।

তখন থেকেই সাম্প্রদায়িকতার চর্চা একেবারে নিষ্ঠার সঙ্গে চালিয়ে গেছে একটি মহল। একেবারে সাম্প্রতিক ঘটনাগুলোর দিকেও যদি তাকাই, তাহলে দেখা যাবে, যেসব ঘটনা গণমাধ্যমের প্রচারে সমাজে আলোড়ন তোলেনি, সেগুলো ধামাচাপা পড়ে গেছে, বিচার হয়নি। গত বছর দুর্গাপূজার সময় মণ্ডপে মণ্ডপে যে হামলা হয়েছিল, বিশেষত যেখান থেকে সূত্রপাত সেই কুমিল্লার ঘটনার পেছনের তথ্য মিডিয়ায় প্রকাশের পরও তো এর বিচারের আলামত দেখা যাচ্ছে না। বরং এই বিচারহীনতার ফলে সমাজে সাম্প্রদায়িকতার চর্চা বাড়ছে। এর একতরফা শিকার হচ্ছে দেশের হিন্দু জনগোষ্ঠী। প্রভাষক উৎপল কুমার সরকার হয়তো জীবন দিয়ে বিচার পাবেন, কিন্তু অধ্যক্ষ স্বপন বিশ্বাস বা স্কুলের বিজ্ঞানশিক্ষক হৃদয় মণ্ডল কি সুবিচার পাবেন?

অথচ এ রকম একটি ঘটনায় একটি সম্প্রদায়ের বিপুলসংখ্যক মানুষের মধ্যে নিরাপত্তাহীনতা ছড়িয়ে পড়ে। চৌদ্দপুরুষের ভিটেমাটিতে বাস করা যাবে কি না, সেই প্রশ্ন মাথায় ঘুরপাক খেতে থাকে। কারণ, প্রাণের ভয়, নিজের ও নারীদের সম্মান হারানোর ভয়, সম্পদ হারানোর ভয়—এ রকম একটি দৃষ্টান্তে অনেক মানুষের শিকড় আলগা হয়ে যায়। এ পাপ এ দেশে বহুকাল ধরে চলছে। কিন্তু একশ্রেণির মানুষ তা বুঝতে চান না, একদল এসব বিষয়ে সম্পূর্ণ উদাসীন। ফলে দিনে দিনে দেশে হিন্দু সম্প্রদায়ের জনসংখ্যা কমছে। দুর্ভাগ্যের বিষয়, ভারতে ক্ষমতাসীন বিজেপির রাজনীতির মুখ্য বিষয়ই হলো হিন্দুত্ব, যার একটি বহিঃপ্রকাশ হলো মুসলিমবিদ্বেষ ও সাম্প্রদায়িকতা। আজ সারা উপমহাদেশে যেন সাম্প্রদায়িক প্রচারণার ডামাডোলে শিক্ষার প্রকৃত পরিবেশ নষ্ট ও মূল উদ্দেশ্য ব্যর্থ হয়ে যাচ্ছে।

শিক্ষাঙ্গনে ‘ছাত্র’রাজনীতি একটি অযৌক্তিক ও অমানবিক পথ ধরেছে। সমাজ পড়েছে ধর্মান্ধতা ও সাম্প্রদায়িকতার খপ্পরে। উচ্চশিক্ষাঙ্গনে হিংসা ও ভয়ের আবহ ছড়িয়ে পড়েছে। এমন পরিবেশ জ্ঞানচর্চার উপযোগী নয়, সংস্কৃতিচর্চার অনুকূল নয়, মানবিক সত্তার বিকাশে সহায়ক নয়। এ রকম পরিবেশের কারণে সমাজে এবং শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বারবার অযৌক্তিক, অরুচিকর ও অমানবিক ঘটনা বা অপরাধ ঘটতে দেখছি আমরা। গত মঙ্গলবারের প্রথম আলোতেই দেশের তিনটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে ক্ষমতাসীন দলের ছাত্র সংগঠনের ছাত্রাবাসের ওপর দখলদারির খবর রয়েছে। শিরোনামেই অবস্থা পরিষ্কার, কোন কক্ষে কে থাকবেন, সেটা ঠিক করে ছাত্রলীগ (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়), হলে থাকতে চাইলে ছাত্রলীগই শেষ কথা (চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়) এবং প্রশাসনের নিয়ন্ত্রণে মাত্র ৪.৪১% আসন (শাহজালাল বিশ্ববিদ্যালয়)।

আদতে কোনো পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়েই ছাত্রাবাসে কর্তৃপক্ষের কোনো নিয়ন্ত্রণ নেই। যদিও সবখানে বিশ্ববিদ্যালয়ের পক্ষে প্রাধ্যক্ষ ও হাউস টিউটররা রয়েছেন। কিন্তু বাস্তবতা হলো, তাঁরা এদের দখলদারত্বের সাক্ষী থাকছেন, ফলে একে বৈধতা দিয়ে যাচ্ছেন। শোনা যায়, অনেক কলেজ ও স্কুলেও শিক্ষকদের এভাবে তথাকথিত ‘ছাত্রনেতাদের’ সঙ্গে সমঝোতা ও আপস করেই চলতে হয়। এর ব্যতিক্রম হলে কী হতে পারে, তার নজির দিয়েছেন প্রাণ দিয়ে প্রভাষক উৎপল কুমার সরকার। কিছুদিন আগে খুলনা প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ে একজন প্রাধ্যক্ষ ছাত্রদের সঙ্গে বৈঠকের পরে মৃত্যুবরণ করেছিলেন। তাঁর টেনশনের কথা তিনি বাড়িতেও বলেছিলেন। বোঝা যায়, দেশে একশ্রেণির শিক্ষক ক্ষমতার তল্পি বইছেন, আরেক দল শিক্ষক চরম মনোকষ্টে দিন কাটাচ্ছেন। পদ্মা সেতুসহ বিভিন্ন মেগা প্রকল্পের সাফল্য তাঁদের প্রতিদিনের অপমান, গ্লানি ও মনোকষ্ট দূর করতে পারে না। পারে না যে, তার প্রমাণ দুঃখী মানুষের দেশের তালিকায় বাংলাদেশের উচ্চ অবস্থান।

শিক্ষকের অসম্মান শুরু হয় ব্যবস্থা ও কর্মসংস্কৃতির মাধ্যমে। সরকারি ব্যবস্থাপনায়ই শিক্ষকগণ বহু কর্তৃপক্ষ ও কর্তার অধীনস্ত পদানত ব্যক্তি। এই সংস্কৃতিতে ঊর্ধতন কর্তারা স্কুলে পরিদর্শনে বা অন্য কোনো কাজে এলে প্রধান শিক্ষককে উঠে গিয়ে নিজ আসনে তাঁদের বসতে দিয়ে প্রায়ই দাঁড়িয়ে জেরার উত্তর দিতে হয়, প্রায় অদৃশ্য কাঠগড়ার আসামি বা তামাদি খাজনার অভিযুক্ত প্রজার মতো। এ দৃশ্য দেখে শিক্ষার্থীদের মধ্যে সংবেদনশীল কারও হয়তো মায়া হতে পারে বেচারা শিক্ষকের জন্য। কিন্তু আরেক দল তাঁদের উপেক্ষা ও অসম্মান করার শিক্ষাও পায়।

মর্যাদাসম্পন্ন শিক্ষক নিয়োগ এবং শিক্ষকের মর্যাদা প্রতিষ্ঠা ও রক্ষা শিক্ষার উন্নয়নের অন্যতম শর্ত। এ শর্ত এ দেশে ভালোভাবেই উপেক্ষিত ও লঙ্ঘিত হচ্ছে। এটা জরুরি এবং প্রাথমিক কাজ, কারণ শিক্ষার গুণগত রূপান্তর ও মানোন্নয়নের কাজ বাস্তবায়ন করবেন তো শিক্ষকেরাই। তাঁদের কৃপাপাত্র ও পঙ্গু করে রাখলে শিক্ষারও সেই দশাই হবে।

এরপর প্রয়োজন শিক্ষা কার্যক্রমের মূল কাজ শ্রেণিকক্ষের পাঠে শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণের সুযোগ এবং তাদের কল্পনা ও চিন্তাশক্তি প্রয়োগের অবকাশ তৈরি। আর প্রয়োজন তাদের জন্যে শিক্ষার্থীজীবনকে আনন্দদায়ক করে তোলা। আর এর জন্য তথাকথিত নেতাদের অবাঞ্ছিত হস্তক্ষেপ বন্ধ করতে হবে। বাকিটা শিক্ষার্থী ও শিক্ষকেরা মিলে সম্পন্ন করে ফেলবেন। তাঁরা কী করবেন, দেশের শিক্ষার মরা গাঙে বান আনবেন, মুমূর্ষু শিক্ষাব্যবস্থায় প্রাণ সঞ্চার করবেন। প্রাণবন্ত শিক্ষা ও শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানেই সত্যিকারের জ্ঞান–বিজ্ঞানের ফলন হয়, আলোকিত মানুষের ফসল উৎপন্ন হয়।

দেখি, সরকার সেই কাজে হাত দিক তো, সমাজের একটা জাদুকরি রূপান্তর না হয়ে যায় কি না! দুঃখী মানুষের দেশ সুখী মানুষের দেশে উন্নীত হয় কি না। যে দেশের জনসংখ্যার মূল অংশ তরুণ, সে দেশ কেন দুঃখী দেশ হবে? প্রয়োজন একটা ঝাঁকুনির, যাতে বাঁধ ভেঙে শুকনো গাঙে জীবনের জোয়ার আসে। এই রূপান্তরের বড্ড প্রয়োজন আজ।

  • আবুল মোমেন কবি, প্রাবন্ধিক ও সাংবাদিক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন