লকডাউন পরিস্থিতিতে বিশ্বজুড়ে বেড়ে চলেছে নারীর প্রতি সহিংসতা ও নির্যাতন। সারা বিশ্বে নারী নির্যাতন বৃদ্ধির হার বেড়েছে প্রায় ২০ শতাংশ। শুধু তা–ই নয়, অনলাইনে সাহায্য প্রার্থনার হার বেড়েছে প্রায় ১২০ শতাংশ। সম্প্রতি মানুষের জন্য ফাউন্ডেশন প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, শুধু এপ্রিল মাসে ৪ হাজার ২৪৯ জন নারী ও ৪৫৬ জন শিশু লকডাউনের মধ্যে পারিবারিক সহিংসতার শিকার হয়েছে। ২৪টি সহযোগী সংগঠনের মাধ্যমে ২৭টি জেলার ৫৮টি উপজেলার নির্দিষ্ট কিছু এলাকায় নারী ও শিশুদের সঙ্গে মোবাইল ফোনের মাধ্যমে জরিপটি পরিচালিত হয়। জরিপের তথ্য অনুযায়ী, স্বামীর হাতে শারীরিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ৮৪৮ নারী, মানসিক নির্যাতনের শিকার ২ হাজার, যৌন নির্যাতনের শিকার ৮৫ জন এবং অর্থনৈতিক নির্যাতনের শিকার হয়েছেন ১ হাজার ৩০৮ জন।

তবে এই পরিস্থিতিতে স্বামী কর্তৃক যৌন নির্যাতনের সংখ্যাটি তুলনামূলকভাবে কম বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। এই নির্যাতনের তথ্য যাচাইয়ের মানদণ্ডটি অজানা থাকলেও বুঝতে কষ্ট হয় না যে নির্যাতনের শিকার এই নারীদের অধিকাংশই ম্যারিটাল রেপ বা বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার হয়েছেন। জরিপে ৮৫ জন নারীর কথা বলা হলেও এই সংখ্যাটি বাস্তবে কয়েক গুণ বেশি হলে অবাক হওয়ার কিছু নেই।

শুধু লকডাউন নয়, স্বাভাবিক পরিস্থিতিতেও বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার হওয়া নারীর প্রকৃত সংখ্যা বের করা বেশ কঠিন এবং অনেক ক্ষেত্রেই তা একবারেই অসম্ভব। বৈবাহিক ধর্ষণ সম্পর্কে অজ্ঞানতা, পারিবারিক চাপ, সামাজিক দৃষ্টিভঙ্গি আর উদাসীনতার কারণে অধিকাংশ বৈবাহিক ধর্ষণের শিকার নারী এ বিষয়ে নিশ্চুপ থাকেন। তাঁদের আর্তনাদ তাই ঘরের চারদেয়ালেই চাপা পড়ে যায়।

ধর্ষণকারী হিসেবে আমরা সাধারণত দাম্পত্য সম্পর্কের বাইরের কাউকেই বিবেচনায় আনি। বৈবাহিক ধর্ষণ বিষয়টি অনেকেরই অজানা। এমনকি অনেক নারীরও বিষয়টি নিয়ে অজ্ঞানতা আছে। আর অধিকাংশ পুরুষ বিষয়টিকে কোনো অপরাধ বলেই মনে করেন না। ‘বৈবাহিক ধর্ষণ’ বলতে স্বামী কর্তৃক এমন আচরণকে বোঝায়, যেখানে স্ত্রীর সম্মতি ছাড়া এবং অনিচ্ছা সত্ত্বেও স্বামী জোরপূর্বক স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিক সংসর্গে লিপ্ত হন। বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হওয়ার পর জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি বাংলাদেশসহ বিশ্বের অধিকাংশ দেশে ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃত নয়।

১৮৬০ সালের দণ্ডবিধির ৩৭৫ ধারা অনুযায়ী, ১৩ বছরের ঊর্ধ্বে নারীর ক্ষেত্রে তার ইচ্ছার বিরুদ্ধে সহবাস ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃতি পায় না। বাংলাদেশে ধর্ষণসংক্রান্ত কোনো ধারার কোথাও বৈবাহিক ধর্ষণের কথা বলা হয়নি। অধিকাংশ আইনেই ধর্ষণকে সংজ্ঞায়িত করা হয়, স্ত্রী ব্যতীত অন্য কোনো নারীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে তার সঙ্গে যৌন সম্পর্ক স্থাপন করা। প্রশ্ন হলো, স্ত্রীর ইচ্ছার বিরুদ্ধে স্বামী যদি ধর্ষণকারীর ভূমিকায় অবতীর্ণ হন, তাহলে কি ধর্ষণের ভয়াবহতা কমে যায়? বিবাহ ব্যতিরেকে কোনো নারীর সঙ্গে জোরপূর্বক যৌন সম্পর্ক স্থাপনের বিষয়টি যদি ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃত হয়, তবে বৈবাহিক সম্পর্কেও ক্ষেত্রে এই জবরদস্তি কেন ধর্ষণ হিসেবে স্বীকৃত হবে না? বিবাহবন্ধনে আবদ্ধ হলেই যে ঘটনাটির ভয়াবহতা কমে যায়, ব্যাপারটি কিন্তু সে রকম নয়। বরং দিনের পর দিন একটি সম্পর্কে আবদ্ধ থেকে ধর্ষণের অভিজ্ঞতায় ট্রমা অনেক বেশি থাকে এবং সেখান থেকে পরিত্রাণের কোনো উপায় থাকে না।

আরেকটি বিষয় হলো প্রচলিত অর্থে ধর্ষণকারী আইনের কাছে অপরাধী বলে বিবেচিত হওয়ায় তার ধরা পড়ার ভয় থাকে, ভয় থাকে শাস্তি পাওয়ার। কিন্তু বৈবাহিক ধর্ষণের ক্ষেত্রে কোনো আইন না থাকায় ধর্ষণে অভ্যস্ত পুরুষটির মধ্যে কোনো ভয় কিংবা অনুশোচনা কাজ করে না। বরং ধর্ষণ করাকেই নিজের অধিকার জ্ঞান করে দিনের পর দিন তিনি এই অপরাধের চর্চা করেন। অন্যদিকে বৈবাহিক সম্পর্কের বেড়াজালে আবদ্ধ নারীটি ধর্ষণের শিকার হয়েও সন্তান, পরিবার, সমাজ, আর সম্পর্ক থেকে বেরিয়ে আসতে না পারার বাস্তবতায় এক নিদারুণ বিষাদময় জীবন অতিবাহিত করেন।

 ২০১৩ সালে জাতিসংঘ বাংলাদেশসহ নয়টি দেশে ১০ হাজার পুরুষের ওপর যে জরিপ পরিচালনা করে, তাতে বেরিয়ে এসেছিল যে এসব দেশের এক–চতুর্থাংশ পুরুষই জোরপূর্বক তাদের স্ত্রীর সঙ্গে শারীরিকভাবে মিলিত হন। বাংলাদেশ ও চীনের ক্ষেত্রে এর পেছনে সবচেয়ে বড় কারণ হিসেবে যা পাওয়া গিয়েছিল, তা হলো এসব দেশের পুরুষেরা শারীরিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে নারীর সম্মতির তোয়াক্কা করেন না। তাই দিন দিন বাড়ছে এ ধরনের নির্যাতনের তীব্রতা। ইউএন উইমেন কর্তৃক ২০১৯ সালে প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে বিশ্বের ৫৮ শতাংশ দেশেই বৈবাহিক ধর্ষণকে শাস্তিযোগ্য অপরাধ হয়েছে গণ্য করা হয় না। এ ক্ষেত্রে আইন প্রণয়নে এশিয়া মহাদেশ সবচেয়ে পিছিয়ে।

বৈবাহিক ধর্ষণের মতো অপরাধকে আইনের আওতায় নিয়ে আসা এখন সময়ের দাবি। শুধু বৈবাহিক সম্পর্কে আবদ্ধ থাকার কারণে দিনের পর দিন ধর্ষণের মতো অপরাধকে মেনে নেওয়ার বিষয়টি অত্যন্ত অমানবিক—যা জবরদস্তি, তা জবরদস্তিই। শুধু বৈধতার সার্টিফিকেটের আড়ালে এ ধরনের অপরাধ ক্ষমার যোগ্য হতে পারে না। তাই প্রয়োজন প্রচলিত আইনের সংশোধন এনে বৈবাহিক ধর্ষণের সুস্পষ্ট সংজ্ঞা নির্ধারণ করা এবং সে অনুযায়ী এ ধরনের অপরাধের শাস্তির বিষয়টি নিশ্চিত করা। আরও প্রয়োজন আমাদের দৃষ্টিভঙ্গির পরিবর্তন। আইনের সুস্পষ্ট ব্যাখ্যা ও তার যথাযথ প্রয়োগ দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তনেও সহায়ক হয়।

পরিশেষে বলতে চাই, ঘরের বাইরের ধর্ষণকারী তবু ধরা পড়ে; কিন্তু বৈবাহিক সম্পর্কে জড়িয়ে থাকা নারীকে যখন ধর্ষণকারী পুরুষটির কাছে রোজ ধরা দিতে হয়, তখন সে জীবন হয়ে ওঠে অভিশপ্ত। লকডাউনের দিন হয়তো একদিন শেষ হবে, কিন্তু আজীবন ধর্ষণকারী পুরুষের সঙ্গে দাম্পত্য সম্পর্কে থাকা নারীর মুক্তি মিলবে কীভাবে?

নিশাত সুলতানা
লেখক ও গবেষক
purba_du@yahoo. com

বিজ্ঞাপন
মন্তব্য পড়ুন 0