default-image


বাংলাদেশে তেমন খবর হয়নি, তবে ভারতে সমালোচনা হচ্ছে, আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমের নজরেও এসেছে। এই প্রথম অভিন্ন নদী নিয়ে বাংলাদেশ ও ভারতের স্বার্থ এক কাতারে দাঁড়াতে যাচ্ছে। ঘটনার কেন্দ্রে রয়েছে পৃথিবীর উচ্চতম নদী ইয়ারলাং জাংবো (Yarlung Zangbo)। হিমালয় দুহিতা এই নদীটি চীনের তিব্বত থেকে নেমে ভারতের অরুণাচল ও আসাম প্রদেশ হয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে। তিব্বতে এর নাম সাংপো, অরুণাচলে সিয়ং এবং আসাম ও বাংলাদেশে এর নাম হয়েছে ব্রহ্মপুত্র।কুড়িগ্রাম সীমান্ত দিয়ে বাংলাদেশে প্রবেশ করে গোয়ালন্দের কাছে এটি পদ্মায় মিলেছে।

কুড়িগ্রামের চিলমারীতে তিস্তা নদী এসে পড়েছে ব্রহ্মপুত্রে। নিম্ন-ব্রহ্মপুত্রই আবার যমুনা নাম নিয়ে দক্ষিণ দিকে ছুটেছে। ব্রহ্মপুত্র-যমুনার রয়েছে চারটি প্রধান উপনদী: দুধকুমার, ধরলা, তিস্তা এবং করতোয়া—আত্রাই নদ প্রণালি। সাংপো-ব্রহ্মপুত্র-যমুনা পৃথিবীর দীর্ঘতম এক নদী। পদ্মা ও মেঘনার চেয়ে এর শক্তি ও জলধারা অনেক বেশি। ব্রহ্মপুত্র ও পদ্মার সঙ্গমস্থলেই বিশ্বের বৃহত্তম বদ্বীপ সুন্দরবন অবস্থিত। ব্রহ্মপুত্র তাই বাংলাদেশের প্রধান তিনটি নদীব্যবস্থার প্রাণ।

বিজ্ঞাপন
অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীপ্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে এমন কোনো কাঠামো তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার যে নিয়ম রয়েছে, চীন এ ক্ষেত্রে সেটা করেনি।

এই নদীর ওপর চীন তৈরি করতে যাচ্ছে বিশাল জলবিদ্যুৎ তৈরির ড্যাম। এই জলবিদ্যুৎ প্রকল্পটি হবে চীনের বৃহত্তম থ্রি গর্জেস ড্যামের চেয়ে তিন গুণ বড় এবং বিশ্বের মধ্যে বৃহত্তম। এখানে উৎপাদিত হবে ৬০ মিলিয়ন কিলোওয়াট অর্থাৎ ৬০ গিগাওয়াট বিদ্যুৎ। বাংলাদেশের বর্তমান মোট বিদ্যুৎ উৎপাদন সক্ষমতা প্রায় আড়াই গিগাওয়াট এবং বাস্তবে উৎপাদিত হয় দেড় গিগাওয়াটের কম (https://tinyurl.com/y6lopu2o)। এ থেকে বোঝা যাবে, ব্রহ্মপুত্র নিয়ে চীন কত বড় দক্ষযজ্ঞ করতে যাচ্ছে।

ঘটনাটি পাকিয়ে ওঠার সময়টাও গুরুত্বপূর্ণ। হিমালয় অঞ্চলে চীন ও ভারতের রাজনৈতিক ও সামরিক উত্তেজনা ১৯৬২ সালের চীন-ভারত যুদ্ধের পরের সর্বোচ্চ অবস্থায় উঠেছে। লাদাখ ও অরুণাচলে উভয়ের মধ্যে সংঘাত হচ্ছে। অরুণাচলের অনেক এলাকায় চীন অনুপ্রবেশ, বসতি স্থাপন এবং দখলদারির চেষ্টা করছে বলে ভারত অভিযোগ জানাচ্ছে। সেই সংঘাত এখন পানি নিয়ে বিরোধের দিকেও যেতে পারে।

অভিন্ন আন্তর্জাতিক নদীপ্রবাহে পরিবর্তন আনতে পারে এমন কোনো কাঠামো তৈরির আগে সংশ্লিষ্ট দেশগুলোর সঙ্গে আলোচনা করার যে নিয়ম রয়েছে, চীন এ ক্ষেত্রে সেটা করেনি। ভারত ও চীনের মধ্যে কোনো ন্যায্য পানিবণ্টন চুক্তি না হলে তা দুই এশীয় পরাশক্তির মধ্যে নতুন সংঘাতের জ্বালানি জোগাবে এবং সেই চুক্তিতে বাংলাদেশের হিস্যা নিশ্চিত না হলে ফারাক্কা ও তিস্তার মতো বড় রকমের পানি বঞ্চনার শিকার হবে বাংলাদেশ। অন্যভাবে বলা যায়, পদ্মা ও তিস্তার ন্যায্য হিস্যাবঞ্চিত নাজুক বাংলাদেশের নদীব্যবস্থা ব্রহ্মপুত্রে মার খেয়ে মুমূর্ষু হয়ে পড়বে। আরও শুকিয়ে আসবে ১৮ কোটি মানুষের এই দেশের জীবননালি। চীন মেকং নদীতে যে ১১টি বড় জলকাঠামো তৈরি করেছে, সেসব নিয়ে ভাটিতে থাকা মিয়ানমার, লাওস, থাইল্যান্ড, কম্বোডিয়া ও ভিয়েতনামের ভোগান্তি থেকে তাই শেখার আছে। এসব দেশকে চাপে রাখায় চীন মেকং নদীর পানিকে অস্ত্র হিসেবে ব্যবহার করে থাকে।

ইয়ারলাং সাংপো নদীতে জলবিদ্যুৎ প্রকল্প বাস্তবায়নের কথা চীন প্রথম বলে তার চতুর্দশ পঞ্চবার্ষিক পরিকল্পনা (২০২১-২০২৫) এবং ২০৩৫ অভিমুখী দীর্ঘমেয়াদি রূপকল্পে। গত বছরের অক্টোবরে পাওয়ারচায়না এ বিষয়ে চুক্তি স্বাক্ষর করে। বিষয়টা আরও স্পষ্ট হয় গত ডিসেম্বরে। ডিসেম্বরের প্রথম দিকে চীনের রাষ্ট্রীয় কোম্পানি পাওয়ারচায়না ঘোষণা করে, তারা এ রকম কিছু বাস্তবায়ন করতে যাচ্ছে এবং ইতিহাসে তা অভূতপূর্ব। তারপর ভারতীয় গণমাধ্যমে আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়।

যথারীতি ভারতের চীনা দূতাবাসের মুখপাত্র চিন্তা মাত করতে বলেছেন। বলেছেন, ‘চীন অবশ্যই ভাটির দেশের উদ্বেগ নিয়ে দায়িত্বশীল ভূমিকা নেবে। প্রকল্পটি যেহেতু খুবই প্রাথমিক অবস্থায় রয়েছে, সেহেতু বাইরের দুনিয়ার উচিত নয় এটা নিয়ে অতি-ব্যাখ্যায় লিপ্ত হওয়া।’ এর পরপরই চীনের পররাষ্ট্র দপ্তর থেকে বলা হয়, ‘নিজেদের নদীতে জলবিদ্যুৎ উৎপাদন চীনের বৈধ অধিকারের মধ্যে পড়ে। দীর্ঘ সময় ধরে চীন বন্যা, দুর্যোগ মোকাবিলা ও প্রতিকার এবং জরুরি পদক্ষেপ বিষয়ে ভারত ও বাংলাদেশের সঙ্গে তথ্য ভাগ করে নেয়। চীন বিদ্যমান উপায়ে দেশ দুটির সঙ্গে যোগাযোগ রেখে চলবে।’

বিজ্ঞাপন

তবে চীনের পক্ষে অন্য যুক্তিও রয়েছে। তারা বলছে, জলবিদ্যুৎ প্রকল্প মানেই ভাটির দেশে পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া নয়। কথা সত্য। যদি সেখানে বড় জলাধার তৈরি করে পানি আটকে রাখা এবং অন্য খাতে বইয়ে দেওয়া হয়, তাহলে অবশ্যই চিন্তিত হওয়া দরকার। তাদের দ্বিতীয় যুক্তি হলো, ব্রহ্মপুত্রে বহমান পানির বড় অংশটাই আসে অরুণাচল ও আসামে বিপুল মৌসুমি বৃষ্টি এবং অন্য দুটি নদীর প্রবাহের সঙ্গে মিলনের ফলে। যদি এসব ঠিক থাকে, তাহলে ব্রহ্মপুত্রের বড় ক্ষতি হওয়ার কথা নয়।

তিব্বতে হিমালয়ের কৈলাস হ্রদের যেখান থেকে ব্রহ্মপুত্রের জন্ম, সেটি পৃথিবীর ছাদ বলে পরিচিত। সেখান থেকে অরুণাচল ও আসাম পর্যন্ত এলাকা প্রতিবেশগতভাবে খুবই স্পর্শকাতর। যদি জলাধার বানিয়ে পানি সরিয়ে নেওয়া না–ও হয়, তবুও প্রতিবেশের যে ক্ষতি হবে, তা নিচের দিকের জনপদগুলোকেও প্রভাবিত করবে। আজকের দুনিয়ায় প্রতিবেশগতভাবে কয়লাবিদ্যুতের মতো জলবিদ্যুৎ প্রকল্পও ক্ষতিকর হিসেবে বিবেচিত। নদীকে নদীর মতো থাকতে দেওয়ার নীতি বিশ্ব সাধে গ্রহণ করেনি। এর কারণ শুধু নদী নয়, নদীর সঙ্গে জলবায়ু, পরিবেশ, কৃষি ও জনস্বাস্থ্যের মাতৃনালির মতো সম্পর্ক। তা ছাড়া আন্তর্জাতিক নদীপ্রবাহ নিয়ন্ত্রণ ভূরাজনীতির হাতিয়ার হয়ে দুর্বল ও নিচের দিকে থাকা দেশগুলোকে বেকায়দা অবস্থায় ফেলতে যে পারে, ভারত-বাংলাদেশের পানি রাজনীতির তিক্ত অভিজ্ঞতাই তার প্রমাণ। ঘরপোড়া গরু তাই সিঁদুরে মেঘ দেখে ভয় পাবেই।

ভারতীয় বাঁধ যত নিচের দিকে হবে, বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ তত কমবে। এর মানে হলো, তিব্বতে চীনের পানি আটকে রাখায় যত সমস্যা হবে, অরুণাচলে বাঁধ হলে তা আরও বাড়বে; যেহেতু অরুণাচল থেকেই ব্রহ্মপুত্র বেশি জলধারা পায়। ভারত ও বাংলাদেশ এখানে একযোগে চীনের সঙ্গে আলোচনায় নামতে পারে।

বাংলাদেশের জন্য মড়ার উপর খাঁড়ার ঘা হয়ে দেখা দিতে পারে আরেক বাস্তবতা। চীনের জবাবে ভারতও অরুণাচলে ১০ গিগাওয়াট ক্ষমতাসম্পন্ন জলবিদ্যুতের বাঁধ ও জলাধার তৈরির কথা বলছে। এই প্রকল্পে পানি সরিয়ে নেওয়ার ব্যবস্থা রাখার কথা বলেছেন এক ভারতীয় সরকারি কর্মকর্তা। কিন্তু ভারত ইতিমধ্যে চাহিদার চেয়ে বেশি বিদ্যুৎ উৎপাদনের সক্ষমতা অর্জন করায় নতুন জলবিদ্যুৎ প্রকল্পের বাস্তব প্রয়োজন নেই।

তবে অরুণাচল প্রদেশ ঘিরে ভারত ও চীন যে ধরনের বিবাদে লিপ্ত, তাতে জ্বালানির জন্য অদরকারি হলেও ভূরাজনৈতিক প্রয়োজনে তারা বাঁধের জবাবে বাঁধ বানাতেও পারে। সেই ভারতীয় বাঁধ যত নিচের দিকে হবে, বাংলাদেশের দিকে পানিপ্রবাহ তত কমবে। এর মানে হলো, তিব্বতে চীনের পানি আটকে রাখায় যত সমস্যা হবে, অরুণাচলে বাঁধ হলে তা আরও বাড়বে; যেহেতু অরুণাচল থেকেই ব্রহ্মপুত্র বেশি জলধারা পায়। ভারত ও বাংলাদেশ এখানে একযোগে চীনের সঙ্গে আলোচনায় নামতে পারে। এই ত্রিপক্ষীয় দর-কষাকষি ভারতের সঙ্গে তিস্তা নদীর পানিবণ্টন বিষয়ে বাংলাদেশের জন্য ইতিবাচক বৈ নেতিবাচক হবে না।

পদ্মা–মেঘনা–যমুনা যে বাংলাদেশের ঠিকানা, সেই ঠিকানা তৈরিতে ব্রহ্মপুত্রের অবদান এখনো বিপুল। এ ক্ষেত্রে যেন আমরা পদ্মা ও তিস্তার মতো কেবল বন্ধুদেশের আশ্বাসে বুক বেঁধে বসে না থাকি।

ফারুক ওয়াসিফ লেখক ও সাংবাদিক
faruk.wasif@prothomalo.com

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন