সে ক্ষেত্রে আমাদের মন ভালো রাখতে হবে। করোনার খবর থেকে মন অন্যত্র সরিয়ে নিতে হবে। বাংলাদেশের মানুষের মনকে সবচেয়ে বেশি টানে, সবচেয়ে বেশি দখল করে ফেলে ব্রাজিল-আর্জেন্টিনা দ্বৈরথ। এটা যদি বিশ্বকাপ হতো এবং এখন যদি সব দোকানপাট, দরজিঘর খোলা থাকত, আমরা এতক্ষণে নীল-সাদা, হলুদ-সবুজ পতাকা দিয়ে বাংলার আকাশ ঢেকে দিতে পারতাম। একজন একটা পতাকা তুললেই হলো, সে ব্রাজিলের হোক কিংবা আর্জেন্টিনার, অমনি তার প্রতিপক্ষ সমর্থকেরা তারও চেয়ে বড় পতাকা তুলবেই। খেলার ফল মাঠে যা হবে, তা আমার হাতে নেই, পতাকার দৈর্ঘ্য–প্রস্থ তো আমার হাতে, এটাতে আমি আমার প্রিয় দলকে হেরে যেতে দিতে পারি না।

তবে এর মধ্যে একটা খবর পড়ে প্রথমে খানিকটা হাসলাম। ব্রাজিল–সমর্থকের চাচাকে পিটিয়েছে আর্জেন্টিনার সমর্থকেরা। ঘটনা ঘটেছে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদরের দামচাইল বাজার এলাকায়। আগের দিন ব্রাজিল আর আর্জেন্টিনার দুই সমর্থকের মধ্যে কথা-কাটাকাটি থেকে সামান্য মারামারি হয়েছে। এলাকাবাসী সেটা মিটমাটও করে দিয়েছেন। পরের দিন ব্রাজিল–সমর্থকের চাচা একা একা গেছেন ঘাস কাটতে। তাঁকে একলা পেয়ে আর্জেন্টিনা–সমর্থকেরা ধরে মার দিয়েছে।

ভালোভাবে খবরটা পড়ে দেখার পর মুখের হাসি আমার নিভে গেল। আমিও তো একলা চলি। আমি যার চাচা, মানে আমার ভাতিজা যে, সে কিসের সমর্থক, এটা তো জানা দরকার। আমি ফোন দিলাম আমার ভ্রাতুষ্পুত্রকে, বাবা, কেমন আছ?

জি চাচা। ভালো আছি।

কই তুমি? একটু কথা বলা যাবে?

জি চাচা।

তুমি ব্রাজিল সমর্থন করো, নাকি আর্জেন্টিনা?

ব্রাজিল, চাচা।

সর্বনাশ!

কেন চাচা?

না মানে তুমি কি আর্জেন্টিনা সমর্থন করতে পারো না?

না চাচা। তুমি জানো, আমি সেই ছোটবেলা থেকেই ব্রাজিল...

আর বোলো না। ফোন কনভারসেশন রেকর্ড হয়। এই কথা এখন যদি ছড়িয়ে পড়ে, আমার তো...

কেন চাচা?

তুমি জানো না, ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় আর্জেন্টিনা–সমর্থকেরা ব্রাজিল–সমর্থকের চাচাকে মার দিয়েছে। প্রথম আলো ডট কমের ৭ জুলাইয়ের খবর।

আমার ভ্রাতুষ্পুত্র হাসতে লাগল।

কিন্তু ব্যাপারটা যে হাসির নয়, আপনারা জানেন। ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা নিয়ে আমাদের দেশের সমর্থকদের কর্মকাণ্ড সব সময় হাসির থাকে না। অনেক সময় কান্নারই কারণ হয়। এরই মধ্যে আর্জেন্টিনার পতাকা ছাদে ওড়াতে গিয়ে বিদ্যুৎস্পৃষ্ট হয়ে একজনের মৃত্যুর খবরও প্রকাশিত হয়েছে। এরপর আরও মারামারি, হতাহত হওয়ার খবর আসবে। তারপর আসবে খেলা চলার সময় হার্ট ফেলের খবর। আসবে আর্জেন্টিনা–সমর্থক স্ত্রীর ব্রাজিল–সমর্থক স্বামীকে তালাক দেওয়ার খবর।

এসব বাড়াবাড়ি না থাকলে ফুটবল নিয়ে এই মাতামাতিটা কিন্তু ভালোই। লোকে যার যার বাড়িতে বসে খেলা দেখবে, ফলে ‘কঠোর বিধিনিষেধ’ বেশ খানিকটা সফল হবে। করোনা ছাড়াও অন্য বিষয়ে মানুষ মন দেবে, ফলে মনের ওপরে চাপ কমবে। ফেসবুকে ‘মিম’ হয়েছে, ব্রাজিল–আর্জেন্টিনা খেলা আসায় বাংলাদেশের মানুষ প্রমাণ করতে পারছে যে এই দেশে বাক্‌স্বাধীনতা আছে, বেছে নেওয়ার অধিকার আছে।

ছোটবেলায় একটা গল্প শুনেছিলাম। সেটা থেকে নাটকও করা হতো। দুই পরিবারের দুই বাচ্চার ঝগড়া লেগেছে। তা ক্রমে ছড়িয়ে পড়ল দুই পরিবারের বড়দের মধ্যে। সেটা বড় হতে হতে পরিণত হলো এলাকার দুই গোত্রের বৃহত্তর সংঘাতে। যখন যুদ্ধের দামামা ভয়ংকরভাবে বাজছে, দুই বাচ্চা তখন একসঙ্গে খেলছে, আর হাসছে। তাদের মধ্যে কোনো দ্বন্দ্ব নেই।

আমরা, বাংলার দামাল ছেলেরা, যখন আর্জেন্টিনা আর ব্রাজিল বলে চিৎকার করতে করতে এ ওর ঘাড়ে দু–চারটা মুষ্ট্যাঘাত করে বসছি, মেসি আর নেইমার তখন একসঙ্গে বসে চা খাচ্ছেন, আর হাসিঠাট্টা করছেন। নেইমার বলেছেন, ফাইনালে আর্জেন্টিনাকে চাই, কারণ মেসি আমার বন্ধু। মেসি বলেছেন, নেইমার কেন আর্জেন্টিনাকে সমর্থন করেছে, আমি জানি। কারণ, সে আমার খুব ভালো বন্ধু।

ওরা ও রকম বলতেই পারে। ওরা ছেলেমানুষ। শিশু। একবার গালাগালি করে পরমুহূর্তেই গলাগলি ওরা করতেই পারে। ওদের কাছে এটা ছেলেখেলা। কিন্তু আমরা, বাংলা সদা জাগ্রত সমর্থকেরা, আমরা তো খেলাটাকে ছেলেখেলা বানিয়ে ফেলতে পারি না। ‘যায় যদি যাক প্রাণ, হীরকের রাজা ভগবান’ বলে আমরা লাঠি-সড়কি নিয়ে ঝাঁপিয়ে পড়ব। আজ তোরই একদিন নাকি আমারই একদিন।

ভাই, আমি ব্রাজিল–সমর্থকের চাচা হলেও আমার দ্ব্যর্থহীন ঘোষণা, আর্জেন্টিনাই পৃথিবীর সর্বশ্রেষ্ঠ ফুটবল দল। কারণ, আমার ভাতিজা আমাকে একটু আগে ফোন করে বলেছে, চাচা, আপন প্রাণ বাঁচা। কথাটা আবার ব্রাজিল–সমর্থকদের কানে তুলে দেবেন না যেন!

আনিসুল হক প্রথম আলোর সহযোগী সম্পাদক ও সাহিত্যিক