
পুকুরের শান্ত জলে হঠাৎ ঢিল পড়লে একটু তরঙ্গ তৈরি হয় এবং কিছুক্ষণ পর তা মিলিয়ে যায়। গত সোমবার ছাত্রলীগের সমাবেশে সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের মন্তব্যের প্রতিক্রিয়া অনেকটা সে রকম। রাজনীতির মাঠে একটু উত্তাপ ছড়িয়েছে। তবে তা সাময়িক। এমনটা মাঝেমধ্যেই হয়। আওয়ামী লীগের অজ্ঞাতকুলশীল কোনো রাম-রহিম এ ধরনের কথা বললে হয়তো আমরা মাথা ঘামাতাম না। কিন্তু সৈয়দ আশরাফ বলে কথা, তিনি আওয়ামী লীগের একজন গুরুত্বপূর্ণ নেতা, সাধারণ সম্পাদক। তিনি ফালতু কথা বলার লোক? নিশ্চয়ই না। তিনি যা বলেছেন, দায়িত্ব নিয়েই বলেছেন। সে জন্যই বিতর্ক তৈরি হয়েছে।
সৈয়দ আশরাফ মৃদুভাষী লোক। ক্যামেরার সন্ধানে হুমড়ি খেয়ে পড়েন না। মাঝে মাঝে তাঁর কিছু তির্যক মন্তব্যে সরকারকেও বিব্রত হতে হয়। বেশ কিছুদিন আগে তিনি মার্কিন উপপররাষ্ট্রমন্ত্রীকে দুই আনার মন্ত্রী বলে উপহাস করেছিলেন। তিনি নিজেও একসময় চার আনার মন্ত্রী ছিলেন। পরে আট আনার হয়েছেন। প্রধানমন্ত্রীই একমাত্র ষোলো আনা। গত বছর আওয়ামী লীগের প্রেসিডিয়াম সদস্য শেখ ফজলুল করিম সেলিম একই রকমভাবে জাসদের বিরুদ্ধে বিষোদ্গার করেছিলেন। আমার তখন মনে হয়েছিল, অপ্রাপ্তির হতাশা, ক্ষোভ ও ঈর্ষা থেকে হয়তো তিনি ওই রকম কথা বলেছিলেন। সৈয়দ আশরাফের মনেও কি ক্ষোভ জমেছে?
ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন নিয়ে তুলকালাম হয়েছে। আওয়ামী লীগ বনাম আওয়ামী লীগের এই লড়াইয়ে তৃণমূল পর্যায়ে দল অনেক জায়গায় ছত্রখান হয়ে গেছে। আসন্ন কাউন্সিল সভার প্রতিনিধি হিসেবে ইউনিয়ন ও উপজেলা কমিটি থেকে কারা কাউন্সিলে প্রতিনিধিত্ব করবেন, তা নিয়ে যথেষ্ট উদ্বেগ আছে দলের মধ্যে। কাউন্সিল তিন মাস পিছিয়ে দেওয়া হয়েছে। বলা হয়েছে বর্ষাকাল, কোরবানির ঈদ ইত্যাদি ইত্যাদি। তো, জুলাই মাসে বৃষ্টি হয়, সেপ্টেম্বরে কোরবানি হবে, এটা তো অনেক আগে থেকেই জানা। এটা নতুন করে আবিষ্কারের তো দরকার নেই। মনে হয় দলে কিছুটা হলেও সংকট আছে। সংকটে আছেন সৈয়দ আশরাফও। বোধ হয় নানা কারণে তিনি বিরক্ত কিংবা ক্ষুব্ধ। এবং তার কোপটা গিয়ে পড়েছে জাসদের ঘাড়ে।
বাংলাদেশের রাজনীতিতে ‘গণতন্ত্র’ আর ‘ষড়যন্ত্র’ হাত ধরাধরি করে চলে। এখানে ষড়যন্ত্র কারও কাছে পাপ, কারও কাছে পুণ্য। তখন ষড়যন্ত্রের অন্য নাম হয় রাজনীতি আর রণকৌশল। যিনি নিজেকে ‘বিপ্লবী’ মনে করেন, প্রতিপক্ষের কাছে তিনিই ‘ষড়যন্ত্রকারী’। সৈয়দ আশরাফের ভাষায় জাসদ ষড়যন্ত্র করেছে। জাসদের ভাষায় তারা করেছে বিপ্লবী রাজনীতি। সরকার উৎখাতের প্রকাশ্য ঘোষণা দিয়েই বাহাত্তরের ৩১ অক্টোবর জাসদের জন্ম হয়েছিল।
এ দেশে সন্ত্রাসবাদী ধারার সশস্ত্র রাজনীতি শুরু করেছিল নানান গোত্রে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে থাকা কমিউনিস্টরা। চুয়াত্তরের মাঝামাঝি থেকে জাসদও এই যাত্রায় শরিক হয়েছিল। জাসদের মূল নেতৃত্ব ষাটের দশকের গণতান্ত্রিক জাতীয়তাবাদী রাজনীতির উত্তরাধিকার বহন করত। দলটির জনসম্পৃক্ততাও ছিল ভালো রকমের। ফলে অল্প দিনেই জাসদ আওয়ামী লীগের প্রতিপক্ষ হতে পেরেছিল। একদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগের অসহিষ্ণু আচরণ, অন্যদিকে জাসদের ক্রমাগত অধৈর্য হয়ে পড়ার ফলে দেশে একটা সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছিল। জাসদের আর তর সইছিল না ১৯৭৮ সালের নির্বাচন পর্যন্ত অপেক্ষা করার। ফলে যা হওয়ার তা-ই হলো। এই সুযোগে তৃতীয় পক্ষের হাতে ঘটে গেল স্মরণকালের নৃশংসতম হত্যাকাণ্ড। শেখ সেলিম এবং পরবর্তী সময়ে সৈয়দ আশরাফের কথা শুনে মনে হয় আওয়ামী লীগের অনেক নেতা এখনো ১৯৭২-৭৫-এর বৈরী সময়ের দুঃসহ স্মৃতি কাটিয়ে উঠতে পারেননি। ইতিমধ্যে চারটি দশক পার হয়ে গেছে। আওয়ামী লীগ ও জাসদ ২০০২ সালের পর থেকেই ১৪-দলীয় জোটের সহযাত্রী। তারপরও পুরোনো ক্ষতটা বারবার মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে।
আওয়ামী লীগ বরাবরই ‘একলা চলো’ রাজনীতিতে অভ্যস্ত। এ কারণেই ১৯৫৪ সালের নির্বাচনের পর ‘যুক্তফ্রন্ট’ ভেঙে গিয়েছিল। আওয়ামী লীগের আগ্রাসী মনোভাবের কারণেই ১৯৭৩ সালে গড়ে ওঠা নিন্দনীয় ‘ক্ষণ ঐক্যজোট’ এক বছরের বেশি টেকেনি। জিয়াউর রহমানের সামরিক শাসনের সময় আওয়ামী লীগ জোটের রাজনীতিতে নতুন করে প্রবেশ করে। অনেকের মতো জাসদও সহযাত্রী হয়। তারা তৈরি করে ১০-দলীয় ঐক্যজোট। পরে এটা হয় ১৪-দলীয় জোট। ১৯৮৬ সালের নির্বাচনকে কেন্দ্র করে জোট ভেঙে যায়। জাসদ ও কয়েকটি দল মিলে পাঁচদলীয় জোট তৈরি করে নির্বাচন বর্জন করে। আওয়ামী লীগ একটি আটদলীয় জোট বজায় রাখে। ২০০১ সালের নির্বাচনের পর আওয়ামী লীগ ও জাসদ আবার সঙ্গী হয় ১৪-দলীয় জোট। ২০০৯ সাল থেকে জাসদ আওয়ামী লীগের নেতৃত্বাধীন সরকারের অংশ। এত দিন একসঙ্গে পথ চলার পরও আওয়ামী লীগের গুরুত্বপূর্ণ নেতারা যখন জাসদকে গালমন্দ করেন, তখন বোঝা যায় জোটের ভিত্তি যথেষ্ট সবল নয়। ‘অতীত দিনের স্মৃতি কেউ ভোলে না কেউ ভোলে।’
জোটের রাজনীতির অর্থই হলো ভিন্নমতের একাধিক দল ন্যূনতম কর্মসূচি নিয়ে একসঙ্গে চলবে। সব বিষয়ে তাদের একমত হওয়ার দরকার নেই। এদিক থেকে জাসদকে অনেক বেশি নম্বর দিতে হয়। তারা তো সব বিষয়েই আওয়ামী লীগের সঙ্গে একমত। ‘অর্থনৈতিক উন্নয়ন ও জঙ্গিবাদ ঠেকানোর জন্য প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার হাতকে শক্তিশালী করাই’ জাসদের ধ্যান-জ্ঞান। শেখ হাসিনার প্রতি জাসদ নেতৃত্বের আনুগত্যে কোনো ফাটল চোখে পড়ে না। তারপরও আওয়ামী লীগের অনেক নেতার চক্ষুশূল জাসদ। কেন?
১৪-দলীয় জোটের ঐক্য ও সংহতি টিকিয়ে রাখতে জাসদ মরিয়া। এ দেশে ছোট দলগুলো নিজের শক্তিতে সংসদীয় রাজনীতিতে টিকে থাকার জন্য যুদ্ধ করে যাচ্ছে। কিন্তু তা প্রায় অসম্ভব। জাসদ যদি আওয়ামী লীগের কক্ষপথে হাঁটে, তাহলে ‘চুয়ানো’ প্রক্রিয়ায় (ট্রিক্ল ডাউন প্রসেস) কিছু সুবিধা পায়, সংসদে দু-চারজন বসতে পারেন, মন্ত্রীও হতে পারেন কেউ কেউ। জোটে না থাকলে দলটাকে হয়তো কিছুদিন পর অণুবীক্ষণ যন্ত্র দিয়ে খুঁজতে হবে। জাসদকে জোটে রাখলে আওয়ামী লীগেরও লাভ ছাড়া ক্ষতি নেই। এতে অন্তত একজন সম্ভাব্য ‘শত্রু’কে নির্বীর্য করা যায় এবং প্রধান প্রতিপক্ষ বিএনপি আরও কোণঠাসা হয়।
রাজনীতিতে আওয়ামী লীগ আর জাসদ এখন খুব কাছাকাছি। আওয়ামী লীগের বাইরে জাসদের আলাদা রাজনীতি নেই বললেই চলে। সুতরাং তাদের এক জোটে না থাকাটাই হবে অস্বাভাবিক। অতীতের রাজনীতি থেকে অনেক সরে এসেছে দুটো দলই। আওয়ামী লীগ আর সমাজতন্ত্র বা বাকশালের কথা বলে না। জাসদ বৈজ্ঞানিক সমাজতন্ত্রের স্লোগানটা পুরোপুরি বর্জন করেছে। উভয়েই এখন মুক্তবাজার অর্থনীতির নৌকায় সওয়ার হয়েছে। অতীত রাজনীতি আছে শুধু স্মৃতিতেই। কেউ কেউ এখনো তার জাবর কাটেন। তাতে পুরোনো আহত মনস্তত্ত্ব জেগে ওঠে, লাভ হয় না কারও।
একদিক থেকে জাসদের অবস্থা বেশ নাজুক। যদি কোনো কারণে জাসদ আওয়ামীবৃত্ত থেকে ছিটকে পড়ে, তাহলে তার উঠে দাঁড়ানো খুব কঠিন হবে। দলটির স্বতন্ত্র রাজনীতি দৃশ্যমান না থাকার কারণে এটা অবলুপ্ত হয়ে যেতে পারে, যেমনটি অতীতে ঘটেছে অনেক দলের ক্ষেত্রে। তবে এটা ঠিক যে জোটে থেকে জাসদের দর-কষাকষির ক্ষমতা কমে গেছে। তারপরও জাসদ মাটি কামড়ে এই জোটে থাকার চেষ্টা করবে।
কোটি টাকার প্রশ্ন হলো, আওয়ামী লীগের মধ্য থেকে জাসদের বিরুদ্ধে এ ধরনের বিষোদ্গার হয় কেন? এতে কি জোটের শৃঙ্খলা নষ্ট হয় না? নাকি আওয়ামী লীগ এখনো জোটের রাজনীতিতে শতভাগ অভ্যস্ত হয়ে উঠতে পারেনি? জোটের প্রথাগত নিয়ম হলো, দল যত ছোটই হোক, যত দুর্বলই হোক, শরিক হিসেবে সে মর্যাদা দাবি করতে পারে। বিশ্বসভায় বড় ও ক্ষমতাশালী দেশগুলো অনেক সময় ছোট ও দুর্বল দেশকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য করে। এটা বৈশ্বিক রাজনৈতিক ব্যবস্থার একটা দুর্বলতা। এ নিয়ে আছে অনেক দ্বন্দ্ব-সংঘাত, আছে মন-কষাকষি। দেশের ভেতরে ছোট পরিসরে জোটের রাজনীতিতেও আছে তেমনই টানাপোড়েন। এর ফলে অনেক সময় তৈরি হয় অবিশ্বাস ও আস্থাহীনতা। ‘বড়র পিরিতি বালির বাঁধ, ক্ষণে হাতে দড়ি ক্ষণেকে চাঁদ।’ জাসদের জন্য আওয়ামী লীগও তেমন একজন মিত্র। খুবই দরকারি, কিন্তু নির্ভরযোগ্য কি?
মহিউদ্দিন আহমদ: লেখক ও গবেষক।