বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

শরীফ উদ্দিনের এই বক্তব্য বিচ্ছিন্ন কিছু নয়। অতীতে আমরা বহুবার প্রধানমন্ত্রীকে শেষ বা একমাত্র ভরসা হিসেবে আর্তি জানাতে দেখেছি। গত বছরের কিছু উদাহরণ দিই। গত বছরের জুনে গুম হয়ে যাওয়া ইসলামি বক্তা আবু ত্ব-হার খোঁজ চেয়ে শেষ ভরসা হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর কাছে আবেদন করেন তাঁর অসহায় স্ত্রী। জুনেই প্রধানমন্ত্রীকে মা সম্বোধন করে পুলিশ-র‍্যাবের কাছে ভোগান্তির বিচার চেয়েছেন অভিনেত্রী পরীমনি। জুলাইয়ে চিকিৎসা খরচের জন্য প্রধানমন্ত্রীকে শেষ ভরসা বলে উল্লেখ করেন পাবনার ঈশ্বরদীর একজন মুক্তিযোদ্ধা। আগস্টে বয়স্ক ভাতার জন্য প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছেন ঝিনাইদহের সত্তরের কোঠায় পৌঁছানো একজন মানুষ। অক্টোবরে যশোরের ভবদহ অঞ্চলের জলাবদ্ধতা সমস্যা রোধে ‘সাধারণ মানুষের শেষ ভরসা’ হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপের আর্তি জানানো হয় সংবাদ সম্মেলনে।

এর আগে ২০২০ সালে মার্চে করোনাকালে শ্রমিকদের বেতন দেওয়ার আশ্বাস দেওয়াকালে বিজিএমইএর সভাপতি সবাইকে প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা রাখার আহ্বান জানান। জুনে স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মহাপরিচালক করোনা পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর ওপর ভরসা রাখার আহ্বান জানান। কয়েক বছর আগে নিজের বিবাহবিচ্ছেদ-সংক্রান্ত জটিলতা সমাধানে প্রধানমন্ত্রীকে শেষ ভরসা হিসেবে উল্লেখ করেন অভিনেত্রী অপু বিশ্বাস।

বিভিন্ন কারণে ইউরোপ-আমেরিকায় থেকেছি বহু বছর। সারা জীবন দেশ-বিদেশের খবর রাখি নিজের আগ্রহে। মনে হয় না এমন সংবাদ অন্য কোথাও দেখেছি আর। এটা কি সুশাসন, নাকি অন্য কিছুর লক্ষণ?

প্রধানমন্ত্রী এককভাবে মানুষের ‘ভরসা’ হতে পারেন না। তিনি ‘ভরসা’ দেওয়ার ব্যবস্থার প্রধান। এ ব্যবস্থার অংশ হচ্ছে মন্ত্রিসভা, সরকারি প্রশাসনযন্ত্র, পুলিশ-গোয়েন্দা আর বিচার বিভাগ। এখানে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বেতন, বাড়ি-গাড়ি, সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবই হয় জনগণের করের টাকায়। সংবিধান বলেছে, তাঁরা সবাই জনগণের সেবক।

২.

বাংলাদেশের সংবিধান অনুসারে প্রধানমন্ত্রী সবচেয়ে ক্ষমতাধর ব্যক্তি। তাঁর ক্ষমতা অন্য অনেক প্রধানমন্ত্রীর চেয়ে বেশি। যেমন: ভারতে রাষ্ট্রপতিকে চলতে হয় মন্ত্রিসভার পরামর্শ মোতাবেক, বাংলাদেশে শুধু প্রধানমন্ত্রীর পরামর্শ মোতাবেক।

বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তাই বলে মধ্যযুগের রাজরাজড়াদের মতো একচ্ছত্র ক্ষমতার অধিকারী নন। রাজকোষ, ধর্মশালা, সৈন্যসামন্ত—সব ছিল তাঁদের একচ্ছত্র নিয়ন্ত্রণে। তাঁরাই শাসন করতেন, আইন বানাতেন, ইচ্ছেমতো বিচার করতেন। এমন রাজরাজড়াদের দরবারে এক লহমায় প্রতিকার বা অনুগ্রহ পাওয়ার আশা করতে পারতেন সাধারণ মানুষ। কিন্তু রাজতন্ত্রেও এমন ক্ষমতা এখন নেই আর।

বাংলাদেশ রাজতন্ত্র নয়। এখানে সংবিধানে বরং সংসদের কাছে প্রধানমন্ত্রী ও তাঁর মন্ত্রিসভার জবাবদিহির বিধান রয়েছে। এখানে নির্বাহী ক্ষমতার প্রয়োগ হওয়ার কথা সরকারের রুলস অব বিজনেস অনুসারে। জলাবদ্ধতা সমস্যার সমাধান করবে পানি উন্নয়ন বোর্ড। সরকারি চাকরিতে অন্যায় পদক্ষেপের শিকার হলে প্রতিকার দেবেন প্রশাসনিক আদালত। র‍্যাব-পুলিশ ভোগান্তি সৃষ্টি করলে প্রতিকার চাওয়ার সুযোগ আছে উচ্চ আদালতে।

সংবিধান, আইন আর ব্যবস্থা থাকা সত্ত্বেও আমরা কেন প্রধানমন্ত্রীর কাছে প্রতিকার চাই এখন? এটা কি রাষ্ট্রীয় ব্যবস্থা আর প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আস্থা হারিয়ে ফেলার লক্ষণ নয়?

৩.

ভিন্ন কিছু উদাহরণও আছে। পরীমনির জামিন বা সিনহা হত্যার বিচারের মতো কিছু উদাহরণ দিয়ে বলা যায় রাষ্ট্রব্যবস্থা কাজ করছে না কোথায়, প্রতিকার পাওয়া যাচ্ছে না কীভাবে? কিন্তু তলিয়ে দেখলে দেখা যাবে, এগুলো আসলে ব্যতিক্রমী ঘটনা বা এসবের মধ্যেও রয়েছে রাষ্ট্রব্যবস্থার বহু গলদের চিহ্ন।

যেমন পরীমনি জামিন পেয়েছেন সত্যি, কিন্তু এর আগে মদের ‘বোতল উদ্ধার’ নিয়ে তাঁকে সারা দেশবাসীর কাছে অপদস্থ হতে হয়েছে, রিমান্ডে কয়েকবার অসহনীয় দুরবস্থার মুখোমুখি হতে হয়েছে, অশ্লীল প্রচারণার শিকার হতে হয়েছে বহুদিন। সিনহা সাবেক সেনা কর্মকর্তা হওয়াতেই হয়তো তাঁর হত্যা মামলায় ওসি প্রদীপসহ কয়েকজনের দোষ আদালতে প্রমাণিত হয়েছে। কিন্তু তাঁর অঞ্চলে আরও প্রায় ২০০ সাধারণ মানুষ বিচারবহির্ভূত হত্যাকাণ্ডের শিকার হয়েছেন। এসব ঘটনার বিচার হয়নি, অনেকে অভিযোগ জানানোর সাহস পাননি। বরং ওসি প্রদীপই তাঁর কাজের দক্ষতার জন্য রাষ্ট্রপতি পদক পেয়েছিলেন এসব হত্যাকাণ্ডের সময়। এগুলো রাষ্ট্রব্যবস্থার গলদের কিছু উদাহরণমাত্র।

এসব ব্যবস্থাকে ডিঙিয়ে আমরা তাই মরিয়া হয়ে প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চাইতে দেখি। যাঁদের এটা করার মানসিকতা নেই, তাঁদের অনেকে বিচারের দাবি বা আশা ছেড়ে দেন (যেমন দীপনের বাবা, অভিজিতের স্ত্রী)। যাঁরা প্রধানমন্ত্রীর হস্তক্ষেপ চান, তাঁরাও যে সব সময় প্রতিকার পান, তা নয়। নারায়ণগঞ্জে কিশোর ত্বকী হত্যাকাণ্ডের বিচারের কোনো সুরাহা হচ্ছে না প্রধানমন্ত্রীর কাছে বারবার হস্তক্ষেপ চেয়েও। সাগর-রুনির হত্যাকাণ্ডের পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আমাদের আশ্বাস দিয়েছিলেন যে প্রধানমন্ত্রীই বিষয়টি দেখছেন। ১০ বছর হতে চলল, এই ভয়াবহ হত্যাকাণ্ডের কোনো তদন্তই সম্পন্ন হয়নি।

এর দুটো মানে হতে পারে। প্রধানমন্ত্রী হস্তক্ষেপ করেন নির্বাচিত ক্ষেত্রে বা তাঁর হস্তক্ষেপের পরও কাজ হয় না কিছু কিছু ক্ষেত্রে। দুটোর কোনোটিই আশাবাদী হওয়ার মতো কিছু নয়। সুশাসন ও ন্যায়বিচারের পরিচায়ক নয়।

৪.

প্রধানমন্ত্রীর কাছে শেষ ভরসা হিসেবে আকুতি জানায় মানুষ অনন্যোপায় হয়ে। তবে সবার মনে নিশ্চয়ই এমন আকুতি জানানোর চিন্তা আসে না বা এর সুযোগ হয় না। সাধারণ মানুষের অনেকে বরং ব্যবস্থার কাছেই ছুটে যায় প্রাথমিক প্রতিকার পেতে। তাদের কী পরিণতি হয়, তা হয়তো আমরা জানতে পারতাম রাষ্ট্রের জবাবদিহিমূলক প্রতিষ্ঠানগুলো (সংসদীয় কমিটি, মানবাধিকার কমিশন, তথ্য কমিশন) ঠিকমতো কাজ করলে। তবে কিছুটা আমরা আঁচ করতে পারি উচ্চ আদালতে আগাম জামিন, মামলা খারিজ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের মামলার অজস্র আবেদন থেকে। সেখানেও প্রতিকার পাওয়া সময়সাপেক্ষ বা ব্যয়বহুল, কখনো কখনো অসম্ভব সরকারি হস্তক্ষেপের কারণে বা এর আশঙ্কায়।

কিন্তু তাই বলে প্রধানমন্ত্রী এককভাবে মানুষের ‘ভরসা’ হতে পারেন না। তিনি ‘ভরসা’ দেওয়ার ব্যবস্থার প্রধান। এ ব্যবস্থার অংশ হচ্ছে মন্ত্রিসভা, সরকারি প্রশাসনযন্ত্র, পুলিশ-গোয়েন্দা আর বিচার বিভাগ। এখানে যাঁরা আছেন, তাঁদের প্রত্যেকের বেতন, বাড়ি-গাড়ি, সন্তানের ভবিষ্যৎ—সবই হয় জনগণের করের টাকায়। সংবিধান বলেছে, তাঁরা সবাই জনগণের সেবক।

এ ব্যবস্থা ঠিকমতো কাজ করছে, তা নিশ্চিত করার মূল দায়িত্ব প্রধানমন্ত্রীর। এটি করতে পারলেই শুধু জনগণের প্রকৃত ভরসা হওয়া যায়। ব্যবস্থার ওপর হারিয়ে মানুষ অবিচার মেনে নিলে বা স্বয়ং প্রধানমন্ত্রীর কাছে ফরিয়াদ জানাতে বাধ্য হলে তা ব্যবস্থার প্রধান হিসেবে প্রধানমন্ত্রীর জন্য গৌরবজনক নয়।

আমরা সবাই কি উপলব্ধি করতে পারি এটি?

আসিফ নজরুল ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইন বিভাগের অধ্যাপক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন