বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন

বাংলার আকাশে যখন দুর্যোগের ঘনঘটা, তখন এই সিঁড়ি বেয়েই তিনি দৃপ্ত পদক্ষেপে ৭ মার্চের এক মধ্যাহ্নে লাখো কোটি মানুষের সামনে হাজির হয়েছিলেন ‘দুঃখভারাক্রান্ত হৃদয়ে’। সাড়ে সাত কোটি বাঙালির মুক্তির বার্তা স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়ে ফিরে এসেছিলেন ক্লান্ত শরীরে। ফিরেছিলেন যে সিঁড়ি বেয়ে, সেই সিঁড়ি বেয়েই কালরাত্রিতে খাকি পোশাকে বুটের শব্দ তুলে হানা দিয়েছিল পাকিস্তানি হানাদারেরা। রাতের খাবার শেষে বেশি সময় পাননি তিনি। কেননা, অল্পক্ষণের মধ্যে সেই সিঁড়ি দিয়েই বন্দী বঙ্গবন্ধুকে নিচে নামিয়ে আনা হয়।

তারপর ১০ মাস কারাগারের অন্ধকার কাটিয়ে স্বাধীন বাংলাদেশে ফিরে আসেন তিনি। হাচুর (শেখ হাসিনা) মায়ের হাত ধরে এই সিঁড়ি বেয়ে উঠেছিলেন তিনি দোতলায় শীর্ণ ক্লান্ত দেহে তাঁর চিরচেনা ঘরে। প্রতীক্ষায় ছিল সন্তানেরা আর ছিল প্রিয় তালপাতার শীতল বাতাস। স্বাধীন বাংলার প্রধানমন্ত্রীর ঘরে ছিল না কোনো কার্পেট কিংবা শীততাপের মেশিন। মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের জন্য যিনি রাতদিন ১৯ ঘণ্টা পরিশ্রম শেষে এই সিঁড়ি বেয়েই দোতলায় নিজ ঘরে ফিরতেন, তিনিই আমাদের জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ফিরতেন পুত্র–কন্যাদের পাশে নাতি ও নাতনি জয় আর পুতুলের কাছে।

আহ, কী ভয়ংকর, কী নিষ্ঠুর সেই শব্দ। অটোমেটিক রাইফেলের গগনবিদারী শব্দে কেঁপে ওঠে সেই সিঁড়ি, ধানমন্ডির ঐতিহাসিক সেই বাড়ি! বুলেট–গুলি অনবরত খাবলে খেয়ে ফেলে তাঁর বিশাল হৃদয়ের হৃৎপিণ্ডটাকে!

শিশিরভেজা ভোরে কিংবা আজানের সুরে ঘুম ভেঙে ছুটেছেন তেঁতুলিয়া কিংবা রংপুরে, কখনোবা রাঙামাটি কিংবা বিস্তীর্ণ নদী পদ্মার পারে রাজশাহী। ব্রিজ নেই, রিজার্ভে টাকা নেই, শস্যভান্ডারে শস্য নেই; তবু কোকিলের ডাক ছিল মধ্যাহ্নে। ক্লান্ত শরীরে ছুটে বেড়িয়েছেন সদ্য স্বাধীন দেশের বিধ্বস্ত অর্থনীতি চাঙা করতে দেশ থেকে দেশান্তরে সাহায্যের আশায়। আবার ফিরেছেন নিজ গৃহে এই সিঁড়ি বেয়েই। বিশ্রাম কাকে বলে ভুলেছিলেন তিনি।

গ্রীষ্মের এক দুপুরে একাকী বসেছিলেন তিনতলার ছাদে। গোধূলিতে আমি এসে দেখি স্যান্ডো গেঞ্জি গায়ে লুঙ্গি পরা বঙ্গবন্ধু বিষণ্নবদনে খোলা আকাশের নিচে একাকী বসে। বঙ্গবন্ধুকে এমন অবস্থায় আর কখনো দেখিনি আগে। সাধারণ এক বাঙালি। পরম মমতায় বাবার ক্যামেরায় মুহূর্তেই অবিস্মরণীয় এক ছবি তুলে ফেলি আমি। ভাগ্যের কী নির্মম পরিহাস, কদিন পরই ১৫ আগস্টে ভোরে সেই সিঁড়ি বেয়ে মারণাস্ত্র হাতে এসে হাজির হলো পথভ্রষ্টরা। আততায়ীদের রুখে দিতে এই সিঁড়ি বেয়েই নেমে এসেছিলেন তিনি দৃপ্ত পায়ে, হাতে চশমা, ভয়শূন্য অকম্পিত কণ্ঠে উচ্চারিত হয়েছিল তাঁর চিরায়ত সেই বজ্রকণ্ঠ, ‘কী চাস তোরা?’

ঘাতকদের জবাব এসেছিল অটোমেটিক রাইফেলের ধাবমান তাজা বুলেটে। একটা নয়, দশটা নয়, নিরস্ত্র পিতার প্রশস্ত বুকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে ছুটে এসেছিল ঘাতকের তপ্ত বুলেট!

আহ, কী ভয়ংকর, কী নিষ্ঠুর সেই শব্দ। অটোমেটিক রাইফেলের গগনবিদারী শব্দে কেঁপে ওঠে সেই সিঁড়ি, ধানমন্ডির ঐতিহাসিক সেই বাড়ি! বুলেট–গুলি অনবরত খাবলে খেয়ে ফেলে তাঁর বিশাল হৃদয়ের হৃৎপিণ্ডটাকে!

অবিশ্বাস্য হলেও সত্য যে প্রাণহীন কংক্রিটের মোজাইক আলপনা আঁকা সেই সিঁড়ি কৃতজ্ঞচিত্তে বুক পেতে দেয় বঙ্গবন্ধুকে সীমাহীন ভালোবাসায়। সেই সিঁড়িই বাঙালির আদরের ধন জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে আগলে রেখেছিল তার বুকে ৩২ ঘণ্টা!

বঙ্গবন্ধুর রক্তে রঞ্জিত সেই সিঁড়িকে পরম মমতায়, ভালোবাসায় আগলে রেখেছেন যিনি, তিনি আর কেউ নন, শেখ হাসিনা।

পিতার রক্তে রঞ্জিত ৩২ যেন নিজেই আগ্নেয়গিরি।
পতাকা আর ফুলেল ভালোবাসায় আচ্ছাদিত আজ সেই সিঁড়ি।
পৃথিবীর আর কোথাও কি কোনো সিঁড়ি ভূষিত হয়েছে এমন মর্যদায়?
আছেন কি কোনো কন্যা মৃত্যুপরোয়ানাতেও নিয়েছেন এতটা দায়?
কেউ উঁকি মারিনি একটিবারও সেই সিঁড়িতে!
পবিত্র রক্তের স্রোতধারা ছুটেছিল যে প্রভাতে।
পদ্মা মেঘনা যমুনায়
আজও লাল সেই রক্ত বয়ে যায়
কোটি বাঙালির শ্রদ্ধা ভালোবাসায়…।

পাভেল রহমান আলোকচিত্রী

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন