আমার নিজের জীবনেও শ্রমজীবী মানুষের ভালোবাসার এ গল্প অনেক দীর্ঘ। আজ এত দিন পরে এমন ভালোবাসার দু-একটি গল্প বললে অপরাধবোধ হয়তো কিছুটা লাঘব হতে পারে। এসএসসি পরীক্ষার আগে শীতকালে স্কুলে কোচিং শেষ হতে হতে সন্ধ্যা নেমে যেত গ্রামে। আমাদের গ্রামের সুখ কাকু প্রতিদিন দাঁড়িয়ে থাকতেন গেটের বাইরে। বাড়িতে পৌঁছে দিয়ে যেতেন মায়ের হাতে, অথচ কেউ তাঁকে বলেননি ওই দায়িত্ব পালন করতে। গ্রামে সাধারণত একই ভিটায় অনেক পরিবার বাস করে। একদিন জ্যোৎস্না রাতে দেখি স্কুলে পড়া ১২-১৩ বছরের অনিতা তাঁদের কুঁড়েঘরের সামনে পিঁড়িতে বসে রাতের খাবার খাচ্ছে। আমাকে দেখে অনিতা বলেছিল, ‘শাক দিয়ে চাটটি ভাত খাবি, দাদা?’ আমি খেতে চাইনি বলে যে কী কষ্ট পেয়েছিল এই সরল মেয়েটি, আজ বড় হয়ে তা বুঝতে পারি। আর তা মনে পড়লে আজও চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। পশ্চিম ধারের বাড়ির সদানন্দ দাদা প্রতি রাতে রাতের খাবার শেষ করেই চলে আসতেন আমাদের বাড়ি। আমার পড়ার টেবিলে একটি চেয়ার টেনে বসে থাকতেন আমি না ঘুমানো পর্যন্ত। বলতেন, ‘পড়ো, মন দিয়া পড়ো। তোমাকে ডাক্তার হইতে হবে। বড় ডাক্তার হইয়া আবার গ্রামে চইলা আসবা।’ আমাদের সময়ে ডাক্তারি বা ইঞ্জিনিয়ারিং পড়াকে মনে করা হতো অনেক বড় কিছু। আমি যখন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে পদার্থবিদ্যায় ভর্তি হলাম, বড় বাড়ির ফজল ভাই বলেছিলেন, ‘শুইনা খুব কষ্ট পাইলাম। আমার অনেক আশা ছিল তুমি বড় কিছু হবা।’

ঢাকায় আমাদের বাসায় একবার কমলা নামের একটি মেয়ে কাজ করত। আমি সাধারণত সকালে বেরিয়ে গিয়ে রাতে বাড়ি ফিরতাম। দুপুরে বাইরে খেতাম। কদাচিৎ দুপুর দুইটার দিকে বাড়িতে চলে আসতাম। এমন প্রায়ই হতো যে কমলা তাঁর নিজের খাবারের প্রস্তুতি নিচ্ছে। জিজ্ঞেস করতাম, ‘কমলা, ভাত আছে, খাওয়াতে পারবি?’ হ্যাঁ সূচক জবাব দিয়েই সে টেবিলে আমার জন্য খাবার সাজিয়ে দিত। আমি খাওয়া শেষ করে রান্নাঘরে ঢুকে দেখি, সে ভাতের মধ্যে ডিম আর আলু সেদ্ধ করছে। আমি বুঝলাম, সে নিজের খাবার আমাকে দিয়েছে। আমি এ জন্য বকা দেওয়ার পরিবর্তে চোখের জল সংবরণ করার জন্য নিজের কক্ষে ফিরে গিয়ে দরজা বন্ধ করে অঝোরে কেঁদেছি। অথচ দেখুন, গৃহকর্তারা গৃহকর্মীদের প্রায়শই চোর বলে সাব্যস্ত করে থাকেন। বিয়ে ঠিক হলে কমলা গ্রামে চলে যায়। যাওয়ার দিন কমলা বলেছিল, ‘মামা, আমার বিয়েতে আপনি যাবেন না?’ অপরাধবোধের কথা আগেই উল্লেখ করেছি। কথা দিয়েছিলাম, যাব; কিন্তু যাওয়া হয়নি। কিছু টাকা পাঠিয়ে দায়িত্ব শেষ করেছিলাম। একমাত্র মা-ই নিজে না খেয়ে সন্তানকে খাওয়ায়। যে কমলা আমার মায়ের উচ্চতায় উঠে গিয়েছিল, তাঁর কথা এই মধ্য গগনে একাকী জীবনে খুব মনে পড়ে।

ইংল্যান্ডের বাথ ইউনিভার্সিটিতে আমার পিএইচডি অফিসে অনেক রাত পর্যন্ত পড়াশোনা করে অফিসের মেঝেতেই ঘুমিয়ে থাকতাম প্রায়ই। আমার বিল্ডিংয়ে ক্লিনার হিসেবে যিনি কাজ করতেন, তাঁর নাম ‘পল’। ভোর পাঁচটার মধ্যেই পল এসে হাজির হতেন। অতএব, আমাকে পাঁচটার মধ্যেই উঠতে হতো এবং ভান করতে হতো যে আমি ভোরেই এসেছি। এভাবে অফিসের মেঝেতে রাতে ঘুমানো সম্পূর্ণ নিষেধ ছিল। এমন অনেক দিন হয়েছে যে বাইরে থেকে তালা খুলে পল আমাকে শায়িত অবস্থায় দেখতে পেয়েছেন কিন্তু কোনো দিন রিপোর্ট করেননি; বরং একদিন তিনি আমাকে বললেন, ‘আপনি একদম চিন্তা করবেন না। আমি কাউকে বলব না। আমি জানি আপনি অনেক কষ্ট করেন, অনেক রাত জেগে পড়াশোনা করেন, মেঝেতে ঘুমিয়ে থাকেন, আমি আসার আগে অনেক সময় উঠতে পারেন না...।’ পল আমাকে তাঁর মেয়ের বিয়েতে নিমন্ত্রণ করেছিলেন। আমি গিয়েছিলাম। আমি যাওয়ায় তাঁর সে কী আনন্দ! তাঁর মেয়ের বিয়েতে এক বিদেশি ছাত্র এসেছে—এটা ছিল তাঁর গর্বের বিষয়। ইংল্যান্ডের প্রবাস জীবনের স্মৃতি খুঁড়তে গেলে প্রথম দিকেই আমার মনে ভিড় করে মি. পলের স্মৃতি কারণ ওই বিদেশ-বিভুঁইয়ে একাকী জীবনে আমি তাঁর কাছ থেকে পিতৃস্নেহ লাভ করেছিলাম।

...এমন ভালোবাসার কী মূল্য দিতে পারি! তাই এ লেখা। আমি জানি, সের্গেই এ লেখার কথা কোনো দিন জানবেন না—জানবেন না যে আমিও তাঁকে ভালোবাসি ঠিক বাবার মতো। জানবেন না কোনো দিন ভালোবাসা যা পেয়েছি, পেয়েছি এই শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকেই। নারীর কাছ থেকে প্রেমের নামে যা এসেছিল, তার সবই ছিল বিষ মিশ্রিত নকল ভালোবাসা।

সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটিতে চাকরি নিয়ে আমি রাশিয়া যাই ২০১৬ সালের জুলাই মাসে। কর্তৃপক্ষ আমাকে থাকতে দিয়েছিল ক্যাম্পাসে ২৪ তলার একটি সুসজ্জিত ভবনে। আমার অ্যাপার্টমেন্ট যিনি দেখাশোনা করেন, তাঁর নাম সের্গেই, বয়স ষাটের মতো হবে। তাঁর কাজ আমার ঘরের কোনো কিছু নষ্ট হলে বা ভেঙে গেলে তা ঠিক করা, নতুন কিছু লাগলে তা এনে দেওয়া, আমার আর কিছু লাগবে কি না, তা মাঝে মধ্যে এসে জিজ্ঞাসা করা। কিন্তু নির্দিষ্ট করা তাঁর এসব দায়িত্বের চেয়েও অনেক বেশি করেন তিনি আমার জন্য; যেমন আমার গাছে জল দেওয়া, ঘর সাজাতে সাহায্য করা, বাজার থেকে ফিরে এলে ব্যাগগুলো ওপরে নিয়ে আসা ইত্যাদি। তিনি প্রায়ই কারণে-অকারণে আমার ঘরে বেল দিয়ে চমৎকার একটা হাসি দিয়ে অভিবাদন করেন আর জিজ্ঞাসা করেন, ‘কেমন আছ, প্রফেসর? সব ঠিক আছে? কোনো সমস্যা নেই তো? কিছু লাগবে নাকি?’ আমি বুঝি তিনি এসব করেন আমার প্রতি এক গভীর ভালোবাসা থেকে, এক ভিনদেশির প্রতি সহমর্মিতা থেকে। কিন্তু আমি খোঁজ নিয়ে দেখেছি, তিনি এত কিছু সব ভিনদেশির জন্য করেন না। আমি বোঝার চেষ্টা করেছি, তিনি আমাকে কেন এত কদর করেন?

যতবারই তাঁর সঙ্গে দেখা হয়, আমি হাত বাড়িয়ে দিই করমর্দন করার জন্য। আবার দুই হাত খালি থাকলে বাঙালি-ভারতীয় কায়দায় নমস্কার দিই। জোর করে কখনো ঘরে নিয়ে আসি। যখনই তিনি আসেন, আমি তাঁকে কফি খেতে বলি; কিন্তু লাজুক প্রকৃতির সের্গেইকে আজও কফি খাওয়াতে পারিনি। শুধু একদিন জোর করে নতুন বছরের শুরুতে এক ব্যাগ চকলেট দিতে পেরেছিলাম।

তিনি আমাকে অবাক করে দিয়ে একদিন সকালে আমার ঘরে এসে উপস্থিত, হাতে কাচের দুটি পাত্র নিয়ে। ভেতরে এসে ব্যাগ থেকে ওগুলো বের করে বুঝিয়ে বললেন, ‘এটা আমাদের বাগানের ফলের তৈরি জ্যাম। আর এটা পাঁচমিশালি ফল দিয়ে তৈরি ঘন রস। তুমি এগুলো প্রতিদিন সকালে খাবে। বুঝেছ? বাজারের জিনিস তুমি খাবে না। এতে তোমার ঠিক এক মাস চলে যাবে। এক মাস পরে আবার দিয়ে যাব। এখন আমি যাই। অনেক কাজ। পরে দেখা হবে।’ আমি তড়িঘড়ি কফি বানাতে যাই। কিন্তু সের্গেই থাকেন না। তিনি চলে যান আর রেখে যান আমার জন্য বেদনামিশ্রিত ভালোবাসা আর চোখের জল। আমার মনে পড়ে বাবার কথা, মায়ের কথা। ভেবে কূল পাই না এত ভালোবাসা সের্গেই কোথায় পেয়েছেন!

আমার আগের জ্যাম দু-এক দিনের মধ্যেই শেষ হবে—এমনই অবস্থা। সের্গেই ঠিক সেদিনই এসে হাজির আবার এক বিশাল কাচের পাত্রভর্তি ঘরে বানানো জ্যাম নিয়ে। তাঁকে খুশি করার জন্য তাঁর সামনেই কাচের পাত্রটি খুলে ঘন কালচে লাল জ্যাম এক চামচ মুখে দিয়ে বললাম, ‘ওয়াও! দারুণ হয়েছে। আমি এখনো নাশতা করিনি। আমি এটা দিয়েই এখন নাশতা করব। আপনি বসুন। এক্ষুনি নাশতা রেডি করছি। দুজনে একসঙ্গে খাব।’ কিন্তু সের্গেই আমার কথায় কর্ণপাত না করে বলেন, ‘না না আমার সময় নেই। তুমি খাও। এটা তোমার জন্য। সাইবেরিয়ার ঠান্ডায় তোমার শরীর ঠিক রাখা দরকার। দাস-ভিদানিয়া (বিদায়!)।’

কী সহজেই সের্গেই আমাকে বিদায় জানিয়ে চলে গেলেন; কিন্তু আমি তো সে বিদায় গ্রহণ করতে পারিনি অত সহজে। সারা দিন তাঁর এই ভালোবাসার কথা মাথার মধ্যে ঘুরপাক খেয়েছে। বারবার মনে হয়েছে, এমন ভালোবাসার কী মূল্য দিতে পারি! তাই এ লেখা। আমি জানি, সের্গেই এ লেখার কথা কোনো দিন জানবেন না—জানবেন না যে আমিও তাঁকে ভালোবাসি ঠিক বাবার মতো। জানবেন না কোনো দিন ভালোবাসা যা পেয়েছি, পেয়েছি এই শ্রমজীবী মানুষের কাছ থেকেই। নারীর কাছ থেকে প্রেমের নামে যা এসেছিল, তার সবই ছিল বিষ মিশ্রিত নকল ভালোবাসা।

কিন্তু এ তো শুধু এক জীবনের গল্প। এক জীবনের গল্প দিয়ে তো আর সাধারণীকরণ করা চলে না; বরং ‘প্রতিটি সফল পুরুষের জীবনের কেন্দ্রে ছিল একজন নারীর প্রেরণা’—এমন গল্পই জীবনের গল্প। সমরেশ মজুমদারের উপন্যাস কালবেলার নায়ক অনিমেষের তৃষ্ণার্ত জীবনে যেমন মাধবীলতা এক গ্লাস ঠান্ডা জল হয়ে এসেছিল, তেমনি নিশ্চয়ই একদিন কেউ এসে হাজির হবে সকালে, দুপুরে কিংবা বিকেলে—এই আশায় দিন কাটুক। সুনীল যেমন বলেছেন কবিতার ভাষায়—
তবু দিন কাটে, দিন কেটে যায়
আশায় আশায় আশায় আশায়...

ড. এন এন তরুণ রাশিয়ার সাইবেরিয়ান ফেডারেল ইউনিভার্সিটির অর্থনীতির ভিজিটিং প্রফেসর ও সাউথ এশিয়া জার্নাল-এর এডিটর অ্যাট লার্জ। [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন