বিজ্ঞাপন

আবদুস সোবহান সাহেবের সব কীর্তির বয়ান এই পরিসরে দেওয়া অসম্ভব। তবে একটা–দুটো বলা যায়। যেমন: নিয়োগ নীতিমালায় আছে, কেউ শিক্ষক হতে গেলে তাঁর ন্যূনতম সিজিপিএ ৩.৫ থাকতে হবে। আর ব্যাচে প্রথম সাতজনের মধ্যে থাকতে হবে। কিন্তু এ টি এম শাহেদ পারভেজ নামের এক লোকের সিজিপিএ ছিল ৩.৫–এর নিচে, ফলে প্রথম সাতজনের মধ্যে তাঁর থাকা হয়নি।

কিন্তু দেখা গেল শাহেদ পারভেজ ঘটনাক্রমে আগেই উপাচার্যের জামাই হয়ে বসে আছেন। সেই যোগ্যতার ফাঁপরে পড়ে আইন নিজেই নিজের গতিতে নিজেকে পাল্টিয়ে শাহেদ পারভেজের পায়ে পড়ল। উপাচার্য প্রিয় জামাইকে শিক্ষকতার মতো মহান পেশায় পুনর্বাসিত করার মানসে সিন্ডিকেট সভা করলেন।

সেই সভায় আবেদনকারীর ন্যূনতম যোগ্যতা কমিয়ে সিজিপিএ ৩.২৫ করে নিলেন। অযোগ্য জামাই যোগ্য হয়ে উঠলেন। মেয়েই বা বঞ্চিত থাকবেন কেন? শাহেদ পারভেজের স্ত্রীকেও আইন ভেঙে শিক্ষক বানিয়ে দিলেন। যেহেতু ‘জামাইয়ের জন্য মারে হাঁস, বাড়িসুদ্ধ খায় মাস’, সেহেতু জামাইয়ের জন্য শিথিল করা নীতিমালার হাত ধরে সেই সময় যোগ্য প্রার্থীদের বাদ দিয়ে অপেক্ষাকৃত কম যোগ্য আরও ৩৪ জনকে শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হলো।

এ ধরনের নিয়োগ রংপুরেও কম হয়নি। সেখানকার বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে অতি উচ্চফলনশীল বিষবৃক্ষ লাগিয়ে তাতে পর্যাপ্ত সেচ ও সার দিয়েছেন উপাচার্য নাজমুল আহসান কলিমউল্লাহ। তাতে বাম্পার ফলন হয়েছে। কলিমউল্লাহ দিনের পর দিন ক্যাম্পাসে না এসেও অবৈধভাবে বিজনেস স্টাডিজ, সামাজিক বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি অনুষদের ডিন এবং এর পাশাপাশি সমাজবিজ্ঞান বিভাগের বিভাগীয় প্রধানের গদি কামড়ে আছেন।

এর বাইরে তিনি কোষাধ্যক্ষ এবং একটি রিসার্চ ইনস্টিটিউটের পরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বিদ্যোৎসাহী এই শিক্ষক টেলিভিশনে টক শোতে ‘লং লং টক’ করার পাশাপাশি একাই বিভিন্ন বিভাগের শিক্ষার্থীদের অর্ধশতাধিক কোর্স পড়ানোর কাজ করেন এবং কোনো কোর্সেই না পড়িয়ে পারিতোষিক বাবদ লাখ লাখ টাকা বিল তুলে মনের ভুলে খেয়ে ফেলেছেন।

ঢাকায় লিয়াজোঁ অফিসে বসে তিনি সমানে সিন্ডিকেট সভা, নিয়োগ বোর্ডসহ অনেক সভা করে যাচ্ছেন। এতে বিশ্ববিদ্যালয়ের লাখ লাখ টাকা যাতায়াত বাবদ ব্যয় দেখানো যাচ্ছে। এই ভিসি এতটাই মাতৃভক্ত যে তাঁর মা নিলুফার বেগম কোনো দিন কোনো বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতা না করলেও একান্ত শ্রদ্ধাবশত তাঁকে তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের নিয়োগ বোর্ডের সদস্য করেছেন।

এবার খুলনার দিকে তাকান। সেখানে খুলনা কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি শহীদুর রহমান খান নিজের ছেলেকে ‘অ্যাডহক’ ভিত্তিতে সেকশন অফিসার পদে নিয়োগ দিয়ে বাৎসল্যের পরিচয় দিয়েছেন। ‘আমার চক্ষে পুরুষ-রমণী কোনো ভেদাভেদ নাই’ নীতি মেনে ঘোলাটে প্রক্রিয়ায় নিজের মেয়েকেও নিয়োগ দিয়েছেন শিক্ষক হিসেবে। ছেলে–মেয়েকে চাকরি দেওয়ার পর স্ত্রীকে বঞ্চিত করলে লোকে ছোটলোক বলতে পারে—হয়তো এমন আশঙ্কা থেকে তিনি উপজেলা প্রাণিসম্পদ কর্মকর্তা হিসেবে কর্মরত নিজের স্ত্রীকেও অধ্যাপক পদে নিয়োগ দেওয়ার চেষ্টায় নেমেছিলেন। মন্ত্রণালয়ের কারণে হয়ে ওঠেনি।

গোপালগঞ্জের বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য খোন্দকার নাসির উদ্দিন যা করে গেছেন, তা এক অমর ইতিহাস। তাঁর কীর্তির যথার্থ মর্মার্থ ধরতে না পেরে শিক্ষার্থীরা তাঁর বিরুদ্ধে আন্দোলনে নেমেছিলেন এবং তাঁকে সরিয়ে দেওয়া হয়েছিল। হাজারখানেক টাকা দামের একটা বনসাইয়ের দাম কীভাবে কাগজে–কলমে ছয় লাখ টাকা দেখাতে হয় এবং কোনো রকম উন্নয়নকাজ না করেও ১০ কোটি টাকা কীভাবে খরচ করতে হয়, জাতিকে তিনি তা হাতে ও কলমে দেখিয়েছেন।

এ ছাড়া তিনি মাত্র ২৪ জন আত্মীয়কে এই প্রতিষ্ঠানে চাকরি দিয়েছেন। ছাত্রছাত্রীরা এ নিয়ে তাঁর সঙ্গে কথা বলতে গেলে তিনি সমাজে তাঁর স্থানটি যে কত গুরুতর এবং ছাত্রছাত্রীদের অবস্থান যে কত লঘুতর তার রেখাচিত্র তুলে ধরেছিলেন। সোঁদা মাটির গন্ধমাখা আঞ্চলিক ভাষায় তিনি শিক্ষার্থীদের মৃদু ভর্ৎসনা করে বলেছিলেন, ‘তোর বাপ এহেনে (এখানে) কী চালায়? কী চালায় ক দিনি তোর আব্বা? এ জানোয়ারের দল! এ জানোয়ার, তোগে তো লাথি দিয়ে অ্যান্নে (এখন) বাইর কইরে দিতি মন চাচ্ছে।’

নাসির উদ্দিনের স্বহস্ত-নির্বাচিত নিয়োগপ্রাপ্ত আত্মীয়স্বজন এখন গোটা ক্যাম্পাসকে ‘মিলেমিশে আছে ওরা আত্মীয় হেন’ টাইপের একটি পারিবারিক আবহে রূপ দিয়েছেন।
জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়ে ভিসি ফারজানা ইসলামের বিরুদ্ধে লাগাতার আন্দোলন হয়েছিল। তিনি বিশেষ গা করেননি। ১ হাজার ৪৪৫ কোটি টাকার উন্নয়নকাজ মসৃণভাবে যাতে অগ্রসর হতে পারে সে জন্য মাথা গরম করা কিছু ছাত্রকে তিনি ১ কোটির বেশি টাকা ঈদের সালামি দিয়েছিলেন বলে খবর বেরিয়েছিল।

তার জের ধরে ছাত্রলীগের নেতৃত্বে পর্যন্ত বদল এসেছিল। কিন্তু ফারজানার গদি বদলায়নি। তিনি তাঁর স্বামী জনাব আখতার হোসেনকে বিশ্ববিদ্যালয়ে শিক্ষকতার চাকরি দেননি। তবে বিশ্ববিদ্যালয়ের একমাত্র ‘মহিলা ক্লাব’টির সভাপতির পদটি উপহার দিয়েছেন।

কত বলব? লিস্টি তো অনেক বড়। ঢাকার ইসলামিক আরবি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মুহাম্মদ আহসান উল্লাহ, টাঙ্গাইলের মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি মো. আলাউদ্দিন, নোয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি এম অহিদুজ্জামান, জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি এ এইচ এম মোস্তাফিজুর রহমান ও যশোর বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক ভিসি মো. আবদুস সাত্তারের বিরুদ্ধে ওঠা অভিযোগ খতিয়ে দেখা হয়েছে বা হচ্ছে।

এক চাকরিপ্রার্থীর কাছ থেকে টাকা নেওয়ার অভিযোগে বেশ কিছুদিন পাবনা বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য এম রুস্তম আলীর পদত্যাগ চেয়ে আন্দোলন করেছেন শিক্ষার্থীরা। বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয়ের সাবেক উপাচার্য এস এম ইমামুল হকের পদত্যাগের দাবিতে শিক্ষার্থীরা তুমুল আন্দোলন গড়ে তুললে তাঁকে বাধ্যতামূলক ছুটির নামে মেয়াদ শেষ করার সুযোগ দেওয়া হয়। এই রকম প্রায় দুই ডজন উপাচার্যকে জড়িয়ে স্বজনপ্রীতি, নিয়োগে অনিয়ম, ভবন নির্মাণ ও কেনাকাটায় আর্থিক দুর্নীতির খবর এসেছে। এ নিয়ে তদন্তও হচ্ছে বা হয়েছে।

এত অনিয়ম ও দুর্নীতির পরও কারও কিছুই হচ্ছে না। মহান উদার বাদশাহ আলমগীরের মতো এই সব সম্মানিত শিক্ষকের মর্যাদা অটুট রাখতে সরকার তাঁদের সাধারণত কিছু বলে না। দুদকের মামলায় শুধু জেল খেটেছিলেন বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে নিয়োগ-অনিয়মে রেকর্ড গড়া সাবেক উপাচার্য মু. আবদুল জলিল মিয়া।
বাকিদের সাজা হয়নি। হয়তো হবে না।

কারণ শিক্ষাক্ষেত্র আসলে রাষ্ট্রীয় রাজনীতিরই সম্প্রসারণ। এই পরিসর বড় হচ্ছে। অতএব, ‘বাচ্চালোগ, তালিয়া বাজাও!’

সারফুদ্দিন আহমেদ প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ সহসম্পাদক
ই–মেইল: [email protected]

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন
বিজ্ঞাপন
বিজ্ঞাপন