এ অবস্থার মধ্যে রিপোর্টার্স উইদাউট বর্ডারস (আরএসএফ) ২০২২ সালের বিশ্ব মুক্ত সংবাদমাধ্যম সূচক প্রকাশ করেছে। এ সূচকে আমরা কখনোই খুব বেশি ভালো অবস্থানে ছিলাম না। এবারও তার ব্যতিক্রম হয়নি। বরং অনুমিতভাবেই সূচকে আমাদের দেশের অবস্থান আরও নিচে নেমে গেছে। গতবার অবস্থান ছিল ১৫২। এবার ১০ ধাপ কমে ১৬২ হয়েছে। দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে আমাদের অবস্থান সবার নিচে। এমনকি যুদ্ধবিধ্বস্ত ও তালেবানশাসিত আফগানিস্তানের চেয়েও আমাদের পরিস্থিতি খারাপ। আরএসএফের মতে, বাংলাদেশের সংবাদমাধ্যমের পরিস্থিতি খুবই বাজে।

রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক, সামাজিক, আইনবিষয়ক ও নিরাপত্তার পরিস্থিতিকে বিবেচনা করে আরএসএফ মুক্ত সংবাদমাধ্যমের সূচক তৈরি করেছে। বিশ্লেষণ করলে দেখা যাবে, প্রতিটি ক্ষেত্রেই আমাদের সংবাদমাধ্যম বাজে অবস্থায় রয়েছে। প্রথমেই রাজনৈতিক প্রসঙ্গ নিয়ে আলাপ করা যেতে পারে। রাজনৈতিক চাপ, হামলা-মামলার কারণে দেশে সাংবাদিকতা করা অনেকটা আতঙ্কের বিষয়ে পরিণত হয়েছে। পরিস্থিতি এতটাই খারাপ যে সাংবাদিকতা করা অনেকটা হাত-পা বেঁধে পুকুরে ফেলে দিয়ে কুমিরের সঙ্গে লড়াই করার মতো পরিস্থিতি বলে সরকার-সমর্থক প্রবীণ সাংবাদিকেরাই বলছেন। এ মন্তব্য থেকেই দেশে সংবাদমাধ্যমের স্বাধীনতার বিষয়টি আঁচ করা যায়।

সমালোচনামূলক রাজনৈতিক স্যাটায়ার বা কার্টুন এখন সংবাদমাধ্যম থেকে বলতে গেলে রীতিমতো উধাও। পরিস্থিতি অনুধাবন করে প্রথিতযশা অনেক কার্টুন আঁকিয়ে হাত-পা গুটিয়ে আছেন নিজস্ব নিরাপত্তার খাতিরে।

আপাতত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের গণতন্ত্র ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয়েছে এক দশক ধরেই। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে সংবাদমাধ্যম, ব্যক্তিস্বাধীনতাও ভালো অবস্থায় থাকার কথা নয়। আমাদের দেশে তা নেইও। বিভিন্ন দেশের ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দমবন্ধ করা অবস্থারই প্রতিফলন হচ্ছে। সরকার যতই নাকচ করে দিক, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকে চাপের মুখে রাখুক, অনুগত সংবাদমাধ্যম দিয়ে প্রচারণা চালাক, সত্য বেরিয়ে আসবেই।

একটু এদিক-সেদিক হলেই সরকার-সমর্থকদের হুমকি-ধমকির সঙ্গে আছে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের প্রয়োগ। বন্ধ করে দেওয়া হয়েছে অনেক সংবাদমাধ্যম। আরএসএফ জানাচ্ছে, সরকারকে বিরাগভাজন করে সংবাদকর্মীরা তথ্য প্রকাশে সাহসী হচ্ছেন না। ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের (ডিএসএ) ৫৭ নম্বর ধারায় সারা দেশে কমপক্ষে ২৫ সাংবাদিকের বিরুদ্ধে মামলা করা হয়েছে কেবল ২০১৭ সালেই। এই আইনের বিভিন্ন ধারায় দোষী সাব্যস্ত হলে ১৪ বছরের কারাদণ্ড, ৫০ লাখ টাকা জরিমানার বিধান রাখা হয়েছে। ঢাকার গণমাধ্যমগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যাচ্ছে, গত দুই বছরে ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনে ১ হাজার ৪০০ মামলা হয়েছে। এর ১৬ শতাংশ মামলাই সাংবাদিকদের বিরুদ্ধে করা হয়েছে। এর আগে ২০১৯ থেকে ২০২১ সাল পর্যন্ত ১ হাজার ৫০০ মামলার মধ্যে ৭৫৪টি মামলায় ১ হাজার ৮৪১ জনকে আসামি করা হয়েছে। আসামিদের ২৫ শতাংশই সংবাদকর্মী। ওই সময় ৬৫৫ জনকে আটক করা হয় ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের আইনের মামলায়। (সূত্র: অধ্যাপক আলী রীয়াজের প্রবন্ধ)।

সরকারের চাপের পাশাপাশি যুক্ত হয়েছে সরকার-সমর্থক সংবাদমাধ্যম ও সরকারবিরোধীদের সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ভুয়া সংবাদের প্রোপাগান্ডা। এটাও স্বাধীন ও সুস্থ সাংবাদিকতাকে বাধাগ্রস্ত করছে। বিভিন্ন আইনি বেড়াজালের কারণে সব সময় সব তথ্য প্রচার করা যাচ্ছে না, এটা যেমন সঠিক, আবার এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে অতিমাত্রায় সরকারের গুণগান করে সংবাদ প্রচার ও প্রচারণা।

আরএসএর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, সরকারি প্রচারমাধ্যমগুলোর সঙ্গে বেসরকারি সংবাদমাধ্যমও এ প্রক্রিয়ায় যুক্ত হয়েছে। অনেক সময় বিরোধী দল বা নিরীহ পথচারীদের ওপর সরকারি দলের হামলাকারীদের পরিচয় প্রকাশ করা হয় না। দীর্ঘদিন ধরেই গুম ও বিনা বিচারে হত্যার সংবাদ পুরোপুরিই সরকারি ভাষ্যের ওপর নির্ভর করে প্রকাশ করা হয়। দু–একটি ব্যতিক্রম বাদ দিলে গুম বা বিনা বিচারে হত্যার অনুসন্ধানী প্রতিবেদন খুব বেশি প্রকাশ করা হয় না।

এখানে আইনের চাপ ও সরকার অনুগামী সাংবাদিকতা—দুটিই আছে। সাংবাদিকতা ও গণমাধ্যম অধ্যয়নে ‘পলিটিক্যাল প্যারালালিজম’ বলে একটি জিনিস পড়ানো হয়। এ ধারণা অনুসারে সংবাদমাধ্যম রাজনৈতিক আদর্শ বা দলের সমান্তরালে কাজ করে ওই আদর্শ বা দলের গুণগান প্রচার করে। আমাদের দেশে সরকারের পক্ষে পলিটিক্যাল প্যারালালিজম খুবই প্রকট আকার ধারণ করেছে। সরকার-সমর্থক মালিকপক্ষ ও সাংবাদিকদের কারণে পরিস্থিতি এতটাই ভয়াবহ যে স্বাভাবিক সাংবাদিকতা করাই এখন মুশকিলের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে।

সরকারি চাপ ও দলপন্থী সাংবাদিকতার কারণে যেহেতু স্বাভাবিকভাবে তথ্য প্রকাশিত ও প্রচারিত হচ্ছে না, তাই সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ওপর সাধারণ মানুষের নির্ভরতা বাড়ছে। এ সুযোগে চটকদার, ভুয়া সংবাদের এখন রমরমা অবস্থা। এ ক্ষেত্রে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের অবস্থা খুবই ভয়াবহ। ফেসবুক বা ইউটিউব চ্যানেল খুলে যে যাঁর মতো করে সংবাদ, বিশ্লেষণ প্রচার করছেন। এর কিছু মোটামুটি মানসম্পন্ন হলেও বড় একটি অংশই চরিত্রহনন, বিদ্বেষ ছড়ানোর কাজ করছে। ধর্মীয় বিদ্বেষ প্রচার করে সংঘাতময় পরিস্থিতির সৃষ্টি করা হচ্ছে। রাজনৈতিক নেতা-কর্মী ছাড়াও সাংস্কৃতিক ও সংবাদকর্মীদের বিরুদ্ধেও ভুয়া তথ্য প্রচার করা হচ্ছে। তাঁদের বড় একটি অংশ প্রবাসে বসে এসব প্রচারণা করছেন। ফলে সরকার তাঁদের নিয়ন্ত্রণও করতে পারছে না। তাই ফেসবুক পেজ বা ইউটিউব চ্যানেল বন্ধ করছে সরকার। কিন্তু নানাভাবে এসব তথ্য দেশের মানুষের কাছে পৌঁছে যাচ্ছে।

অবাধ তথ্যপ্রবাহের যুগে বন্ধ করে, আইন করে তথ্যের বিস্তার রোধ করা যায় না। বরং এতে অপ্রচলিত মাধ্যমে তথ্যের আদান-প্রদান আরও বৃদ্ধি পায়। বরং এভাবে তথ্য আদান-প্রদানের ফাঁকে ভুয়া তথ্যের প্রকোপ বৃদ্ধি পাচ্ছে। আরএসএফের এবারের প্রতিবেদনেও বিষয়টি উল্লেখ করা হয়েছে। এতে বলা হয়েছে, কর্তৃত্ববাদী শাসকেরা গণমাধ্যমের ওপর কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ আরোপ করছে বিভিন্ন আইন প্রয়োগ করে। এটা আন্তর্জাতিক ও অভ্যন্তরীণ রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই হচ্ছে। সমান্তরালভাবে ভুয়া সংবাদের প্রকোপও বাড়ছে বলে এতে বলা হয়েছে। এই ভুয়া সংবাদের প্রচারণা সরকার পক্ষের লোক ও বিরোধী পক্ষ—উভয় দলই করে থাকে। তবে ভুয়া তথ্যের মিছিল থেকে কর্তৃত্ববাদী শাসকেরাই লাভবান হচ্ছেন।

আমরাও এ পরিস্থিতির বাইরে নই। গত ১০ বছরে এ রকম উদাহরণ ভূরি ভূরি আছে। নানা ধরনের ভুয়া তথ্য ছড়িয়ে সাধারণ মানুষকে উত্তেজিত করে সংখ্যালঘু জনগোষ্ঠীর মন্দির, বাড়িঘরে হামলা করা হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী হামলা ঠেকাতে ব্যর্থ হয়েছে। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ধরে আয়োজন করে হামলা হয়েছে, লুটপাট হয়েছে। সব শেষ হওয়ার পর পুলিশ পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করেছে। অনেকটা রোগী মারা যাওয়ার পর ডাক্তার আসার মতো অবস্থা। এরপর গণমামলা করে বিরোধী পক্ষের নেতা-কর্মীদের আটক করা হচ্ছে।

আপাতত এ পরিস্থিতি থেকে উত্তরণের কোনো লক্ষণ দেখা যাচ্ছে না। আমাদের গণতন্ত্র ঝুঁকির মধ্যে পতিত হয়েছে এক দশক ধরেই। ন্যূনতম গণতান্ত্রিক পরিবেশ না থাকলে সংবাদমাধ্যম, ব্যক্তিস্বাধীনতাও ভালো অবস্থায় থাকার কথা নয়। আমাদের দেশে তা নেইও। বিভিন্ন দেশের ও আন্তর্জাতিক সংস্থার প্রতিবেদনে দমবন্ধ করা অবস্থারই প্রতিফলন হচ্ছে। সরকার যতই নাকচ করে দিক, ডিজিটাল সিকিউরিটি আইন দিয়ে স্থানীয় গণমাধ্যমকে চাপের মুখে রাখুক, অনুগত সংবাদমাধ্যম দিয়ে প্রচারণা চালাক, সত্য বেরিয়ে আসবেই।

ড. মারুফ মল্লিক রাজনৈতিক বিশ্লেষক

কলাম থেকে আরও পড়ুন
মন্তব্য করুন